
শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 19 November 2024 18:47
গত এক সপ্তাহ নাওয়া-খাওয়া-ঘুম নেই কবির। খেপে-খেপে একটু রেস্ট, তারপর ফের কাজ। ফোন ফ্লাইট মোডে। ইন্টারনেট অন থাকলেও ফোন রয়েছে সাইলেন্ট। কল এলেও, সব রিসিভ করার অবকাশ নেই। বেছে নিতে হচ্ছে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ কলগুলোর মধ্যে। কিছু ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কল এড়াতে হচ্ছে, অন্যদিকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ধরতেই হচ্ছে। কারণ বেশির ভাগ ফোন আসছে দক্ষিণ ভারত থেকে। কখনও পরিচালক সুকুমার। কখনও সঙ্গীত পরিচালক দেবী শ্রী প্রসাদ।
‘একবার যখন দায়িত্ব নিয়েছি, তাই দায়ভারও বর্তায়, সমানুপাতে...’, একটু থেমে বললেন শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়।
দায়িত্ব: ‘পুষ্পা-২’ এর সংলাপ এবং গানের ডাবিংয়ের কাজ শেষ করতে হবে।
দায়ভার: আগামী ৫ ডিসেম্বর মুক্তি পাচ্ছে ‘পুষ্পা-২’, তাই দ্রুত এ কাজ শেষ করতে হবে!
সাক্ষাৎকার চলা অবস্থায় ফোনের ওপারের ডাবিং স্টুডিও থেকে ভেসে আসছিল টুকরোটাকরা কথা। তাতে যা শোনা গেল, তার মধ্যে অন্তত দশবার শুনতে হল, ‘রাখব না ফেলব?’ অর্থাৎ শ্রীজাতকে প্রশ্ন করছেন শিল্পীরা। কবিকে তার উত্তরও দিতে হল সঙ্গে-সঙ্গেই।
এসবের মাঝে আবার দু-তিন বার ইন্টারনেট সংযোগের গোলমালে কল কেটেও গেল। সেসব বাদ দিয়ে বাকিটা পুরো তুলে ধরা হল। শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আনকাট এক্সক্লুসিভ আড্ডায় শুভঙ্কর চক্রবর্তী
দ্য ওয়াল: বুঝতে পারছি আপনি ব্যস্ত, কিন্তু এই যে আপনি ‘পুষ্পা-২’-এর সঙ্গে প্রথমে গান এবং তারপর গোটা ফিল্মের সংলাপের সঙ্গে জুড়ে গেলেন আর তা দর্শক জানতে পারল ট্রেলরে, এরপর থেকেই এক্সাইটমেন্ট বাড়ছে, তাই এটাকে খানিক কমাতেই এই কল…
শ্রীজাত: (হাসি) বুঝতেই পারছি। আসলে, আমারও খুব নাজেহাল অবস্থা। এতটুকুও অবসর নেই। একটু তো প্রেশার রয়েইছে... এত বড় মাপের ছবি।
দ্য ওয়াল: এই কাজের খবর এল কীভাবে?
শ্রীজাত: শ্রেয়া (ঘোষাল) ‘পুষ্পা-২’-এর তেলুগু ভার্সান গানটি গেয়েছে। পরে ঠিক হয়, সেই গানের বাংলা ভার্সানও হবে। তখন ওঁরা (প্রযোজনা সংস্থা) শ্রেয়ার (ঘোষাল) সঙ্গে যোগাযোগ করে, জানতে চায় কে বাংলায় গানটি লিখতে পারবে। তথন শ্রেয়া আমার নাম উল্লেখ করে। তারপর দেবী শ্রী প্রসাদ (সঙ্গীত পরিচালক, ‘পুষ্পা-২’) আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেন, শ্রেয়ার থেকে নম্বর পেয়ে কল করছি, আপনি যদি চেন্নাই আসেন, এবং দু’টো গান লেখেন... সেই দু’টো গান লিখতে-লিখতে এখন তা ছ’টা গানে থেমেছে...(দীর্ঘ নিঃশ্বাস)
দ্য ওয়াল: ‘পুষ্পা-২’-এর গান আর কারা গাইছেন?
শ্রীজাত: শ্রেয়া তো দু’টো গান গেয়েছে। এছাড়া পুষ্পার ঠোঁটে সব গানই তিমির (বিশ্বাস) গেয়েছে। আর উজ্জয়িনী (মুখোপাধ্যায়)ও অর্পিতাও (চক্রবর্তী) গাইছে। এখনও গানের ডাবিং কিন্তু হয়নি।
দ্য ওয়াল: বাংলা ডাবড ট্রেলরের ক্রেডিটে, সংলাপও যে দেখা গেল জ্বলজ্বল করছে আপনার নাম...
শ্রীজাত: আরে সেটাই তো, যখন ছ’ֹটা গানের কাজ করছি, ঠিক তার মাঝে বলল, আমরা এমন একজনকে খুঁজছি যে সংলাপগুলোও লিখতে পারে। আমি একটু ভয়ই পেয়েছিলাম শুনে।
দ্য ওয়াল: কেন?
শ্রীজাত: ওঁরা আমাকে আড়াই-তিন সপ্তাহের সময় দিচ্ছিলেন গোটা ছবিটার সংলাপ লেখার জন্যে। তিন ঘন্টার একটা ছবি, তার উপর আমি এমন কাজ আগে কখনও করিনি, সবটাই আমার কাছে নতুন।
View this post on Instagram
দ্য ওয়াল: ‘পুষ্পা-২’-এর ট্রেলর সংক্রান্ত এক পোস্টে দেখলাম, একটি কোম্পানির নাম উল্লেখ করেছেন...
শ্রীজাত: হ্যাঁ, জেনেসিস। ওঁদের তত্ত্বাবধানেই গোটা কাজ হয়। ডায়ালগ সব লিখি। একটা টিম ফর্ম হয়েছে। চেক-রিচেক প্রসেসও চলছে। এখনও কিন্তু শেষ হয়নি। এই মুহূর্তেও চলছে।
View this post on Instagram
দ্য ওয়াল: তেলুগু ভাষা বুঝে, তার অর্থ বুঝে, সেই অর্থ বজায় রেখে বাংলা ভাষায় লেখা, এটা তো বেশ কঠিন কাজ। তাও আবার আপনার কথায় তিন ঘন্টার এক ধুমধাড়াক্কা ছবির...
শ্রীজাত: একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, যে প্রত্যেক সংলাপের একটা সময়সীমা থাকে। তেলুগু ভাষায় যে ডায়ালগ ৩৫ সেকেন্ডে শেষ হয়ে যাচ্ছে, আমাকে বাংলাতেও সেই পঁয়ত্রিশ সেকেন্ডেই শেষ করতে হবে। এটা গানের ক্ষেত্রেও সত্যি। ধরা যাক, ‘চল রাস্তায় সাজি ট্রাম লাইন, আর কবিতায় শুয়ে কাপ্লেট’, এই দুটো লাইন গাইতে একটা সময় লাগে। মারাঠি বা তেলুগুতে লিখতে গিয়ে গানের স্ক্যানশন, সময়সীমা এবং শব্দের অর্থ সবগুলোই মাথায় রাখতে হবে। ভীষণ কঠিন এই কাজ... শুনতে একরকম। যখন এই প্রসেসে কাজ করি তখন যে কতটা কঠিন তা বোঝানো আরও কঠিন।
দ্য ওয়াল: সময়সাপেক্ষও তো...
শ্রীজাত: একেবারেই। দুম করে বসলাম, ফটাস করে অনুবাদ করে দিলাম, স্ক্রিপ্ট নেমে গেল, এমন একেবারেই নয়।
দ্য ওয়াল: অনুবাদও তো নয়...
শ্রীজাত: অনুবাদও নয়। ট্রান্সক্রিয়েট করা... তেলুগু ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিকভাবে বাংলার থেকে অনেক আলাদা। আকাশ-পাতাল তফাত। তাই বাংলা এবং বাঙালির মনের কাছাকাছি পৌঁছনোটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
দ্য ওয়াল: এই ট্রান্সক্রিয়েটিং প্রসেসটা হচ্ছে কীভাবে?
শ্রীজাত: ওঁরা ইংরেজি ভাষায় অনুবাদিত চিত্রনাট্যটি আমাদের দিয়েছিল, এবং হায়দরাবাদ থেকে একজন সহযোগী এসেছিলেন, যিনি হিন্দি-ইংরেজিতে সাবলীল। তেলুগু ওঁর মাতৃভাষা। উনি পড়ে-পড়ে গোটা স্ক্রিপ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।
দ্য ওয়াল: শ্রেয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে আর?
শ্রীজাত: হ্যাঁ। মাঝেমাঝে হয়েছে। তবে, মজাদার বিষয়, ওকে এটা বলাই হয়নি, যে বাংলায় গোটা সিনেমার সংলাপও আমিই লিখেছি!
দ্য ওয়াল: আল্লু আর্জুনের চরিত্রের বাংলা ডাবিং কে করছেন?
শ্রীজাত: ওঁর ভাল নাম তো জানি না। যে নাম জানি তা হল, বুম্বা।
দ্য ওয়াল: বাংলায় বসে প্রথম ‘পুষ্পা-২’ তো আপনি দেখলেন। কেমন লাগল ছবি?
শ্রীজাত: (আবার হাসি) তাও আবার একবার নয়, মোট ৯০ ঘন্টা ধরে দেখেছি ছবিটা! ‘পুষ্পা-২’ আরও বড় মাপের ছবি। বিরাট। আরও জাঁকজমকপূর্ণ।
দ্য ওয়াল: পুষ্পার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হয়েছে?
শ্রীজাত: আমি কাজ করতে চেন্নাই গিয়েছিলাম, উনি তখন হায়দ্রাবাদে। তবে শুনছি ছবির প্রচারে কলকাতায় আসবেন। দেখা যাক... ফাঁকতালে দেখা হলে তো ভালই হয়।
দ্য ওয়াল: দেখা হলে কী বলবেন?
শ্রীজাত: কী বলব... (ভেবে) বাংলায় আপনার মুখে আমিই কথা বসাচ্ছি, আর কী! (হাসি)