শেষ আপডেট: 19 November 2019 08:37
সে গল্প ফুটিয়ে তোলার জন্য চশমার ওপর দিয়ে উত্তমকুমারের তাকানোর স্টাইলটা ঠিক করেছিলেন পরিচালক নিজেই। মহানায়ক নিজে কিন্তু ছিলেন বেশ টেনশনে। এমন নতুন ম্যানারিজম যদি দর্শকরা না নেন! কিন্তু উত্তমকুমারকে ভুল প্রতিপন্ন করেছিলেন দর্শকরাই। ওই ভাবে চশমার উপর দিয়ে তাকানোটাই অগ্নীশ্বরের ট্রেডমার্ক হয়ে গেল। কত পুরুষ যে ও ভাবে তাকিয়ে উত্তম হতেন!
বিধবা বোনের বিয়ে দেওয়া হোক বা মুসলিম বার্বুচির হাতে রান্না করা শুয়োর-মুরগি খাওয়া হোক-- সবই দাপটের সঙ্গে করতেন অগ্নীশ্বর। আস্তিক স্ত্রীর ধর্মবিশ্বাসও তাঁর যুক্তিবাদী চিন্তার কাছে হেরে গেছে। অথচ সেই অগ্নীশ্বরই আলপনা দেওয়া ঠাকুরঘরে জুতো খুলে ঢুকলেন স্ত্রীর মৃত্যুর পরে। এই যে বেদনাবিধুর পরাভব-- এও কি এক পুরুষকার নয়!
তিনি আবার একজন লেখকও। আদতে অগ্নীশ্বর ছিলেন এক জন গম্ভীর ডাক্তার, অথচ তাঁর রসবোধও তীক্ষ্ণ। ওষুধের ডোজ নিয়ে সবজান্তা প্রতিবেশীকে অগ্নীশ্বর বলেছিলেন "আপনার গালে যদি ঠাস ঠাস করে তিনটে চড় মারার দরকার হয়, সেখানে একটা চড়ে কাজ হবে কি? আমার পেশেন্টের যদি এক দাগেই কাজ হতো, তাহলে তিন দাগ দিয়েছিলাম কেন?"
‘অগ্নীশ্বর’-এর আগে ‘নিশিপদ্ম’-তে প্রথম নায়কোচিত চেনা ভূমিকার বাইরে এসে অন্য ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উত্তমকুমার। তাঁর অভিনীত ‘অনঙ্গ দত্ত’ চরিত্রটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল গল্পে ছিলই না। পরিচালত অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ই সৃষ্টি করেন সেই চরিত্র। সেখানেও অনঙ্গ দত্ত এমন একটি আদর্শ পুরুষ চরিত্র। যে বেশ্যাবাড়িতে রোজ আহার গ্রহণ করেও, বেশ্যাকে ভালোবেসেও, শারীরিক ভাবে আকৃষ্ট হননি। পতিতা হলেও তাঁকে নারীর সম্মান দিয়েছেন, মায়ের সম্মান দিয়েছেন। তাঁর পালিত ছেলের দায়িত্ব নিয়েছেন। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও যে অন্য কোনও সম্পর্কের এত জোর হয়, তাও এক জন পতিতার প্রতি, তা যেন অনঙ্গ দত্তই পারেন।
অগ্নীশ্বরেও তেমনই হল। রুপোলি পর্দার ছক ভেঙে সে চরিত্রকে বাস্তবের ভগবান মেনেছিল মানুষ। শোনা যায়, ছবি দেখে দর্শকরা যখন হল থেকে বেরোতেন তখন অগ্নীশ্বরের পোস্টারে মাথা ঠেকিয়ে নমস্কার করে যেতেন তাঁরা। যেন ভগবান দর্শন হল!
সরকারি ডাক্তার, বেসরকারি ডাক্তার, কর্পোরেট ডাক্তার, প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার, এক জন ডাক্তারও কি ডাক্তারি পেশা নিয়ে অগ্নীশ্বরের জবানিকে বা খোদ অগ্নীশ্বরকে অস্বীকার করতে পারবে?
ক্ষিদ্দাকে দেখে যত দূর বোঝা যায়, তাঁর চরিত্রটি শারীরিক ভাবে অত্যন্ত অ্যাক্টিভ ছিল, যেটা উত্তমকুমারের শেষ দিকের চেহারায় কতটা মানানসই হতো জানা নেই। সেদিক থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একেবারে সঠিক পছন্দ। অনেকেই বলেন, সৌমিত্র সত্যজিতের মানসপুত্র। কিন্তু সত্যজিৎ বাদেও অনেক উল্লেখযোগ্য জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য কাজ করেছেন সৌমিত্র। যার প্রথমেই আসবে 'কোনি' র ক্ষিদ্দা। শুধু পুরুষ দিবসে নয়। শিক্ষক দিবসেও ক্ষিদ্দা প্রণম্য।
'কোথায় অযোধ্যা কোথা সেই রাম
কোথায় হারাল গুণধাম,
একি হল একি হল,
পশু আজ মানুষেরই নাম।'
হিংলাজ মাতা দর্শনের দুর্গম পথে আবালবৃদ্ধবনিতার মনের জোর হয়ে ওঠে রূপলালের ঠোঁটে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া এই গান। কিংবা, পরম শান্তি আর ক্লান্তির সেই সুপরিচিত সুর--
'তবু জানি কোলে শেষে তুমি টেনে নাও,
মাগো যতই দুঃখ তুমি দেবে দাও
তবু জানি কোলে শেষে তুমি টেনে নাও,
মাগো তুমি ছাড়া এ আঁধারে গতি নাই
তোমায় কেমনে ভুলে রবো,
কত দূর? আর কত দূর বল মা? ... '
অনিল ছিলেন এমন এক অভিনেতা, যাকে নায়ক বা ভিলেন বা বিদূষক হিসেবে আলাদা করে তকমা দেওয়া যায় না। বরং বলা যায়, তিনি যেন সকলেরর বিবেক অন্তরতম।
'নির্জন সৈকতে' সিনেমার সেই ছেলেটির কথাও মনে পড়ে, যেখানে সমাজ-সংসারে আটকে রাখা যায় না পুরুষকে। যে বেরিয়ে পড়ে নিরুদ্দেশ ভ্রমণে। সেখানে তার সঙ্গে দেখা হয় মাতৃসমা বিধবা মহিলাদের যাঁরা তাকে সংসারের ছেলে করে নেন। সে পেয়ে যায় এক মনের মানুষ রেণুকেও (শর্মিলা ঠাকুর )। কিন্তু তবু যেন বাঁধনছাড়া প্রাণ তিনি। এমন আপনভোলা চরিত্র, সুর করে কথা বলা যেন অনিল চট্টোপাধ্যায়ই পারতেন। যিনি স্টার হয়েও স্টারডম মানতেন না। পর্দার বাইরের জীবনে, ভাড়াবাড়িতে থেকে সংসারে সকলের দায়িত্ব পালন করে প্রতিবেশীর অসুস্থতাতেও সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন চিঠির মতো মন পড়তে পারা 'পোস্টমাস্টার'!
সেই সংসারে সকলের দায়িত্ব নিয়ে, কর্তব্য পালন করে, ভগবানস্বরূপ থাকতেন এক বড়দা। যে বড়দাকে দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে সকলের। কারণ তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন সর্বসমক্ষে কোনও রকম স্বজনপোষণ না করেই। এমন বড়দা যেন সব পরিবারই চাইত। তাই তো রঞ্জিত মল্লিককে বড়দার রূপে সুপারহিট বাজার দিলেন অঞ্জন চৌধুরী।
আজকাল দশটা ছবি মিলিয়ে যা হিট হয় না, এই ছবিগুলো একটা ছবিতে সেই বক্সঅফিস টেনে সুপারহিট হত। রঞ্জিত মল্লিক বড়দা কিন্তু সব ছবিতেই ধ্রুব আদর্শ হয়ে থাকতেন।
এ পুরুষকে বাঙালি একান্নবর্তী পরিবার ভোলে কী করে? অণু পরিবারগুলো আজ হয়তো বুঝছে এমন একখান বড়দার অভাব।
একের পর এক আসতে থাকে 'আরেকটি প্রেমের গল্প', 'চিত্রাঙ্গদা', 'মেমোরিজ ইন মার্চ'। অন্য এক লড়াইয়ে তোলপাড় হচ্ছেন তথাকথিত পুরুষেরা। ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন লিঙ্গসত্তার সন্ধানে। বালিশে উপুড় হয়ে কাঁদছেন।
বহু মহিলাও তো আছেন, যাঁরা মনে পুরুষ শরীরে নারী। সমাজ তো তাঁদের নিয়েও টিটকিরি কাটবে। তাই তো তাঁদের 'উষ্ণতার জন্য' এগিয়ে আসে তারা, 'যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল'।
'রাজকাহিনী', 'যোদ্ধা', 'গোত্র'। শুধুমাত্র গোত্রর তারেক আলি কি তারক গুহ নয়। সে আসলে এক জন আদর্শ পুরুষ, যাকে নির্ভর করে বাড়িওয়ালি মাসিমা। সে নির্ভরতায় মুগ্ধ হয়ে আমদর্শক স্বপ্ন দেখে আদর্শ পুরুষের।
আসলে, নাইজেল এমন এক জন পুরুষ, যে নিজে সংশোধিত হয়ে আরও মানুষকে সংশোধন হতে সাহায্য করে চলেছেন। যৌনকর্মী,সংশোধানাগারের আসামি, ড্রাগ অ্যাডিক্ট, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ-- সবাইকে দিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করেছেন নাইজেল। বহু বেপথু মানুষকে দিশা দেখিয়েছেন। শুধু তাই নয়, একা থাকা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দিকে ভরসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে নাইজেলের কলকাতা ফেসিলিটিস ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ। এই সব কিছুই নাইজেলের ছবির মাধ্যমে হলেও, শুধুই ছবি করার মানসিকতায় নাইজেল আটকে নেই। পর্দা থেকে নেমে এসে সমাজের প্রান্তিক মানুষদের পরিত্রাতা হয়ে উঠেছেন নাইজেল।
নারী দিবস নিয়ে হাজারো হইচই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী দিবসের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু পুরুষ দিবসের খবর রাখাটুকুও কি আমাদের দায়িত্ব নয়? নারী দিবসে তো নারীদের শুভেচ্ছা জানান সক্কলে। কিন্তু পুরুষ দিবস বহু দিন পর্যন্ত কেবল গুগলেই আবদ্ধ ছিল। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার পথ ধরে সে দিবস ক্রমে পৌঁছচ্ছে আমাদের পরিচিতির পরিধির ভিতরে। অথচ তারও আগে, সেই কবে থেকেই পুরুষের গল্প বলছে টলিউড!
আজ ১৯ নভেম্বর, আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস। সকল পুরুষকে এবং পুরুষমনা মানুষকে শুভেচ্ছা!