
অপরাজিতা আঢ্য ও মানসী সিনহা। গ্রাফিক: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 22 February 2025 15:39
হা হা হা হা হা হা হা হা। এমনভাবে কে হাসে? আমি আমার বাপের জন্মে এমন উচ্চকিতভাবে হাসতে কাউকে দেখিনি। অপাকে (Aparajita Auddy) দেখেছি। কী জ্বালা! কতবার বলেছি, বুঝেছি খুব মজা পেয়েছিস, কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশের একটা ধরণ থাকবে। পাশে বয়স্ক কেউ থাকলে, নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক! আর না হলে তিনি একেবারে কালা হয়ে যাবেন! তারপর তোকে থানায় ডাকা হবে! আমাকেই তো ছুটতে হবে। আমার কথা শেষ না হতেই, ওর আরও হা হা হা হা হা হা হা হা, বেড়ে যায়! কী মুশকিল!
২০০৪ কিংবা ২০০৫। মাসটা ঠিক মনে নেই। ভোর-ভোর এনটি ওয়ান স্টুডিয়োতে চলছে ‘ধ্যাত্তেরিকা’র শুটিং। ওই সিরিয়ালেই আমার প্রথম অভিনয় ছিল। মেকআপ রুমে বসে আছি। কারওর সঙ্গে কোনও আলাপ নেই। হঠাৎ একটি মেয়ে, ছিপছিপে, বড় চোখ, জানলা থেকে মুখ বের করে জিজ্ঞেস করল, ‘অ্যাই, তুই তো নতুন অভিনয় করছিস?’ তখন খানিক অপ্রস্তুত আমি। মুখ তুলে বললাম, হুম। তখন (Aparajita Auddy) বলল, ‘তুই খুব ভাল অভিনয় করিস’ বলেই সেই হা হা হা হা হা হা হা হা।
উফ! ওর প্রশংসা আমি কিচ্ছু শুনতেই পাইনি। ওর হাসিটা পেয়েছি। আমি কিন্তু ওকে কিচ্ছু জিজ্ঞেস অবধি করিনি! নামধাম কিচ্ছু। নিজেই বলল, ‘আমি অপরাজিতা। অপা বলে সবাই ডাকে!’
সেই শুরু। তারপর (Aparajita Auddy) আমায় একদিন বলল, ‘তোকে আমি মানু বলে ডাকব, বয়সফয়স এসবের তোয়াক্কা করবি না!’ আমি বললাম আচ্ছা। ও কেমন একটা দাদাগিরি চালায় আমার উপরে। ওর অজস্র দাবি আমায় সইতে হয়। আমার উপর ওর একটা অধিকারবোধ কাজ করে। আমার বেশ ভালই লাগে এগুলো। আসলে ইন্ডাস্ট্রিতে খুব বেশি বন্ধু আমার নেই। করিনি। বেশিরভাগজন আমার পরিচিত কিংবা সহকর্মী। অপা আমার বন্ধু। আমার কাছের। প্রাণের। তাই এগুলো আমার কাছে একেবারে নতুন। আমার ভালও লাগে।
বন্ধুত্ব। শব্দটার একটা ভার আছে। বয়স যত বাড়ছে। ভার আরও ভারি হচ্ছে। বাড়ছে টানাপড়েন। অতএব, আমাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়েছে। গোঁসা হয়েছে। তবে, একে অপরের যে কোনও সমস্যায় পাশে থেকেছি, যতই মনমালিন্য থাকুক না কেন। অতনুদা (অপরাজিতার স্বামী) অপার জীবনের প্রথম মানুষ, যিনি জানেন অপার সমস্যার সবটুকু। আর দ্বিতীয় মানুষটি, আমি।
‘মানু, আমার মাথা থেকে এটা কিছুতেই বেরচ্ছে না, তোর সঙ্গে কথা বলব’—এমন মেসেজ এলে বুঝতে পারি, অপার আমাকেই এখন প্রয়োজন। আমার সব ধরণের ব্যস্ততা উবে যায় তখন, ফোনের কথোপকথন বা কখনও সাক্ষাতে সমাধানের পথ খুঁজতে হয় আমাদের। সত্যি, ভাবতে অবাক লাগে, এতগুলো বছর হয়ে গেল, এতটুকুও চিড় ধরেনি আমাদের সম্পর্কে।
আজ সকালে ওকে (Aparajita Auddy) মেসেজ করলাম। ‘এখনও অবধি যা অর্জন করেছিস, নিজের যোগ্যতায় করেছিস। ঈশ্বর তোর সহায় থাকুক। শুধু আজকের জন্য নয়। বাকি জীবনের জন্যও তোকে শুভেচ্ছা’। পাল্টা মেসেজে অপা লিখল, ‘এবার যা অর্জন করব, তোর ঘাড়ে চেপে করব। আর তুই যদি ঘাড়ে চাপতে না দিস, তোর গলা টিপে ধরব’। কাছের বন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছার মেসেজ করলে, তার জবাবে এমন বিটকেল মেসেজ, কে করে, আমি জানি না! অপা করে। আমি শুধুমাত্র একটা ‘ধন্যবাদ’ আশা করেছিলাম!
যাই হোক, অপা (Aparajita Auddy), আসলে হাঁসের মতো, জলের উপরে অনায়াসে, ভেসে চলে। আমরা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে দেখি। কিন্তু জলের নিচে হাঁসের পা দুটো যে ক্রমাগত নড়ে চলেছে, তা আমাদের চোখ দেখতে পায় না। হাঁসের প্যাডলিং চলতে থাকে আর তার সঙ্গে চলতে থাকে জলের সঙ্গে ওর যুদ্ধ। অপার জন্মদিনে আমি মন থেকে চাইব, ওর এই প্যাডলিংয়ের গতি খানিক কমুক। সঙ্গে এই স্ট্রাগল। একটু শান্ত হয়ে জলের উপরে অপা ভেসে বেড়াক। ওর ভিতর-ভিতর যে লড়াইটা চলছে, তার স্থিরতা আসুক। অনেকের জন্য ওর ভাবনা চিন্তা। পরিশ্রম এবং অনেকটা মানসিক চাপ। সেটা খানিক কমে যাক। এবং অপা নিজেকে যেন আরও একটু বেশি ভালবাসতে পারে।