শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
হিন্দি সিনেমার দুনিয়ায় যাঁরা বাংলা ছবি সম্পর্কে কিছুই জানেন না তাঁরাও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে চেনেন। কিন্তু সে চেনা অবশ্য বলিউড দিয়ে। কারণ এই সুপারস্টারের প্রথম জীবনের এক হিন্দি ছবি হিট করেছিল সেখানেই। নাম, 'আঁধিয়া'। এই ছবিটি দিয়েই বলিউডের নাতিদীর্ঘ কেরিয়ার শুরু তাঁর, আর এই ছবি দিয়েই তাঁকে আজও অনেকে চেনেন বি টাউনে। তখন অনেকেই জেনে গেছিলেন, বলাবলি করতেন, 'বিশ্বজিতের ছেলের প্রথম হিন্দি ছবি 'আঁধিয়া'।'
সালটা ১৯৯০। সে বছরেই ৮ জুন 'আঁধিয়া' দিয়ে বলিউডে প্রথম হিন্দি ছবিতে ডেবিউ করেন প্রসেনজিৎ। গতকালই ৩০ বছর পূর্ণ হল এই সূচনার। ডেভিড ধাওয়ানের সেই ছবিতে ছিলেন মুমতাজের মতো অভিনেত্রী। মুমতাজের কামব্যাক ছবি ছিল এটি। মুমতাজ-শত্রুঘ্ন সিনহা জুটির সঙ্গে ছিল তাঁদের জুনিয়র জুটি প্রসেনজিৎ এবং মধুশ্রী।

ছবির চরিত্র শকুন্তলাকে ঘিরে গল্প। সে চরিত্রেই ছিলেন মুমতাজ। বলিউড কুইন মুমতাজের ছেলের ভূমিকায় প্রসেনজিৎ। বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একসময় মুমতাজের নায়ক। তাঁর ছেলে হল মুমতাজের স্ক্রিন-পুত্র। কিন্তু স্টারকিড হওয়া সত্ত্বেও পিতার সাহায্য কিংবা সুযোগ প্রসেনজিৎ পাননি বাকিদের মতো। বম্বেতে থেকে অনেকদিন স্ট্রাগল করেন কেরিয়ারের গোড়ায়।
'আঁধিয়া'তে প্রসেনজিতের বিপরীতে মধুশ্রী থাকলেও পরিচালকের ফার্স্ট চয়েস তিনি ছিলেননা। মহরতের আগে প্রেস রিলিজে প্রসেনজিতের বলিউড নায়িকা ছিলেন সোনম। অজানা কারণে সোনম ছবিটা ছেড়ে দেন। সোনমের জায়গায় রিপ্লেস করা হয় মধুশ্রীকে। ওই বছরেই অবশ্য পরে প্রসেনজিৎ-সোনম জুটির বাংলা ছবি 'মন্দিরা' সুপারহিট হয়।

বলিউডের আঁধিয়া সিনেমা করার আগে প্রসেনজিৎ নায়ক হিসেবে বাংলায় বেশ ক'টি ছবি করেন। দু'টি পাতা তার মধ্যে হিটও করে। ছোট বউ, বৌদি, নীলকণ্ঠ-- এমন আরও অনেক ছবি করে ফেললেও সেগুলো একক প্রসেনজিৎ হিট ছিল না।
কিন্তু সুজিত গুহর 'অমর সঙ্গী' প্রসেনজিৎকে এনে দেয় সুপারহিট নায়ক তকমা। সেসময়ে তাপস পাল, চিরঞ্জিতের পাশাপাশি প্রসেনজিৎও নিজের জায়গা করে নেন পারফেক্ট হিরো হিসেবে। আর এই 'অমর সঙ্গী' দেখেই প্রসেনজিৎকে সুরজ বরজাতিয়া 'ম্যায়নে পেয়ার কিয়া'র হিরো করবেন বলে ভাবেন। এসময় প্রসেনজিৎ বম্বেতে ছবি করবেন ভাবছেন। কিন্তু সুরজ বরজাতিয়ার রাজশ্রী প্রোডাকশানের 'ম্যায়নে পেয়ার কিয়া' ছবির বড় অফার পেয়েও ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রসেনজিৎ।
অনেকেই মনে করেন, এর কারণ হল, কয়েক দিন আগেই তাপস পালকে নিয়ে 'অবোধ' ছবি করেছিলেন সুরজ বরজাতিয়া। মাধুরী দীক্ষিতকে হিরোইন পেয়েও সে ছবি ডাহা ফ্লপ করে। তাই রাজশ্রীর ছবি করলেন না প্রসেনজিৎ। এর পরেই আসে ডেভিড ধাওয়ানের 'আঁধিয়া'র অফার। মুমতাজের ছেলের ভূমিকায় এই রোলে প্রসেনজিৎ সাইন করেন।

পরে একটি সাক্ষাৎকারে 'আঁধিয়া' নিয়ে মুমতাজ বলেছিলেন, "নায়িকার রোল থেকে সরে যাওয়ার বহু যুগ পরে 'আঁধিয়া'তে ফের নায়িকা হয়ে কামব্যাক করি। আমার ছেলের ভূমিকায় ছিল বিশ্বজিতের ছেলে। ছবিটা এমন ভাবে ফ্লপ করল, যা আমার কাছে ছিল হৃদয়বিদারক। এর পরে আমি আর ছবি করিনি। আমার তখন আর ইঁদুর দৌড়ের প্রয়োজন ছিল না। লন্ডনেই থেকে যাই তার পর থেকে।"
'আঁধিয়া'র পর আরও কয়েকটি বলিউড ছবি করেন প্রসেনজিৎ, কিন্তু সাফল্য পাননি সে অর্থে। পরে প্রসেনজিৎ বলেছেন "যে কোনও ভাবে উপার্জন করতে হবে, এটাই ছিল আমার ছবিতে আসার উদ্দ্যেশ। যে বয়সে লোকে খেলে বেড়ায়, সে বয়সে আমি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের জন্য ঘুরে বেড়িয়েছি। স্টারকিড ফেভার কখনই পাইনি। স্টার বাবার চেয়ে ঘরোয়া মায়ের অবদান অনেক বেশি। তখন বাংলা ছবি করে হিন্দি ভালো ছবি করার অফার ছেড়ে দিয়েছি সময়ের কারণে। ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া থেকে সাজনের মতো ছবি ছেড়ে দিয়েছি। ম্যাচিওরিটিরও অভাব ছিল আমার। যা করতাম সেটা একার ভাবনায়।"

পাশাপাশি বাংলায় কাজও শুরু হয়। তখন যে প্রযোজকরা বুম্বার জন্য তাঁদের ছবিতে টাকার অঙ্কে বিনিয়োগ করছেন, তাঁদের প্রতিও দায়িত্ব ছিল তাঁর। বম্বেতে গিয়ে চতুর্থ বা পঞ্চম রো-তে দাঁড়ানোর থেকে বাংলায় যাদের জন্য তিনি প্রথম সারির নায়ক, তাঁদের কথা বেশি ভেবেছেন। 'বম্বে থেকে ফ্লপ করে টলিউডে আবার ফিরে এসেছে।'-- এটা কাউকে বলার সুযোগ দেননি।
ভুল যে করেননি, সেটা আজ তাঁর খ্যাতি ও জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, প্রথম শুরু সবসময়ই অতুলনীয়। তাই হিট হোক বা ফ্লপ, বাঙালি তারকা যে একদা বলিউডে অভিষিক্ত হয়েছিলেন, সে কথা ফেলে দেওয়া যায় না। সেই অভিষেকেরই তিন দশক পূর্ণ হল গতকাল।