
শেষ আপডেট: 4 October 2023 17:50
'আমার নিঠুর মনোহর
যদি পাই তোমার লাগর,
খুলিয়া কইতাম তোমারে পরানের খবর।
আমি প্রেমফাঁসি লইয়া গলে
যাইগো যদি মরিয়া, প্রেমফাঁসি,
দেইখো আসিয়া,
আমার বন্ধু চিকন কালিয়া
দেইখো আসিয়া।।'
গত বেশ কিছুদিন ধরেই ইউটিউব থেকে শুরু করে অন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও সবচেয়ে বেশি ট্রেন্ডিং এই 'নিঠুর মনোহর' গান। এক নবাগত তরুণের লেখনী ও গায়কীতে মাত হয়েছে সারা পৃথিবীর বাঙালি। যাঁরা অবাঙালি তাঁরা কথা না বুঝলেও এই গানের সুরে মজেছেন। মিষ্টি কথা ও সুরে এবং অসামান্য খোলা কণ্ঠের এই গান অনেকদিন পর শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁতে পেরেছে। বাংলাদেশের ছেলের গানে ডুবেছে সারা ভারত। 'নিঠুর মনোহর' গানের স্রষ্টা ও গায়ক ঈশান মজুমদার এই প্রথম অকপট আড্ডায় ধরা দিলেন কোনও ভারতীয় সংবাদ পোর্টালে। 'দ্য ওয়াল'-এর আড্ডায় সঙ্গীতশিল্পী ঈশান মজুমদার। শিল্পীর সঙ্গে আড্ডা দিলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
'নিঠুর মনোহর' দুই বাংলা সহ সারা পৃথিবীর মানুষ পছন্দ করছেন। আপনার গান ফেসবুক-ইউটিউবে ট্রেন্ডিং। আপনার গান শুনে শ্রোতারা চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না! এটা কতটা ভাল লাগছে?
'নিঠুর মনোহর' গানটি একদিন উকুলেলে-তে গেয়ে আমার পেজে আপলোড করি। তারপর থেকে গানটি সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। গানটার একটা রেকর্ডেড ভার্সন সবাই চাইতে শুরু করে। তারপর আমি গানটা নিজের মতো করে গেয়েছি। মানুষের ভালবাসা যা পাচ্ছি সবই আশীর্বাদ মনে হচ্ছে। এই সবকিছুই আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করছে।
আপনার আরেকটা নাম তো মুকুল। স্কুল কলেজের নাম কী?
মুকুল আমার বাবা-মায়ের দেওয়া ভাল নাম। কিন্তু আমার বন্ধুমহলে সবাই আমাকে ঈশান নামেই চেনে। ঈশান নামে ডাকলেই আমার ভাল লাগে।
ঈশানের ছেলেবেলা থেকে বড় হওয়া কোথায়? বাড়িতে কে কে আছেন?
আমার বড় হওয়া ঢাকাতে। ছোটবেলার পুরোটা সময় ঢাকা শহরেই কেটেছে। পরিবারে আছেন আমার বাবা মা এবং দুই বোন।
গানের প্রতি ভালবাসা কবে থেকে শুরু?
আমি ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশের 'ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তন' -এর সঙ্গে যুক্ত। সেখানে আমাদের দেশের অনেক গুণী শিল্পীদের সান্নিধ্য পেয়েছি। গান শেখা ও গানের প্রতি ভালবাসাটা সেখান থেকেই শুরু হয়েছে।
কোন গান কীভাবে আপনাকে প্রথম প্রচারের আলোয় নিয়ে আসে?
ভার্সিটির এক বড় ভাইয়ের (পড়ুন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দাদার) অনুপ্রেরণায় আমি 'গানকবি' নামে একটা থিয়েট্রিক্যাল লোকসঙ্গীত ব্যান্ডে গায়ক হিসেবে যুক্ত হয়েছিলাম। ব্যান্ডের প্রথম শো থেকেই দেখলাম যে শ্রোতারা আমার গান পছন্দ করছেন। এরপর আমার ফেসবুক পেজ 'ঈশানের গান'-ও দেখছিলাম অনেকে এসে প্রশংসা করে যাচ্ছেন। তবে 'কোক স্টুডিও' -তে 'দাঁড়ালে দুয়ারে' গানটি গাওয়ার পর প্রথম মাস অডিয়েন্সের কাছে আমার গান পৌঁছে যায়।
'নিঠুর মনোহর' গান তৈরি গল্পটা কী?
গান লেখার চর্চা কিংবা নিজের লেখা কথায় সুর দেওয়ার চেষ্টা করছি বেশকিছু দিন আগে থেকেই। আমার ঠিক মনে নেই, কিছু একটা ভাবতে ভাবতেই 'নিঠুর মনোহর' গানটা আমি লিখি। পরে সুর করার সময় আমার মনে হয় সুর সবখানেই আছে। বাংলার আকাশে, বাতাসে সব জায়গাতেই সুর খেলা করে। গ্রাম বাংলার প্রাচীন গানের সুর নতুন গানে ফিরে ফিরে এসেছে। সেরকম কিছু প্রাচীন সুর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর গানে ব্যবহার করেছেন। আমার মনে হয়েছে আদি সুরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি চাই পুরনো সুরগুলোকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে বাঁচিয়ে রাখতেই পারি। আর 'নিঠুর মনোহর' গানে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে সারিন্দা, ঢোল, দোতারা, হারমোনিয়াম, বাঁশি। যেসব বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার আজকাল খুব একটা দেখা যায় না। এইসব ব্যাপারগুলোই 'নিঠুর মনোহর' গানটাকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে।
'নিঠুর মনোহর' গানের সুরের সঙ্গে ভীষণ মিল আইকনিক শ্যামাসঙ্গীত 'মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন'-এর। ওই সুরের প্রভাবেই কী তৈরি 'নিঠুর মনোহর'?
'নিঠুর মনোহর' লেখাটা কিংবা গানটা 'মায়ের পায়ের জবা হয়ে' র প্রভাবে বা অনুপ্রাণিত হয়ে বানানো হয়নি। আমি আগেই বলেছি, একদিন কিছু একটা ভাবতে ভাবতেই লেখাটা আমি লিখি। এই সুর ব্যবহার করব সেটাও মাথায় আসেনি তখন। কিন্তু যখন দেখলাম সুরটা প্রচলিত, পরে বুঝতে পারলাম যে এই সুর বহু আগের, বহু পুরনো। হয়তো আমাদেরই গ্রামবাংলার কোনও এক গাঁয়ে এই সুরে গলা ছেড়ে কোনও এক বাউল তাঁর মনের ভাব প্রকাশ করেছিলেন, কিংবা মাঝিভাই বৈঠা বাইতে বাইতে গেয়ে উঠেছিলেন এই সুর। এভাবেই এই সুর বাংলার প্রকৃতিতে মিশেছে আর বাংলাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। লোকগানে এমন প্রচলিত সুর ব্যবহার করা হয়েছে, সেরকম আরও অনেক গান আছে, হয়তো গানগুলো আমাদের খুবই পরিচিত, কিন্তু আমরা জানি না যে সুরটা আদি কোনও প্রচলিত সুর। প্রচলিত কিছু সুর ধরে রাখাটাই আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল আসলে। আমি নিজের সুর করা গানের পাশাপাশি আরও কিছু প্রচলিত সুরেও গান বাঁধার পরিকল্পনা করছি, এমনকি বেঁধেছিও। ঈশ্বর চাইলে, আর যদি সুস্থ থাকি তাহলে সামনে শুনতে পাবে সবাই।
নিঠুর মনোহর মিউজিক ভিডিও কোথায় শ্যুট করেছিলেন? স্মরণীয় কোনও ঘটনা ঘটেছিল শ্যুটের সময়?
'নিঠুর মনোহর' গানের মিউজিক ভিডিও শ্যুট হয়েছিল মুন্সিগঞ্জের ভাগ্যকূল গ্রামে। এই প্রশ্নটা আমায় অনেকেই করেছেন যে জায়গাটা কোথায়? এটা আমি এতদিন কাউকে সেভাবে বলতে পারিনি। আমি চাই 'দ্য ওয়াল'-এর মাধ্যমে সবার সামনে আসুক। ভাগ্যকূল গ্রামটা ভীষণ সুন্দর। আমরা যে বাড়িটা দেখিয়েছি গানে, সেটা হল ভাগ্যকূলের জমিদার বাড়ি। শ্যুটের দিন আমাদের ভাগ্য খুব ভাল ছিল কারণ সেদিন আমরা বৃষ্টি পেয়েছিলাম। সেই কারণে গ্রাম বাংলার অনেক মনোরম দৃশ্য আমরা তুলে ধরতে পেরেছি। আবার এমনও হয়েছে, বৃষ্টির কারণে অনেক প্রত্যাশিত শট নিতে পারিনি। আর মিউজিক ভিডিওতে আমি ঢোলের তালে তালে যে জায়গাটায় ডুবে ছিলাম সেখানে বেশ বড় বড় সাপ ছিল। অনেকগুলো বড় বড় সাপ আমাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু জায়গাটা আমাদের এত ভাল লেগেছিল যে ঝুঁকি নিয়েই শ্যুট করেছিলাম।
ভারত-বাংলাদেশের বহু সেলিব্রিটিও আপনার 'নিঠুর মনোহর' গান গাইছেন বা রিল বানাচ্ছেন। এ ব্যাপারে কোনও স্মরণীয় প্রাপ্তি হয়েছে?
ভালবাসা পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। এমনকী আমি যাঁদের গান ও অভিনয়ের ভক্ত তাঁরাও দেখেছি আমার গান শেয়ার করেছেন। বিশেষ করে, অর্ণব ভাই সহ আরও অনেক সিনিয়র শিল্পী, মিউজিশিয়ন আমার গান শেয়ার করেছেন। সেই ভাললাগাটা কতখানি আমি বলে বোঝাতে পারব না।
'কোক স্টুডিও বাংলা'-তে আপনার কণ্ঠে নজরুলগীতি 'দাঁড়ালে দুয়ারে' গানটি রীতিমতো ভাইরাল। এই নজরুলগীতির প্রতি প্রেম কী ভাবে এল?
শ্যামাসঙ্গীত, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত সবেতেই ভীষণ সমৃদ্ধ বাংলা। আমরা যদি নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে উপস্থাপনা করতে পারি গানগুলো, তাহলে সেটা মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হবেই। গানগুলো সম্পর্কে আগ্রহ বাড়বে নতুনদের। সেই চেষ্টাটাই 'কোক স্টুডিও বাংলা' করছে।
রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার পরিকল্পনা আছে?
আমি সব ধরনের গান শুনি। সব ধরনের গান নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে। আর রবীন্দ্রনাথের গান তো বাঙালির আবেগ। রবি ঠাকুরের গান গাইবার পরিকল্পনা অবশ্যই আছে।
কলকাতায় আসার ইচ্ছে আছে? কলকাতার শ্রোতারা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ঈশানের কাছে?
কলকাতার মানুষ এত ভালবাসা দিয়েছেন যে তাদের মাঝে গান গাইতে পারলে আমার সত্যি ভীষণ ভাল লাগবে। কলকাতা থেকে কিছু কাজের অফারও এসেছে।
ঈশানের কন্ঠ এত রোম্যান্টিক, প্রেম বলতে ঈশান কী বোঝেন?
আমি ইতিমধ্যে দেখেছি যে 'নিঠুর মনোহর' গানটি যখন বের হল তারপর সব বয়সি মানুষই গানটি গেয়েছেন, নাচের কভার করেছেন। বিশেষ করে বাচ্চারা যখন আমার গানটি গাইছিল তখন আমার খুব ভাল লাগছিল। 'নিঠুর মনোহর' শুনে সবাই যে আমায় এত ভালবাসছে এটাই আমার কাছে প্রেম।
ঈশান কি অন্তর্মুখী? আড়ালে রাখতেই নিজেকে ভালবাসে? তারপরও তাঁর গান এত হিট!
আমি ছোটবেলা থেকেই একটু চুপচাপ প্রকৃতির। নিজের কাছের মানুষদের কাছেই নিজেকে মেলে ধরতে ভাল লাগে। আর আমি চাই আমার গানের মাধ্যমে মানুষ আমাকে চিনুক। আমার কাজের মাধ্যমে সবার মাঝে বেঁচে থাকতে চাই।
ঈশানের নতুন গান কী কী আসছে?
আমার নিজের লেখা ও সুর করা কিছু গানের কাজ আমি ইতিমধ্যে শুরু করেছি। 'নিঠুর মনোহর' এত প্রশংসা পাওয়ার পর থেকে আমার কাজের প্রতি আগ্রহটা অনেক বেড়েছে। বেশ কিছু গান নিয়ে কথা হচ্ছে। সেগুলো ফাইনাল হলে জানাতে পারব।
শ্রোতাদের বিশেষ কোনও পছন্দের বার্তা দিতে চান?
একজন শিল্পীর জন্য তাঁর শ্রোতারা অনেক বড়। আমার শ্রোতাদের কাছে আমার একটাই চাওয়া, তাঁরা বাংলা গান শুনুন। বাংলা গানের জন্য যাঁরা নিরলস চেষ্টা করছেন তাঁরা বাংলা গান ধরে রাখতে পারবেন যদি শ্রোতারা বাংলা গান বেশি করে শোনেন। নিঠুর মনোহর আর দাঁড়ালে দুয়ারের জন্য মানুষ আমায় যে অকুণ্ঠ ভালবাসা দিয়েছেন আমি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি আমাদের সংস্কৃতিটা সবার মাঝে উপস্থাপন করতে চাই। নিজেকে নতুনভাবে তুলে ধরতে চাই সবার সামনে। শ্রোতারা যদি সেই সাহসটা আমাকে দেন তবেই আমার পক্ষে তা সম্ভব। সবার আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে আমি শুধু গান গেয়ে যেতে চাই।