
শেষ আপডেট: 27 April 2023 09:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অবশেষে উঠল নিষেধাজ্ঞা। ১৪ বছরের 'বনবাস' শেষে নিজের দেশ ইরান (Iran) ছেড়ে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি পেলেন বিখ্যাত চিত্র পরিচালক জাফর পানাহি (Jafar Panahi)। সরকারের রোষানলে পড়ে বিগত ১৪টা বছর তাঁকে একপ্রকার বন্দি (travel ban) হয়েই দিন কাটাতে হয়েছে। এবার তিনি মুক্তির স্বাদ ফিরে পেলেন।
সামনে বিশাল স্টেডিয়াম, খেলা চলছে ছেলেদের ফুটবল। গ্যালারিতে মানুষ পাগলের মত চেঁচাচ্ছে। তারই মাঝে চোখ আটকালো তিনজন মহিলার দিকে। ইরানিয়ান ফুটবলের প্রতি ভালবাসা থেকেই ছেলে সেজে মাঠে ঢুকতে হয়েছে তাঁদের।
ইরানে কড়া নীতি, ছেলেদের জন্য তৈরি হওয়া কোনও খেলাতে মেয়েরা যোগদান করতে পারবে না। এমনকি মাঠে ঢুকে খেলা দেখাও বারণ। কিন্তু ভাললাগা আর ভালবাসার টান কি আটকানো যায়? আজকে যদি আপনি শচীন, ধোনি, মেসি বা রোনাল্ডোকে দেখার সুযোগ পান, কিন্তু আপনার দেশের সরকার আপনার ভিন্ন লিঙ্গের দোহাই দিয়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ কেড়ে নেয়, তাহলে রাগ হবে? প্রশ্ন তুলবেন? সরকারকে জিজ্ঞেস করবেন কেন এমন নিয়ম? সেই প্রশ্নই তুলেছিল জাফর পানাহির ছবি 'অফসাইড'। এমন আইনের পিছনে কারণ কি সেটা না বুঝেই দিনের পর দিন সবাই মেনে চলেছেন। সেই প্রথা ভেঙ্গে তিনজন খেলা পাগল মহিলার মাঠে গিয়ে খেলা দেখার গল্প করেছেন পানাহি। দেখিয়েছেন ধরা পরার পর তাঁদের অবস্থাও।
জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত ইরানি পরিচালক জাফর পানাহি এমন বহু ছবি বানিয়েছেন যা প্রতিনিয়ত সেখানকার সরকারকে প্রশ্ন করে। তাঁর ছবি ইরানে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক নানা ঘটনা, সেখানকার মানুষের লড়াই চোখের সামনে তুলে ধরেছে বারবার। বহুবার পানাহি এই কারণে জেলবন্দি হয়েছেন। নানা হেনস্তার শিকারও হতে হয়েছে তাঁকে। নিজের দেশে থেকেও যেন নিজের বাড়ি ছাড়া আর কোথাও বেরোনোর অনুমতি ছিল না তাঁর কাছে। সরকার বিরোধী সিনেমা বানাচ্ছেন তিনি এমন কথা বলে সরকার তাঁর সিনেমা বানানোর অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়। তাঁর তৈরি কিছু বিখ্যাত ছবি যা আজও শুধু ইরান কেন সারা বিশ্বের মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে যেমন- 'দ্য হোয়াইট বেলুন', 'দ্য সার্কেল', 'ট্যাক্সি তেহরান'। ২০২২ সালে কলকাতা আন্তর্জতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয় পানাহির বানানো 'নো বিয়ার্স', যা বহু বহু মানুষের প্রশংসা পায়।
মঙ্গলবার পানাহির স্ত্রী তাহরেন সাইদি সোশ্যাল মিডিয়াতে একটি পোস্ট করেন। যেখানে দেখা গেছে পানাহি এবং তাঁর স্ত্রী কোথাও ঘুরতে যাচ্ছেন। লেখা, ‘পানাহির উপর থেকে বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে ইরানের সরকার ফলে কিছুদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি আমরা।'
১৪ বছর পর এই প্রথম ইরানের বাইরে যাচ্ছেন বিদ্রোহী পরিচালক। ভাবুন তো, ১৪ বছর ধরে একই জায়গায়, একই জীবনযাপন, সর্বদা সরকারের নজরবন্দি। কারণ, আপনি আপনার ভাষায় দেশে ঘটে চলা ঘটনা মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন বা আপনারই বানানো সরকারের কাছে কিছু প্রশ্ন রেখেছেন। এটাই আপনার দোষ। সিনেমা এমন একটি মাধ্যম যেটা সবার কথা বলে, সবার জন্য কথা বলে।
ইরানের মত দেশে যেখানে সরকারের কথাই শেষ, যেখানে মেয়েদের স্বাধীনতা বলতে কিছুই নেই। যেখানে ছাত্রদের হাতে ক্ষমতা বলতে কেবলই বই। যেখানে সরকারকে প্রশ্ন করলে আপনার মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। সেখানে দাঁড়িয়ে পানাহি ছবি বানাচ্ছে ইরানের জন্য, ইরানের মহিলাদের জন্য, মানুষের জন্য। তাই 'শাস্তি' তো কপালে লেখা ছিলই।
অবশেষে সেই শাস্তির মেয়াদ ফুরিয়েছে। পরিচালকের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে ইরান সরকার। তাতেই খানিক মুক্তির স্বাদ পেতে নিজের স্ত্রী'কে নিয়ে জাফর চললেন বিদেশে। আপাতত খানিক মুক্তি। কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস। তারপর হয়তো আবার নতুন ছবি, নতুন লড়াই, নতুন বিদ্রোহ। যার উদ্দেশ্য একটাই- স্বাধীনতা।