
শেষ আপডেট: 8 December 2022 11:08

আটের দশকে একটি ধারাবাহিক সপ্তাহে একদিনই দেখা যেত, মাত্র আধ ঘন্টার জন্য। নয়ের দশকের শুরুতেও সেই ট্রেন্ডই চলত। ততদিনে বম্বেতে শুরু হয়েছে মেগা সিরিয়াল (Mega Serial) 'স্বাভিমান'। যা বাংলা ডাবিং এ 'আত্মসম্মান' নামে সম্প্রচার হত। ভীষণ জনপ্রিয় ছিল সেই সিরিয়াল।
তার আগে থেকেই একজন নবীন পরিচালক বাংলায় 'মেগা' করার স্বপ্ন নিয়ে স্টুডিও পাড়ায় ঘুরছিলেন। ততদিনে সে বেশ কিছু অল্পদিনের স্লটে দূরদর্শনে ধারাবাহিক বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বাংলায় অত দিন ধরে মেগা সিরিয়াল বানানো কী মুখের কথা? তাঁর স্বপ্ন শুনে টলিপাড়ার লোকজনই তাঁকে টিটকিরি দিত। কত শখ বাংলায় নাকি মেগা সিরিয়াল বানাবে? কিন্তু সেই স্বপ্ন সত্যি করে দেখিয়েছিলেন সেই পরিচালক।

তিনি বাংলা টেলিভিশনে মেগা সিরিয়ালের জনক বিষ্ণু পালচৌধুরী (Bishnu Palchowdhury)। আজ, বৃহস্পতিবার প্রয়াত হলেন। শরীরে ক্যানসার বাসা বেঁধেছিল। মুম্বাই থেকে প্রথম কিস্তির চিকিৎসা সেরে কলকাতা সদ্য ফিরেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। চলে গেলেন সিরিয়ালের জনক।
১৯৯৫ সালের কথা। দুপুর সাড়ে ১২টা বাজলেই রাস্তাঘাট ফাঁকা, শুনশান হয়ে যায়, দোকানপাট বন্ধ, টার্মিনাস থেকে বাস ছাড়বেনা, রাস্তায় রিকশা নেই, মা-মাসিরা রান্না সেরে অপেক্ষা করে আছেন। এমনই সময়ে টেলিভিশনে কলকাতা দূরদর্শনের পর্দা জুড়ে আসতেন 'জননী' সুপ্রিয়া দেবী। সুপ্রিয়া মানে সাহসী স্টাইল আইকন,বাঁধভাঙা যৌনতা, বাঙালীর সোফিয়া লরেন। সেই ইমেজ ভেঙে সুপ্রিয়া হলেন জননী।

যাঁরা ওই সময়টা পার করে এসেছেন, তাঁরা জানেন জননী-এফেক্ট কতখানি ছিল। মানুষের মধ্যে জননী দেখার উন্মাদনা ছিল কতটা। সব বাড়ি থেকেই ভেসে আসত জননীর টাইটেল সং, 'যে হাসি মুখে সবই সয়, জগতের সেই তো জননী।' ঘিয়ে গরদের আঁচল উড়ছে সুপ্রিয়া দেবীর, আর সেখানেই উঠছে প্রথম মেগা সিরিয়ালের টাইটেল কার্ড।
'জননী'র তিন প্রধান কারিগর, পরিচালক বিষ্ণু পালচৌধুরী, কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার দুলেন্দ্র ভৌমিক এবং প্রযোজক অশোক সুরানা।

২৭ বছর আগে মেগা সিরিয়াল কি জিনিস বাঙালি দর্শকরা জানত না। তখন সিরিয়ালকে বলা হত ধারাবাহিক, যা সপ্তাহে একদিন করে চার মাসের স্লটে বা রোজ রাতে এক দু মাসের স্লটে হত। বছরের পর বছর চলা সিরিয়াল যে হতে পারে তা কল্পনাও করতে পারত না কেউ। অল্পদিনের স্লটের সেই ধারাবাহিক থেকে মেগা সিরিয়ালের এই যুগে চলে আসা একদিনে হয়নি।
প্রথম আইডিয়া ভেবেছিলেন এই জননীর পরিচালক বিষ্ণু পালচৌধুরীই। তার পরেই বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে জন্ম হয় 'মেগা' শব্দের। সুপ্রিয়া দেবী লাল কাতান পরে গাড়ি থেকে নেমে বলতেন, 'আপনাদের জন্য আসছে নতুন মেগা সিরিয়াল জননী। আমি থাকছি আপনাদের সঙ্গে।' এমনই প্রিভিউ শ্যুট করে 'জননী'র প্রচার শুরু হয় এবং একদিন দুপুর সাড়ে বারোটায় এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ছোটপর্দা জুড়ে এলেন জননী সুপ্রিয়া দেবী। লাল কাতান, লাল চুড়িদার থেকে একদম ঘিয়ে গরদে এবং ঘিয়ে চুলে চার খোকার জননী সুপ্রিয়া দেবী।

২৭ বছর পর অনেকটাই পাল্টে গেছে সিরিয়ালের দুনিয়া। এসেছে অনেক বিগ বাজেট প্রোডাকশন হাউস, অনেক নতুন মুখ, চলে গেছেন প্রবীন শিল্পীরা। তবু আজও ফিকে হয়নি জননীর নস্ট্যালজিয়া। ইউটিউবে এখনও অনেকেই দেখতে চান সেই 'জননী'।
জননীর স্টোরিলাইন ছিল ভাগের মায়ের গল্প। তখনও ছেলেদের খোকা ডাকটা হারিয়ে যায়নি বাঙালিদের ঘরে। পিতার মৃত্যুর পর মায়ের দায়িত্ব কোন সন্তান নেবে? চার খোকার বাড়ি এদিকে চার জায়গায়। তাই মা হয়ে গেলেন ভাগের মা। বছরে তিন মাস করে চার ছেলের বাড়িতে মা থাকতেন, আর ছেলে-বৌমার সংসারে সবকিছুর মুশকিল আসান যেন হয়ে উঠতেন জননী সুপ্রিয়া। তিনি কিন্তু সাদামাঠা জননী ছিলেন না। তাঁর ছিল ভীষণ ব্যক্তিত্ব। তখন সুপ্রিয়ার স্টারডমে কাঁপছে সারা বাংলা-সহ ভারত। সুপ্রিয়ার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল বিদেশেও।

তার আগে পর্যন্ত সুপ্রিয়া দেবীকে 'উত্তমকুমারের রক্ষিতা' বলে যে বাঙালিরা নিন্দা করেছিল, তারাই জননী রূপে সুপ্রিয়াকে দেখে দেবী বলতে বাধ্য হয়েছিল।
জননীর পর বিষ্ণু পালচৌধুরী 'শান্তিনিকেন' সিরিয়াল করেছিলেন। সেই সিরিয়ালে উত্তমকুমারের নায়িকারা ও সেই সময়কার সব লেজেন্ডারি অভিনেত্রী একসঙ্গে অভিনয় করেন। সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, ললিতা চট্টোপাধ্যায়, অলকা গাঙ্গুলি, গীতা দে-- সবাই ছিলেন। ইটিভি বাংলায় হত এই জনপ্রিয় মেগা। দূরদর্শনের জন্য বানান 'কনকাঞ্জলি' মেগা সিরিয়ালও।

জনপ্রিয় তারকা নায়িকা স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের নায়িকা রূপে ডেবিউ বিষ্ণু পালচৌধুরীর 'দেবদাসী' সিরিয়ালে। এই সিরিয়ালের সেটে এসেই ঋতুপর্ণ ঘোষ স্বস্তিকাকে 'চোখের বালি'তে ছোট্ট চরিত্রের জন্য নির্বাচন করেন। তারপর তো বড় পর্দার নায়িকা হয়ে যান স্বস্তিকা। অপরাজিতা আঢ্য, জয় বদলানি, রীতা কয়রাল, জয়ন্ত দত্তবর্মণ, ভাস্বর চ্যাটার্জী-- বহু অভিনেতাই তারকা হন এই পরিচালকের মেগাতে কাজ করেই।

সিরিয়ালের হিট পরিচালক বিষ্ণু পালচৌধুরী সে সময় ইন্দ্রাণী দত্ত ও সঞ্জীব দাশগুপ্তকে নিয়ে 'স্বপ্ন নিয়ে' ছবিও করেছিলেন। এছাড়াও বিষ্ণু ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভক্ত। তাই 'নীললোহিত' ছবিও পরবর্তীকালে পরিচালনা করেন।
তবে একসময়ে মেগা সিরিয়ালের জনকের কাছে সিরিয়াল বানাতে আসত না কোনও চ্যানেল বা প্রযোজক সংস্থা। বিষ্ণু পালচৌধুরী নিজেই বলতেন, 'সময়!' সময় বোধহয় সত্যিই সব পাল্টে দেয়। বর্তমান সময়ের মোটা দাগের মেগা সিরিয়ালের সঙ্গে নিজের ভাবনা মেলাতে পারতেন না বিষ্ণু পালচৌধুরী। কাজ একেবারেই কমে যাওয়াতে হতাশায় ভুগতেন। তবে নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রী তৈরি করতে একটি অভিনয় শিক্ষার স্কুল প্রতিষ্ঠা করে এক বছর মতো ক্লাস নিয়েছিলেন।

সব আশায় বাধ সাধল ক্যানসার। মেজাজী, আমুদে মানুষটা বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন এই অসুখে। মুম্বই গেছিলেন চিকিৎসা করাতে। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী।

এক মাস আগেই বিষ্ণু পালচৌধুরীর ক্যানসা ধরা পড়ে। তিনি রসালো আমিষ খাবার আর ধূমপান ও সুরাপানের ভক্ত ছিলেন। অতি ধূমপান আর মদ্যপানই বোধহয় তাঁর কাল হল। তবে মানুষ হিসেবে বড় মনের ছিলেন। তিনি পথ না দেখালে আজকের মেগা সিরিয়াল হত না।
গত পরশু মুম্বই থেকে ক্যানসারের চিকিৎসা করে ফিরে আসেন তিনি। মুম্বইয়ে বাংলার রোগীদের ফুটপাথে শুয়ে থাকতে দেখে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বিষ্ণু পালচৌধুরীর করজোড়ে আবেদনও করেন, "অন্যান্য প্রদেশের মতো ক্যানসার রোগীদের জন্য থাকার আবাসন বানিয়ে দিন! চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না, কত সুদূর গ্রাম থেকে শিশু, রোগী, বাচ্চা, মহিলাদের নিয়ে মুম্বইয়ের ফুটপাতে শুয়ে আছেন বাংলার মা জননীরা! টাটা ফ্রি-তে চিকিৎসা দিচ্ছে, কিন্তু থাকার ব্যবস্থা নেই! অন্যান্য প্রদেশ থেকে তাই সরকার আবাসন বানিয়ে দিয়েছে তাদের নিজের লোকেদের জন্য ! দিদিকে অনুরোধ, আপনি মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে জমি চাইলেই পাবেন! বাংলা থেকে একটা আবাসন বানিয়ে দিন ফুটপাথে মাথা গুঁজে থাকা ক্যানসার রোগীদের জন্য। নাম দিন 'মমতা আবাসন'।"
এটাই ছিল পরিচালকের শেষ ইচ্ছে। এর পরে গতকাল হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পিয়ারলেস হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। তার পর আজ সকালে সব শেষ। চতুর্থ স্টেজ ক্যানসার লিভার থেকে সারা দেহে ছড়িয়ে গেছিল। অসহ্য যন্ত্রণায় এক মাস কাটিয়ে, সব ব্যথাবেদনা থেকে মুক্তি পেলেন বিষ্ণু পালচৌধুরী।

শুধু একটাই প্রশ্ন, মেগা সিরিয়ালের জনক শেষ জীবনে কেন কাজ পেলেন না? সেই সময়কার বহু পরিচালককেই আর টলিপাড়ার প্রযোজকদের প্রয়োজন নেই। সেইসব পরিচালকরা যে রুচিসম্মত কাজ করতেন, তা এখনকার প্রযোজক সংস্থাগুলি গ্রহণও করবে না। একসময় বিষ্ণু পালচৌধুরীর নিজের প্রযোজনা সংস্থাও ছিল। কিন্তু শেষ জীবনেও কাজ পাগল মানুষটা ভাল ভাল সিরিয়াল বানাতে পারলেন না।
বিষ্ণু পালচৌধুরীর ছেলে থাইল্যান্ডে থাকেন। তিনি এলেই সম্ভবত শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। বিদায় মেগা সিরিয়ালের জনক।
পেশায় উকিল, নেশায় অভিনেতা! জটায়ু ছাড়াও সন্তোষ দত্তর অভিনয়ে অমর অবলাকান্ত থেকে গোপাল ভাঁড়