
শেষ আপডেট: 1 July 2022 10:10
তখন ইন্ডাস্ট্রিতে নবাগত কুড়ি বছরের সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। নিমাই শ্রীচৈতন্য-র রোল করতে গিয়ে বাদ পড়লেন স্ক্রিন টেস্ট। 'নীলাচলে মহাপ্রভু' (Nilachale Mahaprabhu) ছবি থেকে নাম কাটা গেল তাঁর। পরিচালক কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের পছন্দ হল না সৌমিত্রকে। উত্তম-সুচিত্রা যুগ রমরম করে চলছে তখন। সৌমিত্রও চেষ্টা করছেন সিনেমা পাড়ায়। কিন্তু উত্তম কুমারকে দিয়ে শ্রীচৈতন্য হবে না। দর্শকও নেবে না। চাই নবাগত, অপাপবিদ্ধ কোনও তরুণ মুখ। তাঁকেই মানাবে নদিয়ার নিমাইয়ের চরিত্রে। খোঁজ চলল নতুন মুখের।
এমনই সময়ে এক জন ২৪-২৫ বছরের উঠতি যুবক চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে চা খেতে-খেতে আড্ডা মারছিলেন। রোজই আড্ডা দেন এই ঠেকে। কে জানত সেখানেই তাঁর ভাগ্যবদল হবে! উল্টো দিকেই চা খাচ্ছিলেন একজন ব্যক্তি। সুদর্শন যুবকটিকে তিনি প্রস্তাব দিলেন, "সিনেমায় অভিনয় করবেন?"
যুবকের তো আকাশ থেকে পড়ার জোগাড়। স্বপ্নেও ছিল না সিনেমায় যাবার ভাবনা। পাশ থেকে তখন বন্ধুরা বলছে "বসে বসে সিনেমায় সুযোগ! বলে দে করবি।" তখনও জানা নেই কী চরিত্র, কী ছবি। হ্যাঁ বলে দিলেন যুবক। ভদ্রলোক তাঁর নাম, ঠিকানা দিয়ে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওয় বিকেলে দেখা করতে বললেন পরিচালক কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের কাছে।
সেই ভদ্রলোক ছিলেন পরিচালকের সহকারী। কথামতো স্টুডিওয় গেলেন যুবক, দেখা করলেন কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাঁর পাশে বসেছিলেন সনামধন্য সঙ্গীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়াল, যিনি এই ছবির সঙ্গীত পরিচালক। যুবককে দেখে সকলের পছন্দ হল। এবার ভয়েস টেস্ট নিলেন নটসূর্য অহীন্দ্র চৌধুরী। তার পরে স্ক্রিন টেস্টেও পাশ।

ব্যস, বদলে গেল ভাগ্য। অন্য জীবন পেয়ে গেলেন অসীম কুমার। তাঁকে নিয়ে শ্যুটিং শুরু হল নীলাচলে মহাপ্রভুর। আর শুরু হল তাঁর জীবনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। মুক্তি পেল অসীম কুমারের 'নীলাচলে মহাপ্রভু'। হাউসফুল বোর্ড হলে হলে। দর্শকরা ভক্তিরসে এতই কাবু হয়ে গেলন, যে জুতো সিনেমা হলের বাইরে খুলে হলে ঢুকতেন বলে শোনা যায়। হাতজোড় করে নিমাই-দর্শন করতেন তাঁরা। আর এই ছবিতে বাদ যাওয়া আগের ছেলেটি, অর্থাৎ কিনা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তিনি কয়েক দিন পরেই সুযোগ পেলেন নায়ক রূপে সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কাজ করার। 'অপুর সংসার'-এ সকলকে মুগ্ধ করলেন তিনি।

নামভূমিকায় অসীম কুমার ছাড়াও এ ছবিতে ছিলেন দীপ্তি রায় বিষ্ণুপ্রিয়া রূপে, সুমিত্রা দেবী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, ছবি বিশ্বাস, কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও অহীন্দ্র চৌধুরী। এটিই অহীন্দ্র চৌধুরীর শেষ ছবি। ছবির চিত্রনাট্যে করেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় ও বিমল মিত্র। বাম্পার হিট এই ছবি ১৯৫৭-এর রথযাত্রার দিনে রিলিজ করেছিল।

নদিয়া থেকে পুরি, জগন্নাথ, শ্রীচৈতন্য রহস্য-- সব মিলিয়ে এ ছবি বক্সঅফিস কাঁপিয়ে দিল। আর অসীম কুমার যেন হয়ে উঠলেন সেই মূর্তির মতোই অবিকল নিমাই! তাই 'নীলাচলে মহাপ্রভু' সুপারহিট হওয়ার পরে একলাফে সুপারস্টার অসীম কুমার। তাঁর পারিশ্রমিক দশ গুণ বেড়ে গেল। যেন স্বপ্নের মতো সব চলতে লাগল।

অসীম কুমার ঐ সময়ে উত্তম কুমারের থেকেও বড় স্টার হয়ে দেখা দিতে শুরু করলেন সারা দেশ জুড়েই। কারণ ভক্তিমূলক এই ছবি হিন্দি, ওড়িয়া, তামিল ভাষায় ইংরেজি সাবটাইটেলে বিভিন্ন প্রদেশে রিলিজ করল। ভারতব্যাপী খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল অসীম কুমারের। অসীম কুমার রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে তাঁকে নিমাই বলে ডেকে লোকে প্রণাম করে ধন্য হত। পাশাপাশি আরও ছবির অফার আসতে লাগল তাঁর কাছে। কিন্তু বেশীরভাগই ধর্মীয় চরিত্র। 'নদের নিমাই' আর 'শচীমার সংসার'-এ নিমাই, 'সাধক রামপ্রসাদ'-এ রামপ্রসাদ, 'যুগমানব কবীর'-এ কবীর, 'মহাকবি কৃত্তিবাস'-এ কৃত্তিবাস, 'নলদময়ন্তী'-তে নল, 'সীতা'য় রাম, 'তানসেন'-এ তানসেন, লালন ফকিরে লালন।

তবে ভক্তিমূলকের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ছবিতেও অভিনয় করেছেন তিনি। পাশাপাশি চাকরিও করতেন। তবে সিনেমার গ্ল্যামারে বিভোর হয়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন একসময়ে। সময়েও কুলোতো না। এর পরে অফার পেলেন বলিউড থেকে। নায়ক রূপেই কাজ করলেন 'সরস্বতী চন্দ্র'তে। নায়িকা নূতন। ছবি রিলিজ হতেই 'চন্দন সা বদন চঞ্চল চিতবন' গান কাঁপিয়ে দিল হিন্দি গানের দুনিয়া।

হিন্দিতেও অসীম কুমার সুপারহিট। কিন্তু বম্বেতে অসীম কুমার বলে খ্যাত আর এক অভিনেতা আগে থেকেই ছিলেন বলে তাঁর বাংলার অসীম কুমার নাম বদলে করা হল মণীষ। কাজ করলেন 'বিষ্ণুপুরাণ', 'ছট মাইয়া' ছবিতে। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই ধর্মীয় চরিত্র। ওই শুরুর নিমাই তাঁর পিছু ছাড়ল না। ধর্মীয় চরিত্রের বাইরে তাঁকে কেউ ভাবছেও না। হাঁফিয়ে উঠে পালিয়ে এলেন বম্বে থেকে। ততদিনে এখানে উত্তমের পাশে বড় স্টার সৌমিত্র।

তবুও অসীম কুমার ধর্মীয় রোল বাদে অন্য রোলে চেষ্টাও করেছেন। যেমন সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত 'কাজল' ছবিতে অসীম কুমার-সুপ্রিয়া চৌধুরী জুটি আবার অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি 'কিছুক্ষণ' এ নায়ক-নায়িকা ছিলেন অসীম কুমার-অরুন্ধতী দেবী জুটি। কিন্তু ছবিগুলো তেমন হিট করল না। তিনি মহাপ্রভু রূপে বাংলা ছবিতে যে সাফল্য পেয়েছিলেন, তা আর কোনও ছবিতে পেলেন না। এছাড়া কাজ করেছেন 'মর্মবাণী', 'জোনাকির আলো', 'রাতের অন্ধকারে', 'অগ্নীশ্বর', 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি' ছবিতে।

ক্ষয়িষ্ণু হয়ে আসতে থাকল নিমাইয়ের ম্যাজিক। সেই অটোগ্রাফ দেওয়া, জনতার ছুটে এসে প্রণাম করা-- সবই ফিকে হয়ে যেতে থাকল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।
এক সময়ে অসীম বেছে নিলেন পেশাদারী নাটকের মঞ্চকে। রোজগারের তাগিদেই করতে হল এমনটা। নাটকে তাঁর প্রথম অভিনয় ছয়ের দশকে। বিশ্বরূপা থিয়েটারের বিখ্যাত 'সেতু' নাটকে আত্মপ্রকাশ। কিন্তু সেখানেও তাঁর অভিনয় করার কথা ছিল না। নাটকের হিরো করতেন অসিত বরণ আর নায়িকা তৃপ্তি মিত্র। কিন্তু প্রযোজক দক্ষিণেশ্বর সরকারের সঙ্গে অসিত বরণের বিবাদ হওয়ায় তিনি ছেড়ে দিলেন আচমকা। দক্ষিণেশ্বরবাবু আচমকা অসীমকে বললেন, "আপনাকে আজই হিরো হতে হবে।" ওঁর কথায় তাজ্জব অসীম কুমার। পার্ট জানেন না, ডায়লগ মুখস্থ নেই, লাইভ অ্যাক্টিং কীভাবে করবেন এত দর্শকের সামনে!

শেষমেশ রাজি হতে হল। নাটক শুরুর আগে দর্শকদের সামনে স্টেজে দাঁড়িয়ে তৃপ্তি মিত্র বললেন, 'অসিতবরণের জায়গায় আজ থেকে 'নীলাচলে মহাপ্রভু' খ্যাত অসীমকুমার অভিনয় করবেন। আপনারা দয়া করে দেখুন।' সেই প্রথম প্রফেশনাল মঞ্চে এলেন অসীম কুমার। নাটক করে উতরেও গেলেন। দর্শকরা বুঁদ হয়ে দেখলেন। তাঁর কাজ পাকা হয়ে গেল। এরপর একের পর এক নাটক 'অনন্যা', 'কৃষ্ণকান্তের উইল', 'প্রিয়ার খোঁজে', 'মোহিনী পিঙ্গলা', 'অগ্নিকন্যা'। থিয়েটারে অসীম কুমার ধর্মীয় চরিত্র বাদেও অনেক ভাল ভাল চরিত্রে অভিনয় করে সকলের মন জয় করেছেন।
কিন্তু সময়ের নিয়মে ঝাঁপ বন্ধ হল থিয়েটার পাড়ার। কাজ কমে গেল সকলের। দর্শকরা মুখ ফিরিয়ে নিলেন থিয়েটার থেকে। স্টুডিও পাড়াতেও নতুন মুখের ভিড়। তাই ক্যারেক্টার রোলেই যা পেতেন তাতেই কাজ করতেন অসীম কুমার। শেষ ছবি করেছেন চিরঞ্জীৎ-দেবশ্রী রায় জুটির 'জীবন যৌবন'। টিভিতে শেষ দিকে অসীম কুমারকে সুযোগ দেন পরিচালক বিষ্ণু পালচৌধুরী তাঁর বিখ্যাত সুপারহিট প্রথম মেগা সিরিয়াল জননীতে। এখানে সুপ্রিয়া দেবী জননী। সেই চৌধুরী বাড়ির বিশ্বাসী ভৃত্যর রোল করেছিলেন অসীম কুমার।
জননীর পরিচালক বিষ্ণু পালচৌধুরী অসীম কুমার সম্পর্কে বললেন, "তখন জননী সিরিয়াল চলছে। সকালবেলা স্টুডিওয় যাচ্ছি, হঠাৎ গাড়ি থেকে চোখ পড়ল টালিগঞ্জ ফাঁড়ির মুখে লটারির টিকিট বিক্রির সামনে অসীমবাবু দাঁড়িয়ে, নোংরা পাজামা আর শতছিন্ন পাঞ্জাবি। আমি অবাক! শুনেছিলাম অর্থ কষ্টে আছেন, তাই বলে... টেকনিশিয়ান স্টুডিওয় পৌঁছে তাড়াতাড়ি প্রোডাকশনের নিশিদাকে ডেকে বললাম ওঁকে নিয়ে আসতে। আসতে না চাইলে জোর করে আনতে। ড্রেসার কাল্টুকে বললাম সাবান, পোশাক তৈরি রাখতে। চা আর জলখাবারের ব্যবস্থাও করে রাখলাম। নিশিদা ভদ্রলোককে নিয়ে এল। পার্ট দিলাম আমি। চিত্রনাট্যকারকে বললাম এই রকম একটা চরিত্র তৈরি করতে যেন প্রতিদিন শ্যুটিং থাকে ওঁর। উনি ফ্লোরে এলে আমি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেলে উনি কেঁদে ফেললেন। সবাই খুশি। বেণুদিও আমায় আশীর্বাদ করলেন সেদিন। প্রোডাকশনকে ডেকে বললাম ওঁকে প্রতিদিন ক্যাশ টাকা দেবেন পারিশ্রমিক। শ্যুটিং শেষে টাকার খাম হাতে পেয়ে যে কী আনন্দাশ্রু যে বয়ে ছিল ওঁর চোখে, সে দৃশ্য ভোলার নয়। আমি যতদিন কাজ করেছি ততদিন অসীমদা আমার সঙ্গে ছিলেন। আমার 'শান্তিনিকেতন', 'দেবদাসী' সিরিয়ালেও অসীম কুমার কাজ করেছেন।"
এর পরে একদম শেষ বয়সে অসীম কুমার আর কাজ পেতেন না। জীর্ণ বাড়িতে থাকতেন অভাবের সংসারে। পাড়ার রক আর চায়ের দোকানে বসে থাকতেন। সেই চায়ের দোকানে, যেখান থেকে গ্ল্যামার জীবনের শুরু হয়েছিল। অথচ এখন শুধুই অন্ধকার। নিজের সম্পর্কে আক্ষেপ করে অসীম কুমার বলেছিলেন, "রূপনগরের রূপে-মোহে অন্ধ হয়ে গেছিলাম। বুঝিনি, রূপ ফুরোলেই চিরতরে বন্ধ হবে রূপনগরের দরজা!"
শেষ জীবন বেশ দারিদ্রের মধ্যে কাটান অভিনেতা। সংসার চলত না। রোজ পেট ভরে দু'বেলা খাবারও জুটত না। টালিগঞ্জ পাড়া থেকেও খুব একটা কেউ খোঁজ নিত না। এভাবেই অভাবে জীর্ণ হয়ে চলে গেলেন পর্দা কাঁপানো নিমাই সন্ন্যাসী। তারিখটা ঠিক কবে, বলতে পারেন না প্রায় কেউই। হাজারো আক্ষেপ ও যন্ত্রণার অবসান হল।অসীম কুমার মারা যাবার পর কোনও সংবাদমাধ্যম খবর করেনি। ওঁর মৃত্যুর বেশ কিছু দিন পর একটি লিটিল ম্যাগাজিনে মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়।
'নীলাচলে মহাপ্রভু' বাংলা ছবির ইতিহাসে কাল্ট ছবি। যে ছবিটা আজও পুরী মন্দির ও ইসকন মন্দিরের উৎসবে দেখানো হয়। ছবির গানগুলি আজও হিট। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে, অসীম কুমারের লিপে এই ছবির গান 'জগন্নাথ জগৎবন্ধু' আজও প্রতি রথযাত্রায় বাজতে থাকে।
শতবর্ষে ভি বালসারা, স্ত্রী-দুই পুত্রের মৃত্যুশোক ভুলেছিলেন একাকী, সুরে সুরে মাতিয়েছিলেন গোটা বিশ্ব