
শেষ আপডেট: 26 August 2021 05:52
শহরজুড়ে বেড়ে ওঠা একের পর এক মাল্টিপ্লেক্সের সঙ্গে লড়েও 'প্রাচী' রইল স্বমহিমায়। নতুন হলে ছবি দেখানোও শুরু হয়ে গেছে ১৯ অগস্ট। তবে এবার নতুন আঙ্গিকে ধরা দিয়েছে 'প্রাচী'। একতলায় রয়েছে 'এম বাজার' শপিং মল এবং উপরতলায় রাজকীয় স্ক্রিন ও আধুনিক প্রযুক্তির 'প্রাচী'।
এইরকম ভাবে একটা সিঙ্গল স্ক্রিন হলকে বাঁচিয়ে রাখার কথা ভাবেন না অনেকেই। অনেক সময়ে ভাবলেও, পরিস্থিতির ফেরে সেটা পেরে ওঠেন না সব হলমালিক। কিন্তু 'প্রাচী' সিনেমার বর্তমান কর্ণধার বিদিশা বসু পেরেছেন। এই ক্ষেত্রে একজন মহিলা হয়েও এই টিকে থাকার লড়াই সহজ ছিল না। তার উপর বিদিশার নিজের জীবনেও কম ঝড় বয়নি। তবু বিদিশা লড়ছেন এবং জিতছেন। সেই সঙ্গে অন্নসংস্থান করেছেন 'প্রাচী' হলকর্মীদের।
দ্য ওয়ালকে বিদিশা টেলিফোনে বলছিলেন, "আমাদের লক্ষ্য একটাই ছিল, প্রাচীর ঐতিহ্য ধরে রেখে তাকে আধুনিক ভাবে দর্শকদের সামনে আনা। ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং আজকের দর্শকের চাহিদা দুটো ভেবেই নতুন রূপে প্রাচীকে গড়ে তুলেছি। আমার দাদু জিতেন্দ্রনাথ বসু সিঙ্গল স্ক্রিন হিসেবে প্রাচী শুরু করেছিলেন, তাই সিঙ্গল স্ক্রিনই আমি রাখতে চেয়েছিলাম। এখন সিঙ্গল স্ক্রিন সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম। তাই এই সিঙ্গল স্ক্রিন একই ভাবে রেখে দিয়েছি আমি। একটাই স্ক্রিন আজও প্রাচীতে। হ্যাঁ, মাল্টিপ্লেক্স করে দিলে আয় বেশি হতো, শো টাইম বাড়ত, ছবি বেশি দেখানো যেত। কিন্তু সেই লাভের কথা আমি ভাবিনি। আমি চেয়েছি, সেই আগের মতোই সিঙ্গল স্ক্রিন নস্ট্যালজিয়া নিয়েই দর্শকরা প্রাচীতে বসে ছবি দেখুক।"
বিদিশা আরও বললেন, "একতলাটা আমাদের ফুডকোর্ট ছিল। ওটা 'এম বাজার' ফ্যাশন স্টোরের ফ্রাঞ্চাইজি নিয়েছি। আগে সিনেমার শো শুরু না হওয়া অবধি দর্শকদের হলের বাইরে দাঁড়াতে হত রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে। এখন এই বিপণীতে ঢুকে একটু কেনাকেটি করে ছবি দেখতে ঢুকতে পারবেন দর্শকরা। প্রাচীর আধুনিকীকরণ করলেও আমরা কিন্তু বাংলা ভাষার ব্যবহার বজায় রেখেছি। আজও আমাদের হলের নাম বাংলায়, আজও আমাদের কম্পিউটারাইজড টিকিট ছাপানো হয় বাংলায়। ক, খ, গ, ঘ বা 'অলিন্দ', 'শীর্ষভিত', 'প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ' এই কথাগুলো কিন্তু এখনও আমরা রেখে দিয়েছি। আগেও আমার দাদু, বাবার আমলে বাংলার সঙ্গে হিন্দি আর ইংরাজি কিছু ছবি এসছে হলে। আজও হিন্দি ছবি দেখানো হয়। তাতে কিন্তু আমাদের বাংলার নিজস্বতা নষ্ট হয়নি। বাংলা ছবিকে সবসময় বেশি প্রাধান্য দিই আমি।"
বিদিশা বসু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, যা অনেক নারীর কাছে আদর্শস্বরূপ। রানি রাসমণির আদর্শে বিশ্বাসী বিদিশা বসু জানালেন "আমরা দুই বোন বসু পরিবারে। আমার দিদি আর আমি একই পরিবারের দুই ভাইকে বিয়ে করি। মানে দিদিই আমার বড় জা। আমার দিদির বাড়ি গুরগাঁওতে। প্রতিবার পুজোতে আমরা বদ্রীনাথজীকে দর্শন করতে যেতাম। আমার স্বামী ড্রাইভ করতে ভালবাসতেন, তাই গাড়ি করেই যেতাম আমরা। একবার দর্শন করে ফেরার পথে গাড়িতেই আমার স্বামীর ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়। কোমায় চলে যান। ভোকাল কর্ড নষ্ট হয়ে যায়। হাসপাতালে ভর্তি করার পরে এক বছর ধরে বহু চেষ্টায় উনি প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ২০২০ সালের নভেম্বরে উনি মারা যান। আমাদের মেয়ে খুবই ছোট। গুরগাঁওয়ের স্কুলেই পড়ে।
সিনেমাহল আর মেয়ে দুজনেই আমার সন্তান, তাই দুজনকেই আমায় আগলে রাখতে হবে। গুরগাঁও-কলকাতা যাতায়াত করি আমি। আমার স্বামীর খুব ইচ্ছে ছিল প্রাচীকে উন্নত করার, তাই আমরা দুই বোন মিলে প্রাচীকে নতুন ভাবে ফিরিয়ে এনেছি। এই সিনেমা হল শহরের ল্যান্ডমার্ক, এ শহরে 'প্রাচী'র ঐতিহাসিক গুরুত্ব কম নয়। অন্য সিনেমা হলমালিকরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন আমাদের দেখে, সেটাই পরম প্রাপ্তি। এখনও সবটাই মাল্টিপ্লেক্সে বা মাল্টিস্টোরিডে বিকিয়ে যায়নি।
'প্রাচী' আমার পরিচয়, আমার পরিবার। আমাদের দুই বোনের রক্তে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রাচী সিনেমা। সেটা বিক্রি করে দেব অন্যের হাতে ভাবতেই পারি না। আমি এ বংশের ছেলে নাকি মেয়ে, সেটা ব্যাপার নয়। ইচ্ছে থাকলে মেয়েরাও ঐতিহ্য বাঁচাতে পারে। আমার তো মনে হয় 'প্রাচী' সিনেমাহলে আমার দাদু, বাবা, মা, স্বামীর স্মৃতিচিহ্ন আছে। আজও প্রাচীর দেওয়াল ছুঁয়ে ওঁদের স্পর্শ অনুভব করি। আমার কর্মীরাও আমার পরিবার। আরও যেটা বিশেষত্ব, কর্মীদের মধ্যে চল্লিশ ভাগই মহিলা কর্মী। আমি মেয়েদের আরও এগিয়ে দিতে চাই।"
'প্রাচী' সিনেমা হল শুরু হয়েছিল দেশ স্বাধীন হবার পরে-পরেই, ১৯৪৮ সালের অগস্টে। সেও ছিল এক জন্মাষ্টমী তিথি। পূর্বদিকমুখী হল তাই হলের নাম 'প্রাচী' দেওয়া হয়। বিদিশার ঠাকুরদা (কাকাদাদু) প্রতিষ্ঠাতা জিতেন্দ্রনাথ বসুর হাত ধরেই প্রাচীর যাত্রা শুরু। বাংলা চলচ্চিত্র তখন নির্বাক থেকে সবাক হতে শুরু করেছে। সেইসময় থেকেই বাংলা ভাষা, বাংলা ঐতিহ্য এবং বাংলা ছায়াছবির বাহক হয়ে দাঁড়িয়েছে 'প্রাচী'। প্রমথেশ-কানন থেকে উত্তম-সুচিত্রা বা তাপস-দেবশ্রী থেকে দেব-কোয়েল সব স্টারের বাংলা ছবি পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে রমরমিয়ে চলেছে এই হলে। সত্যজিৎ রায় থেকে তপন সিনহা হয়ে অপর্ণা সেন বা ঋতুপর্ণ ঘোষের মননশীল ছবিও হল আলো করেছে বারবার।
'প্রাচী' মূলত বাংলা ছবির জন্যই বিখ্যাত। কিন্তু ১৯৬৭ সালে উত্তমকুমার তাঁর নিজের প্রোডাকশনের প্রথম হিন্দি ছবি 'ছোটি সি মুলাকাত' 'প্রাচী' সিনেমা হলে দেখাতে অনুরোধ করেন জিতেন্দ্রনাথ বসুকে। মহানায়কের কথা রাখেন জিতেন্দ্র বসু। তারপর থেকে বাংলা ছবির সঙ্গে হিন্দি ছবিও দেখানো হয়।
https://youtu.be/U4iaCga94so
বর্তমানে 'মুখোশ’ ও ‘বেলবটম’ নিয়ে নতুন উড়ান শুরু করল প্রাচী৷ পরের সপ্তাহে যোগ হবে ‘চেহরে’৷ কোভিডবিধি মেনে আপাতত দৈনিক চারটি করে শো প্রদর্শিত হবে৷ সময় সকাল ১১.৩০, দুপুর ২:০০, বিকেল ৪.৩০ এবং সন্ধ্যা ৬.৪৫৷ তবে প্রতি সপ্তাহে এই সময় পরিবর্তন হবে।
ঘূর্ণিঝড় আমফানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রাচী৷ তার উপরে প্যানডেমিকের প্রবাহ তো রয়েছেই৷ সেকেন্ড ওয়েভ চলাকালীনই প্রাচী প্রেক্ষাগৃহ সংস্কার করা হয়৷ এবার পুজোর আগেই খুলে গেল হলের দরজা৷
প্রাচীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন পরিচালক অভিনেতা প্রযোজক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, 'নতুন রূপে প্রাচী সিনেমা। ধন্যবাদ বিদিশা বসু। সবাইকে আমন্ত্রন জানাই।' অভিনেতা পরিচালক অরিন্দম শীল লিখেছেন "বাহ্। এ তো দারুণ ব্যাপার। বাংলা সিনেমার ভাল হোক।"
এক একটা সিনেমাহলের পেছনে কত গল্প যে লুকিয়ে থাকে, কান পাতলে কত লড়াইয়ের গল্প শুনতে পাওয়া যায়, সেসব প্রকাশ্যে আসে না সবসময়। যেখানে অনেক সিনেমাহলের উত্তরসূরিরা হলের ঝাঁপ ফেলে দিয়েছেন, সেখানে একজন মহিলা হয়েও একটা সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হল চালানো কম কথা নয়। সব মিলিয়ে যেন এক নতুন দিনের আলো দেখাচ্ছেন বিদিশা। শোনা যাচ্ছে, এবার বিদিশার পথেই হাঁটতে চাইছেন প্যারাডাইস হলমালিকরাও। বেহালায় বন্ধ হয়ে থাকা 'ইলোরা' সিনেমাহলকেও একই ভাবে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনতে চান কর্ণধার শতদীপ সাহা।
এখন নতুন রূপে প্রাচীর লাল গালিচা পাতা সিঁড়ি আর বড় স্ক্রিন দেখে আবার দর্শক মেতে উঠেছে প্রাচীতে ছবি দেখতে। সঙ্গী হয়তো ছোটবেলার সেই সিনেমা দেখার স্মৃতি! তবে এ নস্ট্যালজিয়া কিন্তু মন খারাপের নয়, ফিরে পাওয়ার আনন্দেরও বটে। সেই আনন্দের ডাকেই দর্শকদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে নতুন 'প্রাচী'। নামেই যার পূর্বদিক, তার আলো কি নেভে কখনও! সূর্যের মতোই নতুন উদয়ে আজ জ্বলজ্বল করছে 'প্রাচী'র দ্যুতি।