ফিল্ম গবেষকদের মতে (MohdRafi.com ও বিভিন্ন চলচ্চিত্র আর্কাইভ সূত্রে), রফি সাহেব ধর্মেন্দ্রর জন্য ১১০টিরও বেশি গান গেয়েছিলেন — যা এক অদ্ভুত সুরেলা সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে। সেই যুগলবন্দি আজও দেখলেই মনে হয়— এই গলা না থাকলে ধর্মেন্দ্র সম্পূর্ণ হতেন না। মহম্মদ রফি সম্পর্কে ধর্মেন্দ্রও বরাবরই বলতেন, ‘আমার ছবি আত্মা ছিলেন রফি সাহেব। আমার লাকি চার্ম’।

শেষ আপডেট: 11 November 2025 14:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হিন্দি সিনেমার স্বর্ণযুগে নায়কের মুখ, সুরকারের সুর আর গায়কের গায়কি— এই ত্র্যহস্পর্শে তৈরি হতো অমর চলচ্চিত্র-জাদু। সেই জাদুর অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় ছিল ধর্মেন্দ্র (Dhramedra) ও মহম্মদ রফির (Mohammad Rafi) যুগলবন্দি। একজন ছিলেন পর্দায় “হি-ম্যান”— পৌরুষ, প্রেম আর আবেগ তাঁর চেহারায় ছবিতে মিলেমিশে একাকার। অন্যজন সুরের সাধক— যিনি কণ্ঠ দিয়ে রূপ দিয়েছিলেন প্রতিটি আবেগকে, প্রতিটি চাহনি, চোখের জলকে।
ফিল্ম গবেষকদের মতে (MohdRafi.com ও বিভিন্ন চলচ্চিত্র আর্কাইভ সূত্রে), রফি সাহেব ধর্মেন্দ্রর জন্য ১১০টিরও বেশি গান গেয়েছিলেন — যা এক অদ্ভুত সুরেলা সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে। সেই যুগলবন্দি আজও দেখলেই মনে হয়— এই গলা না থাকলে ধর্মেন্দ্র সম্পূর্ণ হতেন না। মহম্মদ রফি সম্পর্কে ধর্মেন্দ্রও বরাবরই বলতেন, ‘আমার ছবি আত্মা ছিলেন রফি সাহেব। আমার লাকি চার্ম’।
প্রথম পর্ব: রোমান্টিক ধর্মেন্দ্র ও মহম্মদ রফি (১৯৬০-এর দশক)
ষাটের দশক ছিল মেলোডির স্বর্ণযুগ। রফির মাধুর্য, শঙ্কর-জয়কিষাণ বা মদন মোহনের সুর, আর ধর্মেন্দ্রর তরুণ মুখ— একসঙ্গে মিশে গিয়েছিল প্রেমের প্রতিটি রঙে। অমর কিছু গান—“ইয়েহি হ্যায় তামান্না তেরে দর কে সামনে” — ছবির নাম ‘আপ কি পরছাইয়া’ (১৯৬৪, সুর: মদন মোহন)। মৃদু আবেগে ভরা এই প্রেমের গানটি ধর্মেন্দ্রর সংবেদনশীল চেহারাকে মানুষের মনে যেন চিরস্থায়ী জায়গা করে দেয়। “কলিয়োঁ নে ঘুঙঘট খোলা” —দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া (১৯৬৬, সুর: সোনিক–ওমি) ছবিকে রফির কোমল কণ্ঠে ধর্মেন্দ্রর লাজুক প্রেমিকরূপ ফুটে ওঠে চমৎকারভাবে। দেখা হ্যায় তেরি আঁখোঁ মে প্যায়ার..” গানটি প্যায়ার হি প্যায়ার ছবির (১৯৬৯, সুর: শংকর–জয়কিষাণ)। এই গানে রফির গলায় যেন প্রাণ পায় ধর্মেন্দ্রর প্রতিটি মুভ ও চাহনি। এর এসবের মধ্যে কিম্বদন্তি হয়ে যায় আরও একটি গান “ম্যায় জাঠ ইয়মলা পাগলা দিওয়ানা”। প্রতিজ্ঞা (১৯৭৫, সুর: লক্ষ্মীকান্ত–পেয়ারেলাল) ছবিতে রফির গলায় এই গান যেন ধর্মেন্দ্রর প্রাণের পরিচয় হয়ে যায়।
দ্বিতীয় পর্ব: অ্যাকশন হিরো
সত্তরের দশকে ধর্মেন্দ্র হয়ে উঠলেন বলিউডের “হি-ম্যান”— অ্যাকশন, লড়াই, সংগ্রাম আর আত্মগরিমার প্রতীক। কিন্তু তাঁর ছবির আবেগের দিকটি জীবন্ত রাখলেন রফি। কণ্ঠে এনে দিলেন মনের গভীরে লুকোনো কোমলতা। এই সময়ের অবিস্মরণীয় গানগুলির মধ্যে রয়েছে, “আজ মওসম বডা বেইমান হ্যায়”। লোফার ছবিতে এই গানে সুর দিয়েছিলেন লক্ষ্মীকান্ত–পেয়ারেলাল। বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় ভরা রফির গলায় ফুটে ওঠে এক হারানো ভালোবাসার ব্যথা। ধর্মেন্দ্রর চোখের ভাষা আর রফির সুর— এক হয়ে যায়। অব তোমহারে হাওয়ালে ওয়াতান সাথিও—হাকিকত ছবিতে এই গানের সুর দিয়েছিলেন মদন মোহন। ভারতের সৈনিকের ত্যাগ, ব্যথা আর দেশপ্রেম— এই গানই হয়ে উঠেছিল অনন্ত প্রেরণার প্রতীক। “না যা কহিঁন অব না যা” — ছবির নাম ছিল ‘বড়ি দিদি’ (১৯৬৯, সুর: লক্ষ্মীকান্ত–পেয়ারেলাল)। “জুলফ কে ফান্দে মে” — ‘পাত্থর কে সনম’ (১৯৬৭, সুর: লক্ষ্মীকান্ত–পেয়ারেলাল)। এই ছবিতে দুষ্টু মিষ্টি প্রেমের গানে রফির সুরে ধর্মেন্দ্র যেন হয়ে ওঠেন এক তরুণ, হাসিখুশি প্রেমিক।
তৃতীয় পর্ব: পরিণত বয়সের আবেগ — নায়ক থেকে কিংবদন্তি
যখন কিশোর কুমারের কণ্ঠে পর্দা কাঁপছে, তখনও রফি ছিলেন ধর্মেন্দ্রর হৃদয়ের অনুবাদক। সত্তর ও আশির দশকেও তাঁদের যুগলবন্দি বেঁচে ছিল স্মৃতিময় আবেগে। এই সময়েও ধর্মেন্দ্রর জন্য অমর কিছু গান গেয়েছিলেন মহম্মদ রফি। যেমন “ইয়ে দুনিয়া ইয়ে মেহফিল” —হীর রাঞ্ঝা ছবিতে রফির গাওয়া এই গান যেন চিরসবুজ হয়ে আছে। বা ‘মেরে সনম’ ছবিতে ধর্মেন্দ্রর জন্য গাওয়া গান ‘পুকারতা চলা হুঁ ম্যায়’। তাঁদের যুগলবন্দির শেষ দিকের এক মণিমুক্তো ছিল বাগাওয়াত ছবিতে গাওয়া নাগিন সা রূপ তেরা। রফির সুরে আবারও ফিরেছিল ধর্মেন্দ্রর নায়কোচিত ব্যাপার স্যাপার।
চলচ্চিত্র সমালোচক রাজু ভারতন একবার লিখেছিলেন, “রফি শুধু ধর্মেন্দ্রর জন্য গান করেননি, তিনি ধর্মেন্দ্রর আত্মা হয়ে গিয়েছিলেন।”