হিন্দি ছবির মুখ্য বিষয় প্রেম হলেও তাতে যে আক্রোশ, প্রতিশোধ, সংগ্রাম ও প্রতিহিংসার স্বাদ ছিল, সে জায়গায় চলে এল এক নতুন ধাতু দিয়ে গড়া প্রেম।

সাতের দশকে কয়েক ঝাঁক অভিনেতা-অভিনেত্রী সামনের সারিতে চলে আসেন।
শেষ আপডেট: 6 September 2025 13:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়...’ প্রখ্যাত অভিনেতা, চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক রাকেশ রোশনের ক্ষেত্রে এই কথাটিই বোধহয় খাটে। সাতের দশকে কয়েক ঝাঁক অভিনেতা-অভিনেত্রী সামনের সারিতে চলে আসেন। সাদা-কালো ছবির যুগ তখন একেবারে শেষ। শাম্মি কাপুর, দেব আনন্দ, রাজেন্দ্র কুমার, রাজ কাপুর, অশোক কুমার, দিলীপ কুমাররা বাবা-জেঠু-দাদুর রোলে চলে গিয়েছেন।
রাজেশ খান্না, ধর্মেন্দ্র, জিতেন্দ্র, বিনোদ খান্না ও অমিতাভ বচ্চনের কাঁধে ভর দিয়ে নাগাড়ে একঘেঁয়ে ফর্মুলার ছবি দেখে ক্লান্ত দর্শক। ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে পর্দায় আসেন ঋষি কাপুর, বিনোদ মেহরা, রাকেশ রোশনের মতো তারকা। ছবির মুখ্য বিষয়- প্রেম। বেকার প্রেমিক, বড়লোক প্রেমিক, নিঃসঙ্গ প্রেমিক, গরিব প্রেমিক, কলেজ ছাত্র প্রেমিক- অর্থাৎ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘চুন চুন কর’ কিংবা ‘খামোশ’-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাড়ার মাইকে বেজে উঠল ‘জ্বলতা হ্যায় জিয়া মেরা’ কিংবা ‘সামা হ্যায় সুহানা সুহানা’।
হিন্দি ছবির মুখ্য বিষয় প্রেম হলেও তাতে যে আক্রোশ, প্রতিশোধ, সংগ্রাম ও প্রতিহিংসার স্বাদ ছিল, সে জায়গায় চলে এল এক নতুন ধাতু দিয়ে গড়া প্রেম। মানুষ বা দর্শকও দুর্বারভাবে সেই প্রেমকে গ্রহণ করল সস্নেহে। তাবড় তাবড় অভিনেতার সামনে চুনোপুঁটি এইসব অভিনেতারা তুলে দিলেন একের পর এক হিট ছবি। তাঁদের মধ্যে অবশ্যই সামনের বেঞ্চে থাকলেন রাকেশ রোশন। যাঁকে এখনকার প্রজন্ম চেনে হৃতিক রোশনের বাবা হিসেবে।
কিন্তু, রাকেশ রোশনের জীবনের শুরু হৃতিকের মতো সোনার চামচ মুখে দিয়ে হয়নি। পেশাগত ও পারিবারিক দুই জীবনেই তাঁকে ডাবল ডেকার বাসের মতোই একবার সিঁড়ি দিয়ে উপরে ও একবার পাদানিতে নামতে হয়েছে। সাফল্যের সঙ্গেই চোখের জলে হজম করতে হয়েছে ব্যক্তিগত জীবনের শোক। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবনের ভাঙা গাড়িকে চলতি কা নাম জিন্দেগি দিতে হয়েছে।

ফিল্মফেয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একবার রাকেশ বলেছিলেন, বাবার মৃত্যুতে তাঁদের জীবনে আচমকা অন্ধকার নেমে এসেছিল। তিনি বলেছিলেন, তখন আমার বয়স ১৮। না ছিল বাবার ব্যবসা, না ছিল কোনও গোছগাছ। তাই আমাকেই আমার ব্যবস্থা করে নিতে হয়েছিল। আমি বুঝে নিয়েছিলাম আমাকে এবার লড়তে হবে। আর কিশোর হয়ে থাকলে চলবে না।
আমি তখন ঘরের চৌকাঠের বাইরে এলাম, এবং দায়িত্ব তুলে নিলাম। ওই বয়সেই আমি পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্ককে পরিণত হয়ে গেলাম। তিনি নিজেই জানান, অভিনেতা হিসেবে ব্যর্থ হওয়ার পর আমি প্রযোজক ও পরিচালক হয়ে যাই। কারণ এর থেকে কোনও বিকল্প আমার সামনে খোলা ছিল না। আর সেই ঘরানায় ঢুকে খুন ভরি মাঙ্গ, করণ-অর্জুন, কহো না প্যার হ্যায় এবং কৃষ সিরিজের ছবি।
সেই রাকেশ রোশনের জন্ম হয়েছিল একটি গ্যারাজে। সেখান থেকে তিনি জীবনের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাফল্যের মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিলেন। রাকেশ রোশনের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। তাঁর বাবা লাল নাগরথ ছিলেন একজন প্রখ্যাত সুরকার। মা ইরা মৈত্র ছিলেন বাঙালি গায়িকা। রাকেশের ছোট ভাই রাজেশ রোশনও ছিলেন বিখ্যাত সুরকার।
রাকেশ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমার জন্ম বম্বেতে (মুম্বই)। বিখ্যাত সুরকার হুসনলাল ভগৎরামের গ্যারাজে আমার জন্ম। আমারা বাবা দিল্লি থেকে মুম্বই এসে এই গ্যারাজেই থাকতেন। বাবা একটু নামডাক পাওয়ার পরেই আমরা সান্তাক্রুজে চলে যাই। বাবার মৃত্যুর পর থেকে তিনি সহকারী পরিচালকের ভূমিকায় পেশায় নামেন। কারণ সংসারে উপার্জনক্ষম দ্বিতীয় কেউ ছিল না।

রাকেশের স্ত্রী অর্থাৎ হৃতিকের মা তুলনায় বেশ বড়লোকের মেয়ে ছিলেন। কিন্তু, তিনি ওই দুই কামরার ঘরে ছেলে নিয়ে মানিয়ে চলতেন। রাকেশ বলেছেন, ওর মধ্যে কোনও অভিযোগ ছিল না। কিন্তু, দারিদ্র্যের জন্য আমাকে বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নিয়েও সংসার চালাতে হয়েছে। ও তার মধ্যেই চালিয়ে নিয়েছে ঘরগৃহস্থী। রাকেশ রোশনের সিনেমার পর্দায় পা দেওয়া সহশিল্পী হিসেবে। ঘর ঘর কি কাহানি ছবিতে। সাত ও আটের দশক মিলিয়ে তিনি ৮৪টি ছবি করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, একটা ছোট্ট রোল পাওয়ার জন্য দিনে অন্তত পাঁচজন প্রযোজককে ফোন করতাম।
রাকেশের স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করে রয়েছে, একবার এক পার্টির কথা। তিনি গিয়েছিলেন স্ত্রী পিঙ্কিকে সঙ্গে নিয়ে। সেখানে এসেছিলেন ঋষি কাপুর, নীতু কাপুর সিং, জিতেন্দ্র ও তাঁর স্ত্রী শোভা। ফটোগ্রাফাররা রাকেশ ও পিঙ্কিকে বলেন, একটু দূরে সরে দাঁড়ান ওঁদের ছবি তোলা হবে। পরে রাকেশের খান্ডালার বাংলোয় ছিল একটি অলিম্পক্স সাইজের সুইমিং পুল, প্রাইভেট থিয়েটার এবং স্পা। পাঁচ একর জমির উপরে ২২,৪০০ বর্গফুটের পেল্লায় বাড়ি। যার দাম আনুমানিক ১২০ কোটি টাকা।