
শেষ আপডেট: 4 July 2022 17:31
তরুণ মজুমদারের (Tarun Majumdar) নায়িকা হিসেবে সুযোগ পেয়েও সে ছবির অফার তিনি ফিরিয়ে দেন। কেন? তরুণ-কথায় আজ অকপট সত্যজিতের 'চারুলতা' মাধবী মুখোপাধ্যায় (Madhabi Mukherjee)। গল্পের সঙ্গী হলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
তরুণ মজুমদার ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর দেখনদারি একদমই ছিল না। এক নিরাভরণ মানুষ। ব্যক্তি হিসেবে সহজ, নিপাট কিন্তু গম্ভীর। শিক্ষা তাঁর অলংকার।
আমি তনুবাবুর মাত্র দুটি ছবিতে কাজ করেছি। কিন্তু আমি ওঁকে শ্রদ্ধা করতাম। নানা অনুষ্ঠানে আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হত। শেষদিকে যেমন মৃণাল সেনের স্মরণ সভায় গোর্কি সদনে আমরা দুজনেই উপস্থিত ছিলাম। আজ সবথেকে বেশি যেটা মনে হচ্ছে, তরুণ বাবু অসুস্থ হয়ে পিজিতে ভর্তি ছিলেন অথচ আমি একদিন দেখতে যেতে পারলাম না। আমি নিজেও হাসপাতাল থেকে কয়েকদিন আগে ফিরেছি। পুরোপুরি সুস্থ নই। গলব্লাডারে স্টোন হয়েছে, অপারেশন হবে। এখন করোনা সংক্রমণ বেড়েছে বলে কদিন পর করতে বলেছেন ডাক্তার। আমি সবাই অসুস্থ হলে চিরকাল দেখতে গেছি। কারণ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সবাই আমার পরিবার, বিশেষত আমাদের সময়কার মানুষরা। শুধু সৌমিত্র বাবু আর তরুণ বাবুর বেলায় যেতে পারলাম না, এমন কোভিড এল।
'গণদেবতা' ছিল তরুণবাবুর মাল্টিস্টারার ছবি। আমরা সবাই বোলপুরে ছবির আউটডোর করতে গেছিলাম। বোলপুর গেস্ট হাউসে আর্টিস্টরা থেকেছিলাম। তরুণ বাবুর ইউনিটে কাজ করলে কোনও অসুবিধা হত না, এত সুন্দর প্ল্যানিং ছিল ওঁর। উনি খুব সুচারু ভাবে সব বন্দোবস্ত করতেন। কার কী সুবিধে অসুবিধে, খোঁজ নিতেন। দুপুরে লাঞ্চের খাবার থাকত বড় ক্যানে। পাঁউরুটি, ডিম আর একটা মিষ্টি। এই খাবার সবাইকে খেতে হবে। টেকনিশিয়ান থেকে আর্টিস্ট সবারই একই খাবার, সে যত বড় আর্টিস্টই কাজ করুন না কেন। ভাল না লাগলেও খেতে হবে। সব ব্যাপারে উনি ভীষণ ভাবে নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলতেন। সকাল সকাল আমাদের সবাইকে গেস্ট হাউস থেকে শ্যুটিং স্পটে যেতে হত। সন্ধেবেলা গেস্ট হাউসে মনের মতো খাবার বললে আমরা পেতাম। কিন্তু শ্যুটিংয়ে সবাইকে ওই পাঁউরুটি টোস্ট, ডিম, মিষ্টি খেতে হবে। অনেকগুলো পাঁউরুটি থাকত যা খাওয়া যায় না, তবু সবাইকে খেতে হত। নিয়ম নিয়মই। সেটা খেয়ে কাজ করতে হত।

পরিচালক হিসেবে খুব ভাল পরিচালক। উনি অভিনয় করে দেখিয়ে দিচ্ছেন, তার পর শট নিচ্ছেন, এরকমও দেখেছি। ওঁর ছবিতে গ্রাম-শহরের দর্শকের ভাগাভাগি ছিল না। তরুণ মজুমদারের বেশিরভাগ ছবির গল্প গ্রামকেন্দ্রিক কিন্তু সেসব ছবি শহরের উঁচুতলার মানুষরাও মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন।
হ্যাঁ আমার আর আল্পনা গুপ্তর ভীষণ ঝগড়ার দৃশ্য ছিল। আমরা দু'জন খুব ঝগড়াও করেছিলাম। কোনও গ্রাম্য গালাগাল বাদ যায়নি। কিন্তু আমি বা আল্পনা গুপ্ত কেউই বাস্তবে ঝগড়ুটে নই। তরুণবাবু আর ইউনিটের সবাই জানত, ঝগড়া থেকে আমি শত হস্ত দূরে থাকি। মতের অমিল হলে সরে আসব। ঝগড়া তো আমি কখনও করিনি। কিন্তু অভিনয় অভিনয়। নিজে মানুষ হিসেবে আমি আলাদা। তাই তরুণ মজুমদার ভেবেছিলেন মাধবী ঠিক মতো এত ঝগড়া করতে পারবে কিনা! সবার খুব টেনশন ছিল। সেই ঝগড়া তো হিট করে গেল। তরুণবাবু খুশি হয়েছিলেন।

'গণদেবতা'য় যার সঙ্গে আমার ঝগড়া ছিল সেই আল্পনা গুপ্ত র সঙ্গে আমার হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। আল্পনা গুপ্ত খুব ভাল অসমিয়া গান গাইতে পারতেন। উনি শ্যুটে এলেই আমরা বলতাম, আল্পনাদি একটু গান করুন। আল্পনা গুপ্তর শেষ সময়েও আমি ওঁর পাশে ছিলাম। আল্পনাদি যখন অসুস্থ, তখন আমার মাও অসুস্থ, অভিনেতা প্রেমাংশু বসু তিনিও অসুস্থ। পিজি হসপিটালে এই তিন জনকে সমানে দেখে গেছি। আল্পনাদি যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন জোর করে ওঁকে ফল খাওয়াতাম নইলে কিনতেন না, খেতেনও না। যাই হোক তিনটি লোককে একসঙ্গে দেখেছি।
ওঁদের মধ্যে দেখনদারি একদম ছিল না। তরুণবাবু ওঁর জীবনের প্রেম ভালবাসাকে কখনও মিডিয়ায় আনেননি। তখন ওঁদের সুসম্পর্ক ছিল। সন্ধ্যা আমার পাশের ঘরেই থাকত, বোলপুর গেস্ট হাউসে। তরুণবাবু টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে থাকতেন। রাতেও। একটা জিনিস খুব ভাল লাগত, সাহিত্যিক প্রভাত মুখোপাধ্যায় এই গেস্ট হাউসে আসতেন। আমাদের সঙ্গে চা খেতেন, গল্প করতেন। উনি রবীন্দ্রনাথের কাছাকাছি এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে গবেষণা করতেন। ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?
প্রভাত বাবু বলেছিলেন তখন, 'রবীন্দ্রনাথ বিশাল বড় কর্মী।' ওঁর এই কথাটা আমার এত ভাল লেগেছিল যে আজও মনে আছে। এভাবে কেউ কখনও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিশ্লেষণ করেননি, যে মানুষটা সারাজীবন কাজ করে গেছেন।
'গণদেবতা'তে দীর্ঘ বিরতির পরে সৌমিত্রবাবুর (চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে কাজ করলাম। মাঝে আমরা একসঙ্গে ছবি করিনি। যদিও কাজটা করি তরুণবাবুর চিত্রনাট্যর জন্যই।
ছোট রোল তবে উল্লেখযোগ্য। তাপস আর আমি যেমন ছবিতে মা-ছেলে তেমন তাপসের সঙ্গে আমার বাস্তবেও বন্ডিং ছিল। দিদি ডাকত আমাকে। তখন তাপস ব্যস্ততম নায়ক, তবু যদি শুনত দিদি অসুস্থ, তাপস আমার বাড়ি চলে আসত। এই গুণগুলো তো ওর ছিল। তাপস ও মহুয়া দু'জনেই তো তরুণবাবুর আবিষ্কার। তরুণবাবু ছবিতে মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ডিং ভীষণ ভাবে দেখাতেন।
না আফসোস নেই। আফসোস হয় যে, 'সংসার সীমান্তে'র চিত্রনাট্যটা তরুণ মজুমদারের থেকে অনেক উন্নত ভেবেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। ঋত্বিকবাবু আমাকে চিত্রনাট্য শুনিয়েছিলেন। এত সুন্দর স্ক্রিপ্ট। ঋত্বিক ঘটক শুধু একটা চোর আর পতিতার গল্প দেখাননি। উনি দেখিয়েছিলেন, সমাজে অনেক চোর আছে, ওই ছেলেটি একা চোর নয়, পরিস্থিতির শিকার। সাহিত্যকে চলচ্চিত্রে অন্য আঙ্গিকে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। তরুণবাবুর ছবিতে সোজাসুজি একটা চোর আর বেশ্যার গল্প ছিল। সেই উত্তরণ হয়নি।

দুই পরিচালকই সৌমিত্রবাবুকে নায়ক অর্থাৎ চোরের ভূমিকায় ভেবেছিলেন। আমার বদলে এল সন্ধ্যা। তরুণ মজুমদারের ছবিতে সন্ধ্যা নায়িকা হবে সেটা কি স্বাভাবিক নয়? নিশ্চয়ই এটা স্বাভাবিক। এ নিয়ে আমার বিলাপ করার কিছু নেই।
তা আছে। 'কুহেলি' ছবির প্রথম অফার তরুণবাবু আমাকে দিয়েছিলেন। সেবা যে চরিত্রটি সেটা উনি আমাকে ভেবেই লেখেন। ভীষণ ভাবে চেয়েছিলেন আমি কাজ করি। কিন্তু আমি তখন অন্তঃসত্ত্বা। বড় মেয়ে হবে। ছবির চিত্রনাট্য শোনাতে চুক্তিপত্র সই করাতে উনি আমার বাড়ি আসছিলেন। আমি ওঁকে বললাম, আমি তো করতে পারব না, এই সময় এই ব্যাপার, কেন খামোখা আসবেন। পরে আমার চরিত্রটি সুমিতা সান্যাল করলেন।

হ্যাঁ তা যেত।
এ নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না। তরুণবাবু তো আমার কাছেই আগে এসেছিলেন।
তরুণ মজুমদার (১৯৩১-২০২২): কানন দেবীর শিক্ষানবীশ থেকে বাঙালির 'ভালবাসার অনেক নাম'
পেনসিল, ব্লাউজ, মিষ্টি— তরুণ মজুমদারকে নিয়ে কত গল্প! স্মৃতির ঝুলি খুললেন তারকারা