
শেষ আপডেট: 16 December 2023 23:12
'দেখো রে নয়ন মেলে ,জগতের বাহার
দিনের আলোয়, কাটে অন্ধকার...'
মা লাবণ্য ঘোষাল আর মেজদি গীতা সেনগুপ্তর কাছে প্রথম গানের তালিম নেওয়া শুরু তাঁর। বাড়িতে গানের পরিবেশ বরাবরই ছিল। শিশুমহলে গান করা একদম ছোট্ট থেকে। এত ছোট, যে মাইক্রোফোনের নাগাল পেতেন না। তাই বালিশের ওপর বসিয়ে তাঁকে গান গাওয়ানো হত। নজরুলের গান আঁকড়ে তাঁর বড় হওয়া। কিন্তু সত্যজিতের সিনেমায় গুপী গাইনের লিপে গান গাওয়ার পর সত্যজিতের গায়ক রূপেই জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ নজরুলগীতিতে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। সেখানে তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি ডঃ অনুপ ঘোষাল।
'আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে'
সত্যজিৎ রায় অনুপের গান শুনেই তাঁকে ফিল্মে প্লেব্যাকের সুযোগ দেন। তখন নজরুলগীতি থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রীতিমতো তালিম ছিল অনুপের। যদিও গুপী গাইন বাঘা বাইনে সত্যজিতের প্রথম পছন্দ ছিলেন কিশোর কুমার। কিশোর গুপীর চরিত্রে অভিনয় সহ প্লেব্যাক দুইই করতেন সেক্ষত্রে। কিন্তু তিনি সময় দিতে না পারাতেই কাস্ট বদলালেন সত্যজিৎ। ১৯৬৮ সাল। তপেন চট্টোপাধ্যায়কে ভাবা হল গুপীর রোলে। দরকার পড়ল গুপীর গলায় গান গাওয়ার জন্য একজন সঙ্গীতশিল্পীর। প্রথিতযশা শিল্পীদের কাছে গিয়েও গুপীর গানের শিল্পী কিছুতেই পছন্দ হয় না সত্যজিতের। এদিকে অনুপ ঘোষালের মা ছিলেন সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায়ের বান্ধবী। বিজয়াই অনুপের গান শুনে সত্যজিৎকে বলেছিলেন "আমাদের ঘরের ছেলে অনুপ থাকতে অন্য গায়ক খুঁজতে যাবে কেন?"
অনুপের ডাক পড়ল। তখন তার বয়স ১৯। সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায়ের কথায়, "শাস্ত্রীয়, রবীন্দ্র, নজরুল মিলিয়ে অনুপ ঘোষাল বাবাকে অনেকগুলি গান শোনালেন। বাবা শুনে বললেন "বাহ এ ছেলে তো চমৎকার গান করে!" তবে বাবা অনুপ বাবুর গান আগেই শুনেছেন। কেননা, অনুপবাবুর আগে তাঁর দিদি নমিতা ঘোষাল "চিড়িয়াখানা"য় "ভালবাসার তুমি কী জানো" গানটি গেয়েছিলেন। লেক অ্যাভিনিউয়ে থাকাকালীন সেই সময় থেকেই ঘোষাল বাড়ির সঙ্গে রায় পরিবারের হৃদ্যতা বাড়ে। এরপর তো ইতিহাস।"
'গুপি গাইন বাঘা বাইন' মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৯ সালে। তখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। তখনই ছবিতে সত্যজিৎ রায় ব্যবহার করেছিলেন, " মহারাজা তোমারে সেলাম/ মোরা বাংলাদেশের থেকে এলাম" গানটি।
'এসে হীরকদেশে, দেখে হীরের চমক'
এরপর আশির দশকে 'হীরক রাজার দেশে' ছবিতেও অনুপ ঘোষালের গান মারকাটারি হিট। যে গানের ভাষা বাঙালি আগে শোনেনি। বিপ্লবের কথা এত সহজভাবে সব শ্রেণির মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলা যায়, আট থেকে আশির প্রথম পছন্দের করে তোলা যায়, দেখালেন সত্যজিৎ। অনুপের কণ্ঠ শুনে লোকে বলাবলি করতেস শুরু করল, প্লেব্যাকে অনুপের কণ্ঠ যেন হেমন্ত আর কিশোরের কণ্ঠের মিশ্রণ।
এরপর সন্দীপ রায় যখন 'গুপী বাঘা ফিরে এলো' করলেন, তখনও গুপী তপেন চট্টোপাধ্যায়ের লিপে অনুপ বিশাল হিট। তিন যুগে গুপী-বাঘা সাদা-কালো থেকে রঙিন হয়েছে, প্রজন্ম বদলেছে, তবু ছবির গানের জনপ্রিয়তা কমেনি। অনুপ ঘোষালের কণ্ঠেও কখনও ক্লান্তির ছাপ পড়েনি। রক গানের জাদুকর রূপম ইসলাম এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, "'হীরক রাজার দেশে' ছবির গান আমায় নাড়িয়ে দিয়েছিল সেই ছোটবেলায়। ১৯৮০ সালে বেরোনো রেকর্ড আমি বাড়িতে বারবার চালিয়ে শুনতাম। এগুলোই প্রতিবাদের গান।
"নহি যন্ত্র নহি যন্ত্র, আমি প্রাণী
আমি জানি।"
সংলাপধর্মী গান অনুপ ঘোষালের কণ্ঠে এই ছবিতে আরও অনেকভাবে সত্যজিৎ রায় ব্যবহার করেছেন,
"না না না … আর বিলম্ব নয়, আর বিলম্ব নয়!
এখনও মোদের শরীরে রক্ত
রয়েছে গরম মেটেনি শখ তো
আছে যত হাড় সবই তো শক্ত
এখনও ধকল সয়।"
প্রয়োজনের তাগিদেই গানগুলো এসেছে। সাজিয়ে রাখার জন্য নয়।
'ধরো নাকো ধরো নাকো সান্ত্রীমশাই, হাত কেন বাড়াও ভাই', 'পায়ে পড়ি বাঘ মামা কোরনা কো রাগ মামা– তুমি যে এ ঘরে কে তা জানত?' গানই গল্পকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সত্যজিৎ রায়ের গান আজও আমার প্রধান অনুপ্রেরণা। এ গান মানুষের জীবনে কাজে লাগবে। মানুষের জীবনের কথা বলবে গান।
গানের কী দুরন্ত আধুনিক অ্যাপ্রোচ, যা চিরকালই প্রযোজ্য। তখন আমার ছ'বছর বয়স। এসব গান শুনে পুরো মাথা বাঁইবাঁই করে ঘুরে গেছিল। আমি রোজ 'হীরক রাজার দেশে'র গান চালিয়ে শুনতাম। এখান থেকেই আমার মনের মধ্যে আমার নিজের গানের রসদ তৈরি হতে থাকে।"
'ফুলে ফুলে বঁধু দুলে দুলে অলি বাজায় সানাই'
তবে শুধু সত্যজিতের গানেই নয়, বাংলা ছবিতে তরুণ মজুমদারের ফুলেশ্বরীতে অনুপ গেয়েছেন 'হ্যাঁদো গো পদ্মরাণী', তপন সিনহার 'সাগিনা মাহাতো'তে 'ছোটি সি পঞ্ছি, 'হারমোনিয়াম' ছবিতে 'সে ভালবাসিলে জীবনে মম', অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের 'নায়িকার ভূমিকায়' 'এক যে আছে কন্যা', বা 'হারায়ে খুঁজি' ছবিতে 'ফুলে ফুলে বঁধূ দুলে দুলে', হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে অনুপ গাইলেন 'সুবর্ণ গোলক' ছবিতে 'কৃষ্ণ পক্ষ শুক্ল পক্ষ'। হেমন্ত-মান্নার জমানায় অনুপ সেভাবে লিড হিরোর লিপে গান না পেলেও যে কটি গান গেয়েছেন সেগুলো বাংলা ছবির গানের ইতিহাসে রয়ে যাবে। বেশিরভাগই শ্রোতাদের মনে আজও উজ্বল। সাগিনা মাহাতো, মাসুম(হিন্দি), গুপী বাঘা ফিরে এলো ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ গায়কের বিএফজেএ পুরস্কার পেয়েছিলেন। হীরক রাজার দেশে ছবিতে গান গেয়ে পান জাতীয় পুরস্কার। দীনেন গুপ্তর 'মর্জিনা আবদাল্লা'-তে সলিল চৌধুরীর সুরে রবি ঘোষ আবদাল্লার লিপে অনুপের কণ্ঠে 'ছিঃ ছিঃ ইত্তা জঞ্জাল' , আজও যেন প্রবাদবাক্যর মতো হিট।
'তুঝসে নারাজ নেহি জিন্দেগি হ্যায়রান হুঁ ম্যায়..'
সত্যজিৎ রায় কিশোর কুমারকে বলেছিলেন অনুপকে দিয়ে যদি বম্বেতে গান গাওয়ানো যায়। আরডি বর্মণ যখন 'মাসুম' ছবির গান 'তুঝসে নারাজ নেহি জিন্দেগি হ্যায়রান হুঁ ম্যায়..' তৈরি করছিলেন, তখন কিশোর কুমারকে দিয়ে তা গাওয়ানোর কথা ভেবেছিলেন। কিশোর আরডিকে বলেন সত্যজিৎ রায়ের ছবির গায়ক বাংলার অনুপ ঘোষালকে দিয়ে এই গান গাওয়াতে। তাঁর অনুরোধ রাখেন আরডি। অনেকটা কিশোরের প্রেরণা থেকেই শেখর কাপুরের মাসুম ছবিতে অনুপ গানটি গাইলেন। একই গান ছবিতে লতা মঙ্গেশকরও গেয়েছিলেন। একই ছবিতে গেয়েছিলেন বাংলার আরতি মুখোপাধ্যায়ও। আরতি ফিল্মফেয়ার পান। তবে আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে গাইলেও অনুপ যদিও বম্বেতে আর জনপ্রিয়তা পাননি।
ভক্তিগীতি থেকে ছোটদের গানেও আট থেকে আশি সবার প্রিয় ছিলেন অনুপ ঘোষাল। আবার নজরুলগীতিতে তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠান। নজরুলের গানের স্বরলিপি থেকে গায়কিতে ডঃ অনুপ ঘোষালের পরিপূরক সম্ভবত আর কেউ হবে না।
'আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়'
অনুপ ঘোষালের সম্পর্কে হৈমন্তী শুক্লা জানিয়েছেন, "ভুল নজরুলগীতি গাইলে অনুপ ভীষণ রেগে যেত। এতটাই কড়া ছিল অনুপ শিক্ষক হিসেবে। 'মনসামঙ্গল' নাটকে বা 'জীবন সাথী' ছবিতে আমি আর অনুপ একসাথে গেয়েছিলাম। আমাকে বোনের মতো স্নেহ করত। অনেকেই জানে না অনুপ কড়া শিক্ষক হলেও ওঁর ভিতর স্নেহ খুব ছিল। আর ওঁর রান্নার হাত খুব ভাল ছিল। ওঁর বাড়ি গেলেই রান্না করে নানা পদ খাওয়াতেন। অনুপের হাতের সর্ষে ইলিশের ঝাল কখনও ভুলব না।"
'এ যে বিনা মেঘে পড়ে বাজ, কেঁচে বুঝি গেল কাজ'
অনুপ ঘোষালের নামেই নানা কুকথা রটেছিল বাজারে। তাঁর অতিঅহংকার নিয়ে নানা কাহিনি চালু ছিল। অনুপের ব্যবহার নাকি খুব খারাপ, টাকার কাঙাল, এমনকী মুখের ওপর কথা বলে মানুষকে অপমান করতেও নাকি তিনি পিছপা হতেন না। এই নেতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে অনুপ ঘোষালকে ফাংশান উদ্যোক্তারা ডাকতে ভয় পেতেন। অনুপ ঘোষালের সঙ্গে তাঁর প্রিয় পোষ্য কুকুরের একটা গল্প বাজারে খুব চালু ছিল। গল্পটা হল, অনুপ ঘোষালের কাছে নাকি একবার এক ফাংশান উদ্যোক্তারা এসেছিলেন। তাঁরা অনুপকে পারিশ্রমিক কতটা দিতে পারবেন সেটা নিয়ে কথা বলছিলেন। অনুপ বেশ বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক দাবি করেছিলেন বলে শোনা যায়।
'আপনি কি যাবেন?' উদ্যোক্তারা জিজ্ঞেস করেছিলেন। সেটা শুনে অনুপ ঘোষাল নাকি তাঁর পাশে বসা কুকুরকে ফাংশান উদ্যোক্তাদের সামনেই জিজ্ঞেস করেছিলেন "কী রে তুই এই টাকায় ফাংশানে গান গাইতে যাবি?" অনুপের কাছে কোনও অনুষ্ঠান উদ্যোক্তারা গেলেই নাকি অনুপ কুকুরকে প্রশ্ন করতেন। এতই তাঁর টাকার চাহিদা আর অহংকার ছিল। শুধু তাই নয়, তাঁর নামের আগে ডঃ না বললে তিনি ভীষণ ভৎর্সনা করতেন।
যদিও অনুপ ঘোষালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রদীপ্ত রায় উল্টো কথা জানিয়েছেন। প্রদীপ্ত রায় গীতিকার-কবি প্রণব রায়ের ছেলে। প্রদীপ্তর দাবি, "অনুপদাকে নিয়ে এই কুকুরের গল্পটা একেবারেই ফেক। কারণ অনুপদার বাড়িতে কোন কুকুরই ছিল না। এমনকী অনুপদা কুকুরে খুব ভয় পেতেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি কোনদিনও অনুপদার বাড়িতে কুকুর ছিল না। আমার ওই বাড়িতে অবারিত দ্বার ছিল। আমি বহুবার অনুপদার বাড়ি গেছি, কখনও কুকুর পুষতে দেখিনি। অথচ কুকুরের গল্প তাঁকে নিয়ে বাজারে কীভাবে যেন ছড়িয়ে গেছিল। যেটা একেবারেই মিথ্যে। অনুপদা লাজুক কিন্তু আন্তরিক মানুষ ছিলেন। একবার একটা এল পি রেকর্ডের গানের ব্যাপারে অনুপদার বাড়ি গেছি। উনি সোজা রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। নিজে হাতেই আমার জন্য বানিয়ে আনলেন ডিমের অমলেট। বললেন "পেটে কিছু না পড়লে কাজের কথা হয় না।" তখন অনুপদা নামকরা শিল্পী, ওঁর নিজে গিয়ে ডিমের অমলেট করার কোনও দরকার ছিল না। কিন্তু উনি করেছিলেন।"
নেগেটিভ প্রচার যেন অনুপ ঘোষালের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন শেষ দিকে, কিন্তু সেখানেও তিনি ব্রাত্যই রয়ে গিয়েছিলেন। অথচ বর্তমান সময়ের বহু জনপ্রিয় গায়কের তুলনায় অনুপ ঘোষালের গান বাংলার সেরা গানের তালিকায় থাকবে। হীরক রাজার দেশের গান আর কোনও শিল্পীই রিমেক করলেও অনুপের বিকল্প হবে না। অথচ অনুপ তাঁর প্রতিভার সম্মান পাননি। তৃণমূলের বিধায়ক হবার পরেও তাঁর নামে নানা কথা রটেছিল। কিছুটা হলেও তাঁকে দল থেকেও ব্রাত্য করে দেওয়া হয়েছিল বলে শোনা যায়।
ডঃ অনুপ ঘোষাল, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী, নজরুলগীতির একজন স্তম্ভ হয়েও মৃত্যুর সময়েও অবহেলিতই রয়ে গেলেন। জীবিত অবস্থাতেও প্রাপ্য কদর পাননি। তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনে অনেকেই চমকে উঠেছেন। কিন্তু তাঁরা জানেন না, প্রবাদপ্রতিম এই শিল্পী জীবন সায়াহ্নে দীর্ঘদিন পড়ে ছিলেন দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক জগতের কাউকেই সেখানে গিয়ে একটিবার গায়কের সঙ্গে দেখা করে আসতে দেখা যায়নি। অনুপ নিজেও হয়তো আর শেষ দাক্ষিণ্যটুকু চাননি! একেবারেই নীরবে নিভৃতে সকলের চোখের আড়ালে চিরঘুমের ঠিকানায় হারিয়ে গেলেন 'গুপী'।
'গঙ্গা সিন্ধু নর্মদা কাবেরী যমুনা ঐ
বহিয়া চলেছে আগের মতই,
কই রে আগের মানুষ কই॥
মৌনী স্তব্ধ সে হিমালয়
তেমনি অটল মহিমাময়
নাই তার সাথে সেই ধ্যানী ঋষি,
আমরা তো আর সে জাতি নই॥'