
পরবাসী।
শেষ আপডেট: 5 November 2025 15:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সময় তখন ১৯৬০। ভারতবর্ষের মানচিত্রে তখনও তাজা রক্তের দাগ, আর পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে ছড়িয়ে আছে ধর্মীয় বিভাজনের আগুন। সেই ভয়াল সময়ের আবহেই জন্ম নিয়েছে মনেট রায় সাহার নতুন ছবি ‘পরবাসী’। ইতিহাসের ভিতরে থাকা এক মানবিক কাহিনির পরতে পরতে ছুঁয়ে যাবে মাটি, মানুষ আর স্মৃতির গন্ধ।
ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে নিমাই—এক প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা, যার জীবন একদিন পাল্টে যায় চিরতরে। পূর্ব পাকিস্তানের অন্ধকারে যখন ধর্মীয় নিপীড়নের ছায়া ঘনিয়ে আসে, নিমাই তার পরিবারকে নিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে পাড়ি দেন সীমান্তের ওপারে। কিন্তু যাত্রাপথেই ঘটে যায় এক ট্র্যাজেডি—প্রিয় কন্যা অসীমা হারিয়ে যায় পথের মধ্যে। সেই হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তেই যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় নিমাইয়ের জীবন, আর ইতিহাসের বুকে খোদাই হয় এক নতুন নির্বাসনযাত্রার কাহিনি।
ত্রিপুরার এক দূর গ্রামে এসে আশ্রয় পান তাঁরা। পুনীরাম নামের এক আদিবাসী মানুষ তাঁর দরজা খুলে দেন উদ্বাস্তু পরিবারটির জন্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিমাই সেখানে স্থানীয় শিশুদের পড়ানো শুরু করেন, নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে নতুন জীবনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ভাগ্যের পথ সবসময় সরল নয়—নিমাইয়ের ছেলে অতুল, পুনীরামের কন্যা ফুলমতিকে ভালোবেসে ফেলে, আর এই প্রেমই হয়ে ওঠে দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্কের অশান্ত সীমানা।
ক্রমে ক্রমে শরণার্থীর ঢল নামতে থাকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে। আদিবাসী জনজাতিরা ভয় পেতে শুরু করে—তাদের মাটি, তাদের সংস্কৃতি কি হারিয়ে যাবে সংখ্যার চাপে? কিছু বিভ্রান্ত যুবকের হাতে সেই ভয় একদিন পরিণত হয় হিংসায়। সম্পর্কের উপর জমতে থাকে অবিশ্বাসের কালো মেঘ। রক্তাক্ত হয় দুই সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
ঠিক সেই সময়, ভাগ্যের এক অপ্রত্যাশিত ঘূর্ণিতে আবারও ফিরে আসে অসীমা—কিন্তু সে আর আগের অসীমা নয়। এখন সে ‘অসীমা বেগম’। বাংলাদেশের এক অন্য জীবনে বাঁচছে সে। নিজের পরিচয় আর অতীতের মাঝে দোদুল্যমান এই মেয়ের পুনর্মিলন কোনও আনন্দ নয়, বরং এক গভীর মানসিক ট্র্যাজেডি। কে সে আসলে? কার ঘরে তার শিকড়? এই প্রশ্নেই দগ্ধ হয় এক ভাঙা পরিবারের শেষ অবলম্বন।
অশ্রুর ধারায় ধুয়ে যায় নিমাইয়ের সংসার। একের পর এক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় এক প্রজন্মের সংগ্রাম, এক ইতিহাসের অধ্যায়। শেষে, নিমাই আবারও বেরিয়ে পড়েন—এক অজানা পথে, এক নতুন আশ্রয়ের খোঁজে। যেন চিরন্তন মানবজাতির প্রতিচ্ছবি—চলে যাওয়া, হারানো, আবারও শুরু করা।
এই অনবদ্য কাহিনি পর্দায় প্রাণ পেয়েছে লোকনাথ দে, কিঞ্জল নন্দ, দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত, স্বাতী মুখোপাধ্যায় ও সবুজ বর্ধনের অভিনয়ে। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আরও একাধিক নামী শিল্পী, যাঁদের উপস্থিতিতে সমৃদ্ধ হয়েছে ছবির প্রতিটি ফ্রেম।
‘পরবাসী’ প্রযোজনা করেছে পূর্ব দিগন্ত ফিল্ম প্রোডাকশন, প্রযোজক অনিল দেবনাথ। ছবির সঙ্গীত পরিচালনায় রয়েছেন অমিত চ্যাটার্জি, আর ক্যামেরার পেছনে আছেন জায়েস নায়ার। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন শান, ইমন চক্রবর্তী, মেখলা দাশগুপ্ত ও ইকশিতা—যাঁদের সুরে মিশেছে বেদনা ও আশার সুরেলা দোলাচল।
মানবতার হৃদস্পন্দনে, ইতিহাসের মর্মে বোনা এই চলচ্চিত্র খুব শীঘ্রই আসছে বড়পর্দায়। ইতিমধ্যেই ছবিটি নির্বাচিত হয়েছে ৩১তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে—যেখানে ৭ই নভেম্বর নন্দনে, ৯ই নভেম্বর স্টার থিয়েটার (বিনোদিনী) ও ১০ই নভেম্বর মেট্রো সিনেমা হলে প্রদর্শিত হবে ছবিটি।