
শেষ আপডেট: 22 May 2023 09:48
অতীত কি সত্যিই ফুরিয়ে যায়? আদৌ কি অতীতের কাছে ফিরতে পারে বর্তমান? সত্যি কি অর্ধেক বলে কিছু হয়? এমনই নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে ২ জুন মুক্তি পাবে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় (Kaushik Ganguly) পরিচালিত ছবি 'অর্ধাঙ্গিনী' (Ardhangini)।
একজন পুরুষের জীবনে কখন আসেন দু'টি নারী?
পরিস্থিতিটা খুবই অদ্ভুত। প্রতিটি নারী-পুরুষ তাঁদের মতো জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে এই পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারবেন। আমাদের একটা সাহিত্য কিংবা চলচ্চিত্র তখনই ভাল লাগে যখন নিজেদের সঙ্গে আমরা শনাক্ত করতে পারি এই ভেবে 'যদি আমার এরকম হত।' এই গল্পে ত্রিভুজ বলতে কিছু নেই। দুই মহিলা একে অপরকে চেনেও না। এই গল্পে অনন্যতা রয়েছে। আমরা অর্ধাঙ্গিনী বলি ঠিকই, তবে অর্ধেক হয় কিনা আমি জানিনা।

একজন বিবাহিত পুরুষের জীবনে আসা দুই নারী আদৌ কি অর্ধাঙ্গিনী হয়ে উঠতে পারে?
বাস্তবে একজন পুরুষের প্রাক্তন এবং একজন বর্তমান হয়। সেক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন জিনিসটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ধরে নিই অতীত চলে গেছে। কিন্তু কারোর জীবন থেকে অতীত চলে যায় না। অতীত আজীবন বেঁচে থাকে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের শরীরের মধ্যে। কাজেই যে প্রাক্তন স্ত্রী তার স্মৃতির ভাগ, কোনদিনই সে সংসার ছেড়ে গেলেও তার থেকে চলে যায় না। ফলে, দু'জন নারীর মধ্যে এটা অদ্ভুত নেগোসিয়েশন। সেটা কতটা সৌজন্য এবং আধুনিক মনস্কতা রেখে ডিল করা যায় সেটাই আমরা চেষ্টা করেছি। এই ছবিগুলো মানুষকে অন্যভাবে অনুপ্রাণিত করে। কেউ প্রথম পক্ষের পক্ষ নেবেন, আবার কেউ দ্বিতীয় পক্ষের পক্ষ নেবেন। কিন্তু পক্ষ নিতে বাধ্য থাকবেন।

এই ছবির মূল আকর্ষণ কী?
একজন স্বামী কোমায় আচ্ছন্ন অর্থাৎ তাঁর মস্তিষ্ক ঘুমিয়ে আছে। অথচ তাঁর যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সেটা তার বর্তমান স্ত্রী জানেন এবং তার অতীত স্পষ্টভাবে জানেন প্রাক্তন স্ত্রী। কাজেই একটা ঘুমিয়ে থাকা মস্তিষ্কের যে মেমোরি ব্যাংক অর্ধেকটা বর্তমান স্ত্রীর কাছে এবং অর্ধেকটা প্রাক্তন স্ত্রীর কাছে এখনও জেগে আছে। এই অর্ধেক অর্ধেক কে জুড়লে একটা মানুষ সম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যে ঘুমিয়ে আছে সেই মাথাটা সক্রিয় হতে পারে। সেইটাই এই অর্ধাঙ্গিনীর প্রধান আকর্ষণ।

আমরা যতই উদার হয়ে দুটো প্রবন্ধ বা কবিতা লিখি, প্রাক্তন এবং বর্তমান মুখোমুখি বসলে দারুন আনন্দদায়ক কিছু হতে পারে না। কারণ একজন অধিকার ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন বা অধিকার হারিয়েছেন, আর আরেকজনের হাতে সম্পূর্ণ অধিকার। একজনের হাতে আর আইন নেই, আর আরেকজন আইনত সে অধিকারের অধিকারী। ছবির পোস্টারে অর্ধাঙ্গিনীর মাঝে একটা ফাটল রয়েছে সেই ফাটল সিঁথির মতো। এই কারণে দুই নারীর সিঁথিতেই সিঁদুর রয়েছে। একজনের ছিল আরেকজনের আছে। এসব ভেবেই ছবিটা তৈরি করা। আশা করি দর্শকদের ভাল লাগবে।
তবে কি এই তিনজনের জীবন ঘটনা ক্রমে সমান্তরাল পথেই হাঁটবে?
এটার উত্তর এত সহজ ভাবে দেওয়া যাবে না। কারণ প্রাক্তন এবং বর্তমান চিরকাল সমান্তরাল থাকে। মাথায় রাখতে হবে ট্রেনের যে লাইন হয় চিরকালই সমান্তরাল চলে বলেই ট্রেনটা চলে। তলা দিয়ে ফিসপ্লেট গুলো বাধা থাকে। ওই কাঠগুলো না থাকলে দুটো সমান্তরাল থাকে না। সেগুলোর জন্যই কিন্তু ট্রেন সমান দূরত্বে চিরকাল নিরাপদে চলেছে। আর ওই 'বার' গুলোই হল মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ, জীবন দর্শন ,স্মৃতি ,ভালবাসা, মন্থন। সব এগুলো এক একেকটা কাঠের বারের মতো। তাই এগুলোর জোরেই কিন্তু দুটো লাইন সমান্তরাল ভাবে তাদের নিজস্ব গন্তব্যে পৌঁছে যায়। তাই জীবন চলছে ওপর দিয়ে।

যিনি প্রাক্তন তাঁর অধিকার চলে গেলে একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়, সেটা অন্য আরেকজনের পক্ষে আদৌ কী পূরণ করা সম্ভব ?
এটার একটাই সহজ উত্তর একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত অন্য একটা রবীন্দ্র সঙ্গীতকে প্রতিস্থাপন করা যায় না। সেই গানটাও সুন্দর এই গানটাও সুন্দর। কিন্তু গানের প্রেক্ষিত আলাদা। একই মেজাজের সুর হলেও ওই গানটাকে এই গানটা এসে কখনও প্রতিস্থাপন করতে পারে না। সেরকমই দু'জন সুরকার কিংবা দুজন অভিনেতা-অভিনেত্রী একে অপরকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
'প্রাক্তন স্ত্রী মহাজনের মতো। সে জানে সে তার ক্যাপিটালটা আর কোনও দিনই ফেরত পাবে না। সুদটা তো তোমাকে চুকিয়ে যেতেই হবে সারা জীবন…' বর্তমান স্ত্রীর উদ্দেশ্যে প্রাক্তনের মুখে এই সংলাপ মনে গভীর দাগ কেটেছে দর্শকের…
(কথা শেষ না হতেই) প্রাক্তন তো তার বর্তমান নয়। আপনার বিক্রি করে দেওয়া চেয়ারে কে বসবে আপনি জানেন না। সেই চেয়ারে আপনার আর কোনও অধিকার নেই। এই চেয়ারটার যে মালিক ছিল তার নাম খোদাই করা থাক বা না থাক আপনি কোনদিন তা অস্বীকার করতে পারবেন না। আর সেই স্মৃতিটাই হল সুদ, বর্তমান স্ত্রী যখন তার স্বামীকে আলিঙ্গন করছেন তখন বুঝবেন এক নারী এই আলিঙ্গন ছেড়ে গেছেন বলেই আপনি পারছেন। আপনার জীবনে যাবতীয় অভিজ্ঞতা, সুখ সমস্ত কিছু বারবার করে মনে করিয়ে দেবে যে একজন ছেড়ে গেছে এইসব সুখ, ভালবাসা, জীবন, যৌবন, যৌনতা সমস্ত কিছু। প্রতিটা পরতে একটা ছেড়ে যাওয়ার গল্প আছে। আমরা বিস্মৃত হতে পারি না সেটা মিথ্যা কথা।

অতীতের কাছে বর্তমান কি আদৌ ফিরতে পারে?
বর্তমান ফিরতে পারে না অতীতের কাছে। বর্তমান শেষ হয়ে যায় ভবিষ্যতের সাথে। বর্তমান সব থেকে ক্ষণজীবি। প্রতি সেকেন্ডে বর্তমান শেষ হয়ে যাচ্ছে।
একজন পুরুষের জীবনে অতীত এবং বর্তমানও কি নিক্তি মেপে সমান ভাগ করা যায়?
না যায় না। আসলে ওটা ভাগই করা যায় না। কারণ অতীত নিশ্চিত, ভবিষ্যৎ খুব অনিশ্চিত। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠলে মনে হবে একটা অতিরিক্ত দিন বেশি পেলাম। আমি সৌভাগ্যবান। আমার মতে নারী পুরুষের ক্ষেত্রে কিচ্ছু আলাদা হয় না। অর্ধেক বলে কিছু নেই।
ছবি মুক্তির আগে চরিত্রদের নাম প্রকাশে আপনি অনিচ্ছুক কেন?
এই মুহূর্তে ছবির কোনও চরিত্রের নাম আমরা প্রকাশ করছি না। নাম না রাখলে যে কোনও মানুষ সেই আসনে বসে। ফলে সে নিজে একটা আলাদা চরিত্র হয়ে যায়। ফলে সে কারণেই নামবিহীন রাখা। তবে ২ জুন ছবি মুক্তির সঙ্গে চরিত্রদের নাম,ঘটনা,পরিণতি সব প্রকাশিত হবে। এটা একটা পরিকল্পনা তো বটেই। খুব জোর করে করা তা ঠিক নয়, হয়ে গেছে ব্যাপারটা। নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি দর্শককে এই ঘটনাটা স্পর্শ করুক সেটাই আমাদের কাম্য।

'খাদ' ছবির পর আবারও লিলি চক্রবর্তীকে আপনার ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যাবে। ছবিতে ওঁনার চরিত্রটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
খুবই শক্তিশালী আধুনিক একটি চরিত্র। আর যে ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম তার মাঝখানে উনি তৃতীয় মহিলা। উনি কৌশিক সেনের মা। পুত্রের প্রাক্তন এবং বর্তমানের মাঝে যখন মা এসে পড়েন তাঁদের পরিস্থিতি কখনও ভাল হতে পারে না। তাঁরা কখনও সহজ হতে পারেন না। তাঁরা তো পুরনো দিনের মানুষ। কিন্তু বয়েস কি মানুষকে সেকেলে করে নাকি মানসিকতা? সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই ছবিতে। আমরা তো অনেক সময় ভাবি ওঁনার বয়স হয়ে গেছে নিশ্চয়ই ওঁনার এটা মনে হবে। সত্যি কি তাঁরা তাই ভাবছেন?
পরিচালক সত্তা নাকি অভিনয় সত্তা কোনটাকে আপনি এগিয়ে রাখবেন?
আমি এই দুটোর মধ্যে কাউকেই এগিয়ে রাখতে পারব না। যদি এগিয়ে রাখতে হয় সেক্ষেত্রে লেখক হিসেবে নিজেকে এগিয়ে রাখব। আমি তো সাহিত্য নির্ভর বা বায়োপিক ছবি তৈরি করিনি। আমি প্রায় ২৯ থেকে ৩০ টা ছবি তৈরি করেছি। ছবিগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ আমার গল্প। সেই গল্পগুলো তো আমি বই হিসাবেও প্রকাশ করতে পারতাম। কয়েকটা গল্প প্রথম শ্রেণির দৈনিকে আমি লিখেছিলাম। সেখান থেকে পরে ছবি তৈরি করেছি। আমি চলচ্চিত্রে নিজের মতো করে গল্প বলেছি যা আমার লেখা। কাজেই সেই লেখককে আমি খুব ভালবাসি যে আজকের সমাজের কথা বলতে চায়। আমি এই সময়ের গুরুত্ব বা দলিলটাকে হারাতে চাই না। আমি চাই এখনকার মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নথিভুক্ত করে রাখতে।

আপনি বায়োপিকের কথা বললেন, কখনও বায়োপিক তৈরি করার কথা মনে হয়নি?
আধুনিক সমাজের ছবিটা বায়োপিক বা একটা ক্লাসিক্যাল সাহিত্য করে হবে না। যদি আমার তাড়না আসে তবে নিশ্চয়ই কোনও একদিন কারোর বায়োপিক বানিয়ে ফেলতে পারি। স্বনামধন্য পরিচালক মৃণাল সেনের জন্ম শতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে আমি 'পালান' নামে একটা ছবি তৈরি করেছি। উনি যে জীবন দর্শন নিয়ে মধ্যবিত্তের ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন আমার কাছে ওই দর্শন টাকে সেলিব্রেট করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
'অর্ধাঙ্গিনী' ছবিতে কারা কারা অভিনয় করেছেন?
স্বর্গীয় অরুণ গুহ ঠাকুরতা, কৌশিক সেন, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, জয়া আহসান, অম্বরীশ ভট্টাচার্য, জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, রায়া ভট্টাচার্য, সৌমিত্র বসু ও আরও অনেকে।
ছবির কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। ক্যামেরার দায়িত্ব রয়েছেন গোপী ভগত। সম্পাদনা করেছেন শুভজিৎ সিংহ। অনুপম রায়ের সুরে গান গেয়েছেন ইমন চক্রবর্তী, অনুপম রায়,সাহানা বাজপেয়ী প্রমুখ। নিবেদনে সুরিন্দর সিং, নিশপাল সিং (রানে)। সুরিন্দর ফিল্মস প্রযোজিত এই ছবি।
কলকাতার বিয়েবাড়ি সাজাচ্ছেন কারা! ফ্লোরিস্টদের ঠিকানা থেকে খরচ, জেনে নিন বিয়ের মরশুমে