
শেষ আপডেট: 26 February 2023 18:04
গত কয়েক বছরে মহানায়কের করা আইকনিক চরিত্রে কিংবা মহানায়ক উত্তমকুমারের বায়োপিকে দেখা গেছে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে (Prasenjit Chatterjee)। রীতিমতো উত্তমকুমার হয়েই পর্দায় এসেছেন প্রসেনজিৎ। সেই নিয়ে দর্শক মহলে বিপুল চর্চা হয়েছে বারবার। তবে এবার আর উত্তমকুমার নয়। বসন্ত চৌধুরী অভিনীত বিখ্যাত চরিত্রে আসতে চলেছেন প্রসেনজিৎ।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'দেবী চৌধুরাণী' উপন্যাসে ভবানী পাঠক (Bhabani Pathak) এক কিংবদন্তী চরিত্র, যিনি বাংলার ডাকাত সর্দার। ডাকাতির অর্থ তাঁর কাছে দুষ্টের দমন করে শিষ্টের পালন। ভবানী পাঠকের আশ্রয়েই অনাথা প্রফুল্ল নিরাপত্তা পায়। ভবানী পাঠক প্রফুল্লর কাছে হয়ে ওঠেন ভবানী ঠাকুর। ভবানী পাঠকের পাঁচ বছরের প্রশিক্ষণে প্রফুল্ল হয়ে ওঠে ডাকাত রানি দেবী চৌধুরাণী। দেবী চৌধুরাণীর ভবানী পাঠক শুধু একজন ডাকাত সর্দার নন, তিনি যেন জীবন দেবতা, তিনি সকলের আদর্শ। যিনি প্রফুল্লর জীবনে না এলে দেবী চৌধুরাণীকে আমরা পেতামনা। যিনি অসহায় নারীর লজ্জা কাড়েননি বরং পিতার স্নেহে নারীকে দিয়েছেন শক্তিমতী হয়ে ওঠার সকল অস্ত্র। তাই তিনি সবার মনে আজও পূজিত।

১৯৭৪ সালে দীনেন গুপ্ত যখন দেবী চৌধুরানী বাংলা ছবি করলেন, তখন তিনি দেবী চৌধুরাণীর নামভূমিকায় ভাবলেন সুচিত্রা সেনকে। আর ভবানী পাঠক বসন্ত চৌধুরী। না, উত্তমকুমারকে দীনেন গুপ্ত ভবানী পাঠকের চরিত্রে ভাবেননি। বসন্ত চৌধুরী যেন এই চরিত্রে যথার্থ। বসন্ত চৌধুরীর সুদর্শন চেহারা, উচ্চতা, রাজকীয় গ্ল্যামার আর ভরাট কণ্ঠস্বরে পর্দা কেঁপে উঠল। দর্শকরা রোমাঞ্চিত হল ভবানী পাঠককে দেখে। সুচিত্রা সেনের পাশে এতটুকু ম্লান হল না বসন্ত চৌধুরীর উপস্থিতি। বরং দু'জন দু'জনকে টক্কর দিলেন রীতিমতো।

দীনেন গুপ্তর দেবী চৌধুরাণী বক্সঅফিসে সফল ছবি হলেও সে অর্থে ক্লাসিক ছবি হয়তো হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ প্রফুল্লর বয়সের তুলনায় সুচিত্রার বয়স ছিল অনেকটাই বেশি। পরিচালনাতেও কিছু জায়গা দুর্বল ছিল। কিন্তু বসন্ত চৌধুরীর ভবানী পাঠক ক্লাসিক চরিত্র হতে পেরেছিল। যে চরিত্রে সবার প্রিয় বসন্ত।

এর আগে বিজয় বসুর 'রাজা রামমোহন' ছবিতে রামমোহন চরিত্র করে কালজয়ী হয়ে ওঠেন বসন্ত চৌধুরী। বসন্ত চৌধুরীর আভিজাত্য সমসাময়িক উত্তম কুমার বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-- কারওই ছিল না। এই আভিজাত্যই বসন্তর রোম্যান্টিক নায়কের রোলে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি পর্দায় এলে ভগবানসম চরিত্রেই ভাবতেন দর্শকরা, যাঁকে শ্রদ্ধা করা যায়, যাঁর সঙ্গে প্রেম করা যায় না।

আজও প্রতিটি বাঙালির মনে ভবানী পাঠক মানেই বসন্ত চৌধুরীর মুণ্ডিত শির, সুদর্শন মুখশ্রী ভেসে ওঠে। যাঁর গম্ভীর কণ্ঠের মন্ত্রোচ্চারণে মন পবিত্র হয়ে ওঠে। ডাকাত সর্দার রূপে তাঁর চরিত্রের বিকল্প হয় না।

এবার আবার পর্দায় আসছেন দেবী চৌধুরাণী। সুচিত্রা সেনের পর বড় পর্দায় শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় দেবী চৌধুরাণী রূপে।
নতুন ছবির ঘোষণা হয়েছে সদ্য। অভিযাত্রিক ছবির পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্র বঙ্কিমচন্দ্রের কালজয়ী উপন্যাস ‘দেবী চৌধুরানী’র কাঠামোকে ভিত্তি করে সিনেমা গড়ছেন নতুন। এই ছবিতে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় হচ্ছেন ভবানী পাঠক। শুধু বাংলা নয়, ছ'টি ভারতীয় ভাষায় মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে এই সিনেমাটির।

যে ভবানী পাঠকের চরিত্রে বসন্ত চৌধুরী সবার মনে বসে আছেন, সেই জায়গায় প্রসেনজিতের ভবানী পাঠক হয়ে স্বীকৃতি পাওয়া বেশ বড় চ্যালেঞ্জের। বসন্ত চৌধুরীর ভগবানদত্ত কণ্ঠ ও অতীব ফর্সা চেহারা প্রসেনজিতের নেই। বসন্তর আভিজাত্যর সঙ্গে কারওই তুলনা হয় না।

প্রসেনজিৎ তাঁর প্রয়াত বসন্ত কাকুর চরিত্রের মতো হয়ে উঠতে পারবেন কি? যদিও জানা গেছে, তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের ভবানী পাঠক চরিত্রটিকে স্টাডি করছেন, দীনেন গুপ্তর বসন্ত ভবানীকে নয়। তবু দর্শক মনে বসন্ত চৌধুরীর সঙ্গে প্রসেনজিতের তুলনা আসবেই।

এর আগে মুণ্ডিত মস্তকে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের 'গুমনামি' ছবিতে দেখা গেছিল প্রসেনজিৎকে। দেবী চৌধুরাণীতে প্রসেনজিৎ কী ভাবে আবির্ভূত হবেন, সেটাই এখন বড় চমকের। প্রসেনজিৎ মানেই নতুন ছবিতে নতুন লুকে ধরা দেন। নিজেকে নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন নিরন্তর। তুলনায় বসন্ত চৌধুরী কিন্তু নিজেকে কম ভেঙেছেন, তিনি আভিজাত্যর মোড়কে একই জাতের চরিত্র করে গেছেন। সেদিক থেকে প্রসেনজিৎ এগিয়ে বই কী।

তবু ভবানী পাঠক বসন্ত চৌধুরীর ক্লাসিক চরিত্রের থেকে প্রসেনজিৎ স্বতন্ত্র ভবানী পাঠক হয়ে উঠতে পারেন কিনা সেটা সময়ই বলবে।

সুচিত্রা থেকে মুনমুন ‘দেবী চৌধুরাণী’ হয়ে আজও সবার মনে, শ্রাবন্তী কতটা যোগ্য?