
শেষ আপডেট: 23 August 2022 15:16
উদাত্ত তাঁর কণ্ঠ, স্পষ্ট তাঁর উচ্চারণ, আর তাঁর সুরের মায়ায় আবিষ্ট হন না এমন মানুষ আছেন কি? তিনি লোপা, লোপামুদ্রা মিত্র (Lopamudra Mitra)। তাঁর গান (singer) জীবনের তিরিশ বছর (musical career) পূর্তি অনুষ্ঠানের আগে আনন্দে আবেগে অকপট লোপামুদ্রা। কথা বললেন সোমা লাহিড়ী।
তিরিশ বছর হয়ে গেল তাহলে?
হ্যাঁ হয়ে গেল। কী করে যে হয়ে গেল আমি নিজেই ভাবতে পারিনা। সেই প্রথম বছর থেকে মনে হয় এই বোধহয় শেষ বছর, আর বুঝি হল না (হাসতে হাসতে)। কিন্তু শ্রোতা আমার গান ভালবেসেছেন, বাসেন, তাইই ….। আমার গান প্রথম রেকর্ড হয়েছিল ১৯৯১ সালে। করেছিল সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমি। এখানে গণসঙ্গীতে ফার্স্ট হয়েছিলাম। সেটাই রেকর্ড হয়েছিল। সেটা ধরেই এই তিরিশ। এমনকি গত বছরই তিরিশ হয়েছে। গত বছর প্যান্ডেমিকের জন্য করা যায়নি। তবে গান গাইছি এর অনেক আগে থেকে। আকাশবাণীতে গেয়েছি ১৯৮৯ থেকে।
কী গাইতে? গণসঙ্গীত?
না না। ভজন আর রবীন্দ্রসঙ্গীত। আমি রেডিওতে এখনও বি হাই শিল্পী। তারপর আর আপগ্রেড করা হয়নি। নিজের মতো গেয়ে গিয়েছি। গণসঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতার গান, আমার নিজের গান।

বাড়িতে নিশ্চয়ই গানের পরিবেশ ছিল?
এক্কেবারে ছিল। বাবার কাছেই প্রথম গান শেখার শুরু। আমার জেঠিমা খুব ভালো গান গাইতেন। আমার মাকে কখনও গুনগুন করতেও শুনিনি। কেন জানিনা, হয়তো কোনও পারিবারিক চাপ ছিল। কিন্তু মা ছিল আমার গানের সব থেকে বড় সমালোচক। অসাধারণ সুরবোধ ছিল। সুরে-তালে কোনও ভুলভ্রান্তি করলেই মা ধরে ফেলত খপ করে। বাবা মা-ই আমার প্রথম সঙ্গীত গুরু।
তারপর?
তারপর যাঁর নাম করতেই হবে তিনি সমীর চট্টোপাধ্যায়। তিনি না থাকলে আমি সঙ্গীতশিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র হতে পারতাম না। আমার বাবার অফিস কলিগ ছিলেন। আমি কাকা বলতাম। দশ বারো বছর বয়স থেকেই কাকা আমাকে গাইড করেছেন। এই যে আমার কবিতার গান, সেটাও রূপ পেয়েছে তাঁর হাত ধরেই। একেবারে প্রচারবিমুখ একজন মানুষ ছিলেন কাকা। আমার গানজীবনের তিরিশ বছরে তাঁর কথা খুব মনে পড়ছে। দু'বছর আগে তাঁকে হারিয়েছি।

তোমার 'বেণীমাধব' কি সুর করেছিলেন সমীরবাবু?
হ্যাঁ। আরও অনেক কবিতাকেই গান করে তুলেছিলেন কাকা। তবে ১৯৯৬-এ আমার 'বেণীমাধব' হিট করেছিল। তারপর থেকে শ্রোতারা আমার এই কবিতা গানকে ভালবেসেছেন। সেই সাত মিনিটের বেণীমাধব থেকে এখন এক মিনিটের 'মেড ফর ইচ আদার'।
'মেড ফর ইচ আদার'! সেটা আবার কী?
আমার আর জয়ের নতুন গান। এক মিনিটের গান এখন খুব জনপ্রিয় জানো তো? গতকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় লঞ্চ হয়েছে এই মজাদার গান। আমার জীবনের প্রথম হাফে যেমন বাবা, মা আর কাকার প্রেরণায় আমি এগিয়েছি, তেমন সেকেন্ড হাফে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছি জয়কে। ঈশ্বরের অসীম আশীর্বাদ যে তিনি এমন একটা গানপাগল মানুষকে আমার সঙ্গী করে দিয়েছেন। কমপ্লিট মিউজিক্যাল মানুষ। এমন একজন গান-মানুষ কাছে থাকলে সুর আপনি আসে মনে। জয় এমন একজন মানুষ যাকে আমার বদলে যদি একটা গিটার হাতে বসিয়ে দেওয়া যায়, সব ভুলে তাই নিয়ে বসে থাকবে।

জয়ের সঙ্গে আলাপ কবে?
সেই কোন ছোটবেলায় ১৯৯৬-এ। আমাদের বিয়েই তো একুশ পেরিয়ে বাইশে পড়ল। আমার শ্বশুরবাড়িও গানের বাড়ি। তাই আমার সৌভাগ্য যে সব দিক থেকে আমি সাপোর্ট পেয়েছি। আমি ছোটবেলা থেকে চেয়েছি নিজের মতে চলতে, নিজে রোজগার করতে, নিজের মতো করে থাকতে আর শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করতে। এ পর্যন্ত আমি যা যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। পরমপুরুষকে বলি, এভাবেই যেন আগামী দিনগুলো কাটিয়ে দিতে পারি।
এই তিরিশ বছরে কতটা বদলেছে গানের জগৎ?
অনেক অনেক অনেক বদলেছে। ওই যে বললাম আমার সাত মিনিটের 'বেণীমাধব' নয়, এখন শ্রোতাদের চাই এক মিনিটের 'মেড ফর ইচ আদার' ধরনের গান। মানুষের ধৈর্য এতটাই কমেছে যে গানও হতে হবে এক মিনিটের! ভাবতে খারাপ লাগে। আবার ভাবি শ্রোতাদের আনন্দ দেওয়ার জন্যই তো গাওয়া। তাই ওঁদের ভালো লাগার কথাও তো মাথায় রাখতে হবে।
স্টেজে গান গাওয়ার সময় নাচের গান করার অনুরোধ আসে? কী মনে হয় তখন?
আসলে আমি হই হই করে বাঁচতে ভালোবাসি বলে হয়তো ততটা খারাপ লাগে না। তবে স্টেজে অনুষ্ঠান করার সময় সব গান তো আর নাচের মতো হতে পারে না। আসলে এখন মানুষের স্ট্রেস, টেনশন এত বেড়ে গেছে যে ভাবেন, এই অনুষ্ঠানের সময়টুকু নেচে-গেয়ে পুরোপুরি উপভোগ করবেন।
আর কী কী বদল এসেছে গান জগতে?
গানের পুরো সিস্টেমটাই তো বদলে গেছে। মিউজিক অ্যারেঞ্জ থেকে রেকর্ডিং। এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে নতুন গান লঞ্চ হচ্ছে। সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে তো চলতেই হবে। নাহলে পিছিয়ে পড়ব যে। তবে অনেক সময়েই একেবারে প্রথা ভেঙে নতুন কিছু আমি সহজে মানতে পারি না। একবার তো জয়ের সঙ্গে আমার ফাটাফাটি ঝগড়া।

কী নিয়ে?
তখন রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয়েছে। ২০০১ সালে জয়ের পরিচালনায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটা অ্যালবাম হচ্ছে, দশটা গান নিয়ে 'আকাশ'। 'আকাশভরা সূর্যতারা' গানটার মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট নিয়ে জয়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটি শুরু হল এইচএমভি-র স্টুডিও থেকে। আমার শ্বশুরবাড়ি দমদমে পৌঁছেও সেই তর্কাতর্কি চলতে লাগল। আমার শাশুড়িমা তো ভয় পেয়ে গেছিলেন। ভেবেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে ঝগড়াতেই বোধহয় আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে। আসলে আধুনিকীকরণটা ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না। পরে অবশ্য বুঝেছিলাম রবীন্দ্রনাথের গানের ধারা অটুট রেখেই জয় কাজটা করেছিল। অসাধারণ কাজ।
তোমার প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড কবে হয়েছিল?
১৯৯৭ সালে প্রথম অ্যালবাম- 'কান পেতে রই'। তখন অনুষ্ঠানেও গণসঙ্গীত আর রবীন্দ্রনাথের গানই গাইতাম। রবীন্দ্রনাথের গান আমাকে বেঁচে থাকার মানে খুঁজে দেয়। আমি যতই হইহই করে বাঁচি না কেন, মানুষ হিসেবে অমি খুব সিরিয়াস, গভীর মনের মানুষ। জীবনের কোনও কিছুকে ওপর ওপর দেখতে পারি না। তাই আমার কাজে-কর্মে, গানে, মননে রবীন্দ্রনাথ আছেন, থাকবেন। ভেবেছি শুধু কবিগুরুর গান নিয়ে একটা অনুষ্ঠান করব।
তোমার বেড়ানোর শখ তো খুব?
বেড়াতে খুব ভালোবাসি। আর ভালবাসি শাড়ি-গয়না নিয়ে কাজ করতে। আমার 'প্রথা'য় প্রচুর এক্সক্লুসিভ শাড়ি থাকে। ব্যবসার থেকেও প্যাশনই আমার কাছে বড়। ভারতের নানান প্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে চলে যাই শাড়ির টানে।

তিরিশ বছর পূর্তি কীভাবে সেলিব্রেট করছ?
অবশ্যই আমার প্রিয় শ্রোতাদের সঙ্গে। আগামী ৩সেপ্টেম্বর সন্ধে সাড়ে ছ'টায় রবীন্দ্র সদনে আমার একক সঙ্গীতানুষ্ঠান- 'গান জীবন ৩০' তো শ্রোতাবন্ধুদের ভালবেসেই। দেখা হবে বন্ধুরা। এভাবেই যেন আরও তিরিশ বছর আপনাদের গান শোনাতে পারি।
শহরে অভিনব পথনাটিকা, নাচে-গানে তারুণ্যের গল্প শোনাল ‘লক্ষ্মী ছেলে’র দল