
শেষ আপডেট: 28 August 2021 02:36

"ছোট্ট আমার মেয়ে সঙ্গিনীদের ডাক শুনতে পেয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচের তলায় যাচ্ছিল সে নেমে অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে থেমে থেমে। হাতে ছিল প্রদীপখানি, আঁচল দিয়ে আড়াল ক’রে চলছিল সাবধানী।
আমি ছিলাম ছাতে তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে। হঠাৎ মেয়ের কান্না শুনে, উঠে দেখতে গেলেম ছুটে। সিঁড়ির মধ্যে যেতে যেতে প্রদীপটা তার নিবে গেছে বাতাসেতে। শুধাই তারে, “কী হয়েছে, বামী।” সে কেঁদে কয় নিচে থেকে, “হারিয়ে গেছি আমি।”
মেয়েকে খোঁজার কবিতা। লিখেছিলেন রবি ঠাকুর। আর সেই কবিতাই ঋতুপর্ণ ঘোষ ব্যবহার করলেন তাঁর 'অসুখ' ছবিতে। কবিতাপাঠে আবহ-কণ্ঠে স্বয়ং অপর্ণা সেন। 'আরেকটি প্রেমের গল্প'র 'অভিরূপ', মেমোরিজ ইন মার্চ'-এর 'অর্ণব' বা চিত্রাঙ্গদা'র 'খোকন' নয়! অসুখে'র 'রোহিণী'ই আসল ঋতুপর্ণ... আর ঋতু তাঁর নিজের মাকেই এঁকেছিল 'অসুখ'-এ রোহিণীর মায়ের রোলে। রোহিণীর নামভূমিকায় দেবশ্রী রায়।
রোহিণী দেবশ্রীর মতোই ব্যস্ত খ্যাতনামা সুপারস্টার নায়িকা। 'শিল্পের জন্যই শিল্পী শুধু, এছাড়া নেই যে তার অন্য জীবন।' যা সত্যি নায়িকা রোহিণীর জীবনে। শ্যুটিং কলকাতার বাইরে বহুদূরে, তবু সবটুকু মন পড়ে থাকে বাড়িতে বৃদ্ধ পিতা ও অসুস্থ মায়ের জন্য। রোহিণীর বাবার চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর মায়ের চরিত্রে গৌরী ঘোষ।
পার্থ ঘোষ-গৌরী ঘোষ শুধু বাচিকশিল্পী দম্পতি রূপেই নয়, গৌরী ঘোষ কিন্তু কয়েকটি বেশ চর্চিত ছবিতে অভিনয় করেছেন। ১৯৮৫ সালে অপর্ণা সেনের 'পরমা'-তে 'পরমা' রাখি গুলজারের বান্ধবীর ছোট্ট রোলে। তারপর ১৯৯০ সালে নবেন্দ্যু চট্টোপাধ্যায়ের 'আত্মজ' ছবিতে প্রধান চরিত্রে গৌরী ঘোষ অভিনয় করেন। ১৯৯৯ সাল ঋতুপর্ণ ঘোষের সবথেকে অনালোচিত অথচ শ্রেষ্ঠ ছবি 'অসুখ'-এ মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করলেন গৌরী ঘোষ।
ঋতুপর্ণর প্রথম ছবি 'হিরের আংটি' কোনওদিনই হল-রিলিজের মুখ দেখেনি।
ঋতুপর্ণ ততদিনে 'উনিশে এপ্রিল', 'দহন'- পরপর দুটি ছবি করে জাতীয় পুরস্কার থেকে বক্সঅফিসে সেরা পরিচালকের আসনে বসেছেন। দেবশ্রী রায়, ইন্দ্রাণী হালদার, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তরা ঋতুপর্ণর ছবিতে কাজ করে পেয়েছেন সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার। এরপর ১৯৯৯ সালে এল ঋতুপর্ণর 'অসুখ'। যদিও ঋতুপর্ণর আগের দুটি ছবির মতো 'অসুখ' মানুষের কাছে পৌঁছয়নি। কিন্তু সমঝদার দর্শকদের কাছে প্রিয় ছবি 'অসুখ'।
'অসুখ'-এর চিত্রনাট্যের ভাবনা কীভাবে মাথায় এসেছিল ঋতুপর্ণর!
ঋতুর অভিন্নহৃদয় বন্ধু ও ঋতুর দশটি সেরা ছবির সহযোগী পরিচালক শৌভিক মিত্র জানালেন সেসব গল্প। যার অবদান ঋতুপর্ণর ছবির অনেকটা জুড়ে। শৌভিক মিত্র পরে নিজেও স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে 'পুনশ্চ', 'কার্জনের কলম'-এর মতো ছবি বানিয়েছেন।
[caption id="attachment_2349680" align="aligncenter" width="600"]
শৌভিক মিত্র[/caption]
শৌভিক মিত্র জানালেন "ঋতুপর্ণ যখন আমার বন্ধু তখন ঋতু ঋতুপর্ণ হয়নি। দূরদর্শনে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। 'টেলিস্কোপ' বলে একটা অনুষ্ঠান করত ঋতু। যাদবপুর কফি হাউসের তলায় বেঞ্চিতে বসে রোজ আমরা রাত দশটা এগারোটা অব্দি আড্ডা মারতাম। ওখান থেকেই উৎপত্তি 'হিরের আংটি' আমাদের প্রথম ফিচার ফিল্ম। এরপর 'উনিশে এপ্রিল', 'দহন'।
অসুখ' তৈরির গোড়ার গল্প শৌভিক শোনালেন, "ঋতুপর্ণ মেয়েদের মন পড়তে পারত ভাল এবং ওর ছবির অভিনেত্রীদের ঋতু অভিনয় করে দেখাত। তাই জন্যে ঋতুর সব কটি ছবি খেয়াল করলে দেখা যায় সব ছবির অভিনেত্রীরা সবাই একভাবে কাঁদেন। 'বাড়িওয়ালি'র কিরণ খের বা 'দোসর'-এর কঙ্কনা, যেই হন। আদতে সে ঋতুই। আসলে ঋতুও অভিমানে দুঃখে একইভাবে কাঁদত। ঋতু কাঁদলে মুঠো করে হাতটা সামনে চলে আসত।
'অসুখ'-এর স্ক্রিপ্ট কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি লেখা। 'দহন'-এর পরেই। তখন ঋতুর কাছে ডি. রামা নাইডু নামে এক প্রযোজক এলেন হায়দ্রাবাদ থেকে এবং তিনি বললেন একটি বাংলা ছবি করবেন। আসলে সেই প্রযোজক তখন ভারতবর্ষের সব ভাষায় ছবি করার বিশ্বরের্কড করে ফেলেছেন। তাই বাংলাতেও একটা ছবি করতে চান। তখন ঋতুর ভাবনায় কোনও গল্প ছিলনা। সেসময় ঋতু নিজের চেনা চরিত্রদের নিয়েই একটা গল্প ভাবল। চিত্রনাট্যে রাখল ঋতুর বাবা, মা, ঋতুর চারপাশের বাস্তব চরিত্রদের আর ঋতু নিজেকেও রাখল। অনেকেই বলে ঋতুপর্ণ নিজেই দেবশ্রী রায়। হ্যাঁ 'রোহিণী' চরিত্রটা ঋতুপর্ণ নিজেই।
ঋতুপর্ণর মায়ের নাম ইরা ঘোষ। ঋতুর বাবা হলেন সুনীল ঘোষ। সুনীল ঘোষ আর ইরা ঘোষ ছিলেন দুজনে আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রী। সেখানেই প্রেম। আর্ট কলেজ থেকে পাশ করবার পর বিয়ে করেন। ইরা ঘোষ ছিলেন খুব ধনী পরিবারের মেয়ে। ঋতুপর্ণদের 'খেলাঘর', 'তাসের ঘর' বাড়িগুলো মায়ের দিকের সম্পত্তি। সুনীল ঘোষ হলেন সোদপুরের মানুষ আদতে। 'গঙ্গা' নামে একটা তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সেখানে ঋতু সহযোগী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিল প্রথম।
[caption id="attachment_2349697" align="aligncenter" width="600"]
প্রযোজক ডি. রামা নাইডুর সঙ্গে ঋতুপর্ণ আর দেবশ্রী[/caption]
যাই হোক, ঋতুপর্ণর মা খুব স্নেহশীলা, কিন্তু বরাবরই ছিলেন রুগ্না। বেশিরভাগ সময় শুয়ে থাকতেন। হাই সুগার ছিল। যার ফলে সংসার পরিচালনা উনি প্রায় চেয়ারে বসে করতেন। এই ঋতুর মায়ের মতোই একটা চরিত্র যে শয্যাশায়ী, আস্তে আস্তে কথা বলেন এটা যদি গৌরী ঘোষকে নেওয়া যায় উনি কি রাজি হবেন? যেমন 'দহন' ছবিতে ঝিনুকের ঠাম্মার বোল্ড চরিত্রে সুচিত্রা মিত্রকে আমরা ভেবেছিলাম।
গৌরীদি আগে কয়েকটা ছবিতে অভিনয় করায় ক্যামেরা-ফ্রেন্ডলি ছিলেন আর উনি রাজিও হলেন। ঋতুর মায়ের মডেলেই চরিত্রটা সেটা ঋতু গৌরীদিকে বলেছিল।"
'অসুখ' বছরের শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবির পুরস্কার জিতে নিয়েছিল জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে। বম্বে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও 'অসুখ' পুরস্কৃত হয়। ছবির নাম 'অসুখ', সেটাও অনেক পরে ঠিক হয়। ডাবিং-এর পরে। প্রথমে ভাবা হয় 'অ-সুখ'। তারপর ঠিক হল 'অসুখ'। এমন একটা অন্যধারার ছবির নামকরণ শক্ত বৈকি!
অনেকের কাছেই আজও রহস্য 'অসুখ' ছবিতে কি গৌরী ঘোষের নিজের কণ্ঠই ব্যবহার করেছিলেন ঋতুপর্ণ?
সে উত্তর দিলেন 'অসুখ'-এর সহযোগী পরিচালক শৌভিক মিত্র। "গৌরীদির যখন পুরো ছবিটা শ্যুটিং করা হয়ে গেল তখন ঋতু বলল গৌরীদি তো বাচিকশিল্পী, ওঁর কথার মধ্যে একটা টান আছে। ডাবিং-এর সময় সেটা কিন্তু কাটাতে হবে। ঋতু আর গৌরীদিকে দিয়ে ডাবিং করায়নি। ও বলল এটা কাটানো মুশকিল, আমি ডাবিং করে দেব। গৌরী ঘোষের কণ্ঠে পুরো ডাবিংটাই ঋতুপর্ণর কণ্ঠ। ঋতুর গলা ওটা। যেহেতু ঋতু ওর নিজের মাকে নকল করছে তাই ভালোবাসা স্নেহ মেশানো গলা নকল করতে ওর খুব একটা অসুবিধে হয়নি। সৌমিত্রদার (চট্টোপাধ্যায়) চরিত্রটাও ঋতুপর্ণর বাবার চরিত্র একদম। সুনীল ঘোষ বসানো। ছবিটা অল্পদিনের মধ্যেই আমরা করেছিলাম। পুরস্কার পেলেও ছবিটা চলেনি। সেটাই খারাপ লাগে।"
গৌরী ঘোষ কিন্তু তখন স্টার বাচিকশিল্পী। বাঙালির মননে তাঁর কণ্ঠ বসে আছে। সেই গৌরী ঘোষের চেনা কণ্ঠ শুনতে পেলেননা ছবি দেখতে গিয়ে দর্শকরা। যদিও অনেকে ধরতে পারেননি তফাত। তাঁর ভক্তরা তো বুঝেইছিল এ কণ্ঠ তাঁদের গৌরীদির নয়। গৌরী ঘোষ কি মানতে পেরেছিলেন এই ডাবিং কাণ্ড?
ঋতুপর্ণর সমস্ত ছবির ডাবিং ইতিহাস নিয়ে লিখলে একটা দুটো বই নেমে যাবে। এত তাঁর গল্প, এত তাঁর বিতর্ক।
গৌরী ঘোষ আর ঋতুপর্ণ ঘোষ সম্পর্কেও চিড় ধরেছিল। কেউই এটা মেনে নেননা যে তাঁর নিজের কণ্ঠ ছবিতে থাকবেনা। আর যেখানে কণ্ঠই গৌরী ঘোষের সত্ত্বা এবং পরিচয়।
ঋতুপর্ণ গৌরী ঘোষকে কিছুটা অন্ধকারে রেখেই নিজে ডাবিং করে দেন। মনোমালিন্য দুজনের কেউই প্রকাশ্যে আনেননি। তবে সম্পর্ক মধুর ছিলনা। তবে ঐ যে পরিচালকই ছবির আসল নাবিক। তাঁর নির্দেশেই ছবিটা কেমন হবে সেটা ঠিক হয়। পরিচালকের স্বাধীনতাও যুক্তিপূর্ণ।
শৌভিক মিত্র বিতর্ক মেটাতে বললেন "ভয়েস ওভার গুণটা ঋতুর শুরু থেকেই ছিল। কলকাতা দূরদর্শনে 'টেলিস্কোপ' অনুষ্ঠানেও ঋতু ভয়েস ওভার দিত। তখন তো ও ঋতুপর্ণ হিসেবে পরিচিতি পায়নি, তাই কেউ জানেনা ওগুলো ঋতুর ডাবিং। আমি তখন দূরদর্শনে কুইজমাস্টার। সেখানেই আমাদের বন্ধুত্ব।
এবার ঋতু 'অসুখ'-এ গৌরীদির গলা রাখবেনা বলে বাদ দিয়েছে সেটা নয়। গৌরীদির একটু খারাপ লেগেছিল সেটা অনস্বীকার্য। ঋতু বলল না গৌরীদি যতই বিখ্যাত বাচিকশিল্পী হন এই আমার মায়ের চরিত্রে সেই টানটা থাকার কথা নয়। এমন হত ডাবিং সেশনে, সকালে দেবশ্রী ডাবিং করে দুপুর দুটো নাগাদ চলে গেল। তারপর স্টুডিও ফাঁকা আছে দেখে ঋতু নিজে ডাবিং করতে বসে যেত। এবার দেখা যেত অভিনেতা অভিনেত্রীর থেকেও ঋতুর কণ্ঠটা বেশি মানানসই হচ্ছে চরিত্রের সঙ্গে। সেটাই ভালো লেগে যেত। ঐ ক্ষমতাটা ওর ছিল। সেইভাবেই গৌরীদির কণ্ঠটা ঋতু করেছিল। দুজনেই গুণী, দুজনের সম্পর্ক মধুর ছিল পরে বলবনা। গৌরীদি ও তাঁর মহলের লোকেরা যেমন ঠিক। তেমন ঋতুপর্ণ বহু অভিনেতা অভিনেত্রীর ডাবিং নিজে করেছিল সেটা ছবির স্বার্থে।"
ঋতুপর্ণ ঘোষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি 'অসুখ' আজ আলোচনার বাইরে তার বড় কারণ ঋতুপর্ণ মানেই আজকাল সমকামী মানুষদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। সে যে নারী পুরুষের ভালোবাসার গল্প, বাবা মেয়ের স্নেহের গল্প, মা মেয়ের আগলে রাখার গল্পগুলো অসাধারণভাবে দেখিয়েছে, সেটা যেন চাপা পড়ে গেছে 'বনমালী তুমি পর জনমে হয় রাধা' র নীচে।
ঋতুপর্ণ নিজেও কিছুটা দায়ী। অথচ যেসব দর্শক নব্বই দশক থেকে ঋতুপর্ণ ভক্ত বা যারা ঋতুপর্ণর কাছের মানুষ ছিলেন তাঁদের মনে কিন্তু রয়ে গেছে কোঁকড়া চুল, গোলগলা টি শার্ট, কার্বন ফ্রেমের চশমার স্বপ্নভেজা চোখের ঋতুপর্ণ। 'উনিশে এপ্রিল'-এর অদিতি দেবশ্রীও তো একই কার্বন ফ্রেমের চশমা পরেই 'নায়ক'-এর চশমা পরিহিতা নায়িকা শর্মিলা ঠাকুরের মিথ ভাঙল।
আমার চোখে দেবশ্রী রায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চরিত্রচিত্রণ অদিতি আর রোহিণী।
[caption id="attachment_2349716" align="aligncenter" width="600"]
অদিতিরূপী দেবশ্রী[/caption]
মায়ের অসুখ নিয়ে বাবার প্রতি মেয়ের সন্দেহ। আবার রাতের খাবার মেয়েকে বাবার সঙ্গেই খেতে হয়। এমনকি মেয়ের চোখের ড্রপ থেকে অন্ধকারে মেয়ে ভয় পেলে বাবা হাত বাড়িয়ে দেয়, যা প্রেমিকও দেয়না সবসময়। প্রেমিকও কি তাঁর আপন? এমন টানাপোড়েনের অভিনয় দেবশ্রী রায় ছাড়া আর কে পারতেন?
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বাবা হিসেবেও মায়ের মতোই ভালো। শ্রাবন্তী মজুমদারের 'আয় খুকু আয়' গানটার ওপিঠ যেন এই ছবি।
'ফেলিতে নিমেষ দেখা হবে শেষ-
যাবে সে সুদূর পুরে!
শুধু, সঙ্গের বাঁশি কোন্ মাঠ হতে
বাজিবে ব্যাকুল সুরে।'
'অসুখ' ঋতুপর্ণর এমন এক ছবি যা আমৃত্যু ভোলার নয়। সে দর্শকানুকূল্য পাক আর না পাক।