
ঋত্বিক চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: 31 March 2025 15:53
আমাদের বন্ধুত্বের বয়স প্রায় ২৩ বছর। ২০০২ সালে আমি রূপকলা কেন্দ্রে (চলচ্চিত্র ও সমাজ সংযোগ প্রতিষ্ঠান, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পঃ বঃ) ভর্তি হই। ভর্তির দিন মনীষ বসু সঙ্গে ঋত্বিককে (Ritwick Chakraborty) প্রথম দেখি। ও ছিল মনীষের বন্ধু। ওরা দু’জনেই বারাকপুরে থাকত। তবে সেই দেখাটা ছিল ক্ষণিকের। ২০০৩ সালে একটা এক্সারসাইজ প্রজেক্ট করতে হয়েছিল আমাদের। সিনেমা তৈরি করতে গেলে দরকার অভিনেতা। আমাদের কারওরই সেভাবে কোনও অভিনেতার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। সেই সময়ে সবকটি ছবিতেই ছিল ঋত্বিক চক্রবর্তী। আলাপ হল, ঋত্বিকের সঙ্গে।
আমার এবং ওর জীবনের প্রথম কাজটিও একসঙ্গে হয়েছিল। ছবির নাম ছিল ‘সত্যি হলেও গল্প’। ১০ মিনিটের ছবি। এখন যখন ছবিটা দেখি, আবার ফিরে যাই ২৩ বছর আগের সময়টাতে। ছিপছিপে, কম কথা বলা ছেলেটা, যার চোখে একরাশ স্বপ্ন...
তিনটে বছর কাটল। আমাদের ঘনিষ্টতা বাড়ল। ২০০২ সালে গড়ফায় একটা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। আমি আর ঋত্বিক (Ritwick Chakraborty) । তখন ও চুটিয়ে মেগা সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট লিখছে। আসা যাওয়া লেগে থাকত। ২০০৫ সালে মাস দুয়েকের জন্য ছিল আমার সঙ্গেই। ২০০৬ সালে পাশেই এক অন্য জায়গায় থাকা শুরু করি। পাকাপাকিভাবে টানা চার বছর আমি আর ঋত্বিক ছিলাম একসঙ্গে। ২০১০ সাল অবধি।
এতগুলো বছর একসঙ্গে ঘর করার দরুণ, ওর মোটামুটি অনেকটাই আমার জানা হয়ে গিয়েছিল। তাই কোন কথার পরিপেক্ষিতে ও কী বলতে পারে, তার আগাম ধারণা আমার আছে। আমি একের পর এক ছোট ছবি এবং টেলিফিল্ম করতে থাকি। প্রত্যেক ছবিতেই আমার সঙ্গে ঋত্বিক। ‘বিশাস নাও করতে পারেন‘(২০০৬), ‘পিঙ্কি আই লাভ ইউ‘(২০০৭), ‘কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল’ (২০০৮), ‘সত্যি হলেও গল্প’ (২০০৯)।
তারপর ২০১০ সালে, যখন ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ছবিটা করছি, ততদিনে আমি অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তীকে (Ritwick Chakraborty) খুঁজে পেয়ে গিয়েছি। বুঝলাম, অভিনয়ে যে ঋত্বিককে দর্শক দেখে, তা সিকি ভাগ মাত্র। ঋত্বিক চক্রবর্তী আদপে, যে কতটা বিরাট তা বোঝানো অসম্ভব। ওর মধ্যে একটা অদ্ভূত এনার্জি রয়েছে। ততোটাই ক্রিয়েটিভ। প্রতিটা দৃশ্যে ওর অভিব্যক্তিতে মিশে যায় সৃজনশীলতা। আর এই মিশেলটা চমৎকার হয়। যাঁরা কাজ করেছেন ওর সঙ্গে, তাঁরা এটা জানেন। আসলে, ওর সঙ্গে কাজ, আমার কাছে আড্ডা মারার থেকে আলাদা কিছুই নয়। সেভাবেই আমার প্রতিটা ছবি হয়েছে। আমার কোনও ফিচার ছবি ঋত্বিককে ছাড়া হতো না। ‘নধরের ভেলা’ ছবিটা দেখলে মানুষ এটা আরও বুঝতে পারবে। আমি একভাবে গল্পটা লিখেছিলাম, দৃশ্যগুলো সাজিয়েছিলাম। কিন্তু ঋত্বিক যখন সেই দৃশ্যে অভিনয় করেছে সেটাকে যে অন্য পর্যায় নিয়ে চলে গিয়েছে, তা আমার কল্পনারও বাইরে।
ঋত্বিকের একাধিক গুণ রয়েছে। প্রথমত, ওঁর মতো সাহায্যকারী মানুষ খুব কম হয়। এবং এই বিষয়ে ওর কোনও রকম অহংকার নেই। একবার আমার গভীর সমস্যায় ও যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল, তা কোনওদিনও ভুলতে পারব না। দ্বিতীয়, ঋত্বিক (Ritwick Chakraborty) দারুণ রাঁধতে পারে। ওর এক্সপেরিমেন্টাল রান্নার হাত যা রয়েছে, তা বড় রেস্তোরাঁর শেফদের ও নেই। আমি হলফ করে বলতে পারি। যতদিন একসঙ্গে ছিলাম। আমি ভাত রান্না করতাম, আর ও বাকি পদ। ওর স্পেশাল রান্নার পদ, ‘জিরে চিকেন’। কতদিন যে হয়ে গেল...বলতে হবে ওকে।
তৃতীয়, ঋত্বিক আমার দেখা প্রকৃতিপ্রিয় মানুষের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। শুধু ঋত্বিক নয়, ও যাঁকে বিয়ে করেছে, তিনিও, অর্থাৎ অপরাজিতা। গাছের প্রতি ঋত্বিক-অপরাজিতার এক অদ্ভূত প্রেম, আদর, ভালবাসা রয়েছে। একবার ওরা বাড়ি বদল করেছিল। মনে আছে, গাছের কোনও ক্ষতি যেন না হয়, এটা নিয়ে যথেষ্ট ভাবিত ছিল। এমন মানুষ আমি সত্যিই দেখিনি। ঋত্বিক গাছপাগল মানুষ।
চতুর্থটি, গুণ কি না জানি না, এটা ওর ক্ষমতা বলাই ভাল। ঋত্বিকের (Ritwick Chakraborty) মানুষের মন দারুণ পড়তে পারে। সামনে বসা মানুষের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার পর ও বুঝতে পারে তাঁর মনের ভিতরটা। ওর এই অনুমানের বিষয়টি দেখে, এবং প্রমাণ পেয়ে, বহুবার স্তম্ভিত হয়েছি।
আজ ঋত্বিক চক্রবর্তীর জন্মদিনে, এমন অনেক কথাই মনে পড়ছে যা আমি লিখতে পারব না। কারণ সেগুলো শুধু আমাদের কথা। বন্ধুর গুণগুলো লিখে ফেললাম, একজন বন্ধু হিসেবে বন্ধুর ‘খারাপটা’ও বলতে হয়। ওর খারাপ, ওর ধূমপানের বিষয়টা। (যদিও এটা পড়ার পড়ে, এই বিষয়ে আমার দিকেও আঙুল উঠবে) তবুও বলিছি এটা কমলে আর ওর কোনও ‘খারাপ’ই লিখতে পারব না, কোনওদিন।
বন্ধুর জন্মদিনে মনপ্রাণ থেকে চাই, ও যেন ভাল থাকে, ও অপরাজিতা, পান্তো, সবাই মিলে যেন ভাল থাকে। ঋত্বিক ঠিক যেমন আছে, তেমনটাই থাকুক। ওর ক্রিয়েটিভ যত দিক আছে, সব এক্সপ্লোর হতে থাকুক। ছড়া লেখা, শ্যাডোগ্রাফি, পাপেটরি, স্ক্রিপ্ট, সব। আর আমাদের মধ্যে যা রয়েছে, তা ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ই থাকুক ঋত্বিক।