
শেষ আপডেট: 21 August 2020 08:32
মাস্টার অরিন্দম গান করছে, মা হারমোনিয়ামে।[/caption]
প্রথম গান তুললাম 'ও শামু শ্যাম রে' গানটা। গানটা তোলার পরে এইচএমভি বলতে শুরু করল 'একে তো নতুনদের নিয়ে ছবি তার ওপর নতুন কেউ গাইলে বিক্রি করা মুশকিল। নামী বিখ্যাত শিল্পীকে দিয়ে না গাওয়ালে চলবে না।' তখন আরতি মুখোপাধ্যায় এলেন। হংসরাজের গানগুলো গাইলেন। উনি তো প্রণম্য শিল্পী, খুবই ভাল গাইলেন, কিন্তু আমার তো খুব কান্না পাচ্ছিল। তখন পরিচালক অজিত গাঙ্গুলি আমায় ডেকে বলেন 'তোর তো এই ছবিতে গান গাওয়া হল না কিন্তু আমি হংসরাজের জন্য নতুন মুখ খুঁজে পাচ্ছি না। তাই তুই হংসরাজের পার্টটা কর।' আমার আবার ওই ছোট বয়সেই খুব আত্মসম্মান ছিল। তাই না করে দিলাম। তখন আমার মা অনুভা গঙ্গোপাধ্যায় আমায় বললেন 'তোকে এখান থেকে গানে বাদ দেওয়া হল তুই এই ছবিতে অভিনয়টাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নে।' সেই চ্যালেঞ্জই নিলাম, এবং হংসরাজ ইতিহাস হয়ে গেল।"
https://youtu.be/dBPU74EUzkI
'ও শামু শ্যাম রে' গানটি যদি এখনও শোনা যায়, সেই মেঠো সুর মুক্ত বাতাসে অনুভূত হয়। আরতি মুখার্জী অসাধারণ গেয়েওছিলেন। কিন্তু তখন আমজনতার অনেকেই ভাবত গানগুলো অরিন্দমই গেয়েছেন। কারণ হংসরাজ যখন সুপারহিট হয়, তখন অরিন্দমের পাবলিক প্রোগামও প্রচুর বেড়ে যায়। তখন অরিন্দম সব গান নিজ কণ্ঠেই গাইতেন। এই গাওয়াও এখনও জনপ্রিয়।
হংসরাজ ছিল খুব কম বাজেটের ছবি। প্রধান চরিত্ররা সব ছোট বাচ্চা। পথে ঘাটে ঘুরে অথবা কারও বাড়িতে শ্যুট করা হয়। আর ইনডোর শ্যুট ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে। তবে আউটডোরগুলো বোলপুরে খুব ভাল করে করা হয়েছিল। সেই লো বাজেট, স্টারবিহীন ছবি, বাউল অঙ্গের গানের ছবি অরিন্দম গাঙ্গুলিকে স্টার বানিয়ে দিল। অরিন্দমের জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে যায় যে পুলিশ ব্যারিকেড করে অরিন্দমকে পাবলিক প্রোগামে নিয়ে যাওয়া হত। গ্রামে গঞ্জের শো-তে এই পুলিশি পাহারা আরও জোরদার করা হত কারণ বিপুল জনতার ঢল নামত শুধুমাত্র পর্দার হংসরাজকে সামনে থেকে দেখার জন্য।
[caption id="attachment_252223" align="aligncenter" width="1280"]
মা ও তোচন ঘোষের সঙ্গে শ্রীমান অরিন্দম।[/caption]
আজকাল কোনও শিশুশিল্পী এমন জনপ্রিয়তা ভাবতেও পারে না। অরিন্দম তখনও মাটিতে পা রেখে চলতেন, আজও তাই চলেন। তাঁর মা বাবার শিক্ষা ছিল সেরকমই। বড় কাজ করো, কিন্তু বড় ভাব দেখিও না। তাই অভিনয় জীবনের পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও আজও এই তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা, পুলিশ ব্যারিকেডের কথা বলতে কুণ্ঠা বোধ করেন হংসরাজ।
মনে পড়ে হংসরাজের আরও একটা বিখ্যাত গান 'টিয়া টিয়া টিয়া, অজ পাড়াগাঁয়ে থাকে, ট্যারা চোখে তাকায় টিয়া নোলক পরা নাকে'। শ্যামশ্রী মজুমদারের কণ্ঠে এ গান ভোলা যায় না। টিয়ার চরিত্রে স্বর্ণালী গাঙ্গুলি হলেন অরিন্দম গাঙ্গুলির নিজের বোন। বিয়ের পরে স্বর্ণালী নাগ। ওঁদের আর এক বোন ছিলেন বর্ণালী, তিনিও শিশুশিল্পী হিসেবে অনেক ছবি করেছেন।
https://youtu.be/8nsKGjOCzrk
স্বর্ণালী বলছিলেন, "আমি তখন এত ছোট ছিলাম যে কিছু বুঝতাম না। যা বলত করে দিতাম। হংসরাজ আমারও প্রথম ছবি নয় কিন্তু। আমার প্রথম ছবি 'শচী মাতার সংসার'। হংসরাজ ছ'নম্বর ছবি। এটা মনে আছে আমি, দাদা, শামুদা আমরা সবাই প্রথম দিন অজিত গাঙ্গুলির বাড়ি দেখা করতে গেছিলাম। আমি একটু বেশি সেজেগুজে গেছিলাম, সিনেমা বলে কথা। তো অজিত মামা বলেছিলেন 'এত সাজ লাগবে না আমার। গ্রামের মেয়ের নোলক পরা সাজ লাগবে।' তার পরে তো টিয়া আইকনিক চরিত্র হয়ে গেল। অনেকেই জানত না আমি দাদার বোন। তখন হংসরাজের পরে দাদা প্রচুর ফাংশন, উদ্বোধন পেত। অর্গানাইজাররা আমাদের বাড়িতে এসে যদি দেখত আমিও রয়েছি, তখন জানতে পারত ভাই-বোনের কথা। তখন আমাদের দুজনকেই ফাংশনে আমন্ত্রণ জানাত। আজও অনেকে চিনতে পারলে আমার মুখে টিয়ার সারল্য খুঁজে পায় বলে। সেটাই প্রাপ্তি।"

প্রতিবেদকের সঙ্গে শামু, হংসরাজ এবং টিয়া।[/caption]
হংসরাজের ডনি কে নিয়ে আরও একটা দারুণ গল্প বললেন অরিন্দম। "ছবির শেষের দিকে একটা সিকোয়েন্স ছিল, প্রতিযোগিতায় গান গাইতে দেওয়া হবে না বলে হংসরাজকে ছাদের ওপর বন্দি করে রেখেছে ডনি। ওই শটটা নেওয়ার সময় এক জন গুন্ডা আমায় কাঁধে তুলে রেখেছে। আর ডনি ‘অ্যাই চুপ কর, চুপ কর’ বলে চেঁচামেচি করছে। হঠাৎ ও শটটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে বলে আমায় মারল এক ঠাঁটিয়ে চড়। ‘ঠাস’ করে বিকট একটা আওয়াজও হল। আচমকা চড়টা আমার চোখের ওপর এসে পড়ল। আমি তো চোখে অন্ধকার দেখছি। কোনরকমে আমি শটটা শেষ করলাম। কিন্তু তার পরই চোখ চেপে বসে পড়লাম। চোখ ফুলে লাল। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ইন্দ্রপুরীর ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে চা-পাতার গরম সেঁক দেওয়া হল, যাতে ফোলাটা একটু কমে, আর পরের শটগুলো করতে পারি। এ দিকে ডনি তখন অপরাধবোধে ভুগছে কেন অতি উৎসাহী হয়ে এসব করতে গেল! আমি ছোটবেলা থেকেই ভেজিটেব্ল চপ খেতে ভালবাসতাম বলে অনুশোচনার ঠেলায় ও তাড়াতাড়ি আমার জন্য চপ কিনে আনল।"
হংসরাজকে দেখার জনপ্রিয়তা তখন তুমুল। আজও অরিন্দম গাঙ্গুলি মানেই হংসরাজ। তার পরে শর্মিলা ঠাকুর, অমল পালেকার অভিনীত 'মাদার' ছবি করেও অরিন্দম জনপ্রিয় হন। এই জনপ্রিয়তাও এক বিড়ম্বনা। অরিন্দম বলছিলেন, "আমার দাদার মতো একজন ছিলেন, ব্রজদা। ওঁদের বাড়িতে রসুলপুরে একটা বিয়ে উপলক্ষে আমরা গেছি। বাড়িতে কত বসে থাকব, তাই আমি, মা, বাবা আর বোন বেরিয়ে একটা চায়ের দোকানে এসে বসেছি। সেখানে এমন ভিড় হয়ে যায় আমায় আর বোনকে দেখে, যে সেই চাওয়ালার দোকান, গ্লাস, শিশি ভেঙে যাচ্ছেতাই অবস্থা। সে চাওয়ালাও প্রচণ্ড রেগেও যান। এ রকমও হয়েছে, আমি বালুরঘাটে একটা অনুষ্ঠান করতে যাব, তাই আগে থেকে বালুরঘাটের সব স্কুল-কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। রাতে ট্রেনে জেগে ভোরে বালুরঘাট পৌঁছেছি। এইবার মন্দিরে ঠাকুর দেখার জন্য যেরকম লাইন পড়ে, ওই সকাল থেকে বিশাল লাইন। আমি সারাদিন ধরে অটোগ্রাফ দিয়েই চলেছি, আর আমায় সবাই দেখেই চলেছে।"
[caption id="attachment_252224" align="aligncenter" width="1203"]
মাদার ছবির শ্যুটিংয়ে অরিন্দম।[/caption]
হংসরাজ করে অরিন্দমের সাফল্য, নাম, যশ যেমন আসে, তেমনই আসে পুরস্কার। এই নিয়েও গল্প বললেন হংসরাজ অরিন্দম নিজেই। "তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার চলচ্চিত্র পুরস্কার দিত। সিদ্ধার্থশংকর রায় মুখ্যমন্ত্রী। সুব্রত মুখোপাধ্যায় ছিলেন তথ্যমন্ত্রী। এক দিন রেডিওতে খবর শুনছি। তখন আটটায় স্থানীয় সংবাদ হত। টেলিভিশনের চল তো হয়নি, রেডিওই সব। খবর পড়ছেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। তখনকার বিখ্যাত সংবাদ পাঠক ছিলেন। 'খবর পড়ছি পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়' এরকম বলতেন। খবরে শুনলাম চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। নামগুলো শুনতে শুনতে হঠাৎ শুনি শ্রেষ্ঠ শিশু অভিনেতা হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে হংসরাজ ছবির জন্য শ্রীমান অরিন্দম। কী যে লাফিয়েছিলাম সে দিন! রেডিও থাকত উঁচুতে। আমি বসতাম মাটিতে বাবু হয়ে। খেলা পাগল ছিলাম। ফুটবল ক্রিকেট অলিম্পিকের কমেন্ট্রি শুনতাম মাটিতে বসে। তো পুরস্কার পেয়েছি শুনে লাফিয়ে উঠে মাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম।"
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যে রবীন্দ্র সদনে সেবার পশ্চিমবঙ্গ সরকার চলচ্চিত্র পুরস্কারে অরিন্দম পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ শিশু অভিনেতার পুরস্কার আর শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী, 'মৃগয়া' ছবির জন্য। প্রথম মিঠুন চক্রবর্তী আত্মপ্রকাশ করলেন এই ছবিতে ও সেরা অভিনেতার প্রথম পুরস্কার পেলেন।"
