
শেষ আপডেট: 2 December 2021 03:33
ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময় প্রথমবার ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত হন ঐন্দ্রিলা। সেই সময় দিল্লির হসপিটালে ভর্তি ছিলেন তিনি, ষোলোটা কেমো নেওয়ার পর ক্যানসারকে জয় করে ফিরেছিলেন জীবনে। তারপর দাপিয়ে অভিনয় করেছেন টেলিভিশনে। লড়াই করে তৈরি করে নিয়েছিলেন নিজের জায়গা। কিন্তু জীবনের লড়াইয়ে তাঁকে ফিরতে হয় আবারও। গত বছরেই দ্বিতীয়বার ক্যানসারে আক্রান্ত হন অভিনেত্রী।
তার পর থেকেই ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে নিয়মিত লিখতে শুরু করেছিলেন সব্যসাচী। তিনি জানিয়েছেন, এভাবে ফেসবুকে লেখা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। তিনি কখনওই চার বছরের সম্পর্কের তেমন কোনও কথা, ছবি, গল্প সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করেননি। তবে ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে নিয়মিত লেখা শুরু করার পরে অজস্র মানুষ জড়িয়ে যান তাঁদের এই জার্নির সঙ্গে। শুভেচ্ছা, শুভকামনা, প্রার্থনারা ভিড় করে প্রতিটি পোস্টে।
এদিন সব্যসাচী লিখেছেন, সেই গোড়ার দিনের কথা। তাঁর লেখায়, "সিনেমার গল্প ভালোবাসো নিশ্চয়, তাহলে বাস্তবের গল্পটাও শোনো। ১৪ই ফেব্রুয়ারী নাকি ভালোবাসার দিবস, আমি বড়ই কাঠখোট্টা মানুষ, এসব বিশেষ দিনে কিছুই করি না কখনও। কিন্তু এই বছর, এই প্রথমবার তিনি বায়না করেছিলেন যে দিনটি মাসের দ্বিতীয় রবিবার, তাই দুজনেরই ছুটি, অতএব রাতে রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে হবে। ভালো কথা, টেবিল বুক করা হলো, বললো দুপুরে একটু ঘুমাচ্ছি, উঠে তৈরী হবো। ঘুমালো কিন্তু আর উঠতে পারলো না। পিঠের যন্ত্রনায় পরিত্রাহি চিৎকার করছে, এদিকে আমি বুঝতেই পারছি না যে কি হয়েছে। অগত্যা খেতে যাওয়া বাতিল করে আমি নিজেই রান্না করে খাওয়ালাম, তখনও আমরা ভাবছি যে পিঠের মাংসপেশিতে টান লেগেছে বোধহয়। পরের দিন জানা গেলো ছয় বছর আগের সেই কালসদৃশ অসুখ আবার ফিরে এসেছে এবং ফুসফুসে এক লিটার রক্ত জমেছিলো, আমরা কেউ তা বুঝিনি। এর পর থেকে, আমাদের জীবনে আর কোনও নির্দিষ্ট ভালোবাসার দিন নেই। জীবনেও তা পালন করবো না।"
এর পর চিকিৎসা শুরু হয় ঐন্দ্রিলার। সে সময়ে ঐন্দ্রিলা কাঁদতেন, চিকিৎসা করাতে চাইতেন না, ওষুধপত্র ফেলে দিতো। আসলে তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি যে ছ'বছর আগের সেই বীভৎসতা আবার ফিরে এসেছে জীবনে এবং আরও বড় আকারে।
সব্যসাচী লিখেছেন, "একটা মেয়ে অনন্ত নিশি থেকে ধূমকেতুর মতন ছুটে এসে ফের নিকষ অন্ধকারে হারিয়ে যাবে, সেটা আমিও ঠিক মেনে নিতে পারিনি। আজ আমি অকপটে স্বীকার করতেই পারি যে আমি বড়ই স্বার্থপর, তোমাদের আপডেট দেওয়ার একটাই উদ্দেশ্য ছিল আমার। আমি চেয়েছিলাম তোমাদের মনে ওকে বাঁচিয়ে রাখতে, ওকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে যে তোমায় কেউ ভোলেনি, কয়েক হাজার মানুষ স্বার্থহীন ভাবে অপেক্ষা করছে, ভালোবাসছে, প্রার্থনা করছে তোমার জন্য। তাই লজ্জার মাথা খেয়ে আমি প্রতি মাসেই কলম ধরেছি।"
এর পরে ভাল খবর দিয়েছেন সব্যসাচী, জানিয়েছেন ঐন্দ্রিলার চিকিৎসা শেষ হওয়ার কথা। এ কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন এক পুরোনো সিনেমার দৃশ্যকল্প। তাঁর লেখায়, "বেশ কয়েক বছর আগে, ইংমার বার্গম্যানের একটা বহু পুরোনো সিনেমা দেখেছিলাম, যেখানে মৃত্যু এসেছে নায়কের প্রাণ নিতে আর এক ধূসর প্রান্তরে বসে, নায়ক মৃত্যুর সাথে দাবা খেলছে। খুব সামনে থেকে এই অসুখটাকে পর্যবেক্ষণ করে, বারবার ওই সিনেমাটার কথা মনে পরে যায় আমার। একটা গুটিকে রক্ষা করতে পনেরোটা গুটি ছুটোছুটি করছে। নিয়ম মেনে, মাপ মেনে নড়াচড়া করে প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। সারাটা বছর ধরে ডাক্তাররা এবং ওর পরিবার মিলে সেটাই করে এসেছে, এক মুহূর্তের জন্যও কেউ হাল ছাড়েনি। জীবন সংশয় আছে জেনেও ঝুঁকি নিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয় মে মাসে। কিছুদিন আগে, অস্ত্রোপচারের ঠিক ছয় মাস পর পুনরায় পরীক্ষা করা হয় ওকে। ডাক্তার জানিয়েছেন যে কোনও বদ কোষ অবশিষ্ট নেই ওর শরীরে। এই মুহূর্তে, ঐন্দ্রিলা সুস্থ এবং বিপদমুক্ত।"
শুধু তাই নয়, ঐন্দ্রিলা আবার ফিরতেও চান কাজে। তাঁর অদম্য ইচ্ছেশক্তি একটুও ফিকে হয়নি এত বড় অসুখেও।
তবে এদিনের লেখায় সব্যসাচী আরও একজনের কথা লিখেছেন, যিনি ২০০৭ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ওভারিয়ান ক্যানসারে। লাস্ট স্টেজ ছিল তাঁর, ৬ মাসের বেশি সময় নেই বলেই জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। নিজের শেষ স্মৃতি হিসেবে একটি গাছও পুঁতেছিলেন মৃত্যুপথযাত্রী ওই মহিলা। কিন্তু তার পরেও হাল ছাড়েননি তাঁর স্বামী। জান লড়িয়ে চিকিৎসা করিয়েছিলেন তাঁর, শেষমেশ সুস্থও হয়ে ওঠেন ওই মহিলা। ঘটনাচক্রে তিনি ঐন্দ্রিলার মা, শিখা শর্মা। এখন তিনি সুস্থ, চাকরি করছেন, অসুস্থ মেয়ের যত্ন নিচ্ছেন।
সবশেষে সব্যসাচী লিখেছেন, "আসলে রোগটা ঐন্দ্রিলার জিনে আছে কিন্তু লড়াইটা আছে রক্তে। ...যে গাছটিকে স্মৃতিফলক হিসেবে ওনাকে দিয়ে রোপণ করা হয়েছিল, সেটি তার পরের বছরই মারা যায়। চেকমেট।"
এ লেখার সঙ্গে সঙ্গেই সব্যসাচী মনে করিয়ে দিয়েছেন চিরন্তন ভালবাসার কথা, শাশ্বত প্রেমের কথা। তাঁর লেখায়, "অনেকেই দেখি লেখেন যে আজকাল ভালোবাসা লুপ্তপ্রায় এবং বেশিরভাগ ছেলেরাই নাকি সুবিধাবাদী। পারলে কোনও ক্যান্সার হসপিটালে একবার ঘুরে এসো, কয়েক শত পুরুষকে সেখানে অপেক্ষারত দেখতে পাবে। তাদের কেউ পিতা, কেউ স্বামী আর কেউ বা সন্তান। গেলে হয়তো ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞা খুঁজে পেতে পারো।"