Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

রচনাকে নামী পরিচালকরা ছবির অফার দেননি কখনও, রাজনীতিতে শেষ আশ্রয় পেলেন 'দিদি নম্বর ওয়ান'

এবার রাজনীতির মঞ্চে অবতীর্ণ হলেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। হুগলি থেকে তাঁকে প্রার্থী করল তৃণমূল ।

রচনাকে নামী পরিচালকরা ছবির অফার দেননি কখনও, রাজনীতিতে শেষ আশ্রয় পেলেন 'দিদি নম্বর ওয়ান'

শেষ আপডেট: 11 March 2024 00:49

শুভদীপ বন্দোপাধ্যায়

ঝুমঝুম বন্দ্যোপাধ্যায় নাম বদলে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে টালিগঞ্জ পাড়ায় পা রেখেছিলেন অভিনেত্রী। নায়িকা থেকে তিনি আজ 'দিদি নম্বর ওয়ান' রূপে সারা বাংলার নয়নের মণি। বিনোদন জগৎ থেকে এবার রাজনীতির মঞ্চে অবতীর্ণ হলেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। হুগলি থেকে তাঁকে প্রার্থী করল তৃণমূল। রবিবার ব্রিগেডের মঞ্চে প্রার্থী হিসেবে তাঁকে নিয়ে হাঁটলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন রাজনীতির ময়দানে রচনা? কারণ অনুসন্ধান করতে কলম ধরলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। 

নব্বই দশকের গোড়াতে 'মিস ক্যালকাটা' শিরোপা জিতে প্রথম প্রচারের আলোতে চলে আসা তাঁর। তখন তিনি সাউথ সিটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। কিন্তু স্কুল-কলেজের শংসাপত্র থেকে শুরু করে 'মিস ক্যালকাটা'র খেতাব… সবতেই ছিল ঝুমঝুম নামটিই। ঝুমঝুমের বাবা উপমুন্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের বন্ধু ছিলেন তখনকার বিখ্যাত অভিনেতা পরিচালক সুখেন দাস। ঝুমঝুম চোখে পড়ে যান সুখেন দাসের। সুখেন দাস তখন 'দান প্রতিদান' ছবি করছিলেন। কিন্তু সুখেন দাসের ঝুমঝুম নামটা ছিল অপছন্দ। তিনি বলেছিলেন, ‘ঝুমঝুম নামটা চলবে না, সকলে বলবে মুনমুন সেনের মেয়ে।’
রবীন্দ্র রচনাবলী খুলে নতুন নাম খুঁজতে লাগলেন সুখেন দাস। সুখেন দাশের হঠাৎই মনে হল, রবীন্দ্র রচনাবলী শব্দবন্ধেই লুকিয়ে আছে সেই নাম – ‘রচনা’। সেই থেকে ঝুমঝুম হয়ে গেলেন রচনা। সুখেন দাসের হাত ধরেই অভিনয় জগতে একেবারে বড় পর্দায় পা রাখা রচনার। সহনায়িকা রূপে প্রথম ছবি। 

সুখেন দাসের পর প্রভাত রায় সেসময় নতুন নায়িকা খুঁজছিলেন। এবার একেবারে নায়িকার রোলে প্রভাত রায়ের 'দুরন্ত প্রেম' ছবিতে সুযোগ পান রচনা। হিরো ছিলেন নবাগত দীপক। মিস জোজো চন্দনা রায় নামে এই ছবির আরেক নায়িকা ছিলেন। দীপক হারিয়ে গেলেও রচনা কিন্তু হারাননি। এসময় রচনার কাছে আসে আর্ট ফিল্মের নায়িকা হবার অফার। চিদানন্দ দাশগুপ্ত তাঁর 'আমোদিনী' রূপে কাস্ট করেন রচনাকে। অপর্ণা সেনের বাবার এই ছবিতে কাজ করে রচনা পান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কিন্তু আর আর্ট ছবি পেলেন না রচনা। এইসময় প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটি বাংলা কমার্শিয়াল ছবিতে রমরম করে চলছে। তাই সেখানে সুযোগ পাবার পরিসর রচনার ছিল না। পরে ওড়িয়া ও দক্ষিণের ছবিতে থিতু হন তিনি।  

এই সময় রচনার জীবনে আসে তাঁর সেরা ছবির অফার। অমিতাভ বচ্চনের নায়িকা হবার অফার। 'সূর্যবংশম' ছবি ছিল নায়ক রূপে অমিতাভের শেষ হিট। পোস্টারে অমিতাভের ছবিতে গাঁদা ফুলের মালা দেখে সমালোচকরা লিখেছিলেন "অমিতাভের বয়সের মতোই তাঁর গলার মালাও যেন শুকনো।" অসম বয়সি নায়ক-নায়িকা হলেও ছবি কিন্তু সুপারহিট। অমিতাভের বাহুলগ্না হবার সুযোগ রচনার মতো আর কোনও নব্বই দশকের বাংলা ছবির নায়িকাই পাননি। তবে 'সূর্যবংশম' এর মতো আলোচিত সুপার ডুপার হিট ছবি করেও রচনার বলিউডে কেরিয়ার জমল না।

বাংলা ছবির আগেই ওড়িয়া তামিল তেলেগু ছবির স্টার বনে যান রচনা। ওড়িয়া হিরো সিদ্ধান্ত মহাপাত্রর সঙ্গে জুটি বেঁধে ৪০টির মতো সুপারহিট ছবি করেছেন। বাংলাতেও ডাবড হয় কিছু ছবি। কাজ করতে গিয়েই মন বিনিময়। পর্দার জুটি বিয়ে করেন রিয়েল দুনিয়ায়। তবে বেশিদিন রচনা-সিদ্ধান্তর সংসার সুখের হয়নি। হিট জুটি ভেঙে যায় বাস্তবে।  

এই সময় বাংলা ছবিতেও নিজেদের মান-অভিমানে ভেঙে যায় প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটি। প্রসেনজিতের পাশে ঋতুপর্ণার শূন্যতা পূরণ করতে হাজির হন রচনা। হিট করে যায় প্রসেনজিৎ-রচনা নতুন জুটি। বাংলা ছবিতে এভাবেই রচনার গাড়ি চলতে শুরু করে। সবুজ সাথী, একাই একশো, প্রতিশোধ,রাখে হরি মারে কে, পরিবার একের পর এক সুপারহিট ছবি প্রসেনজিৎ-রচনার। কিন্তু এরপরই এল বাংলা ছবিতে বাঁকবদল। ভেঙে গেল ছবির ফর্মুলা। মেনস্ট্রিম বাংলা ছবির ঘরানা বদলে মাল্টিপ্লেক্স ছবির ঘরানা চলে এল।

প্রসেনজিৎ সুজিত গুহ, স্বপন সাহাদের শিবির ছেড়ে বেরিয়ে এসে ঋতুপর্ণ ঘোষ, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ছবিতে নিজেকে নতুন ভাবে তৈরি করলেন। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তো হিরোদের কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে। তাই প্রসেনজিতের এই রুট বদলের কারণে অনুপ সেনগুপ্ত, সুজিত গুহ, স্বপন সাহাদের ছবির বাজার শেষ হয়ে গেল। একই ভাবে হাতে কাজ কমে গেল রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। নায়কের প্রস্থানে রচনাও হারালো চিরতরে তাঁর নায়িকার আসন। ফিরদৌস, ইন্দ্রজিৎ, যীশু বা নবাগত দেব কারুর সঙ্গেই রচনার জুটি জমল না। যীশু-রচনা নাইট কল শো তখনও অবশ্য গ্রাম বাংলায় ভীষণ হিট ছিল। 

প্রসেনজিৎ নিজেকে নবকলেবরে গড়ে তুললেও রচনা একেবারেই শান দিতে পারেননি তাঁর অভিনয়ে। দেবশ্রী রায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর পর নায়িকার সুপ্রিম জায়গাটা রচনা কোনওদিনই পাননি। যেসব ছবি প্রসেনজিতের সঙ্গে রচনা করেছেন সেগুলো শিক্ষিত দর্শকের ছবিও ছিল না। ফলে কাজ ক্রমশ হারাতে থাকেন রচনা। আর্ট ফিল্মের খ্যাতনামা পরিচালক থেকে নতুন ধারার পরিচালকরা রচনাকে কেউই কাজের অফার দেননি। 

রচনা যখন দক্ষিণে বা ওড়িয়াতে ছবি করতে ব্যস্ত তখন ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর 'দহন' ছবির অফার রচনাকে দিয়েছিলেন। চুক্তিভঙ্গ হবার কারণে ঋতুপর্ণর ছবি হাতছাড়া হয় রচনার। 'দহন' করেই ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও ইন্দ্রাণী হালদার জাতীয় পুরস্কার পান। ২০০৪-০৫ নাগাদ ইন্দ্রাণী  হালদারেরর সঙ্গে এক চ্যাট শোতে রচনা এই ছবি না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে প্রকাশ্যে বলেছিলেন টেলিভিশনে "অপর্ণা সেন তো তাঁর ছবিতে নিজের মেয়েকে ছাড়া ভাবতেই পারেন না। উনি কেন আমাকে ডাকবেন।"

গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অশোক বিশ্বনাথন, অপর্ণা সেন, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়দের মতো খ্যাতনামা পরিচালকদের ছবিতে কখনও ডাক পাননি রচনা। কেবলমাত্র শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের 'রামধনু' ছবিতে দিদিমণির অভিনয় করে রচনার যেন নবজন্ম হয়েছিল বক্সঅফিসে। তারপরও ভাল অফার আসেনি। বৌদি ডট কম, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে করলেও মুখ থুবড়ে পড়ে ছবি। রচনা দ্বিতীয় বিয়ে করেন প্রবাল বসুকে। প্রবাল-রচনার একমাত্র ছেলে প্রনীল। ছেলে অন্তপ্রাণ রচনার। 

রচনা নিজেকে মেনন্টেন করেছিলেন, করেন খুবই সুন্দর। তাঁর স্নিগ্ধ  উপস্থিতি ঋতুপর্ণাকেও হার মানায়। কিন্তু অভিনেত্রী রচনা কয়েক কদম পিছিয়ে থাকার কারণেও ভাল ছবি পাননি। তাঁকে অবশ্যই ডিরেক্টররা গড়েও নেননি। সুযোগও দেননি। এক বুক আক্ষেপ লুকিয়ে থাকে রচনার অমন সুন্দর হাসির আড়ালে। কেরিয়ারের শুরুতেই সেরা হাসি মুখের পুরস্কার পেয়েছিলেন রচনা ফেমিনা মিস ইন্ডিয়াতে। 

সিনেমার পর্দা পড়ে যেতেই রচনার জীবনে এল আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো 'দিদি নম্বর ওয়ান' সঞ্চালনার সুযোগ। সঞ্চালিকা হিসেবে ঋতুপর্ণা, দেবশ্রী, ইন্দ্রাণীদের দশ গোলে হারিয়ে দিয়েছেন রচনা। স্টারডম ঝেড়ে ফেলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশার মন্ত্র দুর্দান্ত আয়ত্ত করেছেন। সিনেমা তাঁকে যে শিখরে পৌঁছতে দেয়নি দিদি নম্বর ওয়ান রচনাকে সেই শীর্ষস্থানিয়া করে তোলে। বছরের পর বছর কোনও রিয়্যালিটি শোর জনপ্রিয়তা ধরে রাখা কম কথা নয়। এখন রচনাকে একদিন না দেখতে পেলে সারা বিশ্বের বাঙালিদের ঘুম হয় না। 

কিন্তু বিগত দশ বছরে রচনার কাছে ভাল ছবির অফার একদমই আসেনি। আমাকেই দ্য ওয়াল-কে দেওয়া এক পুজো আড্ডায সাক্ষাৎকারে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন কয়েক বছর আগে 
"ছবিতে অভিনয় আর করব না। ভাল পরিচালকরা এতদিনেও তাঁদের ছবিতে ডাকলেন না। আর কতদিন অপেক্ষা করব! ছবিতে অভিনয়ের আর ইচ্ছে নেই।" সে কারণেই দিদি নম্বর ওয়ানের পাশাপাশি শাড়ির ব্যবসা শুরু করেন অভিনেত্রী। একবার তাঁকে ফোন করেছিলাম ব্যবসা কেমন জমল জানতে! রচনা বললেন "এখন বেনারসে এসেছি শাড়ি তুলতে। আমি নিজেই আসি। যখন শুরু করেছি সেরা কাজটাই করব।" শাড়ি গয়নার ব্যবসায় সফল হয়েছিলেন রচনা। 

দিদি নম্বর ওয়ান ঘরে ঘরে সুপারহিট হলেও নিশ্চিত জীবনের আশ্বাস তো দেয় না। টিআরপি নির্ভর শো। ছেলের জীবন সুরক্ষিত করতেই যেন রচনা রাজনীতির ময়দানে যোগ দিলেন। কারণ ফিল্ম থেকে তাঁর পাওয়ার বা হারাবার কিছু নেই। দিদি নম্বর ওয়ান করার পরও ভাল ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব রচনা পাননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিদি নম্বর ওয়ানে খেলতে আসার আগমনে লুকিয়েছিল যেন রচনার তৃনমূলে যোগদানের চাবিকাঠি। বাংলার দর্শকরা তাই মনে করছেন। যে কোনও ফিল্মস্টার বাংলার রাজনীতিতে পা দিলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জোরেই জিতেছেন। কিন্তু রচনা ব্যতিক্রম। তাঁর নিজের দিদি নম্বর ওয়ান ইমেজও আছে। যা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে বাংলার মা বোনেদের হৃদয়ে। 

লোকসভা নির্বাচনের প্রার্থী হয়ে রচনার পাখির চোখ এখন দিল্লি। তবে রচনার সেই ক্ষমতা আছে দিদি নম্বর ওয়ান ও লোকসভা একসঙ্গে সামালানোর। বড় পর্দা, ছোট পর্দার পর রাজনীতির ময়দানে রচনা কতটা হিটমেশিন হতে পারেন সেটাই এবার দেখার। শুভেচ্ছা রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। এগিয়ে চলুন। দিদিমেব জয়তে।


```