
গ্রাফিক্স- শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 21 February 2025 19:10
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বৈবাহিক সম্পর্কে বিশ্বাস করতেন। বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। বহুবার। সে কথা বারবার বলেওছিলেন প্রাণের মানুষটিকে। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। উনি স্বপ্ন দেখতেন, এক বিরাট সংসারের বড় বউ হওয়ার স্বপ্ন। বাড়ি ভর্তি লোক। গমগম করবে গোটা বাড়ি। চারপাশে ঝলমল করবে আলো। পুজোআচ্চা করে দিন কাটাবেন। এই স্বপ্ন দেখেই গেলেন সারা জীবন। সময় চলে গেল। আর সেই স্বপ্ন সত্যি হল না। আমি এই কথাগুলো ওঁর মুখ থেকে শুনেই ‘সত্যি সাবিত্রী’তে লিখেছি। আবার এও ঠিক সামাজিকভাবে অর্থাৎ মন্ত্র পড়ে বিবাহ না করলেও, বৈবাহিক জীবন তিনি কাটিয়েছেন। তাঁর প্রাণপুরুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন। এবং বিবাহিত স্ত্রীর মতোই নিজের কর্তব্য করে গিয়েছেন। অবিচল থেকেছেন। আমি অনেককে বলতে শুনেছি, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক সম্পর্কে ছিলেন। তা কিন্তু নয়। উনি যে দু’টো সম্পর্কে ছিলেন, দুটোই অন্তরঙ্গ। প্রথমজন, যাঁকে বাঙালি এক শব্দে চেনে। মহানায়ক। উত্তম কুমার। এবং দ্বিতীয়জন সর্বেন্দ্র সিং।
উত্তমবাবু ছিলেন বিবাহিত। সাবিত্রী জানতেন, এবং সে কারণেই কখনও তাঁর সংসার ভাঙার চেষ্টাটুকুও করেননি। এমন এক প্রেমের সম্পর্কের কারণে তিনি যে কত অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, তা হিসেবহীন। এ দ্বিতীয়জন ছিলেন সর্বেন্দ্র সিং। সাবিত্রীর মনে এতটাই পাকা ছিল এই সর্বেন্দ্রর জায়গা যে, তাঁকেই মনে-মনে ‘স্বামী’ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন সাবিত্রী। একসঙ্গে থেকেছেনও। কিন্তু কোথাও গিয়ে এই দুই পুরুষের একটা মিল রয়ে গিয়েছে। দু’জনেই ছিলেন বিবাহিত। কিন্তু দুই সম্পর্কেই তাঁর দায়িত্ববোধ ছিল। তিনি তা পালনও করেছেন। কিন্তু সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ভেঙে পড়েন যে সময়ে, তা হল সর্বেন্দ্রর মৃত্যুর পর। লিভার সিরোসিসে মৃত্যু হয় সর্বেন্দ্রর। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় সর্বেন্দ্রর ‘শেষ দেখা’ও হয়নি। আরও ভালভাবে লিখলে, দেখতে দেওয়া হয়নি। এটা সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে সবচেয়ে যন্ত্রণার অধ্যায়।
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় সারাজীবন ‘আদার উইমেন’ হয়েই থেকে গিয়েছেন। কিন্তু যখনই তিনি কোনও সম্পর্কে ছিলেন, নিজের সবটা দিয়ে থেকেছেন। তাতে নিষ্ঠা ছিল। ছিল ভালবাসা। আর তাতে ছিল দায়িত্ববোধ।
‘সত্যি সাবিত্রী’তে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় সর্বেন্দ্রকে নিয়ে লিখেছিলেন, “যতই বিনি সুতোর মালার সম্পর্ক হোক না কেন, তবু আমি তো মনেপ্রাণে ওঁকে আমার যত না বন্ধু ভাবি, তার থেকে অনেক বেশি ভাবি—উনি আমার স্বামী। সিঁথিতে না হয় নাই বা সিঁদুর ছোঁয়ানো হল, হাতে না হয় না-ই বা শাঁখা উঠল, না হয় সানাই বাজিয়ে বেনারসি আর ফুলে মালায় সেজে হাতে হাত রেখে বিয়ের মন্ত্র নাই বা উচ্চারণ করা হল, দু’টো হৃদয় কি আগেই তাদের আপন রঙে সাজেনি? দু’টো মন কি নীরবে-নিভৃতে বিবাহমন্ত্র উচ্চারণ করেনি? বাকি সবটুকু তো বাইরের…”
‘সত্যি সাবিত্রী’ অনুলিখন করেছিলেন লেখিকা, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক লীনা গঙ্গোপাধ্যায়, সাবিত্রীর জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে দ্য ওয়ালের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন আরও কিছু না-বলা কথা ...