Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
পয়লা বৈশাখে শুটিং শুরু, যিশুর কামব্যাক—‘বহুরূপী ২’ কি ভাঙবে সব রেকর্ড?‘কেকেআরের পাওয়ার কোচ রাসেল ২৫ কোটির গ্রিনের থেকে ভাল!’ আক্রমণে টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন তারকাবিহারে আজ থেকে বিজেপি শাসন, রাজনীতির যে‌ অঙ্কে পদ্মের মুখ্যমন্ত্রী আসলে নীতীশেরই প্রথম পছন্দঅশোক মিত্তলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইডি, ক'দিন আগেই রাজ্যসভায় রাঘব চাড্ডার পদ পেয়েছেন এই আপ সাংসদ West Bengal Election 2026: প্রথম দফায় ২,৪০৭ কোম্পানি বাহিনী! কোন জেলায় কত ফোর্স?IPL 2026: ভাগ্যিস আইপিএলে অবনমন নেই! নয়তো এতক্ষণে রেলিগেশন ঠেকানোর প্রস্তুতি নিত কেকেআর TCS Scandal: যৌন হেনস্থা, ধর্মান্তরে চাপ! নাসিকের টিসিএসকাণ্ডে মালয়েশিয়া-যোগে আরও ঘনাল রহস্যক্যান্ডিডেটস জিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে গুকেশের মুখোমুখি সিন্দারভ, ড্র করেও খেতাবের লড়াইয়ে বৈশালীIPL 2026: চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে হেরে টেবিলের তলানিতে কেকেআর! গুরুতর বদলের ইঙ্গিত রাহানের নববর্ষের 'শুভনন্দন'-এও মুখ্যমন্ত্রীর SIR তোপ! বাংলায় পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর

'লোকে গা ভরা গয়না পরে আসে, মাধুরী এসেছে গা ভর্তি জ্বর নিয়ে!' নির্মলার কথায় সবার সে কী হাসি

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘ পাঁচ বছর রোগ যন্ত্রণা ভোগ করে প্রয়াত হলেন নির্মলা মিশ্র (Nirmala Mishra)। শেষ দিকে কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়েছিলেন কিংবদন্তী শিল্পী। এসব পার করে তিনি আজ যন্ত্রণামুক্ত। গানেগানে উদযাপিত তাঁর জীবন। নশ্বর শর

'লোকে গা ভরা গয়না পরে আসে, মাধুরী এসেছে গা ভর্তি জ্বর নিয়ে!' নির্মলার কথায় সবার সে কী হাসি

শেষ আপডেট: 3 August 2022 06:22

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

Subhadeep Bandyopadhyay

দীর্ঘ পাঁচ বছর রোগ যন্ত্রণা ভোগ করে প্রয়াত হলেন নির্মলা মিশ্র (Nirmala Mishra)। শেষ দিকে কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়েছিলেন কিংবদন্তী শিল্পী। এসব পার করে তিনি আজ যন্ত্রণামুক্ত। গানেগানে উদযাপিত তাঁর জীবন। নশ্বর শরীর পার করে মানুষ তো সৃষ্টির মধ্যেই বেঁচে থাকে! সেভাবেই মৃত্যুর পরেও যেন নির্মলার এক নবজন্ম হয়েছে তাঁর গানে গানে।

নির্মলা মিশ্র ভারি মজার, হাসিখুশি এক মানুষ ছিলেন। খুব সাজতে ভালবাসতেন। পাড়ার সবার প্রিয় দিদি। মনটা ছিল শিশুর মতো, বাচ্চাদের খুব ভালও বাসতেন। নিজের বাড়িতে গোপাল পুজো করতেন রোজ। বছরে দু'বার পাড়ার বাচ্চাদের নেমতন্ন করে খাওয়াতেন। সেসব স্মৃতির ভার ফেলে রেখে চলে গেলেন তিনি।

তিনি একা নন, একে একে নিভছে দেউটি। প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে স্বর্ণযুগের শিল্পীদের তালিকা। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্তরা আগেই ছুটি নিয়েছেন জীবন থেকে। সকলেরই ব্যক্তিগত জীবনে ছিল অনেক কষ্ট, একাকীত্ব, হতাশা। তবু নিজেদের আনন্দঘন আড্ডায় তাঁরা জীবনের অক্সিজেন খুঁজে পেতেন।

তাই প্রতিটি গানের জলসা থেকে ঘরোয়া আসর-- এই সব লেজেন্ড শিল্পীরা ঘটাতেন মজার মজার কাণ্ড, যাঁদের হোতা ছিলেন 'ঝামেলা' ওরফে নির্মলা মিশ্র। আবার প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় বা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে নির্মলার ছিল এক অনাবিল মধুর সম্পর্ক। সেসব গল্প নিয়েই এই প্রতিবেদন। এসব গল্পেই বেঁচে থাক বাংলা গানের প্রাণের মেয়েরা।

এই শিল্পীরা পরস্পরকে ডাকতেন নিজেদের সিগনেচার গানের নামে। নির্মলার নাম ছিল 'তোতা পাখি', বনশ্রীর নাম 'ফরেস্ট বিউটি', কারণ ওঁর বিখ্যাত গান 'সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ', প্রতিমা 'কাজলা দিদি', মাধুরী কোকিল, 'কুহু কুহু কোয়েল যদি ডাকে' গান থেকে এই নাম।

প্রতিমাকে অন্ধ কুঠুরি থেকে বার করে আনলেন নির্মলা (Nirmala Mishra)

'মুখুজ্জ্যে পরিবার' ছবিতে ডুয়েট গেয়েছিলেন প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও নির্মলা মিশ্র, 'আবিরে রাঙালো কে আমায়'। দোলের সেই গান হিট আজও। তার আগে নির্মলার কাছে গভীর রাতে হঠাৎ একদিন ফোন, 'শোনেন আমি না প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, গান করি, আমি কইতাছি।' নির্মলার কণ্ঠ শুনে এতকটু থেমে প্রতিমা ফের বললেন, 'আরে নির্মলা নাকি! শোনো মানব বাবুর (মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সুরারোপিত) যে গানটা দিছে, আসো দুজনে মিলে একটু প্র্যাকটিস কইরা লই।' নির্মলা হতবাক। প্রত্যেকদিন রাত্রি বারোটার পরs ফোনেই এই গান প্র্যাকটিস করতেন প্রতিমা-নির্মলা।

শেষ জীবনে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছিলেন। বলা ভাল, ওঁকে আড়ালে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। প্রতিমার চরিত্রের অপার সরলতার সুযোগ নিয়েছিল ওঁর সন্তানরাই। প্রায় অবহেলায় শেষ জীবন কাটান এত বড় শিল্পী। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় প্রতিমার বাড়িতে ফোন করলে প্রতিমাকে ফোন দেওয়া হত না। একবার তো সন্ধ্যাকে ফোনে প্রতিমা বলেই বসেন, তাঁকে বৃদ্ধা বয়সে স্নানের গরম জল দেওয়া হয় না। কিন্তু নির্মলার নাম যে ঝামেলা। তিনি সরাসরি একবার প্রতিমার বাড়ি গিয়ে হাজির হন। বলেন, 'দূরদর্শন থেকে গান গাইবার অফার এসছে। আপনি কি গাইবেন প্রতিমাদি?' প্রতিমা বলেন, 'তুই আমার মেয়ে খুকুরে জিগা!'

নির্মলার মুখের উপর সেদিন কথা বলতে পারেননি প্রতিমার ছেলে-মেয়েরা। প্রতিমাকে অন্ধ কুঠুরি থেকে বার করে এনে প্রকাশ্যে বহু যুগ পর গান গাওয়ালেন নির্মলা। আর হারমোনিয়ামও সেদিন বাজিয়েছিলেন নির্মলা নিজেই।

নির্মলার কুমড়ো অপহরণ

একবার হুগলিতে রাতে ফাংশন করতে গেছেন নির্মলা মিশ্র আর দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। গভীর রাতে ফাংশন শেষ হয়েছে। দ্বিজেনের আগেই নির্মলা গান গেয়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন। দ্বিজেন ফিরতি পথে হঠাৎ দেখেন নির্মলার গাড়ি মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে। দ্বিজেন ভাবলেন নির্মলা কী কোনও বিপদে পড়ল! গাড়ি থেকে নেমে 'নির্মলা' বলে হাঁক পাড়লেন। রাস্তার ধারে নীচের ক্ষেত থেকে ভেসে এল নির্মলার গলা। 'দ্বিজেনদা নীচে আসুন।'

দ্বিজেন আরও ভয় পেয়ে গেলেন। আর একটু এগিয়ে দেখেন, নির্মলা ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষেত থেকে কুমড়ো তুলছেন। নির্মলা বললেন, 'দ্বিজেনদা আপনার কটা কুমড়ো লাগবে বলুন। তুলে দিই। রাতের বেলা খেতের মালিক টের পাবে না।' সেদিন খান দশেক কুমড়ো তুলে কলকাতা ফেরেন নির্মলা আর দ্বিজেন।

নেলপলিশ, লিপস্টিক দিয়ে চশমা রঙ

নির্মলা, বনশ্রী, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, বন্দনা সিংহ-- বান্ধবীরা মিলে নিউ মার্কেটে শপিং করতে যেতেন। একবার বনশ্রী আর নির্মলা দেখেন লাল ফলস চুল দোকানে বিক্রি হচ্ছে। সেইখানেই দাঁড়িয়ে লাল উইগ মাথায় দিয়ে নির্মলা দেখতে লাগলেন। আর সারা নিউ মার্কেটের লোক জমে গেল নির্মলা-বনশ্রীদের কাণ্ড দেখতে।

সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া হল এক ডাবওয়ালার কাছে। ডাব বিক্রেতা নির্মলাকে দেখে চিনতে পেরে বলে উঠল 'আমি তো আপনার তোতা পাখি গান শুনেছি।' সেই শুনে খুশি হয়ে নির্মলা ডাব বিক্রেতাদের রাস্তাতেই গান শুনিয়ে দিলেন গেয়ে এবং ডাবের দাম নিতে চাইলেন না ডাব বিক্রেতা। জনমানসে এমন ছাপ ফেলতে কজন শিল্পী পেরেছেন, জানা নেই।

নির্মলা মিশ্র ভীষণ উজ্জ্বল রং পছন্দ করতেন। প্রতিমা, আরতি বা মাধুরীদের থেকে একদম উল্টো। লাল, হলুদ, সবুজ শাড়ি পরে গান করতে উঠতেন। শুধু তাই নয়, নিজের চশমার ফ্রেম লাল-নীল নেলপলিশ বা লিপস্টিক দিয়ে রং করে শাড়ির সঙ্গে পরতেন! লাল মাথার চুল, লাল শাড়ি, লাল লিপস্টিক, লাল চশমা, লাল কাচের চুড়ি-- এমন সাজে সাজতে ভালবাসতেন। আর থাকত বড় টিপ আর এক মাথা সিঁদুর। সেই বরের দেওয়া সিঁদুর মাথায় পরেই স্বর্গে গেলেন নির্মলা।

https://youtu.be/6939bQnB97c

শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায় আর রাজ্যশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, দুই বোন বলছিলেন, 'নির্মলাদির মনটা ছিল একদম শিশুর মতো। ফাংশনে গিয়ে দৌড়াদৌড়ি করত। সবার গান শুনত বসে। আবার আমরা কোন নতুন গয়না, হার, চূড়, দুল পরে গেছি, দেখলেই বলত, 'কী ভাল রে গয়নাটা! আমার জন্য একটা এনে দিবি!'

নির্মলা-আরতি-মাধুরী ট্রায়ো শো

২০১০ সালে 'বেহালা উৎসব' আজও শিল্পী মহলে স্মরণীয় হয়ে আছে। নির্মলা মিশ্র এলেন তাঁর বর প্রদীপ দাশগুপ্তকে সঙ্গে করে। মজা করে বরকে ডাকতেন 'আমার বুড়ো' বলে। আবার বর-বউ পরস্পরকে জয়-জয়ী বলেও ডাকতেন। আরতি এলেন সরাসরি মুম্বই থেকে। আর মাধুরী চট্টোপাধ্যায় তাঁর মেয়েকে সঙ্গে করে এলেন। মাধুরীর সেদিন খুব জ্বর। তার ওপর আর্য সমিতি দেবদারু ফটকের খোলা মাঠে জানুয়ারির ঠান্ডা। নির্মলা মজা করে দর্শকদের বললেন, 'লোকে গা ভর্তি গয়না পরে আসে, আর মাধুরী এসছে গা ভর্তি জ্বর নিয়ে।'

দর্শকরা হেসে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু যখন মাধুরী ধরলেন, 'কুহু কুহু কোয়েল যদি ডাকে", সে গলা জ্বর গায়েও কোকিলকণ্ঠী। তারপর নির্মলা, মাধুরী দুজনেই আরতিকে বললেন, 'আলো তুই এবার 'তখন তোমার একুশ বছর' ধর।' আরতির ডাকনাম আলো। সে এক সোনার দিন। সেদিন আবার নিজেদের গান বাদেও তিনজন তিনজনের গান গেয়েছিলেন ওঁরা।

এই অনুষ্ঠানে সেদিন তবলায় সঙ্গত করেছিলেন বিখ্যাত তবলা বাদক দীপঙ্কর আচার্য। পঞ্চাশ বছর এইসব শিল্পীদের গানে তবলা বাজাচ্ছেন তিনি। দীপঙ্করবাবু বললেন "বেহালাতে আর একটা ট্রায়ো অনুষ্ঠান হয়েছিল বড়িশা হাইস্কুলের মাঠে। সে বার নির্মলা পিসি, মাধুরীদি আর বনশ্রীদি তিনজনে গেয়েছিলেন। এঁদের সবার মধ্যে নির্মলা মিশ্রকে পিসি বলি কারণ তিনি আমার বাবাকে দাদা বলতেন। নির্মলা পিসি কতবার আমাদের বাড়িতে ছেঁড়া শাড়ি পরে চলে এসেছিলেন। আমার বাবা ওঁকে শাসন করে বলতেন, "কী রে পাগলি, তুই না শিল্পী? এত লোক তোকে চেনে তুই ছেঁড়া শাড়ি পরে বেরিয়েছিস!"

দীপঙ্করবাবুর কথায়, "আসলে নির্মলা মিশ্র, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়রা নিজেরাই জানতেন না তাঁরা কত বড় শিল্পী। চেতলা পাড়াতে হয়তো কেউ ঝগড়া করছে, নির্মলা পিসি তাদের ঝগড়ার মধ্যে ঢুকে থামাতে চলে গেলেন। তাতে হয়তো ওঁর কোনও দরকারই নেই। আমি তো বলব নির্মলা মিশ্র গানের জগতে বঞ্চিত হয়েছেন। প্লে ব্যাকে সন্ধ্যাদির পর পুরো বাজারটাই আরতিদি নিয়ে নেন। আরতিদির গলা সব নায়িকাদের লিপে মানাত। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের যে ব্যাপারটা সুচিত্রা সেন বাদে ঘটেনি। তাই নির্মলা তো সুযোগই পেলেন না প্লে ব্যাক করার বা বম্বে যাওয়ার। তাঁকে সুযোগটা তো দিতে হবে! ওঁকে কোনও মিউজিক ডিরেক্টর প্লে ব্যাক গান দিতেন না। শুধুমাত্র আধুনিক গেয়েই এত নাম করেছিলেন।

যখন নতুন করে 'তোতা পাখি' গানটা আবার গাইলেন নির্মলা মিশ্র তাতে আমি তবলা বাজিয়েছিলাম। লাইভ অনুষ্ঠানের গান শুনলে মনে হয় ওটা কিন্তু ভবানীপুরের তখনকার 'প্রসাদ' রেকর্ডিং হাউসে তোলা। হাততালি গুলো যোগ করা হয়। ক্যাসেটটা মারাত্মক হিট করেছিল, সেটাই নির্মলা মিশ্রকে নবজন্ম দেয়। প্রচুর ফাংশানে ডাক আসত, তাতে ওঁর সঙ্গে চারিদিকে ঘুরে ঘুরে আমি বাজিয়েছি। একবার ফরোয়ার্ড ব্লকের পুজোর বিজয়া সম্মিলনীতে নির্মলা পিসি গাইছেন। হঠাৎ হ্যালোজেন লাইট ব্লার্স্ট করল। পিসির মুখটা ভয়ে থমথমে হয়ে গেল। আমি বললাম 'তোমায় তো দেবীর মতো লাগছে!' আমায় বলেছিলেন, 'আমার মতো বোঁচা নাক দেবী?' আমি বলেছিলাম, 'সুভদ্রার মতো লাগছে।' সেই শুনে পিসির কী হাসি! সেটা আবার দর্শকদের বললেনও।"

'লুঙ্গি ডান্স' নির্মলা

মঞ্চে কিন্তু নির্মলা মিশ্র ছিলেন একজন দারুণ পারফর্মার। নিজের বয়সকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে সব ধরনের দর্শকদের মাতিয়ে রাখতেন। একবার এক চ্যাংড়া ছেলে পাশ থেকে বলে উঠল, 'দিদি 'লুঙ্গি ডান্স' গাইবেন?' নির্মলা এতটুকুও না রেগে ভরা মঞ্চে 'লুঙ্গি ডান্স' গাইলেন এই ক'বছর আগেও।

আবার একবার মঞ্চে নির্মলার গাইবার কথা 'তুমি ময়দা এখন যদি হতে জলখাবারে লুচি বেলতাম'। অথচ রবীন্দ্রসদনে নির্মলা গাইলেন 'নিম্মুডা নিম্মুডা'। বললেন এটাই এখন গাইতে ইচ্ছে করল। আগে পরে না ভেবেই, নিজের ইমেজের কথা না ভেবেই কাজ করতেন নির্মলা।

মেক-আপ লাগিয়ে দু'দিন পরে মুখ ধুয়েছিলেন

বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী প্রয়াত বন্দনা সিংহর থেকে শুনেছিলাম আর এক গল্প। পয়লা বৈশাখের শ্যুটিংয়ে দুই প্রাণের বান্ধবী বন্দনা আর নির্মলা গান গাইতে গিয়েছেন। সেদিন চ্যানেলের মেক-আপ নির্মলার এত পছন্দ হয়েছিল যে দু'দিন পরে মুখ ধুয়েছিলেন তিনি। ২০০৫-এর পর থেকে বন্দনা সিংহ বাইরে কোথাও গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন ২০১০ সালে বন্ধু নির্মলার জোরাজুরিতে দুটি গান গেয়েছিলেন বন্দনা। আর তা শুনে নির্মলা কেঁদেছিলেন অঝোর ধারায়। তারপরে আন্ডার-আই মেক-আপ টচ আপ করিয়েই বাড়ি ফিরেছিলেন।

মহাসপ্তমীর তিথিতে নির্মলা মিশ্রর জন্মদিন

উৎপলা সেনকে গানের গুরু মানতেন নির্মলা। উৎপলা পৌত্র সূর্য সেন জানালেন, "উৎপলা সেন ছিলেন তাঁর সঙ্গীত জীবনের প্রেরণা। মহাসপ্তমীর তিথিতে নির্মলা মিশ্রর জন্মদিন। অতীতে এইরকম এক সপ্তমীর দিনে নির্মলা নিজের হাতে চকলেট পুডিং বানিয়ে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর প্রিয় উৎপলাদির জন্য। উৎপলা ভালবেসে যে শাড়িটা উপহার দিয়েছিলেন সেটিই পরেছিলেন নির্মলা। সেদিন নিজের হাতে সবাইকে পুডিং খাওয়াবেন বলে যেই টেবিলের কাছে এসেছেন, অমনি উৎপলা গেয়ে উঠেছিলেন-

"এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না, যাতে মুক্ত আছে।
এমন কোনও মানুষ খুঁজে পেলাম না, যাঁর নির্মলার মতো মন আছে…"

শিশুর মতো সরল শিল্পী বলেই তিনি ভরপুর ঠকেছেন গানের জগতে। কত গান তাঁর থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তবু নতুন ছেলেমেয়েদের গান গাইবার সুযোগ দিয়েছেন নির্মলা। অথচ মানুষ জাতটি এত অকৃতজ্ঞ, যে নির্মলা মিশ্রের শেষকৃত্যে হাতেগোনা ক'জন শিল্পী ছাড়া দেখা মিলল না কোনও বড় শিল্পী বা বাদ্যযন্ত্রকারের।

আরও পড়ুন: ছ’বার টাইফায়েডে নষ্ট দুটো চোখ ও হার্ট! ‘তোতা পাখি’ নির্মলা মিশ্র শিকল কেটে উড়ে গেলেন


```