
শেষ আপডেট: 22 June 2023 10:32

তিনি বাঙালি নন, অথচ তাঁর বাজানো বাংলা রবীন্দ্রসঙ্গীত বা দেশাত্মবোধক গানের সুরের জাদুতে মোহিত সারা বাংলা-সহ গোটা বিশ্ব! তাঁর সুরের জাদুতে (Musician) মিলেমিশে এক হয়ে যেত সব জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি। তাই তাঁর হাউসফুল শোয়ের থিকথিকে ভিড়ে থাকতেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার থেকে মুচি, মেথর, কৃষক সক্কলে। তিনি অজস্র বাংলা হিট গানেরও সুরকার। আদতে পার্সি মানুষ হয়েও কলকাতাকে আপন করেছিলেন গভীর ভাবে। তিনি ভিয়েস্তাপ আর্দেশির বালসারা (V Balsara)। সারাজীবন নামের আদ্যক্ষর ভি দিয়েই জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি সঙ্গীত পরিচালক ও যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী, সুরের ম্যাজিশিয়ান, ভি বালসারা।
ভায়োলিন, ম্যান্ডোলিন, পিয়ানো, মাউথঅর্গ্যান, অর্কেস্ট্রা-সহ একাধিক বাদ্যযন্ত্র সাবলীল বাজানোয় তাঁর সুখ্যাতি ছিল সারা বিশ্বে। ভি বালসারা ছিলেন মেলোডিকা ও ইউনিভক্সের উদ্ভাবক।
গানের সঙ্গে বাজনার যোগ অবিচ্ছেদ্য। অথচ গায়করা যতটা প্রচার, সম্মান, খ্যাতি পান, তার সিকিভাগও নজরে আসেন না বাজনদাররা। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন ভি বালসারা। শুধু তাঁর বাজনা শুনতেই শ্রোতার ঢল নেমে যেত। তাঁর সুরের মোহিনী মায়ায় বুঁদ হত আট থেকে আশি। বাজনার সুরেই তিনি নিজের আইডেন্টিটি তৈরি করতে পেরেছিলেন। তাই সকল বাঙালির মনের মণিকোঠায় জায়গা হয়েছিল তাঁর। আজ ভি বালসারার শততম জন্মদিনে ফিরে দেখা তাঁর সুরের সফর।
ভিয়েস্তাপ আর্দেশির বালসারার জন্ম ১৯২২ সালের ২২ জুন, বম্বেতে। বালসারার সঙ্গীত শিক্ষায় হাতেখড়ি তাঁর মায়ের কাছে। ভিয়েস্তাপ কথার অর্থ, তেজী ঘোড়া। বালসারার চরিত্রও ছিল তাঁর নামের মতোই। তাঁকে দেখে মনে হত তিনি খুব লাজুক ও ভীতু প্রকৃতির, কিন্তু মনের দিক থেকে তিনি ছিলেন খুব সাহসী।
তাঁর বাবার একটি টিউটোরিয়াল হোম ছিল, যেখানে ভাষা ও বিজ্ঞানের পাশাপাশি শেখানো হত মিউজিক। বালসারা আগে গান গাইতেন কিন্তু গানের গলা ভাল না হওয়ায় তিনি বাদ্যযন্ত্রে আসেন। তাঁর মা নিজে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। মাত্র ছ'বছর বয়েসে মুম্বইয়ের সিজে প্রেক্ষাগৃহে মায়ের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে ছোট্ট ভিয়েস্তাপ তখনকার দিনের একটি প্যাডেল হারমোনিয়াম বাজিয়ে বিদ্বজ্জনদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। একটা বাচ্চা ছেলের পারফরম্যান্স সকলকে মুগ্ধ করেছিল। সেদিনই বোঝা গেছিল, এ ছেলে হতে চলেছে সঙ্গীত জগতের হবু নক্ষত্র।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে বালসারা বাড়ি থেকে পালিয়ে যান, কাজের চেষ্টায়৷ মিলিটারি ক্যাম্পে ঘোড়াকে স্নান করানোর কাজ জুটল৷ পোষাল না সে কাজ৷ বাড়ি ফিরে আরম্ভ করলেন পার্সি বিয়েবাড়িতে জ্যাজ বাজানোর কাজ৷ এদিকে কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষায় ফেল করে লেখাপড়ার পাটও চুকিয়ে দিলেন ভিয়েস্তাপ।
সেই সময় থেকেই যন্ত্রসঙ্গীতের প্রায় সমস্ত দিকে আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে পড়লেন তিনি। খালি শিশি জোগাড় করে তৈরি করেছিলেন ‘বটলফোন’ যন্ত্র। এই ভাবেই একের পর এক সৃষ্টি করেছেন ‘গ্লাসোফোন’, ‘স্টিলোফোন’, ‘বেলোফোন’। সাইকেলের বারোটা ঘণ্টি জোগাড় করে, একটা সাইকেলের বিভিন্ন জায়গায় রেখে, তার পর স্টেজে সাইকেল চালিয়ে সেগুলো থেকে সুরেলা সঙ্গীত তৈরি করতেন। টাইপরাইটারে তাল রাখার খেলায় তাঁর হাতের জাদু ছিল অত্যাশ্চর্য! মঞ্চে কোনও বিখ্যাত গানের সুর বাজানো হচ্ছে, তার সঙ্গে সমান লয় রেখে পুরো গানটি সাদা কাগজে টাইপ করতেন ভিয়েস্তাপ। টাইপিংয়ের শব্দটা কাস্টিনাট বা উডবক্সের মতো শোনাত। টাইপ করা গানের কাগজটি দেখে দর্শকরা বিস্মিত হতেন। বম্বেতে সহকারী সংগীত পরিচালক হিসেবে টুকটাক কাজও করতেন।
শঙ্কর জয়কিশনের সুরে ‘আওয়ারা’ ছবিতে মুকেশের গাওয়া ‘আওয়ারা হুঁ’ গানের শুরুতে পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ন কিংবা তালাত মাহমুদের গাওয়া ‘দাগ’ ছবির সেই বিখ্যাত গান, ‘অ্যায় মেরে দিল কহিঁ আউর চল’, বা হেমন্তকুমার-লতার গাওয়া 'পতিতা' ছবির ‘ইয়াঁদ কিয়া দিল নে কাঁহা হো তুম’ গানের শুরুতে যে প্রিলিউডটি বাজে, তা ভি বালসারা একটা হারমোনিয়ামে অসাধারণ স্কেলে বাজিয়েছিলেন।
ততদিনে বালসারার জীবনে এসছেন তাঁর স্ত্রী ও দুই পুত্র। বম্বেতে তাঁর রোজগার মন্দ ছিল না। তবু তাঁর মাথায় ভূত চাপল কলকাতায় আসার। বম্বের পার্সি বন্ধুরা বালসারাকে বললেন, 'যাচ্ছো যাও, কলকাতার লোকেরা তোমায় মেনে নেবে না। টিকতে না পেরে সেই এখানেই ফিরে আসতে হবে।' তবু তিনি এলেন কলকাতায়।
১৯৫৪ সালে তিনি একটা শার্ট আর প্যান্ট কাগজে মুড়ে কলকাতা চলে এসেছিলেন। পকেটে তিনটে টাকা। বো স্ট্রিটে পার্সিদের গেস্ট হাউসে উঠলেন। এর পর কী করবেন, জানা নেই। ঠিক করলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে হবে। চললেন রেডিও অফিস। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁর দেখা পাওয়া গেল না। এক সহৃদয় ভদ্রলোক পৌঁছে দিলেন ন্যাশনাল অর্কেস্ট্রাতে। সেখানে জ্ঞানপ্রকাশবাবু ব্যস্ত গানের রিহার্সালে। পরের দিন গানটির রেকর্ডিং। ভিয়েস্তাপকে সবাই মিলে জোর করেই বসিয়ে দিলেন পিয়ানোয়। শিল্পী ছিলেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ও আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবির গান। সুরকার অনুপম ঘটক। সেই শুরু।

কিন্তু ভি বালসারাকে প্রচারের আলোয় আনলেন উৎপলা সেন। বালসারা উৎপলা সেনকে নিজের গুরু মা বলতেন সব জায়গায়। আবার উৎপলাও বালসারাকে 'পার্সি বাবা' বলে ডাকতেন। উৎপলা সেনের নাতি সূর্য সেন বললেন, 'মুম্বই থেকে কলকাতায় আসার পর ভি বালসারাকে অনুষ্ঠানের আয়োজক সরোজ সেনগুপ্ত নিয়ে আসেন উৎপলা সেনের কাছে। কারণ সরোজ বাবু জানতেন যে নতুন প্রতিভাদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিতেন উৎপলা। তাই হল। ভি বালসারার প্রথম শো সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের সোশ্যালে যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশন, যার মূল ভাবনা ও ব্যবস্থাপনা ছিল উৎপলার। সেদিন নবাগত শিল্পী বালসারাকে উৎসাহ দিতে উৎপলা সেন বসেছিলেন সামনের সারিতে। সেইসময় উৎপলা ছিলেন খ্যাতির মধ্যগগনে, তাই তাঁর উপস্থিতিও অনুষ্ঠানে একটা আলাদা মাত্রা যোগ করেছিল।'
এরপর উৎপলা উদ্যোগী হয়ে তাঁর পার্সি বাবার জন্য বসুশ্রী সিনেমাহলে 'সাজ্ অর্ আওয়াজ্' নামে বিশাল এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। তৎকালীন সমস্ত সঙ্গীতশিল্পীরা উৎপলার অনুরোধে এসেছিলেন ও তাদের গানের সাথে অর্কেস্ট্রেশনে ছিলেন বালসারাজি । পরের দিন সমস্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল অনুষ্ঠানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং সেই দিন থেকে ভি বালসারাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। 'সাজ্ অর্ আওয়াজ্' নামকরণ ও অনুষ্ঠানের ভাবনায় ছিলেন উৎপলা সেন এবং তখন 'সাজ্ অর্ আওয়াজ্' দিয়েই কলকাতার শিল্পী পরিমণ্ডলে জায়গা করে নিলেন ভি বালসারা। পরবর্তীকালে বালসারা যখন নিজের অর্কেস্ট্রার দল প্রতিষ্ঠা করলেন তার নামও দিলেন 'সাজ্ অর্ আওয়াজ্', গুরু মা উৎপলা সেনকে উৎসর্গ করে।

ভি বালসারা সারা জীবনে তাঁর পরমপ্রিয় উৎপলাদিকে কখনও ভোলেননি। সেযুগের অনেক নামী শিল্পীদের সঙ্গীত জীবনে এগিয়ে যেতে উৎপলা সবসময় সুযোগ করে দিতেন। যদিও বেশিরভাগই সে কথা স্বীকার করেননি পরে। কিন্তু ব্যতিক্রম বালসারা। ভি বালসারা যেভাবে তাঁর বিভিন্ন লেখা ও ইন্টারভিউতে উৎপলা-সতীনাথের কথা নিজমুখে বলেছেন, তা সত্যিই বিরল। এত সৎ মানুষ ছিলেন ভাবলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়।
উৎপলা ও সতীনাথের সঙ্গে বালসারার তৈরি হয়েছিল এক গভীর বন্ধুত্ব এবং পারিবারিক সম্পর্ক, যা ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। নিরহঙ্কারী ও অসম্ভব বিনয়ী মানুষটি সবার জন্মদিন মনে রাখতেন। আমার বাবা আশিস সেন বলেন, 'আমরা জানতাম যে আমাদের পরিবারের সকলের জন্মদিনে সর্বপ্রথম বালসারা কাকু আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা দিতে এক গাল হাসি নিয়ে এসে দাঁড়াবেন।' তাই হত।'

বাংলার লেজেন্ডারি সব অনুষ্ঠান আয়োজক বিখ্যাত তোচন ঘোষ উৎপলা সেনের নিজের ভাইপো। পরবর্তী যুগে তোচন ঘোষ নিজেও বহু অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন, যাতে ভি বালসারার বাজনা ছিল মূল আকর্ষণ। তোচন ঘোষ জানালেন, 'আমার পিসি উৎপলা সেনের বিখ্যাত গান 'ঝিকমিক জোনাকির দীপ জ্বলে শিয়রে'-র রেকর্ডিং যন্ত্রানুষঙ্গে বাজানোর কথা ছিল ভি বালসারার। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুরে পুরো গানের সুর বাজাবেন বালসারাজি। কিন্তু রেকর্ডিংয়ের আগের দিন বালসারাজি হাতে আঘাত পাওয়ায় উনি বাজাতে পারলেননা। তখন আমার পিসেমশাই সতীনাথ মুখোপাধ্যায় হারমোনিয়ামে বালসারাজির অ্যাকোর্ডিয়ানের সুর অবিকল তুলে বাজিয়েছিলেন। আমার আয়োজন করা বসুশ্রীর পয়লা বৈশাখের জলসায় বহুবার বালসারাজি পারফর্ম করেছেন। আমি ওঁর বাড়িতেও বহুবার গেছি। মানুষ ভি বালসারা ভীষণ সাদাসিধে, সরল মানুষ ছিলেন। ওঁর অসাধারণ একটা গুণ ছিল, গ্ল্যামার জগতে থেকেও কোনও রকম নেশা ওঁর ছিল না। জীবনে কোনও দিনও ড্রিংক করতে দেখিনি। পান সুপুরি, সিগারেট কিছু উনি খেতেন না।'
বসুশ্রীর পয়লা বৈশাখের জলসা তো একটা ইতিহাস। সেই বসুশ্রীর কর্ণধার বসু পরিবারের তরফ থেকে দেবজীবন বসু এই গল্পে যোগ করলেন আরও তথ্য। বললেন, 'বসুশ্রীর অনুষ্ঠানে বাঁধাধরা আর্টিস্ট ছিলেন ভি বালসারা। অত বড় শিল্পী অথচ কী লাজুক, নম্র। আমরা বসুশ্রী হলে একবার মান্না দেকে সংর্বধনা দেওয়ার অনুষ্ঠান করলাম। তাতে বম্বে থেকে এলেন রাহুল দেব বর্মণ। সেদিন ভি বালসারার বাজনা সবার মন কেড়ে নিয়েছিল।'

শুধু অর্কেস্ট্রেশন নয়, সুরকার হিসেবেও ভি বালসারা বিখ্যাত। বাঙালি মেজাজে তিনি মিশিয়ে দিতেন পাশ্চাত্য মিউজিক। অপরেশ লাহিড়ীর সৌজন্যে লোকে ভি বালসারাকে একজন সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেও চিনলেন। ১৯৫৬ সালে নির্মল ভট্টাচার্যের সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘চলাচল’, ‘মা’, ‘পঞ্চতপা’, ‘মমতা’ প্রভৃতি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন তিনি। ১৯৫৯ সালে অভিনেতা জহর রায় অভিনীত ‘এ জহর সে জহর নয়’ ছবিতে প্রথম একক ভাবে বাংলাছবির সুরকার হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করলেন বালসারা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীত পরিচালনায় বালসারা বাজালেন ‘সূর্যতোরণ’, ‘দুইভাই’, ‘পলাতক’, ‘বাদশা’, ‘অজানা শপথ’, ‘মন নিয়ে’, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর মতো প্রায় ৭০টি ছবিতে।
গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুরকার বালসারার জুটিও বিখ্যাত। পুলক-বালসারার প্রথম ছবি 'রাতের অন্ধকারে’। অনিল চ্যাটার্জী আর সাবিত্রী চ্যাটার্জী নায়ক-নায়িকা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইলেন ‘আলোতে তুমি মধুর’ আর আশা ভোঁসলে গাইলেন 'এই হাওয়ায় কী সুরভি ঝরে' ও একটি চাইনিজ সুর প্রভাবিত গান। অঞ্জন চৌধুরীর শত্রু, আব্বাজান, ইন্দ্রজিৎ-সহ একাধিক ছবিতে আবহ সঙ্গীত তাঁর করা। রাতুল গাঙ্গুলি পরিচালিত দেবশ্রী রায়ের আলোচিত ছবি 'দাহ'-র সংগীত পরিচালকও ছিলেন ভি বালসারা।

পুলক পুত্র পিয়াল বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, 'বাংলা ছবি শুধু নয়, বাংলা জিঙ্গলও জনপ্রিয় হয় পুলক-বালসারা জুটির হাত ধরে। বাংলা আধুনিক গানেও পুলক-বালসারা সুপারহিট জুটি। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও কন্যা সন্তান ছিল না। তাঁর একমাত্র ছেলে আমি। কিন্তু আমার বাবা লিখলেন, 'আয় খুকু আয়'। আর তাতে সুর করলেন বালসারা কাকু। যে গান চিরদিনের বাবা-মেয়ের গান হয়ে রয়েছে আজও।'
গাছকে ভালবেসে কবি অমিতাভ চৌধুরীর লেখা একটি কবিতায় সুর করেছিলেন বালসারা, ‘সুন্দরবনে সুন্দরী গাছ, গাছটি সুন্দরবনে, চারদিকে রোদ্দুর যেন ঝিলমিল ঝিলমিল কাঁচ, কচি সবুজ পাতা তার।’ বনশ্রী সেনগুপ্ত যে গান গেয়ে এমন হিট হলেন যে তাঁর নাম 'ফরেস্ট কুইন' হয়ে গেল। হেমন্তকন্যা রানু মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে তিনি গাইয়েছিলেন, ‘বুশিবল বুশিবল’ আবার বালসারার সুরে মুকেশ গাইলেন, 'মন্দ বলে লোকে বলুক না', তালাত মেহমুদ গাইলেন, 'তুমি সুন্দর যদি নাহি হও'।

এছাড়াও মঞ্চসফল নাটক 'মধুসূদন দত্ত', ‘আগন্তুক’ ও ‘কাচের পুতুল’-এ তাঁর সুরসৃষ্টি করেছিলেন। নব্বই দশকে দূরদর্শনের জন্য ‘গৃহদাহ’ ও ‘মুন্সী প্রেমচাঁদের গল্প’ সিরিয়ালে তিনি থিম মিউজিক তৈরি করেছিলেন।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি বালসারার আমৃত্যু ভালবাসা ছিল। প্রথম তিনি কলকাতায় এসে এক অনুষ্ঠানে 'এ মণিহার আমার' বাজিয়ে কলকাতার শ্রোতাদের মন জয় করে নেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর প্রতিটি শোতে 'এ মণিহার আমার' বাজাতেন। লতা মঙ্গেশকরের প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘তোমার হল শুরু আমার হল সারা’ গানটির নোটেশন বিশ্বভারতী অনুযায়ী কম্পোজ করলেন বালসারা এবং তার পরে তা রেকর্ড হল । এই গানের মিউজিক অ্যারেঞ্জার ছিলেন ভি.বালসারা। গানে পিয়ানো এবং অর্গানও তাঁর বাজানো ছিল।
ব্যক্তিগত জীবনে ও কর্মজীবনে ভি বালসারাকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বিখ্যাত তবলাবাদক দীপঙ্কর আচার্য। দীপঙ্কর বাবু বললেন, 'বম্বের সিনে মিউজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বালসারাদা। পঞ্চাশের দশকের কলকাতায় আসার আগেই প্রতিষ্ঠা করা হয় এই অ্যাসোসিয়েশন। সেখানকার প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন তিনি। কলকাতায় এসে বালসারাদা ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন ক্যালকাটা সিনে মিউজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। তাতেও উনি প্রেসিডেন্ট হন এবং ওঁর সঙ্গে সেক্রেটারি পদে আমি দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে কাজ করেছি। এই সংস্থা এ বছর ষাট বছরে পা দিল। পরে মিউজিশিয়ানদের ফেডারেশন তৈরি হয় যখন, তাতেও প্রেসিডেন্ট ছিলেন বালসারাদা। ফিল্মের গান, আধুনিক গান রেকর্ডিং থেকে টিভি শো, বালসারাদার পরিচালনায় অনেক বাজিয়েছিলাম।

ভি বালসারা ভীষণ সময়ানুবর্তী ছিলেন। একবার একটা ছবির সংগীত পরিচালনা করছিলেন মনোহর পুকুর রোডের 'সাউন্ড উইং' স্টুডিওতে। আমার যেতে ১৫ মিনিট দেরি হয়েছিল বলে উনি আমাকে বাইরে বসিয়ে রাখলেন, ঢুকতে দিলেন না। একদম স্কুল যেন। ছবির প্রোডিউসার বলছেন, দীপঙ্করের তবলা ছাড়া গান রেকর্ডিং কীভাবে হবে! বালসারাদা তবলা ছাড়াই ফাইনাল টেক লোকগান প্লেব্যাক গাওয়ালেন গায়ক অরিন্দম গাঙ্গুলিকে দিয়ে। আর সেটাই ছবিতে ব্যবহার হল। পরে বালসারাদা আমাকে বললেন, উনি একবার এরকম দেরি করে আসায় হেমন্তদা ওঁকে বসিয়ে রেখেছিলেন। সেই নীতি উনি আমার উপর প্রয়োগ করলেন, যাতে আমিও সময় জ্ঞানের শিক্ষা পাই।
বালসারাদার সঙ্গে আত্মিক যোগও ছিল আমার। ওঁর ১৬ অক্রূর দত্ত লেনের ভাড়াবাড়ির ঘরটা ছিল মন্দিরসম। সেখানে সমস্ত বাদ্যযন্ত্রর সঙ্গে একা থাকতেন। আর দেওয়াল জোড়া ছিল পরলোকগত সঙ্গীতশিল্পী ও মিউজিশিয়ানদের ছবি। সবাইকে রোজ এক ণ্টা ধরে ধূপ দিয়ে আরতি করতেন তিনি। কত প্রয়াত মিউজিশিয়ানদের ছবি আমার থেকে চেয়ে ওই দেওয়ালে বাঁধিয়ে রেখেছেন। এমন করতে কোনও শিল্পীকে সারা জীবনে দেখলাম না।

সবাই জানত উনি মদ্যপান করেন না। কিন্তু রাতে উনি দু'পেগ খেতেন একা। অথচ কখনও পার্টি বা কারও সঙ্গে মদ খাননি। তাই সবাই জানে, উনি ড্রিংক করতেন না। কিন্তু আসলে করতেন, সেটা নিজের একাকীত্ব যাপন বলা যায়। তেমনই অসম্ভব মশলাদার খাবার খেতেন উনি। ওঁদের পার্সি পরিবারে ওটাই রীতি ছিল। বিরিয়ানি, মোগলাই--,ঝাল মশলাদার আরও সব খাবার হতো নিত্য।
বহুমুখীপ্রতিভার মানুষ তিনি। পার্সি লোক হয়েও কলকাতায় এসে বাংলা বলা শুধু নয়, বাংলা লেখা ও বাংলা পড়াও শিখলেন। এমন অসম্ভব ভাল বাংলা পড়তে ও লিখতে কোনও অ-ভারতীয়কে আমি দেখিনি। মিসেস বালসারা ছিলেন ভি বালসারার থেকে পাঁচ বছরের বড়, যে কথা কেউ প্রায় জানে না। উনি আমাকে বলেছিলেন।'

ভি বালসারা দীর্ঘ জীবন কাজের মধ্যে বেঁচেছিলেন, ব্যক্তিগত জীবনের শোককে জয় করে। নিজের প্রিয়জনের মৃত্যু তিনি দেখেছেন একের পর এক। তবু তিনি হেরে যাননি শোকের কাছে। দুই ছেলে ও স্ত্রীর মৃত্যু চোখের সামনে দেখেন তিনি। এক ছেলে অনেক আগেই রোগভোগে প্রয়াত। আরেক ছেলের বিয়ে দেন, নাতনি হয়, কিন্তু সেই ছেলে দুর্ঘটনায় মারা যান।

পার্সিরা মৃত মানুষের শেষকৃত্য কবর বা চুল্লিতে করে না। উঁচু মিনারে দেহ রাখা হয় এবং মৃতদেহ শকুন, চিল, কাকে ছিঁড়ে খায়। দুই ছেলের মৃত্যুর শেষকৃত্য ওভাবেই করেন বালসারা। স্ত্রীর মৃত্যুও ওভাবেই তিনি দেখেন। বালসারা বলেছিলেন, 'পার্সি মতে বলে, মৃতদেহটাও কারও কাজে লাগুক। তাই শকুন-চিলে খায়। আমার শেষকৃত্য যেন কলকাতা শহরে ওখানেই করা হয়।' ছেলের শেষকৃত্য ওইভাবে শেষ করে এসে তিনি সোজা পৌঁছে গেছিলেন অনুষ্ঠানে। বাজনা বাজিয়ে হাজার হাজার শ্রোতাকে মাতিয়ে দেন তিনি। তবে সেদিন কান্না ঝরে পড়ল তাঁর সুরে। বাজালেন 'পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়...'

পার্কসার্কাসে ফ্ল্যাট কিনলেও তিনি থাকতেন অক্রূর দত্ত লেনের ষোলো নম্বর বাড়িতেই। স্ত্রী, সন্তান সবাই একে একে প্রয়াত, তবু শোকাতুর না হয়ে কাজে ডুবে থেকেছেন। শেষ জীবনে যখন তিনি অশীতিপর বৃদ্ধ, তখন একদম একা কাটিয়েছেন, কী দিন কী রাত। সুরকে করেছেন বাঁচার মন্ত্র। দিন শেষে তিনি বলতেন, "এই বেদনা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু, এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু, পিছন-পানে তাকাই যদি কভু।"
শেষ জীবনে মানসিক কষ্টের সঙ্গে জুড়ে বসল শারীরিক কষ্ট। ক্যানসার বাসা বাঁধল শরীরে। ২০০৫ সালের ২৩ মার্চ কলকাতায় প্রয়াত হলেন সুরের দেবতা। তবু আজও শতবর্ষী তরুণ ভি বালসারা যেন বেঁচে আছেন সুরে সুরে, প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। তাঁর প্রতি আজও কৃতজ্ঞতায় ঝুঁকে থাকে বাংলা গানের ডালি।

'শতফুল বিকশিত হোক
মনে-মনে এই শুধু চাওয়া
সব কুঁড়ি কুসুমিত হোক,
চাই শুধু সেই আবহাওয়া।'
তথ্য সহায়তা: আশিস সেন, পিয়াল বন্দ্যোপাধ্যায়, তোচন ঘোষ, দেবজীবন বসু ও দীপঙ্কর আচার্য
ছবি সৌজন্যে: সূর্য সেন, পিয়াল বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপঙ্কর আচার্য
বম্বেতে হিন্দি ছবি করতে যাওয়াই মিঠুর কাল হল! কেমন আছেন স্বয়ংসিদ্ধা মর্জিনা