
শেষ আপডেট: 17 January 2024 19:13
সকাল সাড়ে দশটার সময়েও গা ছমছম করছে। একেবারে শুনশান সবকিছু। দূরে অ্যালকেলি মাঠে ফুটবল খেলছে কয়েকজন বাচ্চা ছেলে। গাছগাছালিতে ঘেরা পরিবেশে বড় অশ্বথগাছটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাগানের ভেতর একটা বাড়ি ধ্বংসস্তূপ হয়ে অতীতের স্মৃতি বয়ে চলেছে।
কোন্নগর স্টেশনের পূর্ব প্রান্ত দিয়ে রিষড়ার দিকে গিয়ে গিয়ে ধর্মডাঙা কোথায় বললেই লোকজন কেমন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। যেন মনে হয় সকাল সকাল তাঁদের নিমপাতা খেতে বলা হয়েছে।
ধর্মডাঙা অঞ্চল বললেই কোন্নগর-রিষড়ার বাসিন্দাদের একজনের নামই মাথায় আসে, হুব্বা শ্যামল। আসল নাম শ্যামল দাস। একসময়ের ত্রাস, যাকে নিয়ে সম্প্রতি ব্রাত্য বসু হুব্বা নামে একটা বায়োপিকও করেছেন। ভাল করে নজর করছিলাম ওই সিনেমার কোনও পোস্টার ধর্মডাঙা অঞ্চলে রয়েছে কিনা। পাওয়া যায়নি। অনেকে বলছেন, এর কারণ হয়তো একটাই। হুব্বা শ্যামল মরে গিয়েও বেঁচে রয়েছেন! তাঁর ত্রাসের অভিঘাত এখনও এতটাই গভীর যে শ্যামল দাসের নাম বলতে গিয়েও অঞ্চলের মানুষ আশপাশ দেখে কথা বলেন। যেন তাঁদের মনে হয় পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন হুব্বা!
হুব্বার পাড়ারই একজন রমেশবাবু (নাম পরিবর্তিত) এদিন বলছিলেন, ‘দেখুন, হুব্বা চলে গেছে, অনেকেই হয়তো বেঁচে গেছে। কিন্তু মনে রাখবেন এসব মানুষরা মরে গেলেও তাদের দলগুলো সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো। জ্বালামুখ নেভে না, ঘুমিয়ে থাকে। আমার তো মনে হয় ওর দলের শাগরেদরাও তাই। আবার কোনওসময়ে হয়তো জীবন্ত হয়ে উঠবে। ভরসা কী বলুন!’
বলার সময়ে রমেশও আশেপাশে দেখে কথা বলছিলেন। যেন তাঁরও আতঙ্ক, দূরে দাঁড়িয়ে হয়তো হুব্বার কোনও শাগরেদ শুনছে। কোনও ‘অপরাধী’ সমাজবিরোধী মরে গিয়েও তার অস্তিত্ব এমনভাবে বেঁচে থাকতে পারে, সেটি ওই পাড়ায় না গেলে বোঝাই যেত না।
চটকলের যে চায়ের দোকানে হুব্বা প্রতিদিন সন্ধ্যায় চা খেতে আসতেন, সেই বুড়ি মা এখনও দোকানের মালকিন। নাতিরা দোকানে বসলেও বুড়ি মা পাশেই মাথা নিচু করে বসে থাকেন। শীতের সকালে সর্বাঙ্গ ঢাকা। কোনওক্রমে মাফলার থেকে মুখটা বের করে বললেন, ‘হুব্বা অপরাধী হতে পারে, তার সাজা সে ভগবানের কাছে পেয়েছে। কিন্তু ওর মনটা ভাল ছিল। আমাদের পাড়ার বহু মেয়ের ওর জন্য বিয়ে হয়েছে।’
দোকানেই বসে চা খাচ্ছিলেন ষাটোর্ধ্ব সুরজ শর্মা। সুরজ বিহার থেকে কাজের সূত্রে এসেছিলেন। এখানেই থেকে গেছেন। তিনিও বললেন, ‘হুব্বাকে আমি বহুবার দেখেছি, ওর সঙ্গে হয়তো কথা হয়নি। কিন্তু এটা শুনেছি বহু কন্যাদায়গস্ত বাবাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।’
হুব্বার পড়াশোনা বেশিদূর নয়। তাঁর বাবা দিনমজুরি করতেন। ধর্মডাঙায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন। আশির দশকের গোড়ায় হুব্বার কাজ চলে যায়। অপরাধে তখনই হাতেখড়ি শ্যামল দাসের। শুরুতে ছিঁচকে চুরি আর ছিনতাই। তারপর ডাকাতি। আগুপিছু না ভেবে অপরাধে জড়িয়ে পড়তেন শ্যামল, তাই তাঁর নাম হয়ে যায় হুব্বা। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে হুব্বা নামেই এলাকায় আতঙ্ক হয়ে ওঠেন শ্যামল।
বন্ধ কারখানার মাল লুঠ করা ছিল তাঁর কাজ। কাজের জন্য দলও তৈরি করে ফেলেছিলেন। তারপর সেই সব কারখানা ফাঁকা হয়ে গেলে প্রোমোটারি এবং জমির দালালি শুরু করেছিলেন। হুব্বার ‘মস্তানি’ হুগলির সীমান্ত ছাড়িয়ে পাশের জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। কয়েক’শ ছেলে ছিল তাঁর দলে। মাস মাইনে দিয়ে তাদের রাখতেন হুব্বা।
শুধু তাদের কাছে নয়, দিন আনা-দিন খাওয়া, অভাবী মানুষের কাছে সে ছিল ভগবান। কিন্তু ধনী, বিত্তশালীদের কাছে ত্রাস। কোন্নগরে একটা কথা চালু রয়েছে, একটা সময়ে এই শহরের একটা ইটও পোঁতা যেত না যদি না হুব্বা অনুমতি দিতেন! প্রোমোটারদের থেকে টাকা দাবি করতেন। যাঁরা ভাল কথায় দিতেন না, তাঁদের হুমকি দিয়ে ছুরি দেখিয়ে টাকা আদায় করা হতো।
ক্ষমতারও একটা লোভ থাকে। যে যত ক্ষমতা ভোগ করে, সে আরও চায় সেটাকে বাড়ানোর জন্য। হুবার সেটাই হয়েছিল। তিনি শেষদিকে নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করতে পারতেন না। তাঁর শাগরেদরাই যে তাঁকে খুন করতে পারে, সেটি আন্দাজও করতে পেরেছিলেন। সেই কারণেই নিজের স্ত্রী ছাড়া আর কাউকে বলতেন না রাতে কোন বাড়িতে থাকবেন!
ওই অঞ্চলেই হুব্বার তিনটি বাড়ি ছিল। সেই বাড়িগুলি থাকলেও তার মালিকানা বদল হয়েছে। সন্তান-পরিজন থাকলেও তারা সমাজে সেইভাবে সম্মান পায় না। অঞ্চলে গিয়ে জানা গিয়েছে, কয়েকদিন ধরে হুব্বার পরিবার ধর্মডাঙা অঞ্চলে নেই। হুব্বার ছেলে একজন প্রোমোটারের অধীনে ঠিকাদারির কাজ করত। তাঁরও খোঁজ মিলল না।
২০১১ সালে খুন হয়ে যান হুব্বা। চার দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন শ্যামল। চার দিন পর বৈদ্যবাটি খালে তাঁর পচাগলা দেহ পাওয়া যায়। গলার নলি কাটা, নাভির উপর থেকে শ্যামলের পেট লম্বালম্বি ভাবে চেরা। যাকে হুব্বাই নাম দিয়েছিল ‘পৈতে কাট’।
পুলিশের সন্দেহ ছিল এক সময়ে হুব্বার ডান হাত এক অবাঙালি সমাজবিরোধীই তাঁকে খুন করেছে। সেই সঙ্গে আরও একজন ছিল তাঁর সঙ্গে। তারা তিন জনে মিলে হুব্বাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করে। তারপর বৈদ্যবাটি খালে ফেলে রেখে যায়।
হুব্বা ঠিক এভাবেই খুন করত। কতগুলো করেছিল তার একটা পুলিশি হিসেব আছে বটে, তবে ধর্মডাঙার অনেকে বলেন, কোনও হিসেব নেই। হুব্বার জীবনের মতই তাঁর খুনের কিসসাও বেহিসেবি!