
শেষ আপডেট: 15 September 2023 13:46
রাজনীতি এবং সিনেমা প্রায়শই হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে। কখনও দুই মাধ্যম গলা জড়াজড়ি করে থেকেছে, আবার কখনও বিবাদ হয়েছে, কিন্তু কেউ কারও পাশ থেকে সরে যায়নি। বাস্তবে বহু কথা বলা না গেলেও সিনেমার মাধ্যমে সহজেই পৌঁছে দেওয়া যায় সাধারণ মানুষের কাছে। এভাবেই অনেক সময় ছবির মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা করার অভিযোগ উঠেছে, আবার সরকার বিরোধিতার স্বরও উঠে এসেছে বড়পর্দায়। কিন্তু মূলধারার কমার্শিয়াল ছবিতে রাজনীতির সহজ পাঠ! বলিউডে সচরাচর এমনটা দেখা যায়নি আগে। সেটাই করে দেখালেন শাহরুখ খান (SRK)। তাঁর ‘জওয়ান’ (Jawan)-কে এবছরের সবথেকে বড় রাজনৈতিক ছবি আখ্যা দিয়েছেন সিনেমা এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। সিংহভাগ দর্শকও মানছেন একই কথা। আর এমন সময়ই এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। শাহরুখ যখন পর্দায় ‘আজাদি’র কথা বলছেন, ঠিক তখনই প্রেক্ষাগৃহের ভিতরেই ‘আজাদি’ (Presidency University Azadi slogan) স্লোগান তুললেন একদল তরুণ-তরুণী।

উত্তর কলকাতার হাতিবাগান এলাকার স্টার থিয়েটার। ঊনবিংশ শতকে এই থিয়েটারই তৎকালীন সমাজে রীতিমতো ‘বিপ্লব’ এনেছিল। যেই সময় নারীদের বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ছিল একপ্রকার পাপ বা গর্হিত অপরাধ, সেইসময় দাঁড়িয়ে এই থিয়েটারেই অভিনয় করে নিজেকে ইতিহাসের পাতায় নিয়ে গিয়েছিলেন নটী বিনোদিনী বা বিনোদিনী দাসী। পুরুষের সাজে একজন নারীর অভিনয় দেখার জন্য এই থিয়েটারের দর্শক আসন উপচে পড়ত সেইসময়। যে সমাজে প্রকাশ্যে বিনোদিনী ছিলেন অচ্ছুৎ, সেই তিনিই থিয়েটারের ভিতর ছিলেন আকাশের চাঁদের মতো। যাঁকে ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতেন দর্শকেরা। এতবছর পেরিয়ে এসে আজও সেই থিয়েটারের ভিতরেই যে ‘আজাদি’র ডাক উঠবে বা দিনবদলের কথা বলবেন নতুন প্রজন্মের কিছু পড়ুয়া, তা হয়ত অনেকেরই কল্পনার বাইরে ছিল। এবার সেই অকল্পনীয় ঘটনাকেই বাস্তব করে তুললেন একদল তরুণ তুর্কি।
দেখুন সেই ভিডিও:
গত ১৩ সেপ্টেম্বর, বুধবার, বিকেল ৪টে ৫০ মিনিটের শো দেখতে এই সিনেমাহলেই গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮৩ জন পড়ুয়া। এঁদের মধ্যে কেউ ততদিনে একবার, কেউ দু’বার করে সিনেমাটি দেখেও ফেলেছেন। কিন্তু দলবেঁধে শাহরুখ খানের সিনেমা দেখতে যাওয়া হবে, সেই ভাবনা থেকেই এই আয়োজন। এক পড়ুয়ার কথায়, ‘প্রেসিডেন্সির ইতিহাসেও এমন হয়েছে কিনা সন্দেহ যেখানে একসঙ্গে ৮৩ জন মিলে সিনেমা দেখতে গিয়েছে।’ গত ২০১৯ সালেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর তৈরি হয় শাহরুখ খানের একটি ফ্যান ক্লাব। যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের সবাই এই ফ্যান ক্লাবেরই সদস্য। এঁদের মধ্যে দু-তিনজন ছাড়া প্রত্যেকেই এখনও প্রেসিডেন্সির পড়ুয়া। সিনিয়র, জুনিয়র মিলিয়েই জোট বেঁধেছেন তাঁরা শুধুমাত্র শাহরুখ খানের জন্য। উল্লেখ্য, মাসখানেক ধরে এই সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক নিয়ে যেখানে যাদবপুর উত্তাল, সেখানে প্রেসিডেন্সির পড়ুয়ারা নতুন উদাহরণ তৈরি করলেন।

আসা যাক মূল বিষয়ে। সেদিন স্টার থিয়েটারে ‘জওয়ান’-এর ওই শো চলাকালীন হঠাৎই ‘আজাদি’ স্লোগান তোলেন এক পড়ুয়া। জবাবে তাঁর সঙ্গে গলা মেলান বাকিরাও। কিন্তু শাহরুখের সিনেমার সঙ্গে এই স্লোগানের কী সম্পর্ক? প্রশ্নের উত্তরে সেদিন প্রেক্ষাগৃহে থাকা প্রেসিডেন্সিরই পড়ুয়া দেবপ্রিয়া অধিকারী বললেন, “ছবির ক্লাইম্যাক্সের ঠিক আগে শাহরুখের ওই দীর্ঘ মোনোলগটার সঙ্গে আমরা অনেকেই বর্তমান সিস্টেমের মিল পেয়েছি। শাহরুখ যখন বলছেন, ‘আজাদি গরিবি সে, আজাদি অন্যায় সে’ তখন আমাদের মনে হচ্ছে, উনি তো আমাদের কথাই বলছেন। আমরা তো বারবার সিস্টেমের বিরুদ্ধে এভাবেই কথা বলতে চেয়েছি। তাই হঠাৎ করেই আমাদের এক বন্ধু এই স্লোগানটি দেন। আমরাও গলা মেলাই।" তাঁর সঙ্গে একমত বিতান ইসলামও। তিনিও প্রেসিডেন্সির ছাত্র। বিতান বললেন, “শাহরুখ যখন ক্যামেরার সামনে বলছিলেন যাঁরা ভোট চাইতে আসছে, তাঁদের কাছে প্রশ্ন করা উচিত কীভাবে সেই নেতারা আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, চাকরির ব্যবস্থা করবেন, তখন কথাগুলো আমাদের ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমরা বারবার ক্যাম্পাসে এই কথাই বলে এসেছি ‘আজাদি’ স্লোগানকে সামনে রেখে। তাই মনে হয়েছে, ওই মুহূর্তে এর চেয়ে ভাল আর কোনও স্লোগান হতে পারে না।"

উত্তরে দেবপ্রিয়া ও বিতান দু’জনেই জানালেন, আগে কয়েকজন সিনেমাটি দেখে নেওয়ায় তাঁরা জানতেন সেই দৃশ্যে শাহরুখ কী বলতে চলেছেন। কিন্তু যাঁরা তখনও দেখেননি, তাঁরা একেবারেই চমকে উঠেছিল প্রিয় অভিনেতার মুখে ‘আজাদি’র কথা শুনে। তাই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এক বন্ধু দর্শকাসনে বসেই ‘আজাদি’ স্লোগান দিয়ে ওঠেন। আর বাকিরা গলা মেলান। একইসঙ্গে দেবপ্রিয়া এও বলেন, “আমরা যারা সেদিন সিনেমাহলে ছিলাম, তাঁদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। আমরা গুটিকয়েক পড়ুয়া ছাড়া বাকিরা ক্যাম্পাসের ভিতরেও রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু বর্তমান সিস্টেম বা বলা ভাল বিজেপি সরকার কীভাবে সবাইকে পরিচালনা করছে, তা সবাই দেখতে পাচ্ছি। তাই এই কৃষি ঋণ, কৃষক আত্মহত্যা, চিকিৎসার গাফিলতিতে শিশুমৃত্যু, ঠিক যা যা গত ১০ বছরে বিজেপির আমলে আমরা দেখে এসেছি, সেগুলোই সিনেমায় দেখতে পেয়েছি। তাই সিস্টেম ও বিজেপির বিরুদ্ধেই আমাদের এই ‘আজাদি’ স্লোগান।”
‘অ্যাটলি-শাহরুখকে অনেক ধন্যবাদ!’ কেন একথা বললেন গোরক্ষপুরের সেই ডাক্তার কাফিল খান