দুইজন দুই প্রজন্মের নায়ক, স্টাইল আইকন। মাঝে বিস্তর বছরের ব্যবধান। কিন্তু দুজনের স্টারডম ঢাকতে পারেনি দুজনের আন্তরিকতাকে। সৌমিত্র চট্যোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee) আর দেব (Dev) যেন সত্যি দাদু-নাতি। ছানা দাদু আর চাঁদু। দুই প্রজন্মের সেতুবন্ধন করেছিল 'সাঁঝবাতি' সিনেমা। জীবনের সায়াহ্নে এসে সন্ধ্যাপ্রদীপ দিতে প্রবীনদের একটা হাতের সঙ্গে আর একটা হাত তো নবীনের লাগেই। 'সাঁঝবাতি'র আড্ডায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ভাগ করেছিলেন দেব। শুনেছিলেন দ্য ওয়ালের প্রতিনিধি
শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
একজন তখন জীবন্ত কিংবদন্তী আর একজন বর্তমান টলিউডের মহাতারকা ও জননেতা। একজন কাজ করেছেন সত্যজিৎ রায় থেকে অঞ্জন চৌধুরী হয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ, এ যুগের অনীক দত্ত, লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। আরেক জন রূপোলি পর্দায় বিরাজমান হওয়া মানেই বিদেশের মাটিতে গান গেয়ে বাঙালিকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। তাঁর ঝুলিতেও অপর্ণা সেন, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় থেকে হার্ডকোর ছবির ডিরেক্টরদের পরিচালনা রয়েছে।
একজন সোনার কেল্লায় রহস্যজয়ী ফেলুদা, অপরজন চাঁদের পাহাড়-আমাজন জয়ী শংকর। একজন যখন বেলা শেষের আশাবরী সুর বাজাচ্ছেন তবু লড়ে চলেছেন, আরেক জন তাঁর মধ্যগগন সাম্রাজ্যে গুটি সাজাতে ব্যস্ত। কিন্তু এরকম দুই মেরুর দুই সুপারস্টার নায়ক এক হয়েছিলেন প্রথম ও শেষবারের মতো 'সাঁঝবাতি' চলচ্চিত্রে। ছবিটি গত বছর বড়দিনে মুক্তি পায়। যেদিন ছিল আবার নবীন নায়কটির জন্মদিন।
এই নবীন নায়ক হলেন দেব অধিকারী। আর লিভিং লেজেন্ড মানুষটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
দেব তো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে অনেক অনেক জুনিয়র। কিন্তু দেব যতই ছোট হোক, উনি এত ভালবেসে দেবের সঙ্গে কথা বলছিলেন, যেন মনে হচ্ছিল দেবের তারুণ্যটাই সৌমিত্রকে অনুপ্রাণিত করছে।
দ্য ওয়াল: দেব, তুমি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই প্রথম কাজ করলে। একসঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করলে। তুমি সোশ্যাল সাইটে লিখেছিলে, তোমার অভিনয় জীবনের এই তেরো বছরে এটা একটা স্বপ্নপূরণ। কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল, লিভিং লেজেন্ডের সঙ্গে কাজ করে?
দেব: ব্রিলিয়ান্ট এক্সপিরিয়েন্স। একজন ৮৫ বছরের ভদ্রলোকের যা এনার্জি, কাজের প্রতি ভালবাসা, ভাবা যায় না। ওঁর তো আর কারও কাছে কিছু প্রমাণ করার দরকার নেই। কিন্তু ওঁর কাজের তাগিদ, ডেডিকেশন, সময়ানুবর্তিতা– সেটা শেখার মতো এখনও। উনি এই বয়সে যে কাজ করছেন সেটাই তো ডেডিকেশন। উনি এখনও থিয়েটার করেন শুধু প্যাশনের জোরে। আমি প্রতি মুহূর্তে শিখেছি। সবচেয়ে বড় কথা, শ্যুটিং করতে গিয়ে যখন রিটেক হয় বারবার, তখনও কোনও রাগ বা বিরক্তি নেই। দম্ভ বলে কিছু নেই ওঁর। মানুষ যে ওঁকে এখনও ভালবাসছে এত, তার কিছু তো কারণ আছে। এই গুণগুলোই সেই কারণ। আমরা ওঁর অভিনয় দেখেই বড় হয়েছি। কিন্তু শুধু অভিনয় নয়, ওঁর জীবনদর্শন থেকে একটু শিখতে পারলেও বেশ সমৃদ্ধ হওয়া যায়।
দ্য ওয়াল: স্টার দেব নয়, মানুষ দেবকে নিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কোন মন্তব্য করেছিলেন?
দেব: সাঁঝবাতি ছবিতে দেবকে ঢেকেই আমি সাধারণ ছেলে হয়ে অভিনয় করেছি। যাতে চাঁদুকে দেখলে কেউ না ভাবে এই সেই দেব! ছবির শুরুতে একটা বিসর্জনের নাচ ছিল, ওই নাচটায় প্রফেশানাল ডান্সিং স্টেপ করিনি। একদম পাড়ার ছেলের নাচ করেছি। চাঁদু আমার একটা প্রিয় চরিত্র যা লীনাদি আর প্রযোজক অতনুদা আমায় ভরসা করে দিয়েছিলেন।

মানুষ দেব কেমন সেটা লোকে বলবে। তবে একটা কথা মনে পড়ছে, 'সাঁঝবাতি' তে সোহিনীদিও (সোহিনী সেনগুপ্ত) ছিলেন। শুনেছিলাম সোহিনীদির থেকে, সৌমিত্রদা সোহিনীদিকে বলেছিলেন “দেব কী ভাল ছেলে না? কোনও রোয়াব নেই ওর।”
দ্য ওয়াল: সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে শ্যুটিংয়ের কোনও গল্প আছে, শট দেওয়ার ফাঁকে?
দেব: হুম, প্রচুর। ওঁর ক্রিকেট নিয়ে ভালবাসা, নবাব পতৌদি নিয়ে তখন কী হয়েছিল, উত্তমকুমার তখন ওঁর সম্পর্ক-– সেই গল্পগুলো করতাম। উত্তম-সৌমিত্রর মধ্যে রাগারাগি, মান-অভিমান ছিল কিনা, দাদা-ভাই সম্পর্ক কতটা… সব। আর আমি খুব মজা করেই কথা বলি। ওঁকে বলেছি “কটা গার্লফ্রেন্ড ছিল তোমার সত্যি করে বলো তো!” সৌমিত্রদা বলেন “তখন তো দাদা মহানায়ক, তাই বেশি ছবি করত পেত।” আমি বললাম “তোমার অভিমান হত না? তোমার মনে হতো না, ‘নায়ক’টা তুমি যদি করতে?” সৌমিত্রদা এই বয়সেও খুব ডিপ্লোম্যাটিক। খুব সুন্দর গুছিয়ে উত্তর দেন। সৌমিত্রদা বললেন “না রে, তা নয়। ঝগড়া হতো, রাগ হতো আমাদের মধ্যে। কিন্তু সে সবই শুধু ওই দিনের জন্য। পরের দিনই আবার ফোনে কথা হতো। স্টুডিওতে দেখা হলেই যে কে সেই। আমাকে (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) বাড়ি থেকেও দাদা (উত্তম কুমার) গাড়িতে তুলে নিত। আবার আমার গাড়ি নিয়েও গেছি। তখন তো আমাদের দুটো ঠেক ছিল। একটা হতো গ্র্যান্ডে, আর একটা হতো এয়ারপোর্টের কাছে।"
দ্য ওয়াল: আরও গল্প আছে নিশ্চয়ই এই নিয়ে আনএডিটেড? উত্তম-সৌমিত্র বন্ধুত্বের ওই সময়কার আরও গল্প তোমায় বলেছিলেন নিশ্চয় সৌমিত্রবাবু?
দেব: তবে এই গল্পটা শোনো। সৌমিত্রদা বলছেন, “তখন আমি নিজে গাড়ি চালাতাম। আর উত্তমদার কাছে তখন ড্রাইভার আছে। ফেরার সময়ে উত্তমদা বলছে, ‘আমার গাড়িতে ওঠ। তোকে ড্রাইভ করতে হবে না। ড্রিঙ্ক করে গাড়ি চালাস না।’ এবার আমার ইগোতে লেগেছে, ‘উত্তমদা তুমি আমায় মাতাল বলছো! আমি ঠিক যেতে পারব।’ তার পরে সৌমিত্রদা গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ি এলেন। নেমে দেখছেন, পেছনে উত্তমকুমারের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে ওঁর বাড়ির সামনে। মানে উত্তমকুমার ফলো করতে করতে এসেছেন পুরো রাস্তা। তখন আমি দাদাকে (উত্তমকুমার) বললাম “তুমি এত দূর এলে! এবার বুঝলে তো আমি মাতাল নই গাড়ি ঠিকঠাক চালাতে পারি।”
সত্যজিৎ বহির্ভূত ২০টি ছবিতে সৌমিত্র ম্যাজিক
এই সব তখন সত্যি ছিল, সৌমিত্রদাই বলেছেন। মান-অভিমান হয়েছে আবার এভাবে কেয়ার করা... দাদা (উত্তমকুমার) যেন আমার অভিভাবক।

আর একটা গল্প মনে পড়ছে সৌমিত্রদার বলা। সৌমিত্রদার শ্যুটিং শেষ হয়ে গেছে তাড়াতাড়ি। উত্তম কুমার বললেন “এই চলে যাচ্ছিস কেন? আমার রাত আটটায় প্যাক আপ আছে। তার পরে একসঙ্গে আড্ডায় বসব।" সকালে উত্তমকুমার শরীর চর্চা করতেন, সৌমিত্রদাকেও বলতেন ব্যায়াম করতে। এই ব্যাপারগুলো তো এখন আমাদের মধ্যে নেই। আমরা নিজেরা জিম করি আপডেট দি মিলিয়ন লাইক কমেন্ট শেয়ার। একজন নায়ক অন্যজনকে কি এখন এতটা কেয়ার করেন!
https://youtu.be/stIxbSa4hrg
সৌমিত্রর মর্নিং ওয়াকের পার্টনার ছিলেন রবি, তাঁদের গভীর বন্ধুত্ব পার করেছিল ইন্ডাস্ট্রির সীমানা