অসমবাসীর হৃদয়ে যাঁর কণ্ঠস্বর এক জীবন্ত স্রোতের মতো বয়ে যেত, সেই জুবিন গর্গ আজ নেই। ১৯ সেপ্টেম্বর, সিঙ্গাপুরে স্কুবা ডাইভ করতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে নিভে যায় অসমের সাংস্কৃতিক আইকনের জীবনপ্রদীপ।

পাপন-জুবিন
শেষ আপডেট: 27 September 2025 17:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অসমবাসীর হৃদয়ে যাঁর কণ্ঠস্বর এক জীবন্ত স্রোতের মতো বয়ে যেত, সেই জুবিন গর্গ আজ নেই।
১৯ সেপ্টেম্বর, সিঙ্গাপুরে স্কুবা ডাইভ করতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে নিভে যায় অসমের সাংস্কৃতিক আইকনের জীবনপ্রদীপ। নর্থ-ইস্ট ফেস্টিভ্যালে যোগ দিতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এক আকস্মিক মৃত্যু যেন অনুরাগীদের মনে সন্দেহের কালো মেঘ জমিয়ে দিল। সত্য খুঁজে বের করতে ইতিমধ্যেই তৎপর অসম সরকার। সিঙ্গাপুরে ময়নাতদন্ত হওয়ার পর ফের গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজে সংগঠিত হয়েছে পুনর্ময়নাতদন্ত। গঠিত হয়েছে বিশেষ তদন্তকারী দল— ‘SIT’।
তদন্তে নামতেই জুবিনের দলের সদস্য শেখরজ্যোতি গোস্বামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন আরও অনেকে। এই আবহেই সরকারের কাছে দ্রুত তদন্ত শেষ করার আর্জি জানিয়েছেন অসমের আরেক ভূমিপুত্র, গায়ক পাপন।
জুবিনের সঙ্গে পাপনের সম্পর্ক ছিল বহু দিনের। দু’জনেই প্রায় একই সময়ে বলিউডের যাত্রা শুরু করেছিলেন। তাই বন্ধুর মৃত্যুতে তাঁর শোক যেন আরও গভীর। সোনাপুরের জোরহাটে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছিলেন পাপন। অতীতের দিনগুলোতে একই মঞ্চে গান গেয়েছিলেন তাঁরা। সেই পুরনো ছবিই সমাজমাধ্যমের পাতায় শেয়ার করলেন গায়ক। সেখানে আবেগভরা কথায় লিখলেন— “তোমাকে খুব মিস করছি ভাই। তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।” একই সঙ্গে পাপন সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন দ্রুত তদন্ত শেষ করার। তাঁর কথায়, “আমরা যেন খুব শীঘ্রই আমাদের কাঙ্ক্ষিত সব প্রশ্নের উত্তর পাই।”
অন্যদিকে, দুর্ঘটনার দিন সিঙ্গাপুরে উপস্থিত ছিলেন শ্যামকানু মোহন্ত-সহ আরও কয়েকজন। SIT জানিয়েছে, তাঁদের প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ড্রামার শেখরজ্যোতি গোস্বামীকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার পরই সমন পাঠানো হয়েছে বাকিদের জন্যও।
শুধু বাংলাতেই নয়, নিজের মাতৃভাষা অসমিয়াতেও পাপন আবেদন জানিয়েছেন এই রহস্যের দ্রুত সমাধান হোক। তাঁর কথায়, তদন্ত যেন দ্রুত এগোয়, যাতে ধোয়ঁাশা প্রশ্নগুলির উত্তর অসমবাসী শিগগিরই পেতে পারেন। এর আগেও জুবিনের মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় শোকপ্রকাশ করেছিলেন পাপন। লিখেছিলেন— “এ এক অকল্পনীয় ঘটনা! এক প্রজন্মের কণ্ঠস্বর চলে গেল। কী বলব! বন্ধুকে হারালাম, ভাইকে হারালাম। এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হলো। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।”
১৯ সেপ্টেম্বরের সেই ঘটনায় সমগ্র অসম স্তম্ভিত। সিঙ্গাপুর থেকে দিল্লি হয়ে গায়কের মরদেহ আনা হয় গুয়াহাটি। এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর, কামারকুচি গ্রামে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সেই সময় উপস্থিত ছিলেন তাঁর অগণিত অনুরাগী, পরিবার, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু-সহ বহু বিশিষ্টজন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জুবিনকে দেওয়া হয়েছিল গান স্যালুট।
শুধু অসম নয়, সমগ্র দেশ জানে জুবিন গর্গকে একজন বহুমুখী প্রতিভা হিসেবে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে হাজারো গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি— অসমিয়া, হিন্দি, বাংলা-সহ বহু ভাষায়। ছিলেন গায়ক, সুরকার, সংগীত পরিচালক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর গানই ছিল সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাসের ভাষা, আড্ডার সঙ্গী, বেদনার ওষুধ।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সুর থেকে যাবে চিরকাল। বন্ধু পাপনের আবেগমাখা কথার মতোই— “তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।” ঠিক তেমনই, অসমের আকাশে, বাংলার মাটিতে, কিংবা হিন্দি গানের দুনিয়ায়— জুবিনের সুরের স্রোত চিরকাল বয়ে যাবে। মৃত্যুর রহস্য যতই গভীর হোক, তাঁর সঙ্গীতের আলো কোনোদিন নিভে যাবে না।