
সুজিত ওয়ান্টস টু টক
শেষ আপডেট: 23 November 2024 12:17
শুভঙ্কর চক্রবর্তী: আমি কথা বলতে চাই’—ঠিক এভাবেই টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে শুরুটা হয়েছিল পরিচালক সুজিত সরকারের সঙ্গে। কথা চলাকালীন সে সব কথা বাঁক নিল বারাকপুর, তারপর টার্ন নিল ডার্বিতে। কখনও কিছুক্ষণের বিরতি নিল জুনিয়র বচ্চন, আবার কখনও পেরিয়ে গেল এল লহমায় বায়োস্কোপের নস্টালজিয়া। মাঝে-মাঝে কথার উপরে কথা ধরাতে অনুভূতিরা সামালও দিল। শীত সকালের পাহাড়ী কোনও রেলস্টেশনের কুয়াশাচ্ছন্ন শিশিরভেজা মতো মুহুর্তগুলো গেঁথে রইল ‘দ্য ওয়াল’-এর ওয়েবসাইটে...
দ্য ওয়াল: আমি কথা বলতে চাই…
সুজিত: হ্যাঁ, আমিও (হাসি)
দ্য ওয়াল: কেমন আছেন?
সুজিত: দারুণ আছি। খেলাধুলো করছি। দৌড়ঝাঁপ চলছে। নতুন ছবি রিলিজ হল। প্রমোশন চলছে জোরকদমে।
দ্য ওয়াল: স্ত্রী? দুই মেয়ে?
সুজিত: সবাই ভাল আছে।
দ্য ওয়াল: আজই রিলিজ করল ‘আই ওয়ান্ট টু টক’। দর্শকের প্রতিক্রিয়া কানে এল কিছু?
সুজিত: ফিল্মের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া আপাতত আশানুরূপ। বক্সঅফিসের পারফর্ম্যান্স পেতে একটু সময় লাগবে। এমন ছবি সবার যে পছন্দ নাও হতে পারে, সে ধারণা আমার ছিল। আশা করছি, দ্বিতীয় সপ্তাহর পর থেকে দর্শকদের ‘ওয়ার্ড অফ মাউথ’-এই ছবির প্রচার হবে। যারা দেখল ছবিটা, তারা বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়পরিজনদের বলবে, তারাও সিনেমা দেখতে আসবে।
দ্য ওয়াল: ‘পিকু’ কিংবা ‘অক্টোবর’-এর ক্ষেত্রেও ‘ওয়ার্ড অফ মাউথ’ কাজ করেছিল...
সুজিত: অবশ্যই। আমি দর্শকদের কথা ভেবেই ছবি বানাই। আমি আমার মতো কাজ করে চলেছি।
দ্য ওয়াল: ছবির টাইটেল এমনই যা আগ্রহ বাড়ায়, হঠাৎ করে এমন এক টাইটেল?
সুজিত: ছবি এডিটিং করার সময়, এই নামটি আমার মাথায় আসে। আসলে আমরা সবাই কথা বলতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি কথা বলেই সব মিটমাট করা সম্ভব। তবে এই টাইটেলে একটা মেটাফরিকাল অর্থও রয়েছে। কমিউনিকেশ, বাংলায় যা যোগাযোগ। আই ওয়ান্ট টু টক-এর অনেক কটি মাত্রা আছে। অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলে। রোজকার জীবনের অনেক কিছু মিস করে যাই, কারণ এই কমিউনিকেট করাটা আমাদের হয়ে ওঠে না। আমরা ছবির চরিত্র ‘অর্জুন’-ও এমনই। অনেক কিছু বলতে চায়, তবে সে পারে না। হি ওয়ান্ট টু টক। হি লিভস টু টক। হি লাভ টু টক।
দ্য ওয়াল: কত এমন কথা আছে যা জমেও থাকে...
সুজিত: কত সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, কথা জমে গেলে...প্রকাশ করতে পারে না মানুষ। একটা ফাঁক তৈরি হয়। একটা ভয়েডনেস...পুরুষদের কাছে জমে থাকা কথাগুলো বেশি। তাঁদের অভিব্যক্তি প্রকাশের ক্ষমতা কমই থাকে। একটু চাপা ধরণের, ইন্ট্রোভার্ট। খুব কম পুরুষ নিজেদের সেই জমে থাকা কথাগুলো বলে ফেলতে পারে। ‘আই ওয়ান্ট টু টক’ তাঁদের কথাই বলবে...(হাসি)
View this post on Instagram
দ্য ওয়াল: যেভাবে কথাগুলো বলছেন, মনে হচ্ছে এমন কত কথা আপনারও তো...
সুজিত: (খানিক চুপ থেকে) অনেক মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আছে। আমি জানি আমার মতো অনেকেই অনেক কিছু বলতে চায়। পারে না। এক্সপ্রেস করাটা জরুরি।
দ্য ওয়াল: বাবাকে নিয়ে দুটো ছবিতে কাজ করা হয়ে গিয়েছে, এবার জুনিয়র বচ্চনের সঙ্গে প্রথম ছবি করলেন, মিল পেলেন কিছু বাবা-ছেলেতে?
সুজিত: দু’জনের মধ্যেই ইনক্রেডিবল সব গুণ রয়েছে। দু’জনেই শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং ততধিক ভদ্র প্রকৃতির! চিত্রনাট্য এবং পরিচালকের প্রতি যে সম্মান দু’জনের রয়েছে, তা প্রশংসনীয়। ‘পিকু’ কিংবা ‘গুলাবো সিতাবো’র সময় মিস্টার বচ্চন যেভাবে নিজেকে আমার কাছে সঁপে দিয়েছিলেন, অভিষেকও তা-ই করেছেন। আমি খুব লাকি যে বাবা-ছেলে দু’জনেই আমার সঙ্গে কাজ করেছেন।
View this post on Instagram
দ্য ওয়াল: জনি লিভার রয়েছেন ছবিতে, এমন এক সিরিয়াস গোছের ছবিতে, মেজাজ হালকা রাখার দায়িত্ব ওঁর উপরেই ছিল নিশ্চয়ই
সুজিত: একেবারে। শুধু শুটিং সেটে নয়, ছবিতেও ওই একই কাজ করেছেন। জীবনদর্শনের কিছু কঠিন সত্যি, নিছক মজার ছলে সহজভাবে বলেছেন। আমি ওঁকে বলেছিলাম স্যর, আপনার ছবিতে আপনার অভিনয় খুব কম সময়ের, কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। উনি স্ক্রিপ্ট শুনেই রাজি হয়ে গেলেন। আমি ব্লেসড, যে উনি আমার ছবিতে কাজ করলেন। আমি ভাবিনি কখনও। আমি ওঁর বিগটাইম ফ্যান।
দ্য ওয়াল: আচ্ছা, ঠিক এই মুহূর্তে ইন্টারনেট খুললেই অভিষেকের নতুন সম্পর্ক, তিনি কেমন মানুষ, স্ত্রী ঐশ্বর্য্যর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, তারপর ওঁর কন্যসন্তানের কী হবে, এ নিয়ে এত মানুষের এত ভাবনা...কথা কোথাও গিয়ে ক্যারেক্টার অ্যাসিনেশন...আপনি তো এতগুলো দিন অভিষেকের সঙ্গে কাটালেন...কী বুঝলেন, এগুলো ওঁকে এই বিষয়গুলো প্রভাবিত করে?
সুজিত: একেবারেই করে না। আসলে কিছু মানুষের একটা বদভ্যেস এটাই যে, অন্যের জীবন নিয়ে ভীষণ আগ্রহী। নিজের জীবনেও যে একই কিছু ঘটছে বা ঘটতে পারে, তা কিন্তু ভাবে না। আমি জানি এই সোশ্যাল মিডিয়ায় কী হচ্ছে তার পাত্তা ও (অভিষেক) দেয় না। আর আমার বিশ্বাস ও দারুণ কাজ করেছে এবং আগামীতেও করবে।
দ্য ওয়াল: অন্য প্রসঙ্গে আসি, ‘শুবাইট’ ছবিটার কী হল?
সুজিত: শুবাইট নিয়ে আমিও বহুদিন ধরে পড়ে আছি। কিচ্ছু জানি না, কবে হবে। কথাবার্তা চলছে। এমন ঝঞ্ঝাটে আটকে রয়েছে। আইনি মামলায় জড়িয়ে পড়েছে। আমি আশা করছি জিও এবং আরও অনেক সংস্থা একসঙ্গে এক জায়গায় এসেছে, কিছু একটা ভাল হতে পারে। ওটিটি রিলিজের চেষ্টা করব।
View this post on Instagram
দ্য ওয়াল: কিশোর কুমারের প্রতি একটা অমোঘ টান আপনার রয়েছে...সেই টানেই বায়োপিক কী হবে?
সুজিত: পাঠক আশাহত হতে পারে উত্তরে...
দ্য ওয়াল: ছবিটা হচ্ছে না!
সুজিত: না। আমি আপাতত করছি না।
দ্য ওয়াল: আর সব খেলার সেরা বাঙালির ফুটবল...গানটা গাইছেন তো!
সুজিত: হাহাহা। গানটা গাই। এখনও তো খেলতে বেরোই, নিয়মিত।
দ্য ওয়াল: আর ছবিটা কী হল? মোহনবাগান নিয়ে করার কথা ছিল যে...
সুজিত: মোহনবাগান নিয়ে যে ছবিটা ভেবেছিলাম, সেটাও প্রায় একই অবস্থা। স্ক্রিপ্ট পছন্দ হচ্ছে না কোনওভাবেই!
দ্য ওয়াল: বারাকপুরে যে জায়গাতে থাকতেন, ওখানে তো গোটাটাই মোহনবাগান সমর্থক!
সুজিত: ছোটবেলায় ছিলাম ডাই হার্ড সাপোর্টার। এখন ফুটবল খেলাটাকেই সাপোর্ট করি।
দ্য ওয়াল: ওপেন টি বাইস্কোপের আপনার মনের ভীষণ কাছের একটি ছবি। মনে হয় না, যদি এই ফোয়ারা, কচুয়া, গোপেশ্বর, টুকাই কিংবা তিতির কেমন বড় হল? তা পর্দায় দেখতে বা দেখাতে?
সুজিত: নিশ্চয়ই। আমি পরিচালক অনিন্দ্যকে (চট্টোপাধ্যায়) বলেছি এই এক কথা। এখন বাচ্চাগুলোও বড় হয়ে গিয়েছে। ও লিখুক না স্ক্রিপ্ট। আবার ছবি হবে। কতবার অনিন্দ্যকে বলেছি। আবারও বলছি এই সাক্ষাৎকার মাধ্যমে।
দ্য ওয়াল: ওপেন টি বাইস্কোপের আপনার মনের ভীষণ কাছের একটি ছবি। মনে হয় না, যদি এই ফোয়ারা, কচুয়া, গোপেশ্বর, টুকাই কিংবা তিতির কেমন বড় হল? তা পর্দায় দেখতে বা দেখাতে?
সুজিত: নিশ্চয়ই। আমি পরিচালক অনিন্দ্যকে (চট্টোপাধ্যায়) বলেছি এই এক কথা।
দ্য ওয়াল: শেষ প্রশ্ন, ভাল স্ক্রিপ্ট হাতে পেলে কী ইচ্ছে করে? নিজেই পরিচালনা করবেন না প্রযোজক হবেন!
সুজিত: হাহাহাহা। হঠাৎ এমন প্রশ্ন?
দ্য ওয়াল: কারণ আর একটা কি বড়জোর দুটো ছবি প্রযোজনা করলেই, আপনি প্রযোজক বেশি পরিচালক কম হয়ে যাবেন যে!
সুজিত: হাহাহাহা। আমি যে সকল পরিচালকদের জন্য ছবি প্রোডিউস করেছি, তাঁরা আমার বন্ধুবান্ধব। এমন হয়েছে, ওদের কাছে স্ক্রিপ্ট রয়েছে, কিছু এগোচ্ছে না। আমি ওদের বলেছি, আমি আছি। যেমন ‘পিঙ্ক’-এ আমি অনিরুদ্ধর সঙ্গে বসে-থেকে শেষ করেছি... ‘ওপেন টি’-ও তাই। আরও বাংলা ছবি প্রযোজনা করতে চাই, কারণ আমি বাংলার বাইরে বড় হয়েছি। তা-ই চেষ্টা করি কোনও না কোনওভাবে জুড়ে থাকা। এই দেখুন না, ‘আই ওয়ান্ট টু টক’-এর চরিত্ররা বাঙালিই। আর এটা বলে রাখি, বাংলা ছবি আমি বানাবই।
দ্য ওয়াল: ভাল লাগল, কথা বলে। ভাল থাকবেন। শুভেচ্ছো রইল।
সুজিত: আপনিও ভাল থাকবেন। ‘দ্য ওয়াল’-এর পাঠকদের বলব, ‘আই ওয়ান্ট টু টক’ ছবিটি দেখবেন, আশা করছি আপনারা আশাহত হবেন না।