
শেষ আপডেট: 8 July 2021 08:21
দিলীপ কুমার এমন এক লেজেন্ডারী অভিনেতা তাঁকে কে না চেনে। তাঁর উপস্থিতিতেই আলো হয়ে যায় চারিদিক। একটা ইন্টারভিউয়ের জন্য সাংবাদিকরা তাঁর পিছনে ছুটতে পারেন সারা জীবন। আবার তাঁর স্বর্ণাক্ষর অটোগ্রাফের জন্য লাখো লাখো দর্শক জীবনপাত করতে পারে। এই স্টারডম নিয়েই চিরকাল বেঁচেছেন দিলীপ কুমার।
কিন্তু এক অদ্ভুত ঘটনায় দিলীপ কুমারের স্টারডম তাঁর নিজের কাছেই ফিকে হয়ে গেছিল। স্টারডমের বাইরে আসল জীবনবোধ ও মনুষ্যত্বকে চিনতে পেরেছিলেন দিলীপ সাব।
বহু বছর আগে একবার দিলীপ কুমার বিমানে যাচ্ছিলেন। তখন দিলীপ কুমার তাঁর খ্যাতির শীর্ষে। এক্সিকিউটিভ ক্লাসেই যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আরও যাত্রীরা স্বভাবতই যাচ্ছিলেন বিমানে। সবার চোখ ততক্ষণে দিলীপ কুমারের দিকে। কিন্তু দিলীপ কুমার যে বৃদ্ধ ভদ্রলোকের পাশে বসলেন তিনি দিলীপ কুমারের দিকে তাকালেনও না।
সমস্ত যাত্রীরা রূপোলি পর্দার হিরোর কাছে আসতে চাইছেন কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছে না তাঁদের। এসব খ্যাতির বিড়ম্বনায় দিলীপ কুমার অভ্যস্ত। কিন্তু দিলীপ কুমার অবাক হয়ে যাচ্ছেন পাশের বৃদ্ধ ভদ্রলোককে দেখে যে তাঁর পাশে বসেও তাঁর স্টারডমকে তোয়াক্কা করছেন না। বৃদ্ধ ভদ্রলোকের পরনে প্যান্ট এবং খুব সাধারণ চেক শার্ট। বিমানযাত্রা শুরু হলে ভদ্রলোক একবার খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছেন আর একবার বাইরের জানলার দিকে দেখছেন। অবশ্যি একবার জল খেলেন, কিন্তু পাশের স্টার নায়ককে যেন আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই ভাবছেন সে।
দিলীপ কুমার ভদ্রলোকের শান্ত ব্যবহারে ক্রমশ অবাক হতে থাকলেন। এমন মানুষকে তিনি বহুবছর মিট করেননি যে তাঁকে চেনেনা।
ভদ্রলোক এবার চা খেলেন তবু খেয়াল করেও করলেন না পাশের হিরোকে, যার জন্য আসমুদ্রহিমাচল পাগল।
দিলীপ কুমারের কৌতুহল বেড়ে চলল এবং এবার নিজেই ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন চোখে চোখ রেখে। বৃদ্ধ ভদ্রলোক দিলীপ কুমারের দিকে তাকিয়ে বললেন "হ্যালো!"
দিলীপ কুমার নিজের পরিচয় বোঝাতে নিজের লাইনেই কথা পাড়লেন এবং বললেন "আপনি সিনেমা দেখেন?"
বৃদ্ধটি বললেন " হ্যাঁ খুব অল্প! তবে দীর্ঘকাল ফিল্ম দেখা হয়না।"
কথা প্রসঙ্গে দিলীপ কুমার বললেন তিনি ফিল্মে কাজ করেন।
ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন " বাহ! কি কাজ করেন আপনি ফিল্মে?"
দিলীপ কুমার "আমি ফিল্মের অভিনেতা। লোকে হিরো বলে।"
"বাহ! দারুণ" বৃদ্ধটি উত্তর দিলেন।এতকিছু খোলসা করে বলার পরও বৃদ্ধটিকে নিজের স্টারডম বোঝাতে পারলেননা দিলীপ কুমার। না পারলেন নিজেকে সে অর্থে চেনাতে। এমন মানুষ তো তিনি কোনকালেই দেখেননি। অবাক আরো হলেন দিলীপ সাব।
বিমানযাত্রায় তাঁদের কথোপকথন এখানেই শেষ হল। ফ্লাইটটি বিমানবন্দরে অবতরণ করলে সৌজন্যের খাতিরে, দিলীপ কুমার ভদ্রলোকের সাথে করমর্দন করলেন এবং শেষমেষ নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন "গুডবাই, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভালো লাগল। আমি হলাম দিলীপ কুমার।"
বৃদ্ধ ভদ্রলোক হাত মিলিয়ে উত্তরে নিজের পরিচয় বললেন "ধন্যবাদ, আমি জে আর ডি টাটা।"
আঁতকে উঠে নিজেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন দিলীপ কুমার। ভদ্রলোকের পরিচয় থমকে দিল তাঁকে।
[caption id="attachment_2324723" align="alignnone" width="337"]
জে আর ডি টাটা।"[/caption]
জে আর ডি টাটা যার পুরো নাম জাহাঙ্গীর রতনজী দাদাভাই টাটা। যিনি নিজেও একজন পাইলট এবং তিনি টাটা গ্রুপের অধীনে বিভিন্ন উদ্যোগ যেমন টাটা কনসাল্টটেন্সী সার্ভিসেস, টাটা মোটরস, টাইটেন ইন্ডাস্ট্রিজ, টাটা সল্ট, ভল্টাস, এবং এয়ার ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা। এত মানুষের অন্নদাতা ও একটি কিংবদন্তি প্রতিষ্ঠান তিনি।
তাঁর অবদানের জন্য ফ্রেঞ্চ সরকার তাঁকে ১৯৮৩ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান 'লেজিয়ন অব অনর' প্রদান করে। ভারত সরকার ভারতীয় উদ্যোগ জগতে তাঁর অগ্রণী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৫৫ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ এবং ১৯৯২ সালে দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করে।
যে প্লেনটিতে করে দিলীপ কুমার সেদিন যাচ্ছিলেন তাঁর মালিকও এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক। ভারতীয় বিমানচালনার পথিকৃৎ জে. আর. ডি. টাটা ছিলেন ভারতের প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিমানচালক। তিনিই ভারতের প্রথম বিমান চলাচলের পথ তৈরি করেন।
জীবনের শেষদিন অবধি যে ঘটনা মনে রেখেছিলেন দিলীপ কুমার এবং এই ঘটনার কথা তাঁর আত্মজীবনীতেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
দিলীপ কুমার বলেছিলেন "তুমি কত বড় মানুষ, কত বড় স্টার, কত বড় ধনী সেটা মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়াই তোমার জীবনদর্শন হতে পারেনা। কারণ তোমার থেকেও কেউ বড় মানুষ আছেন পৃথিবীতে। যা আমি জীবন থেকে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েছিলাম। তাই সর্বদা নম্র হতে হবে। শিখরে উঠলেও সাধারণ থেকে মাটিতে পা রেখে চলতে হবে জীবনে। নম্রতা শেখো, যা জীবনে অমূল্য।"