
শেষ আপডেট: 20 November 2022 13:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রেমিকার প্রাণবায়ুকে জীবনপণ করে ধরে রেখেছিলেন তিনি (Sabyasachi Chowdhury)। এক মুহূর্তের জন্যও ঝাপটা লাগতে দেননি শীতল হাওয়ার (Long and Strong Fight)। প্রতি মুহূর্তে সর্বতোভাবে আড়াল করে আগলে রেখেছিলেন ক্যানসার-বিধ্বস্ত শরীরকে। মনের লড়াইকে প্রতিনিয়ত অক্সিজেন জুগিয়ে গেছেন প্রেম, ভালবাসা, স্নেহ দিয়ে। এ যেন ফুটবল ম্যাচে গোলকিপিং করা, গোলবার আগলে রাখা। শত্রুপক্ষের একটি বলও জালে ঢুকতে না দেওয়া। শত্রু এখানে মৃত্যু ছাড়া আর কেউ নয়। এই গোলকিপিংয়ের কথা নিজেই ফেসবুকে লিখেছিলেন অভিনেত্রী ঐন্দ্রিলা শর্মার প্রেমিক-বন্ধু-জীবনসঙ্গী সব্যসাচী চৈধুরী।
কিন্তু শেষরক্ষা হল না। দু'বার ক্যানসার, একবার ব্রেনস্ট্রোকের পরে একের পর এক হার্ট অ্যাটাকের ঝড় আর সামাল দেওয়া গেল না। মৃত্যুর বল ঢুকেই পড়ল জীবনের গোলপোস্টে। নিভে গেল ঐন্দ্রিলার প্রাণপ্রদীপ।
বছর খানেক আগে ঐন্দ্রিলার ক্যানসার যুদ্ধের কথা নিয়মিত ফেসবুকে লিখতেন সব্যসাচী। সে সময়েই একদিন তিনি লেখেন, 'ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় অবধি আমি একটু আধটু গোলকিপিং করতাম।… দুই পক্ষেই এগারোজন করে খেলে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়, এগুলো দেখেই আমি অভ্যস্ত। কিন্তু এটা তো আর তা নয়, এ বড় অসম লড়াই। একটা তেকাঠি রক্ষা করতে পুরো দলটা কেবল লড়েই যায়, ডাক্তার, পরিবার, বন্ধু, সমাজ, সকলে। এরই ফাঁকে যে কত কাছের মানুষ অচেনা হয়ে যায়, আবার কত দূরের মানুষ নিঃস্বার্থে প্রার্থনা করে, তা হিসেবের বাইরে।'
সেই পোস্টেই সব্যসাচী লিখেছিলেন, 'ক্যানসার শুনলেই অধিকাংশ মানুষ দুভাবে রিঅ্যাক্ট করে। প্রথমটি হল, ক্যানসারের কোনও অ্যানসার নেই। দ্বিতীয়টি হল, আরে এটা কোনও ব্যাপারই না, এই তো আমার অমুকের হয়েছিল, কেমো চলাকালীন কাজকর্ম সবই করতো, এখন তো ঠিকই আছে। বাস্তবে দুটোর কোনোটাই সত্যি নয়। প্রতিটা মানুষের ক্ষেত্রে অসুখটা ভিন্ন জাতের এবং ভিন্ন মাপের। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তার মাত্রা নির্ভর করে। ২০১৫-তে যখন ঐন্দ্রিলার প্রথমবার ক্যান্সার ধরা পরে, প্রাথমিক বিপদ কেটে যাওয়ার পর, কেমো চলাকালীন ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতো, টিউশন যাওয়া থেকে শুরু করে স্কুটি চালানো, সবই করেছে, কিন্তু এই বার বিষয়টা একদমই উল্টো। মাঝেমধ্যে বিছানা থেকে নেমে বাথরুম যাওয়ারও জোর পায় না।'
সব্যসাচীর পোস্ট পড়ে রীতিমতো চোখে জল এসেছিল নেটিজেনদের। কারণ পোস্টটি ঐন্দ্রিলার কষ্ট শুধু নয়, একই সঙ্গে দুরন্ত এক ভালবাসার কথাও বলেছিল সেটি, যে ভালবাসার জোরে মারণ অসুখও বুঝি একটু ভয় পেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল সে সময়ে। সব্যসাচীর লেখার প্রতিটা ছত্রে স্পষ্ট, প্রিয়তম বান্ধবীকে সারিয়ে তুলতে মনপ্রাণ দিয়ে কতটা লড়াই করেছেন তিনি।
সব্যসাচী লিখেছিলেন, 'যা বুঝলাম, এই অসুখটার কোনো নিয়মবিচার নেই। ওষুধপত্র সবই আছে অথচ নেই। চিকিৎসার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ আছে কিন্তু আরোগ্যের নেই। প্রতিবার যখন ডাক্তার বলেন চিকিৎসার সময় বাড়াতে, ওর মুখটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়। প্রতিবার কেমো নেওয়ার পর কয়েক রাত অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে।'
সেই পোস্টেই লেখা শেষ কটা লাইনে যেন উপচে পড়েছিল হতাশা এবং একই সঙ্গে মনের জোর। তিনি লিখেছিলেন, 'এই লড়াইয়ে কোনও নিয়ম নেই, সময়সীমা নেই, আক্রমণ নেই, কাউন্টার অ্যাটাক নেই, কেবল রক্ষণটুকু আছে। … খেলার মাঠের বন্ধুরা কেউই আর সেইভাবে অবশিষ্ট নেই আমার জীবনে। মাঝেমাঝে ইচ্ছা হয় তাদের ডেকে এনে বলি, একবার দেখে যা হতচ্ছাড়াগুলো, জীবনের সেরা কিপিংটা আমি এখন করছি।'
জীবনের সেরা সে কিপিংয়ে শেষমেশ হার মানলেন সব্যসাচী। আজ ঐন্দ্রিলা প্রয়াত হওয়ার পরে নিজের ফেসবুক প্রোফাইল ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেন তিনি। আর কখনও নিজের ভালবাসার কথা তিনি ফেসবুকে লিখবেন কিনা, ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে তাঁর লেখা একটি বাক্যও তাঁর ওয়ালে দেখা যাবে কিনা, কেউ জানে না। যেন প্রবল লড়াইয়ের শেষে দেওয়ালে পিঠ রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রয়েছেন এক পরাজিত সৈনিক। হার মানা হারখানি যেন আজ তাঁরই গলায় পরিয়ে দিয়েছে নিষ্ঠুর, নির্দয় জীবনদেবতা।
দু'বার ক্যানসারকে জয় করে ফিরেছিলেন ঐন্দ্রিলার মা শিখা, মেয়ের লড়াই হার মানল অসুখের কাছে