Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

বাঙালির রুচি যেন বদলে দেওয়া হয়েছে! পুজোর জলসা দেখে কষ্ট লাগে এখন: অরিন্দম

বাঙালির রুচি যেন বদলে দেওয়া হয়েছে! পুজোর জলসা দেখে কষ্ট লাগে এখন: অরিন্দম

শেষ আপডেট: 16 October 2023 22:22

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

পুজো মানেই পূজাবার্ষিকী, পুজোর গান, পুজোর ছবি, পুজোর আড্ডা। এসব জিনিস প্রতিবারই পুজোর সময় আলোচনায় থাকে। কিন্তু পুজোয় বঙ্গজীবন থেকে যা হারিয়ে গেছে তা হল পুজোর জলসা। রুচিশীল ফাংশন আর সমঝদার শ্রোতা যেন এ যুগে একেবারেই গায়েব। হারিয়ে যাওয়া সোনাঝরা দিনের কাহিনি আর নিজের ছেলেবেলার দুর্গাপুজোর গল্প শোনালেন গায়ক-নায়ক-পরিচালক অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে সেসব নিয়ে গল্প করলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। 

শুভদীপ- ছোটবেলার পুজো বললেই প্রথমে কী মনে পড়ে? 

অরিন্দম- পুজো এলেই আমি নস্ট্যালজিক হয়ে পড়ি। আমি আদতে উত্তর কলকাতার ছেলে। যদিও পরে আমরা দক্ষিণ কলকাতায় চলে আসি। উত্তরে ছোটবেলায় আমার বাড়ির পাশেই ছিল জগৎ মুখার্জী পার্ক। ইদানীং জগৎ মুখার্জী পার্কের পুজো খুব নাম করেছে। এখানেই প্রথম আমার পুজোর প্রতি ভালবাসার শুরু। আমার ছোটবেলা মানে বহু বছর আগের কথা। ওই সময় জগৎ মুখার্জী পার্কে 'আর্টের' ঠাকুর হত। ঠাকুর তৈরি করতেন চিত্রকর অশোক বসু। সেই ঠাকুর সারা কলকাতার ঠাকুরের থেকে একদমই আলাদা ছিল।

এক এক বছর এক এক থিমের ঠাকুর হত। থিম পুজোর চল তখন একেবারেই হয়নি। থিম কী জিনিস, লোকে জানত না। কিন্তু এই থিমের আত্মপ্রকাশ ঘটে জগৎ মুখার্জী পার্কের মতো কিছু পুজোতেই। উত্তর কলকাতায় একমাত্র এখানেই আর্টের ঠাকুর দেখেছিলাম সেসময়। ঠাকুর তৈরি হত পার্ক থেকে অনতিদূরে একটা রাজবাড়ির মতো জায়গায়। যেতে-আসতে আমি ঠাকুর বানানো দেখতাম, আর পুজোর আমেজ আমার ভিতর চলে আসত ভরপুর। 

মনে পড়ে, পুজোর জামা কিনতে গিয়ে বাবা অনাদির মোগলাই আর রেলিসের কুলফি খাওয়াতেন আমাদের তিন ভাইবোনকে। এক বছর মনে আছে, বাবা বেশি বোনাস পাননি বলে আমাদের পুজোর জামাকাপড় হয়নি। কিন্তু আমার এক মাসতুতো দাদা আমার জন্য হলুদ রঙের নতুন হাফহাতা শার্ট কিনে এনেছিল। আমার চোখে এখনও ভাসে সেই হলুদ হাফ শার্টটা। অভাব সত্ত্বেও কখনও আমাদের পুজোর আনন্দ মলিন হয়নি। 

বলতে গিয়েই আমি নস্টালজিক হয়ে পড়ছি। কালীপুজোয় পটকা ফাটত আর দুর্গাপুজোয় ক্যাপ ফাটত। শৈশবের অনেক কিছু আমরা এ যুগে হারিয়ে ফেলছি। কিন্তু জীবনে এগুলোর দরকারও পড়ে। পুজো তো অনেক দেবদেবীর হয়। কিন্তু দুর্গাপুজোকেই একমাত্র শুধু পুজো বলা হয়। পুজো মানে সর্বধর্মসমন্বয়। আজও যখন মানুষগুলো এক প্যান্ডেল থেকে হেঁটে হেঁটে অন্য প্যান্ডেলে যান, মানুষের সেই স্রোত দেখতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। আর খারাপ লাগে বিসর্জনের পর ফাঁকা প্যান্ডেল। তাই পুজোর সময় কলকাতার বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না। বেড়িয়ে ফেরার সময় ওই ভাঙা প্যান্ডেল দেখতে ভাল লাগে না। 

শুভদীপ - ছোটবেলার পুজোর কোনও স্মরণীয় ঘটনা আছে?

অরিন্দম- জগৎ মুখার্জী পার্কে যেখানে পুজো হয়, সেখানে পাশে একটা গাড়ি বারান্দা মতো ছিল। এখনও আছে সম্ভবত। সেখানে মাইকে ঘোষণা হত, পুজোর গান বাজত। বড়রা যাঁরা ঘোষনা করতেন তাঁদের পেছনে আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম, কখন আমায় একটু সুযোগ দেবেন। আমি সুযোগ পেলেই অ্যানাউন্স করতাম "আপনারা মণ্ডপে চলে আসুন, এখনই অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি শুরু হচ্ছে'- এসব বলতাম। মাঝেমধ্যে একটু দু লাইন গানও গেয়ে দিতাম মাইকে। হয়তো এগুলোই আমার বিনোদন জগতে আসার সূত্রপাত ছিল।

জগৎ মুখার্জী পার্কের বিসর্জনও অভিনব ছিল। ছেলেরা সাদা পাযজামা-পাঞ্জাবি পরত, আর মেয়েরা লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে পুরো রাস্তা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে গাইতে যেত। এই সংস্কৃতি আর ফিরবে না সমাজে। পুজোর সময় সবেতেই ছাড়। তখন আলু কাবলি, হজমি আর রাস্তার গাড়ির আইসক্রিম আমরা ছোটরা খেতামই খেতাম।

এরপর আমরা দক্ষিণ কলকাতায় চলে আসি। ফিল্ম জগতে শিশু অভিনেতা রূপে যোগদান করি। তার কিছু বছর পর তো হংসরাজ করে আমি রীতিমতো স্টার। কিন্তু নামডাক হবার পর আর কখনও জগৎ মুখার্জী পার্কের পুজোতে যাওয়া হয়নি। কখনও গাড়ি করে যেতে যেতে পার্কটা রাস্তায় পড়লে আমি চেয়ে থাকি। 

শুভদীপ- যৌবনে পা দেওয়ার পর পুজোর দিনগুলো কেমন কাটত?

অরিন্দম- তখন একটা আমাদের ঠাকুর দেখার টিম ছিল। বেশিরভাগ সময় শতাব্দী (রায়) আমার আর আমার বোনেদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোত। কোনও কোনওবার দেবশ্রী(রায়) ওর দিদি ঝুমকিকে নিয়েও আমাদের সঙ্গে বেরোত। তবে শতাব্দীর সঙ্গেই বেশি বেরনো হত। তখন শতাব্দী একডালিয়া এভারগ্রিনের কাছে থাকত। আশির দশকে তখন শতাব্দী জনপ্রিয় নায়িকা, সবে গুরুদক্ষিণা, একান্ত আপন রিলিজ করেছে। ওকে সেই একডালিয়ার ভিড় বাঁচিয়ে নিয়ে আসা হত। 

ছোটবেলায় অরিন্দম ও দেবশ্রী

একবার পুজোয় শতাব্দীর জন্মদিন পড়ল। আমরা সবাই রাত বারোটার সময় ফুলবাগানের একটা চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে ঢুকলাম শতাব্দীর জন্মদিন উদযাপন করতে। কিন্তু আমাদের চেঁচামেচিতে রেস্টুরেন্টের মালিক আমাদের বের করে দিয়েছিলেন। সে ভারী মজার কাণ্ড! সারা রাত ধরে ঠাকুর দেখার সেই দিনগুলো মিস করি। এখন তো সেভাবে ঠাকুর দেখা হয় না। তবে বিচারক হয়ে গেলে কিছু ভাল পুজো দেখা হয়। 

শুভদীপ - ষাট-সত্তরের দশকে পুজোর সময় বা পুজোর পর থেকেই কলকাতা মেতে উঠত নানা জলসায়। সেসব জলসায় শিশুশিল্পী হিসেবে তো মাস্টার অরিন্দম বিশাল স্টার?

অরিন্দম-  পুজোর জলসা তো প্রচুর করেছি। পুজো প্যান্ডেলেও প্রচুর গান গেয়েছি। বিজয়ার পর পরপর জলসা হত শীতকাল জুড়ে। তাতেও ছোট থেকে প্রচুর গান গেয়েছি। তখন যে জলসা হত তার বৈশিষ্ট্যই আলাদা। আগেকার বাংলা গানের শ্রোতারাও ছিল সমঝদার আর আমাদের সাংস্কৃতিক রুচিও অনেক উন্নত ছিল। জলসাতে তখন কোনও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিলই না। সময়টাই দারুণ ছিল। শুধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় নন। তারপরেও যাঁরা ছিলেন, যেমন তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্ত, পিন্টু ভট্টাচার্য- এঁদেরও অজস্র গান হিট। পাড়ায় পাড়ায় জমাটি জলসা হত। এঁদের সঙ্গে সেখানে মাষ্টার অরিন্দম নামটাও থাকত। 

এসব শিল্পীরা ছাড়াও কিছু শিল্পী ছিলেন যাঁরা এক্সক্লুসিভ জলসা আর্টিস্ট ছিলেন। তাঁদের কথা এ যুগে বিস্মৃতপ্রায়। মহম্মদ রফির হিন্দি গান তখন সব জলসায় গাইতেন পি রাজ। লতা মঙ্গেশকরের গান গাইতেন মীনা মুখোপাধ্যায়, উনি তো প্রচুর প্রোগাম করতেন। মাদার ছবিতে মীনা মুখোপাধ্যায় আমার লিপে গান গেয়েওছিলেন। তারপর রত্না-দেবাশিস নামে দুই ভাইবোনের গানের জুটি খুব জনপ্রিয় হল। গৌতম ঘোষ গাইতেন কিশোর কুমারের গান।

জলসা অর্গানাইজার তোচন ঘোষের সঙ্গে অরিন্দম ও তাঁর মা

তখন প্রতি জলসায় একজন করে প্যারোডি আর্টিস্ট থাকতেন। সেই প্যারোডি বাংলা গান এখন উঠেই গেছে। বাংলা প্যারোডি গানের কিং মিন্টু দাশগুপ্ত তো বিখ্যাত। দুই বেচারা আর দীপেন মুখোপাধ্যায়ের প্যারোডি গানও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল সেসময়। এসব নামগুলো আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে মানুষকে জানাতে বলা প্রয়োজন। দীপেন মুখোপাধ্যায়ের লেটার হেডটা খুব মজার ছিল। দী, তারপর একটা পেনের ছবি। তারপর মুখার্জী। আর ছিল হরবোলা। হরবোলা হিসেবে প্রচন্ড নাম করেছিলেন সাধন-অনুপ। ফাংশনে হাস্যকৌতুকে কিং ছিলেন জহর রায়। নৃপতি চট্টোপাধ্যায় ও শীতল বন্দ্যোপাধ্যায় দুজনেও আসর মাতিয়ে দিতেন। 

যেমন শিল্পীরা, তেমন শ্রোতা, তেমনই সব ফাংশন হত।

শুভদীপ - এত বড় বড় নামের মাঝেও মাষ্টার অরিন্দমকে দেখতে শ্রোতাদের আকর্ষণ তো কম ছিল না?

অরিন্দম - ভীষণ আকর্ষণ ছিল। আরও কারণ ছিল, আমি ছোট্ট ছেলে হয়েও সেসময় সব ফাংশানে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে গান গাইতাম। আমার আইকনিক ড্রেস কোড বিখ্যাত হয়ে গেছিল। আর আমার গানের সঙ্গে আমার মা সঙ্গীতশিল্পী অনুভা গঙ্গোপাধ্যায় সব ফাংশানে হারমোনিয়াম বাজাতেন। তবে শুধু আমি নয়, সেসময় সব বড় তারকা ফাংশানে মাষ্টার অরিন্দমের সঙ্গে থাকত রুমকি-ঝুমকি জুটির নাচ। দেবশ্রী রায় ছিলেন রুমকি। আর দেবশ্রীর দিদি ঝুমকি। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বেরোত। সব বড় বড় শিল্পীদের নামের পরে লোকগীতিতে মাষ্টার অরিন্দম আর নৃত্যে রুমকি-ঝুমকি। আসলে আমরা ছোট ছিলাম বলে লোকের আকর্ষণ বেশি থাকত। 

এখন মাষ্টার অরিন্দম আর রুমকি(দেবশ্রী রায়)-ঝুমকি জুটি। সঙ্গে অরিন্দমের মা ও বোন।

শুভদীপ - এখনকার জলসার রূপ বদল নিয়ে কী বলবেন?

অরিন্দম- কী বলব! ভাবা যায় না কতটা খারাপ। দেখে কষ্ট লাগে। কী ছিল, আর কী হয়েছে। মানুষের রুচি যেন বদল করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষিত দর্শকের জন্য পাড়ায় পাড়ায় আর জলসা হয় না। আগে কিন্তু হিন্দি গান খুব কম হত এসব জলসায়। নির্মল বাংলা গানের জলসা হত। জলসার এত গল্প আজ ইতিহাস। তখনকার দর্শক শিল্পীদের সম্মান দিতেন। একবার আমার আগে জলসায় গান গাইছেন স্বয়ং কিশোর কুমার। আমি ভাবলাম আমার গান আর কে শুনবে! কিন্তু অবাক কাণ্ড, আমি কিশোর কুমারের পর মঞ্চে উঠে যেই লোকগান ধরলাম হিন্দি গানের পরেই, একজন দর্শকও আসন ছাড়লেন না। পরের পর অনুরোধ আসতে শুরু করল। 


```