মুর্শিদাবাদে শুরু। কিন্তু তাঁর কীর্তনের মাধুর্য ছড়িয়ে পড়েছিল সীমানা ছাড়িয়ে সারা দেশে। রাধারাণী দেবীকে মনে রেখেছেন কয়জন? আজ যখন অরিজিতের গলায় কীর্তন নিয়ে চারিদিকে মাতামাতি ঠিক তখনই চলে আসছে রাধারাণী দেবীর কথা। তাঁকে নিয়ে লিখলেন, টলি-প্রযোজক রানা সরকার...

শেষ আপডেট: 23 December 2025 20:48
বাংলা ভাষায় ভক্তিগীতি সাগরে ডুব দিয়েছে বাঙালি সেই শ্রী চৈতন্যের যুগ থেকে। কীর্তন রসের নেশা যে ভাবে বঙ্গভূমি কে দীর্ঘকাল আসক্ত রেখেছে তাকে অস্বীকার করেনি বাংলার কোনও কবি সাহিত্যিক সংগীতকার ।
রবীন্দ্র নজরুল থেকে শুরু করে ভবা পাগলা লালন সাঁই হয়ে শচীন দেব বর্মন, রাহুল দেব বর্মন, সলিল চৌধুরী, পণ্ডিত রবিশংকর, হেমন্ত, কিশোর সবাই কখনও না কখনো ডুব দিয়েছে ভক্তি সাগরে।
আজ যখন অরিজিৎ সিংয়ের কণ্ঠে আপামর বাঙালি মন প্রেম রসে কম্পিত তখন আমাদের স্মরণ করতে হবে কীর্তন সম্রাজ্ঞী রাধারাণী দেবী কে, গায়ক অরিজিৎ সিং যাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন।
জিয়াগঞ্জ এ অরিজিৎ সিং এর বাড়ি থেকে ১৫০ মিটার দূরেই বাড়ি সঙ্গীতের আর এক নক্ষত্রের। কীর্তন সম্রাজ্ঞী রাধারাণী দেবী। ১৯১১-১২ নাগাদ শুরু হয়েছিল রাধারাণী দেবীর মিউজিক্যাল জার্নি। শুরু হয়েছিল জিয়াগঞ্জের নেহালিয়া ম্যানশনের বিখ্যাত ঝুলনের মেলার নাট মন্দির থেকে।
সেদিন ছয়-সাত বছরের বালিকার মিষ্টি কণ্ঠের কীর্তন শুনে শ্রোতারা তন্ময় হয়ে ওঠেন। স্বয়ং রায়বাহাদুর জানতে চান "কে এই বালিকা?"। সেই শুরু। তারপর স্বপ্নের দৌড়। কিছুদিনের মধ্যেই খুদে কীর্তনিয়ার নাম ছড়িয়ে পরে চারদিকে। দলের সঙ্গে ঘুরতে থাকেন এদিক ওদিক। তারপর রায়বাহাদুরের পরামর্শেই কলকাতা পাঠানো হয় রাধারাণী কে। কিছুদিনের মধ্যেই বাংলার সঙ্গীত আকাশে জ্বলজ্বল করে রাধারাণী নক্ষত্র।

রবীন্দ্র সঙ্গীত শিখেছিলেন পঙ্কজ মল্লিকের কাছে। স্নেহের ভগিনী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের। শোনা যায় কাজী সাহেব প্রিয় রাধা কে পাশে বসিয়ে গান বাঁধতেন , গান সম্পূর্ন হলে তাঁকে দিয়ে গাওয়াবেন বলে। নিয়মিত শিল্পী ছিলেন অল ইন্ডিয়া রেডিও তে। এক নম্বর গার্স্টিন প্লেসের চাঁদের হাটে নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার, পঙ্কজকুমার মল্লিক, রাইচাঁদ বড়াল, কাজী নজরুল ইসলাম, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, বাণীকুমার, অহীন্দ্র চৌধুরী, আঙুরবালা, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের উজ্জ্বল উপস্থিতির মাঝে ডুবে থাকতেন রাধারানি।
একের পর এক গজল, ঠুমরি, ভজন, হিন্দি, ভোজপুরি, ওড়িয়া, নেপালি প্রভৃতি ভাষায় সঙ্গীত পরিবেশনের পাশাপাশি কীর্তন, পল্লিগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদের গান পরিবেশন করেছেন তিনি। পাখোয়াজ, এস্রাজ-সহ বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজাতেও জানতেন। অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর নামজাদা শিল্পী ছিলেন রতন বাঈ, তিনি রাধারানির গায়কি, উর্দু উচ্চারণ এবং ব্যক্তিত্বময়ী চেহারায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সিনেমায় অভিনয় করার পরামর্শ দেন। ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘কাশীনাথ’, ‘মা ও ছেলে’, ‘সাত নম্বর বাড়ি’-সহ বেশ কয়েকটি বাংলা এবং ‘সুনহেরা বাল’, ‘সিধা রাস্তা’, ‘গজ়ল’, ‘রসিলি’, ‘লাজ’-সহ তিরিশটিরও বেশি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি।
সেই সময় প্রথম বিয়ে ভেঙে যাবার পর ভালোবেসেছিলেন এক বিখ্যাত লেখক কে। সাত পাকে বাঁধা’, ‘শাপমোচন’, ‘হারানো সুর’-এর মতো একাধিক বাংলা সিনেমার চিত্রনাট্যকার নৃপেনকৃষ্ণ চ্যাটার্জী আবার আকাশবাণীতে নাটক, গল্পদাদুর আসর, বিদ্যার্থী মণ্ডলের পরিচালনাও করতেন। বিয়ে না করেও একসঙ্গেই থাকতেন। জিয়াগঞ্জের বাড়িতেও বহুবার গেছেন নৃপেণ। আর নৃপেণ এর মৃত্যুর পর বিয়ে না হওয়া সত্বেও বৈধব্য পালন করতেন রাধারাণী।

নেহালিয়া ম্যানসন
এ হেন কিংবদন্তির আজ হঠাৎ স্মৃতি চারণ কারণ অরিজিৎ সিং এর কন্ঠে লহ গৌরাঙ্গের নাম রে ছবির কীর্তন - কম্পিত তনুদল। নতুন প্রজন্মের কাছে কীর্তন প্রায় মৃত সঙ্গীত। কিন্তু অরিজিৎ গাইল বলেই তার কণ্ঠের উড়ানে চেপে অনেক বেশি শ্রোতার কানে পৌঁছবে কীর্তনের মাধুর্য।
১৯৯৭ সালে মৃত্যুর আগে রাধারাণী দেবীর সঙ্গে অরিজিৎ সিং এর দেখা হয়েছে বহুবার। অরিজিৎ আর তার গুরু স্বর্গীয় শ্রী রাজেন্দ্র প্রসাদ হাজারীর খুবই নিকট ছিলেন রাধারাণী দেবী। ছোট্ট অরিজিৎ কে পাশে বসিয়ে কখনও গান ধরেছেন দুজনে। রাধারাণী দেবী নিজের স্কেল চেঞ্জ হারমোনিয়াম উপহার দিয়েছিলেন রাজেন্দ্রপ্রসাদ কে। সেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে ছোটবেলায় জিয়াগঞ্জের লক্ষ্মী টকিজ এ গান ও গেয়েছেন অরিজিৎ।
তাই অরিজিৎ আর কণ্ঠের এই কীর্তনের সঙ্গে আছে স্বয়ং কীর্তন সম্রাজ্ঞীর আশীর্বাদ। একটা মিউজিক্যাল বৃত্ত সম্পূর্ন হলো জিয়াগঞ্জের , এই কীর্তনের সুরে।
ক্ষণে গোরা চাঁদ ক্ষণে কালা...