
শেষ আপডেট: 4 July 2022 14:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ সকালেই প্রয়াত হয়েছেন প্রবাদপ্রতিম পরিচালক তরুণ মজুমদার (Tarun Majumdar)। তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া বাংলা চলচ্চিত্র জগতে। ইতিমধ্যেই প্রয়াত পরিচালকের (Director) পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় (Srijit Mukherjee), কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় (Kamaleshwar Mukherjee) এবং নেহাল দত্ত (Nehal Dutta)।
ফেসবুকে প্রয়াত পরিচালকের প্রতি শোকবার্তায় তিনি লেখেন, 'শেষ কিংবদন্তি নক্ষত্রপুঞ্জ, যার মধ্যে সত্যিজিৎ রায়,ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিনহা ছাড়াও ছিলেন সেই মানুষটি, যাঁর সিনেমা বিষয়ক বোধ বক্স অফিস, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং পুরস্কারের মঞ্চে নিয়মিত সাফল্যের দুর্লভ মন্ত্র জানতো, তিনি আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। নিমন্ত্রণ, শ্রীমান পৃথ্বীরাজ, সংসার সীমান্তে, কাচের স্বর্গ, পলাতক, ঠগিনী, গণদেবতা, চাওয়া পাওয়া, বালিকা বধূ, দাদার কীর্তি-তালিকা বিশাল এবং অনুকরণীয়! বিদায়, এভার আন্ডাররেটেড তরুণ মজুমদার। ভালভাবে যান, কিংবদন্তি!'
প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ও (Kamaleshwar mukherjee)। উনি তো প্রাতঃস্মরণীয়। সৃজনশীলতাকে এবং শিল্প নৈপুণ্য বজায় রেখে কত সহজে ছবিতে একটা গল্প বলা যায় তা উনি দেখিয়েছেন। সাহিত্যনির্ভর গল্প থেকে বানানো ছবি, কিংবা প্রান্তিক মানুষের জীবনের উপর বানানো ছবি, যেমন সংসার সীমান্তে কিংবা গণদেবতার মতো ছবিকে কীভাবে জনপ্রিয় এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল করা যায়, তা তরুণ বাবুর থেকে শেখার বিষয়। ওঁর সুঠাম মতাদর্শ উনি সারাজীবন বজায় রেখেছিলেন। গণদেবতার মতো ছবি আমাকে ভীষণ ভাবে নাড়া দিয়েছে। আমার নিজের কোনও ছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করার সময় ওঁর কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে।
প্রয়াত পরিচালককে 'জেঠু' বলে ডাকেন আর এক পরিচালক নেহাল দত্ত (Nehal Dutta)। বাবাকে হারিয়েছেন বহু আগেই। তরুণ মজুমদারের হাত ধরেই পরিচালনায় হাতেখড়ি নেহালের। একাধিক ছবিতে 'জেঠু'র সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেছেন তিনি। ২০০৪ সালে 'ভালবাসার অনেক নাম' ছবি দিয়ে শুরু। তরুণ মজুমদারের মৃত্যুতে দ্বিতীয়বার পিতৃহারা হওয়ার অভিজ্ঞতা হল তাঁর। দ্য ওয়ালের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে গলা বুজে এল নেহাল দত্তের।

ভালবাসার অনেক নাম ছবির শ্যুটিং সেটে লাল-নীল পেন্সিল নিয়ে বসতেন তরুণ মজুমদার। প্রথম শটটা লাল পেন্সিলে কাটতেন, দ্বিতীয় শটটা নীল পেন্সিলে কাটতেন, এবং প্রতিটা শটে ডেসক্রিপশন লেখা থাকত। ক্যামেরা, ট্রলির চলাফেরা, সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ লিখে রাখতেন পেন্সিলে। বাংলায় তেমন সড়গড় ছিলাম না বলে ইংলিশে লিখতাম। তাতে আপত্তি ছিল জেঠুর। স্পষ্ট বলতেন, ইংলিশ কালচারে করে কিন্তু ছবি করা যাবে না, বাংলা সাহিত্য পড়তে হবে।

আমার পুরোটাই জেঠুর হাত ধরে শেখা। বোলপুরে শ্যুটিংয়ের সময় যখন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তাপস পাল প্রমুখরা গল্প করতেন, তখন জেঠুর নির্দেশে ক্যামেরাম্যান আমাকে লেন্সের কাজ শেখাতেন। জেঠুর বক্তব্য, 'নয়তো ও ছবি পরিচালনা করবে কী করে?'
শুধু সহকারী নয়, আমাকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন তরুণ মজুমদার। আমার প্রথম ছবির মহরতে এসেছিলেন জেঠু। আমার মুক্তি পাওয়া প্রথম ছবি পলাতকের প্রিমিয়ারে আসতে পারেননি উনি। তবে ফোন করে ছবির সিডি চেয়েছিলেন। জেঠুর ছবির মেকিং, অর্থাৎ তিনি কীভাবে কাজ করেন, সব কিছু আমার কাছে রয়েছে, ওগুলো মহা মূল্যবান। ছবির কাজ শেখার সময় বকেছেন, কখনও মেরেওছেন। পরক্ষণেই আবার বুকে জড়িয়ে ধরেছেন।
ভালোবাসার অনেক নাম ছবির শ্যুটিংয়ের সেটে একবার গাড়ির দরজায় আমার হাত চেপে যায়, সঙ্গে সঙ্গে নীল হয়ে যায় আঙুলগুলো। জেঠু আমাকে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপুরে ডাক্তারের কাছে ছুটেছিলেন। আমি আবার পিতৃহারা হলাম।
‘টিনের তলোয়ার’ করতে চেয়েছিলেন তরুণ মজুমদার, উত্তমকুমারকে ভেবেছিলেন প্রধান চরিত্রে