
গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 16 December 2024 16:00
একটু বেশিই সময় নিয়ে এ লেখা লিখতে বসলাম। কারণ সাহস জোটাতে পারছিলাম না। গভীর রাতে সাংবাদিকদের ফোনেও আমার একটি কথা বলার সাহস হয়নি। আজ সকালেও চ্যানেলে-চ্যানেলে আপনাকে নিয়ে কিছু বলতে বলায়, সেই সাহস খুব কষ্ট করে জোটাতে হয়েছে। ভারতীয় সঙ্গীতকে আন্তর্জািতক পর্যায়ে যে উচ্চতায় আপনি নিয়ে গিয়েছেন, তা আর আলাদা ভাবে লেখার অপেক্ষা রাখে না। তাই আমি নিজেকে তা থেকে দূরেই রাখছি...
আজ আমার সেই চেনা ‘দাদা’ জাকির হোসেনের (zakir hussain) কথা খুব মনে পড়ছে। আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। আমেরিকায় যে বাড়িতে আমি এবং আপনি একসঙ্গে থাকতাম, সেই বাড়িটার কথাও। উপরতলায় আমি মা-বাবা থাকতাম। নিচের তলায় আপনি এবং পণ্ডিত চিত্রেশ দাস। মা-বাবা বেরিয়ে গেলে আমায় দেখে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হতো আপনাকে। যখন বড় হলাম, একসঙ্গে এক মঞ্চে পারফর্ম করছি, কতবার আমার গাল টিপে, চুল টেনে সে কথা মনেও করিয়ে দিয়েছেন। সেই সব কথাও মনে পড়ছে আজ। আমার ছেলেকে কতবার বলেছেন, ‘তেরা জিতনা উমর হ্যাঁয়, তেরে পাপাকা উতনা থা, তবসে ম্যাঁয় উসে জানতা হু! বচপন মে বহুত বদমাশ থা! বাপ রে বাপ!’—সে সবও খুব মনে পড়ছে আজ।
যখন ঠিক করলাম যে ‘ফিউজন’ মিউজিকে মন দেব, তার ঠিক আগে-আগে লস অ্যাঞ্জেলসে দেখা হলো আপনার সঙ্গে। কতক্ষণ সময় নিয়ে আমায় বোঝালেন সঙ্গীতচর্চায় কোন পথ ধরে এগোব, কীভাবে আরও উন্নত করব নিজেকে, কীভাবে সুরের সুক্ষ্মতায় মন দেব, কত কী...আমি সেদিন বুঝেছিলাম, ‘বড়’ মাপের শিল্পীরা ছোটদের ‘বড়’ হওয়ার আলো হয়ে পথ দেখিয়ে দেন। ২০১৬ সালে বাবাকে (পন্ডিত শঙ্কর ঘোষ) হারিয়েছি, তারপর থেকে আমার এক জায়াগা তৈরি হয়, সে ছিল আপনি। শুধু সঙ্গীত নিেয় কেন, জীবনের কত দোলাচলের কথা আপনি জানতেন। সময়ে-সময়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘তেরা অব কৌনসা ফেজ চল রহা হ্যাঁয়?’ আমিও বলতাম অবলীলায়।
আরেক ঘটনা খুব মনে পড়ছে, জাকিরজি। আগেও এ কথা বলেছি আপনাকে, আজ আবারও লিখছি। আমি আপনার থেকে বেরোতে চেয়েছিলাম। ভীষণভাবে। আপনার এক বিরাট প্রভাব আমার কাজে ছিল। আমি সেই প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। পেরেওছি। তা আপনার কারণেই। আপনার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, ‘আমি আপনার মতো হতে চাই না’, আপনি বলেছিলেন, ‘ইয়ে বাত মুঝে আচ্ছা লগা, তু তেরে হিসাব সে বাজা, জো তু করেগা, উয়ো অাচ্ছা হি হোগা, মুঝে পাক্কা ইয়াকিন হ্যাঁয়’। তারপর আর আপনাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করিনি, জাকিরজি। অনুপ্রাণিত হয়েছি বারবার।
আরেকটা বিষয় লেখার সময়, নিজেই খানিক হাসছি। একটা সময় ছিল, তখন আপনার স্টাইল স্টেটমেন্টের সঙ্গে আমারও একটা মিল ছিল। কতগুলো বছর অমনই ছিল আমার হেয়ারস্টাইল। অনেকে বলতেন আমায় নাকি আপনার মতো দেখতে লাগছে। তারপর আস্তে-আস্তে নিজেকে আলাদা করেছি আপনার থেকে। আমার হাতে এসেছে বিডসের মালা, গলায় মাফলার, চোখে গান্ধী চশমা।
আমি অস্বীকার করব না, আপনার থেকে অনেক কিছু শিখেছি। সুরের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন। তবলার বোলের যে ভাষা আমরা বাজানোর সময় বুঝতে পারি, কীভাবে তা শ্রোতাদের মনে ছড়িয়ে দিতে হয়। শিখেছি সুরের স্বকীয়তা কীভাবে ধরে রাখব আবার একইসঙ্গে সবার মাঝে ‘অন্য’ হয়ে উঠব। এই শিক্ষা আমি কেন আমার মতো কত শত শিল্পী রোজ শিখছে। এটাই তো আপনি চেয়েছিলেন মনেপ্রাণে, তাই না? কতবার আড্ডায় উঠে এসেছে ভারতীয় সঙ্গীতকে আরও কীভাবে ‘গ্লোবাল’ করা যায়, তা নিয়ে চর্চা। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটেছে একই বিষয় নিয়ে আলোচনায়। নতুন প্রজন্ম নিয়েও ভাবনা ছিল আপনার, ওয়ার্কশপেও তাঁদের মুখেও শুনেছি শুধু আপনারই প্রশংসা।
গত বছর গোয়ায়, কালকের দিনে আমরা একসঙ্গে ছিলাম জাকিরজি। শো শেষে জড়িয়ে ধরেছিলাম মিনিট পাঁচেক। বুঝতেই পারিনি এক বছর পরে ওই একই দিনে আপনি চলে গেলেন (Zakir Hussain death, Zakir Hussain death news)। আমায় আজ থেকে এমন এক পৃথিবীতে বাঁচতে হবে, যে পৃথিবীতে জাকিরজি নেই!