লোকেশন দিল্লি। একের পর এক শিশুকন্যা নিঁখোজের খবর জোরাল হচ্ছে। এমন এক সময়ে ‘মর্দানি ৩’ শুরু হয়। তবে এই ছবির লড়াই আগের মতো নয়।

শেষ আপডেট: 2 February 2026 13:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লোকেশন দিল্লি। একের পর এক শিশুকন্যা নিঁখোজের খবর জোরাল হচ্ছে। এমন এক সময়ে ‘মর্দানি ৩’ শুরু হয়। তবে এই ছবির লড়াই আগের মতো নয়। কারণ এবারের ‘শিবানী শিবাজি রায়’ শুধু অপরাধীদের তাড়া করছে না, রুখে দাঁড়িয়ে পড়ছে এমন এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে ব্যবস্থা ক্ষমতাশালীদের জন্য জেগে ওঠে, আর গরিবদের জন্য নেতিয়ে পড়ে।
‘মর্দানি’ সিরিজ বরাবরই রানিকে একটি চরিত্র দেয়নি, দিয়েছে এক স্পষ্ট উপস্থিতি। প্রথম ছবিতে মানবপাচারের অন্ধকার গলি, দ্বিতীয় ছবিতে বিকৃত মানসিকতার তরুণ অপরাধী—দুটোই ছিল নির্মম, অথচ সংযত। তৃতীয় অধ্যায়ে পরিচালক বদলেছে, কলমও। অভিরাজ মিনাওয়ালা পরিচালনায় আর আয়ুষ গুপ্তর গল্প ও চিত্রনাট্যে ‘মর্দানি ৩’ শুরুতে যেন এক ‘বুদ্ধিদীপ্ত’ তদন্তকাহিনি। প্রথম ঘণ্টায় শিবানী যখন বলেন, বৃষ্টি নামার আগেই অপরাধস্থলে পৌঁছনো দরকার—তখন আশা জাগে, এই গল্প হয়তো আরও সূক্ষ্ম পথে হাঁটবে। (Mardaani 3, Mardaani 3 review, Rani Mukerji, Shivani Shivaji Roy)
ঘটনার সূত্রপাত বুলন্দ শহরের এক খামারবাড়ি থেকে দুই মেয়ের অপহরণে। একজন প্রভাবশালী আমলার কন্যা, অন্যজন সেই আমলার পরিচারকের সন্তান। পুলিশের তৎপরতা হঠাৎ বেড়ে যায়। কিন্তু শিবানী খুব দ্রুত বুঝে ফেলেন, এই ঘটনাই আসল গল্প নয়। দিল্লি ও আশপাশের এলাকায় তিন মাসে প্রায় একশো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে উধাও—বেশিরভাগই পথশিশু, দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের জন্য কোনও তাড়া নেই, কোনও তাড়াহুড়ো নেই। এই বৈষম্যই শিবানীর লড়াইকে আরও তীব্র করে তোলে।
নতুন দায়িত্বে এনআইএ-র তত্ত্বাবধানে কাজ করতে গিয়ে শিবানীর সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় এক বিস্তৃত মানবপাচার চক্র। এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু এক নারী—আম্মা। মল্লিকা প্রসাদের অভিনয়ে এই চরিত্র যেন আগুন। ‘মর্দানি’ ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রথম মহিলা প্রতিপক্ষ হিসেবে তিনি শুধু ভিলেন নন, তিনি এক বিকৃত ব্যবস্থার প্রমাণ। তাঁর চোখের স্থির দৃষ্টি, সংলাপের ধার, আর অবিচল বিশ্বাস—সব মিলিয়ে তিনি শিবানীর যথাযথ সমকক্ষ এক শক্তি। একজন আইনের বেড়াজালে বাঁধা, অন্যজন কোনও সীমা মানে না। দু’নারীর মুখোমুখি দৃশ্যগুলোই ছবির প্রাণ।

চিত্রনাট্য শিবানীকে ঘোরায় দিল্লি থেকে বুলন্দ শহর, সিকার, জয়পুর হয়ে কলম্বো পর্যন্ত। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন নবীন পুলিশ অফিসার ফাতিমা আনোয়ার—জাঙ্কি বোদিওয়ালার সংযত অথচ দৃঢ় উপস্থিতিতে এই চরিত্র ছবিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। নিষ্ঠুরতা, খুন, অপহরণকারী, আর এক সন্দেহপ্রবণ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, যারা প্রায়ই শিবানীর হাত বেঁধে রাখে। প্রশাসনিক টানাপড়েন, ক্ষমতার সঙ্গে দরকষাকষি—এসব ছোট ছোট মুহূর্তই ছবিকে সাধারণ পুলিশি গল্পের বাইরে বয়ে নিয়ে যায়।
ছবির প্রথমার্ধ প্রায় নিখুঁত। কোনও অপ্রয়োজনীয় সাজ নেই, নির্মাণে সংযম। দ্বিতীয়ার্ধে গতি বজায় থাকলেও গল্প ক্রমে খানিক পরিচিত ছকে ঢুকে পড়ে। গল্পের মোড় আগেভাগেই আন্দাজ করা যায়। একজন অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসারের বারবার ভুল, ভিলেনের বাড়িতে ঢুকে পড়া—এই পুরনো ট্রিকগুলো চোখে লাগে। তবু ছবির আবেগ ভেঙে পড়ে না, কারণ রানি, শিবানীকে এমন দৃঢ়তায় ধরে রাখেন যে দর্শক তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে যায়।
রানির অভিনয় এখানে পালিশ করা নয়। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখের নিচে কালো দাগ—সবই থেকে যায়। তিনি কোনও অলঙ্কৃত নায়িকা নন, তিনি প্রতিদিনের সেই পুলিশ, যিনি প্রশ্নবিদ্ধ হন শুধু পেশা বেছে নেওয়ার কারণে। অ্যাকশন দৃশ্যে তিনি নির্ভীক, কিন্তু ছবির আসল প্রতিচ্ছবি তাঁর নীরবতায়। অন্যদিকে, মল্লিকা প্রসাদ সংলাপের লড়াইয়ে সমানতালে এগিয়ে যান। ‘আম্মা’ ভয়ঙ্কর,—এই সমাজই তাঁকে এমন বানিয়েছে।
ছবিতে আরেক ভিলেন—মুখোশের আড়ালে ‘ভয়ঙ্কর’, তবে বাইরে সুদর্শন। অপরাধচক্রের আসল উদ্দেশ্য শেষ ভাগে প্রকাশ পায়, যখন গল্পের পরিসর হঠাৎ আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে। তখন বোঝা যায়, এই লড়াই শুধু উদ্ধার অভিযান নয়, এটি এক ভয়াবহ বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
চিত্রগ্রহণে আরতুর জুরাভস্কির ক্যামেরা শহরের অন্ধকার অলিগলি থেকে চোখ ফেরায় না। সম্পাদনায় ইয়াশা রাঞ্চান্দানি ছবিকে টানটান রাখেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘আইগিরি নন্দিনী’ ও ‘মহিষাসুর মর্দিনী স্তোত্র’ যেন শিবানীকে এক আধুনিক দেবীর প্রতীকে পরিণত করে।
রানির ‘লড়কি কিউঁ?’ সংলাপ পরিচিত হলেও প্রাসঙ্গিক, আর সবচেয়ে তীক্ষ্ণ বাক্যটি আসে ভিলেনের মুখে—বিদেশিকে উদ্দেশ করে বলা, “এখানে জীবনের দাম কম। আমাদের রাস্তাঘাটের শিশুর চেয়ে তোমাদের পশুও বেশি সুরক্ষিত।” এই এক লাইনে পুরো সমাজের দিকে আঙুল তোলে।
‘মর্দানি ৩’ আগের দুই ছবির মতো সম্পূর্ণ নতুন কিছু না বললেও তার সামাজিক বার্তা, আবহ আর দ্বন্দ্ব, আলাদা করে তোলে। তবু প্রথম ‘মর্দানি’র মতো সেই কাঁচা অভিঘাত এখানে নেই—এ কথা মানতেই হয়। কিন্তু এই অধ্যায় কথোপকথন এগিয়ে নিয়ে যায়, থামিয়ে দেয় না। শেষে এসে ছবিটি ইঙ্গিত দেয়—শিবানী শিবাজি রায়ের পথচলা এখানেই শেষ নয়। হয়তো আবার ফিরবেন তিনি, আরও এক অন্ধকারের মুখোমুখি হতে। যদি সেই লড়াই অর্ধেকও এই ছবির মতো টানটান হয়, দর্শকের কাছে ফুল মার্কস পেতেই পারে। কারণ ‘মর্দানি ৩’ নিখুঁত না হলেও, আঘাত করে ঠিক জায়গায়।