
কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ, সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরিত্রে ভাবা হয় দেবশ্রী, মনীষাকে
শেষ আপডেট: 24 April 2025 18:00
কাবুলিওয়ালা বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাবুলিওয়ালা আর মিনির স্নেহমাখা কাহিনি। ছবি বিশ্বাস আর টিঙ্কু ঠাকুর। কিন্তু কাবুলিওয়ালাদের সঙ্গেই যদি কোনও বাঙালি ব্রাহ্মণের মেয়ে পালিয়ে যায় আফগানিস্তানে, তখন সেটা কতখানি ভয়ংকর হয়ে ওঠে! কাবুলিওয়ালাদের আখড়াটা কেমন? কতটা ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার আর অত্যাচারের কূপ সেই অঞ্চল? কাবুলিওয়ালাদের হাড়হিম করা সমাজব্যবস্থা জানলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সেখানে নেই কোনও স্নেহ, নেই কোনও মায়া, নেই কোনও ভালোবাসা। রক্তের দামে হয় সবকিছুর হিসেবনিকেষ। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলদের অস্তিত্ব তাঁদের কাছে নেই, এ কে ফট্টিসেভেনের নলই শেষ কথা।
মে ১৯৮৮, কলকাতা। কলকাতার মেয়ে সুস্মিতা। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের শিক্ষিতা, সুন্দরী, বাবা মায়ের আদরের কন্যা। আদি বাড়ি বাংলাদেশের খুলনায়। আর পাঁচটা বাঙালি বাড়ির মেয়ের মতোই চলছিল তাঁর জীবন। হঠাৎই সুস্মিতার জীবনে এল প্রেম। কথায় আছে প্রথম প্রেম সবকিছু উজাড় করে দেয়। সুস্মিতারও তাই হল। এক কাবুলিওয়ালার প্রেমে পড়ল বামুন বাড়ির মেয়ে সুস্মিতা। আর পাঁচজন বন্ধুর মতো সাদামাটা ভালোবাসা নয়। অনেকবেশি রোমাঞ্চকর এ ভালোবাসা। লম্বা, সুদর্শন, সুপুরুষ আফগান যুবক জাঁবাজ খান সুস্মিতার প্রেমিক। যা শুনে আঁতকে ওঠে সুস্মিতার পরিবার। এত যত্ন করে মেয়েকে মানুষ করে এই প্রতিদান। প্রথমে ভালো মুখে তারপর চড় থাপ্পরে বুঝিয়েও বাবা মা অনড় সুস্মিতাকে তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে নড়াতে পারেননি। মেয়ের চিরকালই ভীষণ জেদ। জাঁবাজ ভারতে আসতেন সুদের কারবার করতে।
সুস্মিতার পরিবার কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না তাঁদের জামাই একজন সুদের কারবারি এবং তার ওপর মুসলিম কাবুলিওয়ালা। জাঁবাজের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করে সুস্মিতা জানান তাঁর বাবা মা কিছুতেই মেনে নেবেনা জাঁবাজকে। জাঁবাজ সুস্মিতাকে দেখায় নতুন স্বপ্ন। দেয় বিয়ে করে আফগানিস্তানে পালিয়ে যাবার বুদ্ধি। এক বুক ভালোবাসা আর প্রথম প্রেমের সারল্যে সুস্মিতা বাপের বাড়ি ছাড়ে নিজের ঘর বাঁধবার আশায়। লোকচক্ষুর আড়ালে জাঁবাজের হাত ধরে সুস্মিতা পাড়ি দেয় আফগানিস্তান। কেন একটা মেয়ে এমন করল? ঐ যে ভালোবাসা। প্রথম প্রেম।
'প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কে কোথা ধরা পড়ে, কে জানে গরব সব হায় কখন টুটে যায়, সলিল বহে যায় নয়নে।'
জাঁবাজের আকর্ষক রূপেও মজেছিল সুস্মিতা। আর ছিল মেয়ের অসম্ভব দুঃসাহস। আফগানদের জীবনযাত্রা পরখ করে দেখতেই নিজেকে সঁপে দিল তাঁদের সংসারে। ব্রাহ্মণ হয়ে ভিনদেশি এক মুসলমানকে মেয়ের বিয়ে করা বর হিসাবে মেনে নিতে পারেননি সুস্মিতার বাবা-মা। এটাও তাঁরা মেয়েকে বুঝিয়েছিলেন ভিনদেশি কাবুলিওয়ালার পরিবারের লোককে সে চেনেনা, তাহলে এত ঝুঁকি নেবার কী দরকার! কিন্তু মেয়ে ততক্ষণে আফগানিস্তানের মরুভূমির পথে।
বিশেষ বিবাহ আইনে কাবুলিওয়ালার বউ। বাবা মা তো মেয়ের কোনও খবরই পাননি। এক অনিশ্চিত জীবনে ঝাঁপ দিলেন সুস্মিতা সংসার বাঁধার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে।
জুলাই, ১৯৮৮,আফগানিস্তান। সুস্মিতা ভেবেছিল ভালোবাসা দিয়ে স্বামী-শ্বশুরবাড়ির জয় করবেন, কিন্তু একে একে খুলতে লাগল দুই ধর্মের তফাত। শ্বশুরবাড়ির পথে যেতেই চোখের সামনে দেখল যুদ্ধ আর দাঙ্গার দামামা। শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে সুস্মিতার প্রথম নাকে লাগল একটা অচেনা গন্ধ। উগ্র সে গন্ধ। যে মেয়ে ভাবত শ্বশুরবাড়ি ঢুকবে আলতা পায়ে লক্ষ্মীর পায়ে পায়ে সেই মেয়েকে মুসলিম পরিবার বরণ করল ভেড়ার রক্তের টিকা দিয়ে। গাড়ির সামনে ছাগল বা ভেড়া কেটে ফেলে তাঁর গলার রক্ত নববধূর কপালে দিয়ে বরণ করার রীতি আফগানদের। আঁতকে উঠল মেয়ে। বুঝল কোন প্রদেশে এসে পড়েছে। পইপই করে বাড়ির লোক বারণ করেছিল যে পথে যেতে, সে পথে গিয়ে এখন কী কী দেখা বাকি তাঁর! সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন মুসলিম নাম হল সাঈদা কামাল।
কিন্তু ইসলামের নামে শপথ খেতে পারেননি সুস্মিতা। ইসলাম বলতে তাঁর মুখে ঠেকানো হয়েছে বন্দুকের নল, তবু জীবনের শেষদিন অবধি নিজেকে সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে পরিচয় দিয়েছেন কাবুলিওয়ালার বউটি।
আফগান শ্বশুরবাড়িতে পা রাখতেই যেন স্বামীর রূপ ক্রমশ বদলাতে লক্ষ্য করলেন সুস্মিতা। তাঁর থেকে কী যেন গোপন করে শ্বশুরবাড়ির সবাই। ইতিমধ্যে খাওয়া-দাওয়াতেও শুরু হল অসুবিধে। ব্রাহ্মণকন্যা ভালোবাসার ফাঁসে ফেঁসে গরুর নানা পদের গন্ধতেও অভ্যস্ত হতে থাকল। বারবার যেন সব নিয়মেই একটা নৃশংসতা ফুটে উঠত। তবু বাড়ির কজন মহিলা সুস্মিতাকে নরম চোখে দেখতেন। হঠাৎ একদিন সুস্মিতা দেখলেন তাঁর স্বামী রাতে ঘরে নেই। স্বামীকে খুঁজতে বাইরে বেরিয়ে পাশের ঘরে যেতেই চোখে পড়ল স্বামী জাঁবাজ পরস্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গমলীলায় মত্ত। কোনওক্রমে নিজেকে সামলে ঘরে চলে এলেন সুস্মিতা। পরে জানা গেল, না ঐ মহিলা জাঁবাজের পরস্ত্রী নন। নিজেরই স্ত্রী। সুস্মিতার সতীন। প্রথম স্ত্রী গুলগুটি থাকা সত্ত্বেও সুস্মিতাকে বিয়ে করেন জাঁবাজ। শুধু স্ত্রী নয়, এক সন্তানও ছিল। এসবের কিছুই জানতেন না সুস্মিতা। ঘরে দোর দিয়ে সুস্মিতা কেঁদে চললেন অঝোরে। মনে পড়ল বাবা-মায়ের সেই কথা "জাঁবাজের পরিবারে কারা কোথায় কিছুই তুমি জানোনা। কোন ভরসায় ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছ।"
এখানেই শেষ নয়, পরিবারের মধ্যে বহুগামিতা, অবাধ যৌনতার ছড়াছড়ি সুস্মিতার চোখে ধরা পড়ল। বহুবিবাহ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক- সবই ধর্মের দোহাই দিয়ে আফগান পুরুষরা করে বেড়ায়। জাঁবাজ ও তাঁর ভাইদের নারীসঙ্গ অগুন্তি এবং তা পরিবারে বৈধ। মৃত ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীকেও বিয়ে করে নেন দেওর ভাসুররা।
রক্ষণশীল শ্বশুরবাড়িতে বোরখা আর হিজাবের তলায় স্থান ছিল মেয়েদের। তারওপর তালিবানি শাসন শুরু হয়ে গিয়েছিল আফগানিস্তানে। মনগড়া শরিয়তি আইন দেখিয়ে নারী জাতিকে কী ভাবে দিনের পর দিন বেইজ্জত করা হয়েছে তা দেখেছেন সুস্মিতা নিজের চোখে। সুস্মিতা আর তাঁর সতীন কোথাও দুজন দুজনের সমব্যথীও হয়ে উঠেছিলেন। কারণ প্রথম স্ত্রী গুলগুটিও জানতেননা স্বামী সতীন আনছেন। জাঁবাজ যে মাত্রায় বহুগামী ছিলেন তাতে স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব কোনকালেই ছিলনা। ওখানে যেন এমন অবাধ যৌনাচার বৈধ নিয়ম হয়ে উঠেছিল। সুস্মিতা মা হতে পারেননি। জাঁবাজ চাননি। তাই সতীনের মেয়ে তিন্নিকে আপন করে নেন সুস্মিতা। যে মানুষটার হাত ধরে নিজের দেশ ছেড়েছিল সুস্মিতা সেই লোকটা যে কী মাত্রায় তাঁকে ঠকিয়েছিল হাড়েহাড়ে বুঝেছিলেন সুস্মিতা।
কিন্তু মেয়েরা চায় একটু সহনশীল হলে যদি স্বামী ভক্ষকটির ভালোবাসা বাঁচে, সুস্মিতাও তাই চেয়েছিলেন। জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করে তো বাঁচা যায়না। স্বামীর প্রবঞ্চনা ভুলতে আফগান নারীদের দুর্দশায় পাশে দাঁড়ালেন সুস্মিতা। প্রথমে সুস্মিতাকে ওরা হিন্দুস্তানি ভেবে অন্য চোখে দেখতেন। কিন্তু পরে সুস্মিতা ওদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন।

সে একা নয়, ওই প্রদেশের সব নারীরাই প্রায় স্বামীদের ধামসানো পাশবালিশ গোছের ছিল। ভালোবাসার চেয়ে শারীরিক নিগৃহ জুটত তাঁদের বেশি। অথচ সবটাই শান্ত হিজাবে ঢাকা থাকত। যে গলা উঁচু করবে তাকেই প্রাণ দিতে হবে বন্দুকের নলের কাছে। নার্সিং এবং ফার্স্ট এডের শিক্ষা ছিল প্যারামেডিক্যালের ছাত্রী সুস্মিতার। তাই দিয়েই মেয়েদের চিকিৎসা শুরু করলেন। তালিবান রাজত্বে মেয়েদের একা বেরনো নিষেধ ছিল। পুরুষসঙ্গী নিয়েই বেরতে হত তাঁদের। তালিবানরা মহিলাদের ওপর যে বর্বর অত্যাচার করত তা রীতিমতো ধর্ষণের সামিল। এইসবের বিরুদ্ধে জোর গলায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সুস্মিতা। তাতে সুস্মিতা হয়ে উঠলেন তালিবানদের চক্ষুশূল।
সমস্ত তালিবানি বর্বরতা সহ্য করতেন সুস্মিতা জাঁবাজের মুখ চেয়ে। ওদেশ থেকে তাঁর ফেরার পথও জানা ছিলনা। শ্বশুরবাড়ি যেন একটা জেলখানা। আর বাইরে বেরলে তালিবানি অত্যাচার। এর মধ্যে হঠাৎ সুস্মিতার চোখে ধুলো দিয়ে জাঁবাজ ভারতে চলে এল। একা পড়ে থাকেন সুস্মিতা। শুরু হয় শ্বশুরবাড়িতে তাঁর তালিবানপন্থী দেওরদের অত্যাচার।

সুস্মিতার প্রতিবাদী চরিত্র দেখে বাড়িতে একরকম ঘরবন্দি করে রাখে। সুস্মিতাকে ওরা মুসলমান নাম দিলেও মুসলিম রীতিনীতি সব মানতে মন চাইতনা সুস্মিতার। হিন্দু ব্রাহ্মণের মেয়ে হয়ে রমজান করা তাঁর নীতিবিরুদ্ধ মনে হয়েছিল। রমজানে দিনেরবেলায় উনুন জ্বালানোর অপরাধে তালিবানরা সুস্মিতার মুখের ভিতর বন্দুকের নল ঢুকিয়ে মারতে থাকে। তবু সুস্মিতা বলে চলেন তিনি মুসলিম নন, রোজা রাখবেননা। ইসলামকে যেন জোর করে তাঁর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করার লোক কেউ ছিলনা বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে। আর স্বামী, সে তো কবেই তাঁকে ঝেড়ে ফেলেছে।
সেখান থেকে দুবার পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়ে যান। এর মধ্যেও গোপনে মেয়েদের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালিয়ে যেতে থাকেন। তালিবানিরা জানতে পেরে একদিন আচমকা এসে সুস্মিতাকে প্রচণ্ড মারধর করে। ভেঙে ফেলে সমস্ত চিকিৎসার সরঞ্জাম। হিজাব না পরে বাইরে বেরুনোর জন্য তাঁকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে তালিবানি জঙ্গিরা। অনিদ্রা, অত্যাচার, বুকভরা হাহাকার নিয়ে সুস্মিতার মন চাইত দেশের মাটিতে ফিরতে। কিন্তু সে নিজেই তো সে পথ বন্ধ করে এসছে। শেষমেষ নিজেই নিজেকে বোঝালেন তাঁকে এই অন্ধকূপ কারাগার থেকে বেরতে হবেই। কাবুলে তখন তালিবান বনাম রাব্বানির যুদ্ধ চলছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে তালিবানদের চোখ এড়িয়ে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে আসেন সুস্মিতা। চলে যান সোজা পাকিস্তান। ভেবেছিলেন ভারতীয় এম্বাসী তাঁকে সাহায্য করবে। কিন্তু একা মেয়ের সুযোগ সব পুরষই নেয়। এম্বাসির বড়কর্তা সুস্মিতাকে প্রস্তাব দেন তাঁর শয্যাসঙ্গী হলেই মিলবে মুক্তি। পাকিস্তানের পুলিশকে ততক্ষণে কিনে ফেলেছে তালিবানপন্থী আফগানী শ্বশুরবাড়ির লোকজন। ফেরত যেতে হল ঐ শ্বশুরবাড়ির কারাগারে। এবার অত্যাচার আরো ভয়াবহ। কিন্তু তারপরও তালিবানি বন্দুকের নল এড়িয়ে নিজের দেশে ভারতে ফেরেন সুস্মিতা। ভারতীয় দূতাবাসের সাহায্যেই এবার একদিন সুস্মিতা চেপে বসেন দিল্লিগামী বিমানে। দীর্ঘ আট বছর লড়াই করে দেশের মাটির মুখ দেখেন সুস্মিতা।
দেশে সুস্মিতা ফেরার পর তাঁর সঙ্গে তাঁর বাবা মা আর যোগাযোগ রাখেননি। হাইল্যান্ড পার্কের কাছে ফ্ল্যাটে থাকতেন সুস্মিতা। সেই সময় সুস্মিতা ডায়েরি লিখতে শুরু করেন। নিজের সংগ্রামী জীবনের ৮ বছরের অভিজ্ঞতা। তাঁর কলম হয়ে ওঠে এক জ্বলন্ত দলিল। আফগানিস্থানে মেয়েদের দুর্দশার কথা উঠে এল তাঁর কলমে। প্রতিবেশীদের সৌজন্যে পেয়ে গেলেন প্রকাশক স্বপন বিশ্বাস-কে। প্রকাশ পেল সুস্মিতার বই 'কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ'। বই বেরোতেই হটকেক। সারা দেশ যেন শিউরে উঠল সুস্মিতার লেখা পড়ে। এমনও হয়!
এক বাঙালি মেয়ের দুঃসাহসী কলম নাড়িয়ে দিল বাংলা সহ সমগ্র দেশকে। সব জায়গাতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু 'কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ'। মিডিয়াতেও তখন একটাই খবর এক সুঠাম মুসলিম কাবুলিওয়ালাকে ভালোবেসে এক বাঙালি মেয়ের তালিবানি আখড়া থেকে পালিয়ে আসার রোমহর্ষক গল্প।
বই হল ফিচার ফিল্ম, নামজাদা নায়িকারা পা গলালেন সুস্মিতার জুতোতে
২০০৩ সালে 'কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ' বই নিয়ে হিন্দি ছবি তৈরী করলেন পরিচালক উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। যিনি এর আগে 'গণ্ডি', 'কালরাত্রি' ছবি বানিয়েছিলেন। 'Escape from Taliban'। সুস্মিতার নামভূমিকায় মনীষা কৈরালা। যদিও পরিচালকের প্রথম পছন্দ ছিলেন তব্বু।
এই ছবি দিয়েই আন্তর্জাতিক পরিচয় গড়ে ওঠে সুস্মিতা ও তাঁর কলমের। 'Escape from Taliban' সেসময়কার ভীষণ আলোচিত ছবি, কিন্তু ছবিটা বক্সঅফিসে খুব সাফল্য পায়নি। মনীষা কিছু জায়গায় দুর্বল অভিনয় করেছিলেন। চিত্রনাট্যে ফাঁকফোকড় ছিল। তবে যা প্রচার পেয়েছিল এমন একটি কাহিনি তাতে লাইমলাইটে চলে আসেন সুস্মিতা। ছবিটি টিভি সম্প্রচার হলে তালিবানি অত্যাচার নিগ্রহ মানুষের মনে খুব প্রভাব ফেলেছিল। এমনকি 'কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ' বেস্টসেলার বই হওয়ায় সেই কাহিনি অবলম্বনে বাংলা ছবি হবার কথা হয়েছিল। সেই ছবির শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুস্মিতার চরিত্রে ভাবা হয়েছিল দেবশ্রী রায়কে।
বড় প্রচার করে 'কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ' নামেই ছবির মহরৎ করা হয়েছিল। সুস্মিতার পাশে উপস্থিত ছিলেন চিত্রনায়িকা দেবশ্রী রায়। দেবশ্রী তো শিহরিত হয়ে গেছিলেন সুস্মিতার থেকে তাঁর জীবন-কাহিনি শুনে এবং দেবশ্রীর কাছে এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করতে পারা ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু ছবির কাজ সেখানেই ইতি। প্রযোজকগোষ্ঠীর সমস্যায়, রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলা ছবিটি আর হয়নি। দেবশ্রীর স্বপ্নপূরণও হয়নি।
ফের মৃত্যু উপত্যকায় প্রত্যাবর্তন
এসব প্রেস মিডিয়া লাইম-লাইটের মাঝে সুস্মিতার ফ্ল্যাটে এসে উপস্থিত হলেন জাঁবাজ। মেয়েদের মন স্বামীর জন্য পাগল। স্বামীকে নিজের ফ্ল্যাটে জায়গা দিলেন সুস্মিতা। আরেক ভুল করলেন সুস্মিতা। জাঁবাজ সেখান থেকে যাতায়াতও করতেন। নিজের লেখা বই জাঁবাজকে উপহার দিয়েছিলেন সুস্মিতা। টাকাপয়সার টানাটানিতে ফ্ল্যাট বিক্রি করে নাগেরবাজারে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন সুস্মিতা। এই সময়ের মধ্যে আফগানিস্তানের ওপরে বেশ কয়েকটি বই লেখেন সুস্মিতা। নাম হয় লেখক মহলে।
২০১৩ সাল নাগাদ ফের একবার আফগানিস্তানে ফেরার কথা ভাবেন সুস্মিতা। তাঁর সমস্ত শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে বারণ করেছিল মৃত্যু উপত্যকায় ফিরতে। কিন্তু আফগান নারীদের উদ্ধার করার স্বপ্ন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল ঐ কারাগারে আবার। অনেকেই বলেছিল এ তো জেনেশুনে আত্মহত্যা। যে কারাগার থেকে, তালিবান মৃত্যুফাঁদ থেকে এত কষ্ট করে সে মুক্তি পেয়েছিল আবার সেই ফাঁদেই সে ধরা দিল। আসলে আফগানিস্তানে একটা স্বাস্থ্যকর্মীর চাকরি পেয়েছিলেন সুস্মিতা, তাই গেছিলেন নাকি। অন্তত সুস্মিতা তাই বলেছিলেন শেষ সাক্ষাৎকারে। আসলে মেয়েরা বরকে ভালোবেসে শ্বশুরবাড়ির জন্য সব করতে পারে। অথচ জাঁবাজ বরটি কোনওদিনই সুস্মিতাকে ভালোবাসেননি বরং তাঁকে ব্যবহার করেছেন। সুস্মিতা যতই মুখে বলুন আফগান মেয়েদের বাঁচাতে, লেখার রসদ খুঁজতে আবার তালিবান অঞ্চলে যাচ্ছেন আসলে কোথাও একটা বরের কাছেই যেন শেষ ফেরা ফিরতে গেছিলেন। কি ভয়ানক ভুল! বোঝেননি সুস্মিতা তালিবানদের ইজ্জত যায়না ধুলে, স্বভাব যায়না মলে। ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০১৩,আফগানিস্তান আফগানিস্তানে তালিবানরা ঢুকে পড়ে সুস্মিতা-জাঁবাজের ঘরে। জাঁবাজকে বেঁধে রেখে সুস্মিতাকে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে তাঁকে একের পর এক তালিবানি দস্যুরা ধর্ষণ করে। পাশের ঘর থেকে মুখ বাঁধা জাঁবাজ চেঁচিয়ে বলতে থাকেন "সাঈদা...সাঈদা ...সাঈদা । ওরা যা বলছে মেনে নাও..." মাথায় পাগড়ি পরা দাড়িওয়ালা ৫-৬ জন নরপশু তখন টানা অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। হাত দিয়ে টেনে মাথার চুল পর্যন্ত উপড়ে নিয়েছে ওরা। সাঈদা ওরফে সুস্মিতা আর শোনবার অবস্থায় নেই। রাইফেলের বাট দিয়ে মারছে, লাথি-ঘুসি চলছে। খুলে নিয়েছে পরনের পোষাক। তবুও ওরা যেমনটা বলছে তার সঙ্গে একমত হননি সুস্মিতা। একসময় গর্জে উঠল তাদের কালাশনিকভ, কুড়িটা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে চিরশান্তিতে চলে গেলেন কলকাতা থেকে এক কাবুলিওয়ালাকে বিয়ে করে আসা বাঙালি মেয়ে সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ওদেশে যার নামকরণ হয়েছিল সাঈদা কামাল! সুস্মিতার মরদেহ ফেলে দিয়ে যায় একটা মাদ্রাসার সামনে। আফগানিস্থানের মাটি ভিজে গেল কলকাতার মেয়ের রক্তে। শেষ হয়ে গেল সুস্মিতার এতদিনের লড়াই। সাতাশ বছর থেকে পঞ্চাশ বছর তালবানদের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হলেন সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নারীমুক্তির যে বীজ সে পুঁতেছিল আফগানিস্থানে তা অনেকটা ধর্মান্ধতা ঘুচিয়ে শিক্ষিত করেছিল আফগান নারীদের। মনীষা কৈরালা দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন সুস্মিতার মৃত্যুসংবাদে। দেবশ্রী রায় দুঃসংবাদ শুনে বলেছিলেন একটাই কথা 'সুস্মিতা দুঃসাহসী'। লেখক সমরেশ মজুমদার বলেছিলেন "এ তো আত্মহত্যার সামিল।" কিন্তু 'কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ' বইয়ের প্রকাশক স্বপন বিশ্বাস বলেছিলেন "আত্মহনন নয় লেখার রসদ খুঁজতেই সুস্মিতা আফগানিস্থানে গেছিলেন।" সুস্মিতার ভাই গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন "ওঁকে বারণ করেছিলাম আফগানিস্থান ফিরে যেতে। ও বলেছিল লেখার রসদ খুঁজতে যাচ্ছি। ওখানকার মেয়েদের অবস্থা এখন কেমন জানতে যাচ্ছি। লেখার টানেই গেছিল। ওঁর ল্যাপটপটা যদি পাওয়া যেত অনেক রহস্য উন্মোচন হত।" সুস্মিতাকে তালিবানরা মেরেছিল কারণ সুস্মিতাকে 'ভারতীয় গুপ্তচর' সন্দেহ করেছিল ওরা। যেহেতু সুস্মিতা আফগানিস্তান ও তালিবানদের গোপন গল্প লেখার মাধ্যমে সারা বিশ্বে প্রকাশ করছিল সেই হেতু ওঁকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়। অনেকে আবার ভাবেন, সুস্মিতা যখন শ্বশুরবাড়ি ফিরল তখন ওঁর স্বামী দেওররা আহত হিংস্র নেকড়ে হয়েছিল। ওঁরাই তালিবানদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সুস্মিতাকে মেরে ফেলেন। পরে অস্বীকার করেন কিছু জানিনার আড়ালে।
সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজীবন বলে গেছেন " আমার মতো ঐ অত্যাচারের শরিক আর যেন কোনও মেয়েকে হতে না হয়। আমি একা নই। আরও বহু ভারতীয় নারী পড়ে আছেন তালিবান রাজত্বে। আজও বহু মেয়ে কাবুলে যাচ্ছেন, ইরান ইরাকে যাচ্ছেন মুসলিম প্রেমিককে বিশ্বাস করে। তাঁদের চোখে থাকে একটা রঙিন স্বপ্ন আর সেই রঙিন স্বপ্ন মুসলিম প্রেমিকরাও দেখায়। কিন্তু মেয়েরা যেন 'কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ' পড়ে যায়। আমি দিনের পর দিন দেখেছি একটা হাজব্যান্ড তাঁর দুদিকে দুটো বৌকে নিয়ে শোয়। এটাই ওদের সামাজিক জীবন। তার যে যন্ত্রণা সেটা একটা মেয়েই বোঝে। অথচ ওদের পরিবারে সেটাই রীতি। প্রতিবাদ করলে বলত ওদের বাড়ির ছেলের অমঙ্গল চাইছি। বহুগামিতাই ওদের একমাত্র ধর্ম। ইসলাম নন।" 'Escape from Taliban' যখন হয় তখন সুস্মিতা বেঁচে। তাই তাঁর শেষ জীবনের লড়াই আর কোন রিলে ধরা নেই। সুস্মিতা তাঁর ভালোবাসার টানে শহীদ হয়েছিলেন আফগানিস্থানে। তবু নতিস্বীকার করেননি তালিবানি জল্লাদদের কাছে। এই কাহিনি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন থেকে উঠে আসা গল্প। আফগানিস্থানের কাবুলিওয়ালাদের একটা রূপ মালুম হয় সুস্মিতার লড়াই পড়ে। তার মানে ছোটো করা নয়, অপমান করা নয়, কলকাতাতে অবস্থানকারী কাবুলিওয়ালাদের। বহু কাবুলিওয়ালা কলকাতায় আধার কার্ড করিয়ে বাংলার পরিচয়ে থাকেন। তাঁরা তো আমাদের প্রতিবেশী, বন্ধু, সহমর্মী। রক্তাক্ত দলিলের চেয়ে বড় হয়ে থাক পেস্তা, আখরোট, কাজুবাদামের গন্ধ আর রহমত কাবুলিওয়ালাদের স্নেহভরা 'খোঁকী' ডাক।