এমন বিরল অনুষ্ঠানের রেশ যেন এখনও চোখে লেগে আছে। সৃজন-মৌনিতার এই সম্পূর্ণ ভাবনাকে কুর্নিশ।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 2 July 2025 19:34
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি নিয়ে এমন অনুষ্ঠান সহজে চাক্ষুষ করা যায় না। গত রোববার ২৯ জুন রবীন্দ্রসদনে এক বিরল রবীন্দ্র অনুষ্ঠানের সাক্ষী থাকল কলকাতা। রুচিশীল দর্শকদের ভরিয়ে দিল 'সহায় ফাউন্ডেশন-এর আয়োজনে 'রবীন্দ্রোৎসব' অনুষ্ঠান। এমন এক ঝাঁক শিল্পী একসঙ্গে এই অনুষ্ঠানে পারফর্ম করলেন যা চট করে ঘটে না।
দুই পর্বে বিভক্ত ছিল এই অনুষ্ঠান। কবিতা, গান,নৃত্য ও নাট্যধারার ধারাস্নানে দর্শকদের হৃদয়ে যেন শান্তির জলের স্পর্শ দিল।

প্রথম পর্বের নাম ছিল 'প্রাণের মানুষ'। এই পর্বে অংশগ্রহণে ছিলেন পাঁচ নারী একসঙ্গে। ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমিতা মল্লিক, পূর্ণিমা ঘোষ, শাশ্বতী গুহ ঠাকুরতা ও উপালি চট্টোপাধ্যায়। উপালি সূত্রধর। চার বিদুষীর সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি। উপালিই প্রথম শুরু করলেন 'কোথায় পাব তারে' গানে। সব নারীই নিজেদের মেয়েবেলায় প্রথম রবীন্দ্রনাথকে চেনার গল্প বললেন। এঁদের মধ্যে বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী প্রমিতা মল্লিকের কৈশোর যৌবন কেটেছিল শান্তিনিকেতনে। তিনি আশ্রমকন্যা। সবথেকে বেশি যিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যাপন করতে পেরেছিলেন। তখনকার শান্তিনিকেতনে প্রকৃতি দিয়েই প্রমিতার রবীন্দ্রনাথকে প্রথম চেনা। কিশোরীবেলার স্মৃতিচারণ করে প্রমিতা গাইলেন গ্রীষ্মের দুপুরে মাঠের ভিতর দিয়ে পড়তে যাবার সময় দেখতে পেতেন গরমে মাটি থেকে ধোঁয়া উঠছে। তখনই প্রমিতার মনে আসে 'দারুণ অগ্নি বাণে রে', হৃদয় তৃষায় হানে রে'। আবার সেই দাবদাহে যখন কালবৈশাখী আসে তখন কিশোরী প্রমিতার পিছনে ছুটে আসে যেন 'আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা কোথাও না ধরে॥ 'শালের বনে থেকে থেকে ঝড় দোলা দেয় হেঁকে হেঁকে।' বর্ষা জুড়ে 'বাদল দিনের প্রথম কদম ফুলের' সুবাস। পুজো এসে গেলেই 'শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে অরুণরাঙা চরণ ফেলে নয়ন-ভুলানো এলে'। হেমন্ত মানেই ছিল পাটালি আর শীত মানেই 'পৌষ মেলা'। তারপর ঋতুরাজ বসন্তে ফুল গাঁথল।

ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় মুগ্ধ করে দিলেন এইসময়ের কবি অংশুমান করের কবিতায় 'শিলাইদহ ভাবে আপনি ওঁদের, জোড়াসাঁকো ভাবে আপনি এঁদের'। সত্যি তো রবীন্দ্রনাথ আপনি আসলে কার? এরপরেই ব্রততীর 'ঝুলন', তাঁর অসাধারণ আবৃত্তিতে রবীন্দ্রসদনের দর্শকদের চুপ করিয়ে দিলেন। আমি পরানের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা,নিশীথবেলা।' যখন ব্রততী উচ্চারণ করেন 'দে দোল্ দোল্' সারা প্রেক্ষাগৃহ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে।
ব্রততীর সঙ্গে শাশ্বতী গুহঠাকুরতার দিদি-বোনের সম্পর্ক। দু'জনেই প্রথম আমাদের ঘরের লোক হয়ে ওঠেন কলকাতা দূরদর্শন থেকে। শাশ্বতী বললেন ব্রততী আমার বোন। এবার নীলাম্বরী শাড়িতে শাশ্বতী পাঠ করলেন রবীন্দ্রনাথের 'কাবুলিওয়ালা'। মিনি আর রহমতের ভালবাসার আকুতি ফুটে ওঠে শাশ্বতীর সিনেম্যাটিক এক্সপ্রেশনে।

তবে সবাইকে চমকে দিলেন ৮৫ পার করা পূর্ণিমা ঘোষ। চিত্রাঙ্গদা রূপে পূর্ণিমা দেবী যেভাবে মঞ্চে আবির্ভূতা হলেন তা অবিশ্বাস্য। জীবন যেন তাঁর এক সাধনা। পূর্ণিমা ঘোষের দুটি নৃত্য পরিবেশন চক্ষু সার্থক করে দিল। পাঁচ বিদুষীকে নিয়ে এমন রবীন্দ্রনাথের অনুষ্ঠান সত্যিই বিরল। যারা দেখলেন না তাঁরা হারালেন অনেক কিছু।

দ্বিতীয় পর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক ও নৃত্যনাট্য অবলম্বনে একটি মৌলিক উপস্থাপনা, 'পরিবর্তন প্রবর্তন'। অংশগ্রহণে ছিলেন মৌনিতা চট্টোপাধ্যায়, সৃজন চট্টোপাধ্যায়। এছাড়াও একটি বৃহৎ নৃত্যদল ও সুরসমন্বিত কোরাসের সহযোগিতায় মঞ্চস্থ হয় এই পরিবেশনাটি। মুগ্ধ করে সৃজনের উদাত্ত কণ্ঠে রবীন্দ্রগান এবং মৌনিতার মর্মস্পর্শী বাচিক উপস্থাপনা। এক কথায় এই প্রথমবার এমন একটি ব্যতিক্রমী প্রযোজনা মঞ্চস্থ হল কলকাতায়।

এই ভাবনাটা ভীষণ অভিনব। রবীন্দ্রনাথের 'চণ্ডালিকা', 'চিত্রাঙ্গদা', 'বাল্মিকী প্রতিভা' থেকে 'রক্তকরবী' নতুন আঙ্গিকে পেশ করলেন সৃজন-মৌনিতা। সৃজন অনবদ্য গাইতে পারেন তার প্রমাণ আমরা আগেই পেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি যে এত ভাল ডান্স-কোরিওগ্রাফার ও একজন পরিপূর্ণ শিল্পী তা দেখিয়ে দিলেন এই অনুষ্ঠানে। 'চণ্ডালিকা'র মা ও মেয়ের অভিনয় দু রকম মুখোশ পরে সৃজন যেভাবে করলেন তা এই প্রথম দর্শক দেখলেন । গায়ে কাঁটা দেওয়া পারফরম্যান্স। মঞ্চাভিনয়ে মন ভরালেন মৌনিতা। তবে চিত্রাঙ্গদার কুরূপার নাচ তেমন মন কাড়ল না। এই প্রযোজনা আবারও মঞ্চস্থ হওয়া উচিত।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন সমাজ ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজনেরা দেবাঞ্জন দেব, চেয়ারম্যান, সহায় ফাউন্ডেশন। প্রবাদপ্রতীম সঙ্গীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা, চলচ্চিত্র পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়, রাজ্য কর দপ্তরের আধিকারিক মনামী বিশ্বাস, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. আব্দুস সালাম, বিশিষ্ট শিল্পপতি প্রকাশরঞ্জন শ্রীবাস্তব। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়।

এদিনের অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল "ঝলক" নামে একটি নতুন বাংলা ইনফোটেইনমেন্ট অ্যাপ-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। প্রকাশরঞ্জন শ্রীবাস্তব, রাকেশরঞ্জন শ্রীবাস্তব ও দেবাঞ্জন দেব-এর মেধা ও পরিকল্পনায় নির্মিত এই বাংলা অ্যাপটি।, যা বাংলা ওটিটি জগতের প্রেক্ষাপটে আমূল বদল আনতে সক্ষম হবে বলে সকলের বিশ্বাস। খবর, বিনোদন এবং একগুচ্ছ নতুন চিন্তাভাবনায় উদ্দীপক কনটেন্টের মাধ্যমে "ঝলক" হয়ে উঠবে এক সম্পূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এই অ্যাপটি ১৫ আগস্ট, ২০২৫ থেকে Google Play Store ও Apple App Store-এ ডাউনলোডের জন্য উপলব্ধ থাকবে।
এমন বিরল অনুষ্ঠানের রেশ যেন এখনও চোখে লেগে আছে। সৃজন-মৌনিতার এই সম্পূর্ণ ভাবনাকে কুর্নিশ।
ফটোগ্রাফি: রাণা বন্দ্যোপাধ্যায়