দ্য ওয়াল ব্যুরো: বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় প্রয়াত হলেন বর্ষীয়ান পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার বাসু চট্টোপাধ্যায়। আজ, ৪ জুন, বৃহস্পতিবার মুম্বাইয়ের বাড়িতে মারা যান তিনি। বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। বাঙালি পরিচালকদের বলিউড জয়ের ইতিহাসে অন্যতম এক নাম ছিলেন তিনি। আজ চিরতরে 'প্যাক আপ' হল সবকিছুর।
ফিল্মমেকার অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যান্ড টিভি ডিরেক্টর্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অশোক পণ্ডিত নিজের ট্যুইটার হ্যান্ডেলে বাসু চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়ানের খবর প্রকাশ করেন আজ। বাসু চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু চলচ্চিত্র জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি বলেও উল্লেখ করেন অশোক পণ্ডিত।
১৯২৭ সালের ১০ জানুয়ারি রাজস্থানের আজমের শহরে জন্মগ্রহণ করেন বাসু চট্টোপাধ্যায়। বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন, তাই বদলি হতেন সপরিবার। তখন থেকেই বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের জীবন দেখার সুযোগ হয় বাসু চট্টোপাধ্যায়ের। কিন্তু বাংলার বাইরে থাকলেও ভোলেননি বাঙালি শিকড়কে। তাঁরা ছিলেন চার ভাই। ছোট থেকেই সিনেমা দেখার খুব আগ্রহ ছিল। তবে প্রথম জীবনে মুম্বই থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েডে অঙ্কনশিল্পী এবং কার্টুনিস্ট হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়।
ফিল্মের আগ্রহ অবশ্য থেকেই গেছিল। সে কারণেই প্রথম যৌবনে ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হয়েছিলেন বাসু। আর্ট ফিল্ম আসলে কী, তা তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। জার্মানি, ইতালি-- সব দেশের ছবি দেখে সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। ফিল্ম সোসাইটিতেই দেখেন 'বাইসাইকেল থিভস'-- যে ছবি দেখে নিজে ছবি পরিচালনা করার কথা ভাবতে শুরু করছিলেন।

সে সময়ে কোনও ফিল্ম স্কুল ছিল না আলাদা করে। নিজেই চলচ্চিত্র বিষয়ক বহু বই ছিল পড়ে ফেলেন তিনি। আর বাঙালিরাও যে এমনটা, পারে সেটা বুঝতে পেরেছিলেন যখন মুক্তি পেল সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী'। এই সিনেমাটি দেখেই তিনি নিজেও ছবি পরিচালনায় আসবেন বলে ভাবেন বাসু চট্টোপাধ্যায়। শুরুর আগে তিনি হৃষিকেশ মুখার্জী ও বাসু ভট্টাচার্যর সহকারী হিসেবে ছবির জগতে কাজ করেন। রাজ কাপুর ও ওয়াহিদা রহমান অভিনীত 'তিসরি কসম' সিনেমায় তিনি বাসু ভট্টাচার্যর সহকারী হিসেবে কাজ করেন প্রথম। বাসু ভট্টাচার্য ছিলেন তাঁরবন্ধু স্থানীয় দাদা। 'তিসরি কসম' ১৯৬৬ সালে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।
এর পরে মুক্তি পায় বাসু চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত প্রথম ছবি সারা আকাশ (১৯৬৯)। এই ছবিটির জন্য ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার পান তিনিও। ফিল্ম সোসাইটিতে ছবি দেখা অভিজ্ঞতা দিয়েই এই ছবিটি বানিয়েছিলেন। 'সারা আকাশ' রিলিজের পর অনেকে বলেছিলেন, "সবাই ছবি বানায় বোম্বেতে দর্শকদের দেখার জন্য, বাসু চ্যাটার্জী ছবি বানায় সবার শেখার জন্য।" রাজশ্রী প্রোডাকশান ছবিটা প্রযোজনা করেছিল। তারা দ্বিতীয় ছবির অফার দেয় বাসু চ্যাটার্জীকে, 'পিয়া কা ঘর'।
[caption id="attachment_226783" align="aligncenter" width="720"]

মৃনাল সেন, সলিল চৌধুরী, বাসু চ্যাটার্জী।[/caption]
মুম্বই শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প উঠে আসত তাঁর ছবিতে। যে ছবিগুলো বাংলা-সহ সর্বভারতীয় স্তরে সমাদৃত হয় এবং তাঁর ছবির গান আজও সব আইকনিক। সলিল চৌধুরী থেকে রাজেশ রোশনরা তাঁর ছবিতে সুরারোপ করেছেন। সাহিত্য থেকে মৌলিক গল্প-- সব ধরনের বাঙালি ঘরানার ছবি বানিয়েছেন তিনি।
তাঁর কাজের ঝুলিতে রজনীগন্ধা, স্বামী, ছোটি সি বাত, চিৎচোর, দিল লাগি, খাট্টা মিঠা, বাতো বাতো মে, শিশা, দুর্গা, প্রিয়তমার মতো সুপারহিট ছবি রয়েছে। পরে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে এসে হঠাৎ বৃষ্টি, চুপিচুপি, হচ্ছেটা কি-- এই সব ছবি করেছেন। হঠাৎ বৃষ্টি ছিল বাংলাদেশ ভারত যৌথ উদ্যোগে ছবি ফিরদৌস-প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদী অভিনীত। নচিকেতা চক্রবর্তীর সুরে গানগুলি আজও মন ভাল করে।

বাসু চট্টোপাধ্যায়ের নিজের পরিচালিত সবচেয়ে পছন্দের ছবি ছিল 'জিনা ইঁয়াহা'। কিন্তু ছবিটা ফ্লপ করে। মন্নু ভাণ্ডারীর লেখা সত্যি কাহিনি অবলম্বনে এ ছবি। বাসু বাবু দেখান, শহর মানেই জটিলতা নয়। সেখানেও শান্তি আনা যায়। শাবানা আজমি, শেখর কাপুর, অমল পালেকার অভিনীত ছবিটি তৎকালীন সময়ে উল্টো কথা বলেছিল। নগরায়নের হাজার অসুবিধা থাকলেও, তাকে খাটো করে দেখায়নি।
বাসু চ্যাটার্জীর টিভি সিরিজও বিখ্যাত ছিল দূরদর্শনে। প্রিয়া তেন্ডুলকার অভিনীত 'রজনী' কিংবা রজিত কপূর অভিনীত 'ব্যোমক্যাশ বক্সী' মনে রেখেছেন অনেকেই।
লেজেন্ডারি পরিচালক রেখে গেলেন দুই কন্যা-- সোনালি ভট্টাচার্য এবং রূপালি গুহকে। রূপালি নিজেও একজন পরিচালিকা। আজ দুপুর ২টো নাগাদ মুম্বইয়ের সান্তাক্রুজ শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।