বলিউডে সিনেমা আর শুধুই শিল্প নয়। এখানে একেকটা প্রজেক্ট মানে অর্থ, ক্ষমতা, ইগো আর জনমত—সব কিছুর জটিল সমীকরণ। তাই যখন কোনও তারকা হঠাৎ করে ‘ক্রিয়েটিভ ডিফারেন্স’ বা ‘তারিখের সমস্যা’ দেখিয়ে ছবি ছেড়ে দেন, তখনই শুরু হয় এক অন্যরকম খেলা—যার নাম, ‘ন্যারেটিভ কন্ট্রোল।’

দীপিকা পাড়ুকোন-সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা
শেষ আপডেট: 27 May 2025 19:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বলিউডে সিনেমা আর শুধুই শিল্প নয়। এখানে একেকটা প্রজেক্ট মানে অর্থ, ক্ষমতা, ইগো আর জনমত—সব কিছুর জটিল সমীকরণ। তাই যখন কোনও তারকা হঠাৎ করে ‘ক্রিয়েটিভ ডিফারেন্স’ বা ‘তারিখের সমস্যা’ দেখিয়ে ছবি ছেড়ে দেন, তখনই শুরু হয় এক অন্যরকম খেলা—যার নাম, ‘ন্যারেটিভ কন্ট্রোল।’
সেই খেলার প্রথম চালই হল মুখে না বললেও একপাক্ষিক ‘লিকড স্টোরি’, অচেনা উৎসের ‘ব্লাইন্ড আইটেম’ আর ‘নিউজ’-এর ছদ্মবেশে চরিত্র হননের কৌশল। বাস্তবে যতটুকু গণ্ডগোল হয়েছিল, এই ধোঁয়াশাপূর্ণ গল্পগুলো তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে দেয়।
এই মুহূর্তে বলিউডের হট টপিক? পরিচালক সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা এবং অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোনের মধ্যকার তিক্ততা। যদিও সন্দীপ কোথাও দীপিকার নাম উল্লেখ করেননি, কিন্তু তাঁর সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে স্পষ্ট খোঁচা: একজন অভিনেতা নাকি তাঁর বিশ্বাস করে বলা সিনেমার গল্প ফাঁস করে দিয়েছেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর নতুন নায়িকা তৃপ্তি দিমরিকে হেয় করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ব্যঙ্গাত্মক প্রশ্ন, ‘এই কি তোমার ফেমিনিজম?’—যেটা শুধু পেশাগত অসদাচরণ নয়, বরং নৈতিক দ্বিচারিতা বলেও ইঙ্গিত করে।
অন্যদিকে দীপিকা, যিনি বলিউডের প্রথম সারির তারকা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সচেতনতা নিয়ে সরব, এখনও এই বিতর্কে কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি। কিন্তু মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য অজানা সূত্রের ভিত্তিতে দর্শকরা ইতিমধ্যেই দল বেঁধে ফেলেছেন—কারণ আসল উদ্দেশ্যই তো এই: ‘ক্ল্যারিফিকেশন’ নয়, ‘কনফ্রন্টেশন’-এর আগুনে ঘি ঢালা।
এই ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। বলিউডে বড় কোনও তারকা যদি কোনও ছবি থেকে সরে যান, তাহলে নির্মাতাদের একটা চাপ অনুভব হয়: সেই তারকাকে 'বিপজ্জনক', ‘ইনসিকিওর’ কিংবা ‘টেম্পারামেন্টাল’ প্রমাণ করে নিজেদের দায় মুছে ফেলা।
এই একই খেলা উদাহরণ, করণ জোহর এবং কঙ্গনা রাণাওয়াতের দ্বন্দ্বে। ‘কফি উইথ করণ’-এ কঙ্গনা যেদিন করণকে ‘নেপোটিজমের পতাকাবাহী’ বলেন, সে দিন থেকেই শুরু হয় তাঁর চরিত্র খণ্ডনের এক দীর্ঘ অধ্যায়—তাঁকে বলা হয় ‘ডিফিকাল্ট’, ‘ভাইরাল হওয়ার জন্য মুখর’।
কার্তিক আরিয়ানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ঠিক এমন চিত্র। ‘দোস্তানা ২’ থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হলেও কোনও অফিসিয়াল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, কিন্তু ‘সূত্র’ বলে দিল, তিনি নাকি ‘আনপ্রফেশনাল’। আর এতেই তৈরি হয়ে যায় একটা নেতিবাচক ইমেজ।
শ্রদ্ধা কাপুর যখন ‘নাগিন’ থেকে সরে দাঁড়ালেন, তখন হেডলাইন হল—‘ওর মধ্যে সেই এক্স-ফ্যাক্টরটা নেই।’
কিংবা করিনা কাপুর, যিনি ‘দেবদাস’ থেকে যখন বেরিয়ে আসেন, তখন তাঁকে ‘হাই-মেইনটেন্যান্স’ বলে গুজব ছড়ানো হয়।
সব ঘটনার প্যাটার্ন এক—প্রথমে বেরিয়ে যাওয়া তারকাকে কখনওই সম্মানের সঙ্গে যেতে দেওয়া হয় না। এই বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বলিউড এখনও পেশাদার মতভেদকে সম্মান করতে শেখেনি। একজন তারকা বা পরিচালক যদি কোনও প্রজেক্ট ছাড়েন, তাহলে বিষয়টি নিয়ে সম্মানের সঙ্গে নিরবতা বজায় রাখা উচিত—নয়ত এটি হয়ে দাঁড়ায় মানহানির খেলা।
এর সমাধান কী হতে পারে?
প্রথমত, বলিউডে একটা ‘কোড অফ সাইলেন্স’ থাকা দরকার—যা গোপনীয়তা নয়, বরং মর্যাদার কথা বলে। নির্মাতারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ না ঝাড়লে, অভিনেতারাও জানবেন তাঁদের সিদ্ধান্তকে নিয়ে স্ক্যান্ডাল হবে না। মিডিয়াও সাবধান হোক—‘সোর্স’-নির্ভর গল্পকে অফিসিয়াল বিবৃতির সমান গুরুত্ব দেওয়া চলবে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের দর্শকদের আরও সচেতন হওয়া উচিত।
যে কোনও বিতর্কে প্রশ্ন তোলার অভ্যাস হোক—‘এই লিক কার লাভের জন্য?’, ‘এই গল্পটা কার হয়ে বলা হচ্ছে?’ কারণ, পর্দার সিনেমা তো একটা—আসল ছবি চলছে এর বাইরেই।