
রুনা লায়লা
শেষ আপডেট: 7 July 2024 18:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'সাধের লাউ' তারে বৈরাগী বানিয়েছে। যে-সে বৈরাগী নয়, দুই বাংলার জনপ্রিয় এক বৈরাগী। 'বন্ধু তিনদিন তোর বাড়িতে গেলাম' থেকে 'সুজন মাঝি' তাঁর কণ্ঠে অনায়াসে খেলা করে। বহু নতুন ও পুরনো লোকসঙ্গীতের জননী হিসেবে তাঁকেই চেনে তামাম সঙ্গীত জগৎ। সঙ্গীত জগতে ৬০ বছর পার করে ফেললেন তিনি। তাঁর সুরে আজও নেচে ওঠে অনেকের কোমর। তবে অনেকেই জানেন না, সঙ্গীতের রানি হলেও, আদতে তিনিও শিল্পচর্চা শুরু করেছিলেন নাচ দিয়েই।
তিনি রুনা লায়লা। আদতে বাংলাদেশি শিল্পী বলে সুপরিচিত হয়ে উঠলেও, রুনার ছোটবেলার অনেকটাই কেটেছে পাকিস্তানের করাচিতে। তাঁর বাবা এমদাদ আলি ছিলেন পদস্থ সরকারি অফিসার। মা আমিনা লায়লা করাচির বুলবুল অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে নাচ শেখার জন্য ভর্তি করে দিয়েছিলেন। সেখানেই আফরোজা বুলবুলের কাছে চার বছর ধরে কত্থক আর ভরতনাট্যম শিখেছিলেন রুনা। দিদিমার দেওয়া টাকায় একজোড়া ঘুঙুর কিনে, সারা বাড়ি ঝুমঝুমিয়ে নেচে বেড়াতেন। কে জানত, সেই মেয়ে গানের জগতে ৬০ বছর ধরে রাজত্ব করবেন দাপিয়ে!
সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে এ সব কথা জানিয়ে রুনা জানালেন, সেসব নাচ ভুলে গেলেও, এখনও গানের মঞ্চে নিজের অজান্তেই কিছু নাচের মুদ্রা চলে আসে তাঁর। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে গানের জগতে ৬০ বছর পূর্ণ হল তাঁর।
রুনা যখন নাচ শিখতেন, তখন তাঁর দিদি দিনা লায়লা গানের তালিম নিতেন আবদুল কাদের, হাবিব উদ্দিন আহমেদের কাছে। সেসব গান শুনে শুনেই মুখস্থ করে ফেলতেন ছোট্ট রুনা। গুনগুন করে গাইতেন নিজের মতো। একদিন রুনার সেই গানই শুনতে পেয়েছিলেন ওস্তাদ আবদুল কাদের। তাই শুনে মুগ্ধ হন তিনি, বলেন, একদিন গানের জগতেই অনেক সুনাম কুড়োবে রুনা লায়লা।

সেদিন ওস্তাদজির কথা সকলেই শুনেছিলেন। গান শেখানোর জন্য ভর্তিও করেছিলেন। রুনা প্রথম মঞ্চে গান করেন ছ'বছর বয়সে, কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই। করাচির ঢাকা ওল্ড বয়েজ অ্যাসোসিয়েশনের অনুষ্ঠানে রুনার দিদি দিনা লায়লার গান গাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানের আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন দিনা। তাই তার জায়গায় ছোট বোন রুনা গেয়ে দেন। তানপুরা বাজিয়ে গান গেয়ে সেদিন আসর মাত করেছিলেন রুনা।
কিন্তু সত্যিই যে রুনার ভাগ্য তাঁকে গায়িকা হওয়ার দিকে টেনে নিয়ে যাবে, তা কেউ ভাবেননি। তবে সেটাই হল শেষমেশ। মাত্র ১২ বছর বয়সে, ১৯৬৪ সালে প্রথম গান রেকর্ড করার প্রস্তাব আসে রুনার কাছে। বাবা রাজি হননি, যে মেয়ে এত অল্প বয়সে সিনেমায় গান গাক। বাবাকে অতি কষ্টে রাজি করিয়ে, করাচির ইস্টার্ন স্টুডিওতে উর্দু ছবি ‘জুগনু’র একটি গান রেকর্ড করে রুনা। সে গানের নাম ছিল, ‘গুড়িয়া সি মুন্নি মেরি’। পর্দায় ১২ বছরের একটি ছেলের ঠোঁটে ছিল গানটি। ছবির সংগীত পরিচালক মনজুর হোসেনের কাছে এক মাস ধরে অনুশীলন করে এই গান রেকর্ড করেছিলেন রুনা।

সাক্ষাৎকার রুনা বলেন, ‘সিনেমায় গাওয়ার কিছু কৌশল আমায় শিখিয়ে দেন মনজুর হোসেন সাহেব। আমার কণ্ঠ হয়তো ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত, কিন্তু তা ঘষে-মেজে পলিশ করেন মনজুর সাহেব। মনে হয়, এই তো সেদিন! এত বছর হয়ে গেল! ঈশ্বর আর শ্রোতাদের সহযোগিতাতেই এটা সম্ভব হয়েছে।’
সেই সময়েই আরও কয়েকটি গান গাইতে গাইতে রুনার নাম ছড়িয়ে পড়ে, কাজ বাড়তে থাকে। একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে গান। একই দিনে বিভিন্ন স্টুডিওতে ছ'সাতটি গানও রেকর্ডিং করতেন তিনি। ভোর ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত অবিরাম কাজ করতেন। ফলে বাংলা ছবিতে গান গাওয়ার প্রস্তাব পান রুনা। চলচ্চিত্র পরিচালক নজরুল ইসলাম এবং সঙ্গীত পরিচালক সুবল দাস স্বরলিপি ছবির জন্য রুনার গান রেকর্ডিং করতে লাহোরে গিয়েছিলেন।

এর পরে বাংলাদেশে চলে আসেন রুনা, প্রস্তাব আসতে থাকে একের পর এক গানের। রুনা বলেন, ‘খুবই মসণ ছিল আমার সংগীতজীবন। প্রথম গান গাওয়া থেকে শুরু করে কখনওই কারও কাছে যেতে হয়নি, বাড়িতে এসে গান করে দিয়ে গেছেন পরিচালকরা। আমাকে কিছুই করতে হয়নি, স্ট্রাগল করা কাকে বলে, আমি জানতেও পারিনি।'
তবে এত দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে বাধা যে আসেনি, তা নয়। রুনা লায়লা বলেন, ‘অনেকে অনেকভাবে রুখতে চেয়েছে। তবে বাধা হয়ে কেউ দাঁড়াতে পারেনি। মানুষের ভালবাসা ও আশীর্বাদে সব পেরিয়ে এসেছি। আমি জানতাম, কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না, কারণ আমি স্বচ্ছ মনে সবার সঙ্গে মিশেছি। আন্তরিকতা ও ভালবাসার সঙ্গে কাজটা করে গেছি।’
![]()
এইভাবেই দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে গান গেয়ে চলেছেন রুনা। তবে বাংলা, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, পশতু, বেলুচ, আরবি, পারসি, মালয়, নেপালি, জাপানি, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি-সহ মোট ১৭টি ভাষায় গান করেছেন তিনি। ১৯৮২ সালে বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে তাঁর করা গান নিয়ে প্রকাশিত হয় 'সুপার রুনা' অ্যালবাম। প্রথম দিনেই অ্যালবামটির এক লাখ কপি বিক্রি হয়।

তাই এখনকার প্রজন্মের গানের জগতের ছেলেমেয়েদের কাছেও রুনা অনুপ্রেরণা। তিনি নিজেও খুব ভালবাসেন নতুন প্রজন্মকে। তিনি বলেন, 'আমার পরের প্রজন্মের শিল্পীরা যেন আরও অনেক ওপরে ওঠে, অনেক নাম করে। আরও বড় প্ল্যাটফর্ম পাক ওরা, বিশ্ব সঙ্গীতে নাম করুক।’ রুনার নাতি-নাতনিরাও গানবাজনা ভালবাসে। আমেরিকায় মা তানি লায়লার সঙ্গে থাকে তারা। বড় নাতির রয়েছে গানের ব্যান্ড, মেজো নাতিও গানের জগতেই এগোচ্ছে। ছোট নাতির বয়স আড়াই বছর, সেও দিদিমা রুনা লায়লার সঙ্গে হলা মিলিয়ে দিব্যি গুনগুন করে, ঠিক যেমন ছোট্ট রুনা করতেন তাঁর দিদির সঙ্গে!
