
শেষ আপডেট: 18 February 2021 09:48
নায়িকা বা সহনায়িকার রোল বাদে মায়ের রোল করতে ইচ্ছুক নন বলেই ফিল্ম দুনিয়াকে বিদায় জানান নলিনী এবং দীর্ঘ তিন দশকের বেশি তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন। শুধু ফিল্ম জগতের লোকদের থেকেই নয়, নিজের আত্মীয় প্রতিবেশী সবার থেকেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। বন্ধ হয়ে গেছিল তাঁর বাংলোর সদর দরজা অতিথিদের জন্য। নিজের পোষ্যদের নিয়ে একাকী জীবন কাটিয়ে গেলেন 'গোরে গোরে ও বাঁকে ছোরে' গানে লিপ দেওয়া নায়িকা।
https://youtu.be/5U2OXdvN3FI
মৃত্যুর তিনদিন পর তাঁর প্রয়াণের খবর পায় তাঁর পাড়ার লোকেরা। তাও খবর দেবার মতো কেউ ছিল না। মুম্বাইয়ের পুরনো বাংলো বাড়িতে একাই থাকতেন নলিনী। তাঁর পোষ্য কুকুরেরা মালকিনের মৃত্যু সন্দেহ করে অথবা খিদের তাড়নায় কোনভাবে বাড়ির বাইরে এসে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। সন্দেহ হয় পাড়ার লোকজনের। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। অতঃপর পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে নলিনীর মৃতদেহ উদ্ধার করে। ফরেন্সিক দল জানিয়েছিল অন্তত তিন দিন আগেই তিনি মারা গেছেন। তিনদিন পর এম্বুলেন্সে নলিনীর দেহ দেখতে পায় পাড়ার লোকে। সে দেখাছিল একসময়কার টপক্লাস নায়িকাকে বহুযুগ পর অন্তরাল ভেদ করে নিথর অবস্থায় দেখা।
এই অন্তরাল, স্বেচ্ছা নির্বাসন প্রসঙ্গে এসে পড়বে বাংলার হার্টথ্রব সুচিত্রা সেনের নাম। তফাত যেটা লক্ষণীয়, সুচিত্রা স্বেচ্ছা নির্বাসন নিলেও নিজের মেয়ে মুনমুন সেন, জামাতা ভরত দেববর্মনের সঙ্গেই ছিলেন। যোগাযোগ ছিল বোন, ভগ্নীপতি, বোনঝিদের সাথে। সেন একলাযাপন করেছেন একাকীত্বে ভোগেননি। আর নলিনী ছিলেন নিঃসন্তান, যোগাযোগ রাখেননি আত্মীয়দের সঙ্গে। সুবিধে নেননি, কাজ চাননি ফিল্ম জগত থেকেও। নিজেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা করে তুলছিলেন।
সুচিত্রা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন দেশের সবথেকে বড় সম্মান 'দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার'। কিন্তু নলিনী প্রায় বাইশ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন ভেঙে গ্রহণ করতে আসেন এ সম্মান। নলিনীর মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে তাঁকে জীবন-স্বীকৃতি 'দাদাসাহেব ফালকে সম্মান' এ পুরস্কৃত করা হয়। তারপর আবার নিজের অন্তরাল জীবনে ফিরে গেছিলেন নলিনী।
দাদাসাহেব ফালকে সম্মান নেবার চারদিন আগে নলিনী তাঁর মুম্বাইয়ের চেম্বুরের বাংলোয় বসে তাঁর জীবন ও স্বেচ্ছা নির্বাসন সম্পর্কে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। বলেছিলেন তাঁর রূপোলি পর্দায় আসার গল্প।
নলিনী জয়বন্ত ( ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ – ২০শে ডিসেম্বর ২০১০) তৎকালীন বোম্বেতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন এক কাস্টম অফিসার।
দুই পুত্র ও এক কন্যা নলিনী। নাচেগানে পারদর্শী ছিলেন নলিনী। কত্থকের তালিম নেন গুরু মোহন কল্যাণপুর ও গানের তালিম নেন হীরাবাঈ এর কাছে। নলিনীর বাড়ির নিকটেই ছিল সিনেমা হল, সেখানে সিনেমা দেখার আকাঙ্খা নলিনীর মধ্যে ছিল। ইচ্ছে ছিল সিনেমার নায়িকা হওয়ার, কিন্তু তাঁদের বাড়ি ছিল রক্ষণশীল।
নলিনীর তুতো বোন ছিলেন অভিনেত্রী শোভনা সমর্থ, যিনি নূতন ও তনুজার মা। শোভনা আগেই আসেন ফিল্ম জগতে, যা বেশ অপছন্দের চোখে দেখতেন নলিনীর পিতা।
একবার শোভনার মেয়ে নূতনের জন্মদিনে আমন্ত্রিত ছিলেন সিনেমার পরিচালক প্রযোজক চিমান ভাই দেশাই। তিনি তখন 'রাধিকা' ছবির কাজ শুরু করেছেন। চোদ্দ বছরের নলিনীকে ঐ পার্টিতে দেখে পছন্দ করেন দেশাই। নলিনীর পিতাকে বলেন দেশাই 'আপনার মেয়েকে দিন ছবিতে লিড হিরোইন করব।' সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন নলিনীর পিতা। পরে যদিও দেশাই অনুমতি পান নলিনীর পিতার থেকে। কিন্তু চিনমান ভাই পরিচালক হলেন না, পরে পরিচালনা করলেন তাঁর পুত্র বীরেন্দ্র দেশাই। যিনিই পরে মাত্র সতেরো বছরের নলিনীকে ভালোবেসে বিবাহ করেন। বীরেন্দ্র ছিলেন নলিনীর থেকে অনেকটাই বয়সে বড়। এছাড়াও বীরেন্দ্র আগেই ছিলেন বিবাহিত ও সন্তানের পিতা। কিন্তু আবার বিবাহে তাঁকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নলিনীর সঙ্গে অন্যত্র বাসা বাঁধতে হয়। যদিও মাত্র তিন বছর স্থায়ী হয় নলিনী বীরেন্দ্রর বৈবাহিক জীবন।
নলিনীর চলচ্চিত্রে চলার পথে দ্বিতীয় প্রেম আসে সহঅভিনেতা প্রভু দয়াল। দু’জনে জুটি বেঁধে অভিনয়ও করেছেন বেশ কিছু ছবিতে। বিবাহ ও ফের সংসার।
দেব আনন্দ, অশোক কুমার, দিলীপ কুমারের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন নলিনী জয়বন্ত। অশোক কুমার - নলিনীর 'নাজ' ছবি ছিল প্রথম বিদেশে শ্যুট ছবি।
অশোক কুমারের সঙ্গে নলিনীকে জড়িয়ে প্রণয়-রটনা গুঞ্জরিত হয়েছিল। কিন্তু এ নিয়ে নলিনী কখনও মুখ খোলেননি। দাদামণিকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সব রটনাকে গুজব বলে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
নলিনীর নাম রয়ে যাবে দেব আনন্দের সঙ্গে 'কালা পানি' ছবি দিয়ে, এই ছবিতে সেরা সহঅভিনেত্রীর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন নলিনী।
এছাড়াও 'বহেন', 'সমাধি', 'আঁখে', 'আনোখা প্যায়ার', 'দূর্গেশনন্দিনীর মতো ছবি করেছেন নলিনী।
চল্লিশ আর পঞ্চাশ দশকে ছিল তাঁর রাজত্ব।
নলিনীর রূপের ছটায় ঝড় উঠেছিল প্রথমসারির সমস্ত সিনে পত্রিকায়। বারবার সাহসী ফটোশ্যুটে সেসময় দাঁড়িয়ে ঝড় তুলেছেন নলিনী। ষাট দশকের মাঝামাঝি সরে যান ফিল্মি জগত থেকে। কমে আসছিল ছবির অফারও। ফের প্রত্যাবর্তন ১৯৮৩তে 'নাস্তিক' ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের মায়ের ভূমিকায়। কিন্তু একসময়ের শীর্ষস্থানীয়া অভিনেত্রী মেনে নিতে পারেননা ছবির গুরুত্বহীন মায়ের রোল। তাই চিরতরে আলবিদা জানান ফিল্ম জগতকে।
স্বামী প্রভু দয়ালের মৃত্যুর পর বাড়ি থেকে বেরনো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন নলিনী। নিজের স্টারডম ছেড়ে হয়তো জনসাধারনে মিশতেও পারেননি। ছেড়ে গিয়েছে আত্মীয়রা। একাকী শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন নিজের মুম্বাইয়ের বাংলোতে।
মৃত্যুর সময় পাশে পাননি কাউকে। ছিল শুধু পোষ্যরা।
একাকীত্ব না অবসাদ ! কেন এভাবে শেষ পরিণতি জানা নেই। বাংলা ছবির কণিকা মজুমদার তো স্বামীর মৃত্যুর পর বাড়ি বেচে বৃদ্ধাশ্রমে শান্তিতে সবার সঙ্গেই থাকতেন আনন্দে। সেখানেও প্রবেশ ছিল না মিডিয়ার। কিন্তু অন্তরালপ্রিয়া নলিনী নিজের স্টারডম ঝেড়ে ফেলে সাধারণ জীবনে আসতে পারেননি।
চুরাশি বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় অভিনেত্রীর।
নলিনীর মৃত্যুর পর এক ভাইপো উদয় হয় তিনি দাবী করেন অভিনেত্রীর মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়। মারা গেলে তাঁরা দেহ সৎকার করে বাড়ি তালা দিয়ে দেয়। মিডিয়া রং চড়াতে খবর রহস্যময় মৃত্যু প্রচার করে, তালা দেওয়া বাড়ি দেখে।
কিন্তু নলিনীর প্রতিবেশীদের মত ছিল অন্য। তাঁরা বলেছিলেন 'নলিনীর বাড়ি তাঁদের এককালে যাতায়াত ছিল। কিন্তু নলিনীর স্বামীর মৃত্যুর পর নলিনী একেবারেই নিজেকে গুটিয়ে নেন। কখনই বেরতেন না। দরকারের জিনিষ কিনতে হয়তো এক কর্মচারী বেরতো। সেও শেষদিকে ছিল না। আত্মীয়রা কেউ কখনও আসেনি নলিনীর বাড়ি। এক প্রতিবেশী নলিনীর মৃত্যুর কদিন আগে তাঁকে ঘরের ভিতর জানলা দিয়ে দেখতে পান নলিনী পা খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। কাজের লোক বলেছিল নলিনী পড়ে গিয়ে পায়ে চোট পেয়েছেন। প্রতিবেশী বলেন ডাক্তার পাঠিয়ে সাহায্য করবে। কিন্তু নলিনী কখনও কারও অনুগ্রহ নেননি।
মৃত্যুর তিনদিন পর দরজার ভেঙে উদ্ধার হয় অশীতিপর অভিনেত্রীর মৃতদেহ। ময়নাতদন্তের পর মুম্বাই পুলিশ ঐ আত্মীয় ভাইপোর হাতে তুলে দিয়েছিলেন অভিনেত্রীর দেহ। নলিনীর পারলৌকিক কাজ এই ভাইপো তাঁর নিজের বাড়ি থেকে করেছিলেন। নলিনীর বাংলো আজ আর হয়তো নেই।
এক সময়কার স্বপ্নসুন্দরী নায়িকা, যার রূপে নতমস্তক হত সারা দেশের পুরুষজাতি, তিনি কতটা একাকীত্বে শেষ দিন কাটিয়েছিলেন। খোঁজ রাখেনি কেউ।
তবে 'দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার কমিটি' যে তাঁকে পুরস্কৃত করার কথা ভেবেছিল তা প্রশংসনীয়।
যোগাযোগ ছিল না তনুজা, কাজল দের পরিবারের সঙ্গেও। তাঁর প্রয়াণের খবর শুনে চোখের জল ফেলেছিলেন তাঁর দুই নায়ক দিলীপ কুমার আর দেব আনন্দ।