
শেষ আপডেট: 10 May 2023 14:58
চৈতালি দত্ত
একটু বেশি মোটা কিংবা বড্ড রোগা শরীর নিয়ে কতই না ছুঁৎমার্গ! আর স্থূলকায় হলে তো কথাই নেই। কখনও 'ঢেপসি' আবার কখনও 'হাতির মতো মোটা' কত রকমই না বন্ধু-বান্ধব থেকে আশপাশের মানুষের টিপ্পনি শুনে হীনমন্যতায় ভোগেন স্থূলকায় মানুষেরা। এবারে যাঁরা প্রতিদিন আপনাকে মোটা বলে তাঁদের উপযুক্ত জবাব দিতে আপনিও বলতে পারেন, 'মোটা হতে পারি কিন্তু আমাদের জীবন ফাটাফাটি।' আর এই বডিশেমিং-এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন পরিচালক অরিত্র মুখোপাধ্যায়। তাই নিয়ে উইন্ডোজ ব্যানারে ছবি 'ফাটাফাটি' (upcoming movie Fatafati) মুক্তি পাবে ১২ মে। তার আগেই দ্য ওয়াল-এর সঙ্গে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে (exclusive interview of Fatafati director) নানা কথা জানালেন পরিচালক অরিত্র।
আপনাকে সামাজিক বার্তাবাহী ছবি পরিচালনা করতেই দেখা গেছে বেশিরভাগ। এই ধরনের ছবি পরিচালনাতেই কী আপনি স্বচ্ছন্দ?

ঠিক সেরকম নয়। ছবির মাধ্যমে মানুষের কাছে কোনও ইস্যু তুলে ধরতে আমি পছন্দ করি। যদি সমাজের কাছে সেটা গ্রহনীয় হয় তবে আমার খুব ভাল লাগে। আমার আগের দুটো ছবি ইস্যুভিত্তিক হলেও একটা গল্প ছিল। এবারেও তাই। ফাটাফাটি ছবিতে ইস্যু থাকলেও একটা মধ্যবিত্তের স্ট্রাগলের গল্প রয়েছে। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি 'ব্রহ্মা জানেন…' ছবিতে মহিলা পুরোহিতদের নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজও যদি কোনও মহিলা পুরোহিত কোথাও পুজো করেন আমাকে সামাজিক মাধ্যমে তাঁরা জানান এবং ছবি পাঠিয়ে লেখেন, 'দাদা, আমরা কিন্তু নিয়ম ভাঙলাম।' তখন কিন্তু সেটা খুবই আনন্দ দেয়। তবে হ্যাঁ অন্য জঁরের গল্প নিয়ে কাজ করার অবশ্যই ইচ্ছে আছে। সেই নিয়ে আমার এবং জিনিয়ার মাথার মধ্যে নানা রকম চিন্তা ভাবনা রয়েছে।
এই ছবির পর মোটা দেখলেই যাঁদের টিপ্পনি কাটা কিংবা টিটকিরি দেওয়ার স্বভাব সেটা আদৌ বদলাবে বলে মনে হয়?
এক্ষেত্রে একটা কথা বলব, ছবিটা দেখার পর অন্তত কোনও মহিলাকে টিপ্পনি কাটার আগে একবার কেউ ভাববেন। আর যিনি বডি শেমিং-এর শিকার হন তাঁর এই ছবি দেখে মনোবল, আত্মবিশ্বাস বাড়বে এইটুকু বলতে পারি।
গল্পের মূল ভাবনার উৎস কোথায়?

এই ছবির কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার জিনিয়াকে ছোটবেলায় 'কোন রেশনের চালের ভাত খাস', 'তুই খুব মোটা হয়ে গেছিস হাতির মতো'-- এরকম এক-দু'বার শুনতে হয়েছে। এখান থেকেই গল্পের ভাবনা শুরু। যখন জিনিয়া আমাকে বডিশেমিং নিয়ে গল্পের কথা বলে তখন আমারও ভাল লাগে। কারণ আমি যখন বিয়ে করি তখন আমার স্ত্রীর ওজন ছিল ১০০ কেজি। সেই সময় আমাকে অনেকে বলেছেন, 'আর মেয়ে পেলি না এই হাতির মতো মোটা মেয়েকে বিয়ে করলি!' তাই জিনিয়ার গল্পের বিষয় আমার খুব কাছের মনে হয়। যেহেতু এই বিষয় সম্পর্কে আমি অবগত। এটাও তো ঠিক, প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশের মানুষজন, বন্ধু-বান্ধব প্রায়ই বডিশেমিং-এর শিকার হন। সেখান থেকেই গল্পের ভাবনা।
অস্ট্রেলিয়ায় এই ছবির প্রথম শো হাউসফুল, এতে কতটা খুশি পরিচালক হিসেবে?
এটা সত্যিই ভাল লাগছে বিদেশে প্রথম শো হাউসফুল। একটা শো-র জন্য ওঁরা বুক করেছিলেন, সেটাই হাউসফুল। ওখানে ২১ মে দেখানো হবে। ভারতবর্ষেও যেখানে যেখানে এই ছবি মুক্তি পাবে সেই প্রতিফলন হলে তবেই আনন্দের।
উইন্ডোজের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে পরিচালক হিসেবে নিজের পরিচিতি তৈরি করতে কী আপনার একটু বেশি সময় লাগছে?

সেটা আমার কখনএই মনে হয়নি। কারণ ভারতবর্ষের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সফল পরিচালক প্রযোজক নন্দিতাদি, শিবুদা। যশরাজ ব্যানারে ছবি মুক্তির আগেই আমরা কিন্তু প্রথমে ব্যানারের কথা বলি, পরে পরিচালক নিয়ে আমরা আলোচনা করি। তবে এটাও ঠিক, যে পুরো টিম নিয়ে আমরা কাজ করছি যদি আমরা ভাল ছবি তৈরি করতে পারি তবে একটা ব্র্যান্ড তৈরি হবে। তখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবেন যে এঁরাও ভাল ছবি তৈরি করতে পারেন। নন্দিতাদি শিবুদা এত বছর ধরে দর্শকদের ভাল ছবি উপহার দিয়ে আসছেন। এতদিন মে মাসে নন্দিতা দি শিবুদা পরিচালিত ছবি উইন্ডোজ ব্যানার থেকে মুক্তি পেলেও এই প্রথম তার ব্যতিক্রম ঘটতে চলেছে। ওঁরা যে আমাদের পুরো টিমকে ভরসা করেছেন এটা তো বিরাট প্রাপ্তি। এই প্রথম উইন্ডোজ ব্যানারে অন্য কোনও পরিচালকের ছবি মে মাসে মুক্তি পাবে। আর এটাই তো নন্দিতাদি শিবুদার মানবিক দিক যে পরের প্রজন্মকে তাঁরা নির্দ্বিধায় এগিয়ে দিতে পারেন। নন্দিতাদি শিবুদার মতো এরকম মনের মানুষ খুবই কম।
প্রথমে ফাটাফাটি ছবির মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল অপরাজিতা আঢ্যর। পরবর্তী সময়ে সেই জায়গায় আসেন ঋতাভরী। এই বদলের কারণ কী?

এটা একেবারেই গোড়ার দিকের ব্যাপার ছিল। এরপর ২৬টা ড্রাফ্ট পরিবর্তন হয়েছে। গল্পটা পরিবর্তন হতে হতে যখন একটা জায়গায় গিয়ে ফাইনাল হয়, তখন আমাদের মনে হয় একজন অল্পবয়সির শরীরের ওজন নিয়ে খোঁটা শোনা অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু ৪০-৪২ বছরের বয়সে গিয়ে সেটা কিন্তু গা সওয়া হয়ে যায়। আমি নিজের স্ত্রীর ক্ষেত্রে সেটা দেখেছি। তখন আমরা সেই রকম অভিনেত্রীকে খুঁজতে থাকি। সেই সময় হঠাৎই ঋতাভরী এক পুজো উদ্বোধন করতে আসে। সেই পুজোমণ্ডপে আমরাও ছিলাম। তার আগে আমরা শুনেছিলাম যে অস্ত্রোপ্রচারের পরে ওর ওজন একটু বেড়ে গেছে। কিন্তু ওকে সামনে দেখে সত্যি আমরা চমকে যাই। তখন ওকে দেখেই মনে হল যে এ তো আমাদের সত্যিকারের 'ফুল্লরা'। যেটা আমাদের চরিত্রের নাম। তারপর এই ছবির জন্য আরও কুড়ি কেজি ঋতাভরী ওজন বাড়ায়। এছাড়া অন্য আর কোনও কারণ নেই।
আপনার পরিচালনা, আপনার প্রধান সহকারী পরিচালক দীপায়ন সাহা, জিনিয়ার কাহিনি, চিত্রনাট্য এবং সম্রাজ্ঞী মুখোপাধ্যায়ের সংলাপ-- এই নিয়ে আপনাদের টিমের এটি তিন নম্বর ছবি হতে চলেছে অর্থাৎ হ্যাটট্রিক। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?
এটা তো ভীষণ আনন্দের ব্যাপার। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে একটা জুটি বা টিম টিকিয়ে রাখা ভীষণ কঠিন। আমরা একে অপরকে ভাল করে বুঝতে পারি। দর্শক যদি এই ছবিটাকে সাদরে গ্রহণ করে সেটাই আমাদের সকলের সার্থকতা। আশা করি দর্শকদের এই ছবিটা ভাল লাগবে। কারণ এই সমস্যা আমাদের ঘরে ঘরে। রোগা, মোটা, লম্বা, বেঁটে, কালো, ফর্সা-- মানুষকে নানা ধরনের বডিশেমিং-এর শিকার হতে হয়।
নন্দিতা রায় শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁদের প্রযোজনা সংস্থা উইন্ডোজ ব্যানারে যখন একজন পরিচালক হিসেবে কাজ করেন, তখন তাঁরা পরিচালনার ক্ষেত্রে কতটা হস্তক্ষেপ করেন?

গল্পটা তৈরির প্রথম থেকেই তাঁরা থাকেন। তাঁরা গল্প, চিত্রনাট্য শোনেন, মতামত দেন। দৃশ্য নিয়ে আমরা আলোচনা করি। এঁদের সবচেয়ে ভাল দিক নিজেদের মতামত সেটা কিন্তু কখনও আমাদের চাপিয়ে দেন না। কাজে ওঁরা পূর্ণ স্বাধীনতা দেন। এছাড়া দিদি, দাদা ছবি শুরুর দিকে একদিন নাহলে শেষের দিকে একবার শ্যুটিং ফ্লোরে যান। দরকার ছাড়া ওঁরা ফ্লোরে যান না। এমনও হয়েছে বৃষ্টির কারণে দু'ঘন্টা নষ্ট হয়ে গেছে। যেরকম চেয়েছিলাম শ্যুট সেরকম হয়নি, আরেকদিন হলে ভাল হত। সেই কথা শোনা মাত্র তখনই অনুমতি দিয়ে দেন। ছবির ভালর জন্য তখন ওঁরা খরচ নিয়ে ভাবেন না।
'মোটা হতে পারি কিন্তু আমাদের জীবন ফাটাফাটি'… এই সংলাপ এখন লোকের মুখে মুখে। এর মানে কী?
আমাদের চেহারা যাই হোক না কেন আমাদের স্বপ্নটা যেন সব সময় বড় থাকে।
ছবিতে কারা কারা অভিনয় করেছেন?
আবির চট্টোপাধ্যায়, ঋতাভরী চক্রবর্তী ,স্বস্তিকা দত্ত, সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সঙ্ঘশ্রী সিনহা, দেবশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, রক্তিম সামন্ত, অরিজিতা মুখোপাধ্যায়, অস্মি ঘোষ প্রমুখ। ক্যামেরার দায়িত্বে রয়েছেন আলোক মাইতি। শুভজিৎ সিংহ
সম্পাদনা করেছেন। সুরারোপ করেছেন চমক হাসান (বাংলাদেশ), অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, অমিত চট্টোপাধ্যায়। সাউন্ড ডিজাইন করেছেন অমিত।
উইন্ডোজ প্রযোজিত এই ছবির নিবেদক নন্দিতা রায়, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
শাকিরা-টম ক্রুজ কি এবার নতুন যুগল? সম্রাট ও সুন্দরীর মিল দেখার আশায় হলিউড