
শেষ আপডেট: 12 April 2023 10:44
'এসো হে বৈশাখ, এসো এসো, তাপস নিঃশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে! বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক... যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি'...
রবিঠাকুর যাই লিখুন না কেন, যা কিছু পুরাতন সবই কি ফেলে দেওয়া যায়? নাকি ভুলে যাওয়া যায়? নববর্ষ মানেই পুরনোকে বিদায় করে নতুনকে স্বাগত, অতীতকে পার করে নতুন বছরে (Poyla Baisakh) প্রবেশ করার আনন্দ ও উচ্ছ্বাস। আর তাতে ফেলে আসা ছেলেবেলার স্মৃতি আজও জ্বলজ্বল করে অনেকের মনে। তেমনই একজন হলেন, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট গায়ক, পদ্মশ্রী কুমার শানু (Kumar Shanu)। স্মৃতির স্মরণী বেয়ে ফেলে আসা ছেলেবেলার পয়লা বৈশাখের দিনগুলিতে ফিরে গেলেন তিনি। শুনলেন চৈতালি দত্ত।

আমার শৈশব এবং বেড়ে ওঠা উত্তর কলকাতায়। তখন নববর্ষের যে উন্মাদনা, তার রেশ কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত। কারণ সেদিন স্কুল বন্ধ থাকত। ফলে ওই বয়সে সেটা ছিল বাড়তি উন্মাদনা। স্কুল ছুটির মজাটাই ছিল আলাদা। কবে পয়লা বৈশাখ আসবে, সেই অপেক্ষায় থাকতাম। সেদিন বাড়িতে বেশ ভাল খাওয়াদাওয়া হত। মায়ের হাতের লুচি, আলুর দম। আহা! কী স্বাদ, যেন আজও মুখে সেই গন্ধ লেগে আছে।

পয়লা বৈশাখের কয়েকদিন পরেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। ফলে কবিগুরুর জন্মদিনের যে উদযাপন, তা সেদিন থেকেই শুরু হয়ে যেত। চারপাশে যেন এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক বেষ্টনী তৈরি হত। সেই পরিমণ্ডল ছিল আলাদা। আমাদের পাড়ার ক্লাবে সেই দিনই রবি ঠাকুরের বড় ছবিতে মালা পরানো হত। যেহেতু ছোট ছিলাম, তাই সেই অনুষ্ঠানে আমরা এবং পাড়ার বন্ধু-বান্ধবরা অংশগ্রহণ করতাম।
তার অবশ্য আরেকটা কারণও ছিল। সেখানে জিলিপি বিতরণ করা হত। আর সেই জিলিপির লোভে বন্ধুদের সঙ্গে ছুট মারতাম। সে এক নির্মল আনন্দ। আজও মনে পড়লে ভাল লাগার স্পর্শে মন ভরে যায়। শুধু তাই নয়, গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণামও করতাম। এছাড়া সমবয়সি কিংবা অনুজ যাঁরা, তাদের 'উইশ' করতাম। যদিও তখন বাঙালিদের কথাবার্তার মধ্যে 'উইশ 'শব্দ শোনা যেত না। এখন তো হামেশাই শুনতে পাই। তখন আমরা একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাতে 'শুভ নববর্ষ' বলতাম। সকলের শুভ কামনা করতাম। সারাটা দিন হইচই এবং আনন্দ মজা করে কেটে যেত।
খুব মনে পড়ে, আমি তখন গান নিয়ে স্ট্রাগল করছি। সেই সময় নববর্ষের দিন কিংবা তার কয়েকদিন আগে আলমগীরের সুরে 'তিন কন্যা' নামে বাংলাদেশের ছবির গান আমি প্রথম ঊষাদির (ঊষা উত্থুপ) স্টুডিও ভাইব্রেশনে রেকর্ডিং করেছিলাম। গানের জন্য প্রথম রেকর্ডিং করা, সে যে কী আনন্দ, কী ভাল লাগা, তা আজও স্মৃতিতে অমলিন। রেকর্ডিং শেষে আমাদের টিমে যাঁরা ছিলেন, সবাই মিলে বাইরে বেরিয়ে খুব মজা করে খাওয়াদাওয়া করেছিলাম।

কিন্তু আজ পেশাগত কারণে বেশিরভাগ সময় দেশে-বিদেশে অনুষ্ঠান করতে হয়। এখন আমি পরিবারের সঙ্গে আমেরিকাতে থাকি। সেখানেই আমার বাড়ি। ভারতে থাকলে মুম্বইয়ের বাড়িতে থাকি। এই মুহূর্তে আমি আমেরিকাতেই আছি। ফলে পয়লা বৈশাখের যে উচ্ছ্বাস, উন্মাদনা সেটা তো বাইরে থাকলে বোঝা যায় না। কিন্তু তাতে কী। আমি বাঙালি হিসেবে নিজে গর্ববোধ করি। শেকড়কে আজও আমি ভুলিনি।

আমি কুমার শানু হওয়ার পরেও ছেলেবেলার বৈশাখের সেই গন্ধ আজও বয়ে বেড়াই। তবে এই ভেবেই মনে কষ্ট হয়, যে আজ বাঙালিরা নিউ ইয়ার অর্থাৎ ইংরেজি নববর্ষকে নিয়ে যতটা মাতামাতি করেন, এমন অনেক বাঙালি আছেন পয়লা বৈশাখ বাংলার কত সাল সেটাও কিন্তু বলতে পারেন না। এটা একজন বাঙালি হিসেবে বড় কষ্ট দেয়।
আমেরিকায় পয়লা বৈশাখের গন্ধ না পেলেও একজন বাঙালি হিসেবে পয়লা বৈশাখকে আজও আমি মিস করি।
সবাইকে বলি, নতুন বাংলা নববর্ষের অগ্রিম শুভেচ্ছা ভালবাসা। সবাই ভাল থাকবেন। নতুন বাংলা বছর সবার ভাল কাটুক।
কোন দোকানে কত বড় মিষ্টির প্যাকেট দেবে, তাই নিয়েই আলোচনা করতাম তিন ভাইবোন