
শেষ আপডেট: 17 January 2024 16:01
দিল্লির আকবর হোটেলে টানা এক মাস বসে 'আঁধি'র চিত্রনাট্য লিখেছিলেন গুলজার। একমাস সেই হোটেলের ঘর থেকে বেরোননি গুলজার। গুলজারকে খাবারদাবার সার্ভ করতেন এক ওয়েটার যার নাম ছিল জে কে। এত যত্নে সে গুলজারকে রেখেছিল যে গুলজার মনে করলেন তাঁর ঋণ শোধ করা দরকার। তাই গুলজার তাঁর ছবির নায়কের নাম রাখলেন জে কে। যে রোলটি করেন সঞ্জীব কুমার।
'আঁধি'র নায়িকা আরতি দেবীর চরিত্র কিন্তু গুলজার প্রথমে অফার করেন বৈজয়ন্তীমালাকে। কিন্তু বৈজয়ন্তীমালা চিত্রনাট্যে ইন্দিরা গান্ধীর ছায়া খুঁজে পেয়ে ছবির অফার নিতে সাহস করেননি। পরে অবশ্য 'আঁধি'র সাফল্য দেখে, তাও এক বাঙালি নায়িকার দৌলতে, নিজের প্রত্যাখ্যানের জন্য আপশোস করেন বৈজয়ন্তীমালা।

পরে গুলজার বলেছিলেন, "আরতি দেবী ইন্দিরা গান্ধী নয়, একজন মহিলা রাজনীতিবিদের গল্প। মূলত ছবির গল্প গড়ে উঠেছিল বিহারের এক জননেত্রী তারকেশ্বরী সিনহার জীবন অবলম্বনে।" কিন্তু গুলজারের সেই কথা তাঁর স্ত্রী রাখি গুলজারই মানেননি, তো দেশের জনতা কেন মানবে! গুলজার আরও বলেন "তবে এটা ঠিকই চরিত্রটি বিহারের জননেত্রীর হলেও, সে চরিত্রের আদল ছিল ইন্দিরা গান্ধীরই।

হাঁটাচলা, কাঁচা পাকা চুলের স্টাইল, ফাইল হাতে নেওয়া, মাইকে ভাষণ দেওয়া- সব মিলিয়ে টোটাল ইন্দিরা গান্ধী। ঐ অভিনয় 'স্যার' ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। "স্যার! সুচিত্রা সেন। সুচিত্রা সেন প্রথম তাঁর থেকে জুনিয়র পরিচালক গুলজারকে 'স্যার' বলে ডাকেন। গুলজার অবাক হলে সুচিত্রা বলেন "পরিচালকই ফিল্মের শিক্ষক অভিভাবক।" গুলজারও সুচিত্রা সেনকে উল্টে 'স্যার' বলেই চিরকাল ডেকে এসেছেন শ্রদ্ধাবশত।
গুলজারের কথায় "স্যার হচ্ছেন আমার কাছে লর্ড কৃষ্ণ। সুচিত্রা সেনও তাই ভগবান কৃষ্ণ। ভগবান কৃষ্ণ একবার যে জায়গা ছেড়ে চলে এসেছেন সেখানে আর ফিরে যাননি কখনও। সুচিত্রা সেনও তাই, একবার যে রোল করেছিলেন সেই রোলগুলোর দিকে আর ফিরেও তাকাননি। এতেই মানুষের আসল চরিত্রটা বোঝা যায়।"

১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় 'আঁধি' মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পরেই ছবিটি নিষিদ্ধ করে তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধী সরকার। ছবিতে দেখানো হয়েছিল এক বিখ্যাত জননেত্রীর রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তাঁর প্রেমজীবনের গল্প। যিনি তাঁর রাজনীতিবিদ বাবার অমতে বিয়ে করেন এবং পরে সেই স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। যখন সেই মেয়েটি বিখ্যাত নেত্রী, তখন আবার স্বামীর সঙ্গে দেখা। হোটেলের ম্যানেজার স্বামী জে কের সঙ্গে আরতি দেবীর অন্তরঙ্গতা নিয়ে তাঁর ভোটপ্রচারে কাদা ছেটানো হয়।

'আঁধি' রাজনৈতিক ময়দানে এক নায়িকাকেন্দ্রিক গল্প হলেও শেষ পর্যন্ত রোম্যান্টিক গল্পে উত্তরণ ঘটে। অন্যদিকে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসেও জওহরলাল নেহেরু ইন্দিরাকে অক্সফোর্ডে পাঠান উচ্চশিক্ষা লাভ করতে। সে সময় ভারত থেকে আরেকজন যুবক অক্সফোর্ডে লেখাপড়া করছিলেন। যার নাম ফিরোজ জাহাঙ্গির খান গান্ধী। যিনি আদতে পারস্যের লোক, হিন্দু নয়। অক্সফোর্ডে গিয়ে ইন্দিরা ও ফিরোজের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়, একে অন্যের গভীর প্রেমে পড়েন। কিন্তু ভিন্ন ধর্মে বিয়ে দিতে রাজি ছিলেননা ইন্দিরার পরিবার।

ফিরোজকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবেন না এমন প্রতিজ্ঞা-চিঠি লিখে তাঁর বাবাকে শুনিয়ে দেন ইন্দিরা। জওহরলাল নেহেরু বুঝতে পেরেছিলেন মেয়েকে থামানো অসম্ভব। দিশেহারা জওহরলাল নেহেরু ছুটে গেলেন মহাত্মা গান্ধীর কাছে। ইন্দিরার মতি যদি মহাত্মা ফেরাতে পারেন! কিন্তু মহাত্মা গান্ধীও পারলেন না, অথবা চেষ্টা করলেন না। মহাত্মা গান্ধী জওহরলাল নেহেরুকে বললেন, "আমার ছেলের সঙ্গে ইন্দিরাকে বিয়ে দিতে রাজি হবে?" জওহরলাল নেহেরু সম্মতি জানালেন। মহাত্মা গান্ধী বললেন "আজ থেকে ফিরোজ আমার ছেলে।" ১৯৪২ সালে হিন্দু রীতি মেনে বিয়ে হয় ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহেরু ও ফিরোজ জাহাঙ্গির খান গান্ধীর। জওহরলাল মন থেকে মেনে নিতে পারেননি ভিন্নধর্মী জামাইকে। কিন্তু ফিরোজ-ইন্দিরার বিয়ে সুখের হয়নি। এমনকি জওহরলালের বিরুদ্ধেও কণ্ঠ তোলেন জামাই ফিরোজ। ইন্দিরা-ফিরোজের ছাড়াছাড়ি ও ইন্দিরার জননেত্রী হয়ে ওঠা বিশ্ব ইতিহাসের বড় খবর তখন।

'আঁধি' ছবিতে আরতি দেবীর অতীত জীবনের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায় ইন্দিরার জীবন-যৌবন। ছবিতে ছিল আরতি দেবীর যৌনজীবন, সুরায় আসক্তি, ধূমপান সহ কিছু খোলামেলা দৃশ্য। যা ইন্দিরা গান্ধীর গায়ে কাদা ছেটানোর প্রয়াস বলে দাবি করে ছবিটি নিষিদ্ধ করা দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৭৭ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের ফলে জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসে এবং এই ছবির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। 'আঁধি'র টেলিভিশন প্রিমিয়ারেও ব্যাপক সাড়া ফেলে।
মূলত বাংলা ছবির নায়িকা হয়েও সুচিত্রা সেনের জীবনে 'আঁধি' মাইলস্টোন। ২৩তম ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জন্য নমিনেশন পেয়েছিলেন সুচিত্রা সেন এবং ছবিটিতে অভিনয় করার জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পান সঞ্জীব কুমার৷ ছবিটি সেবার ফিল্মফেয়ার ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড-এ শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার পায়৷ 'আঁধি' ছবিটির জনপ্রিয়তার আরও একটা দিক হল রাহুল দেব বর্মনের সুরে লতা মঙ্গেশকর এবং কিশোর কুমারের গান।
আঁধি 'ব্যান' হওয়ায় সুচিত্রা সেন খুব দুঃখ পান। ধাক্কা খেয়েছিল সুচিত্রা সেনের বম্বে প্রত্যাবর্তনও। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে কেউ তাঁকে কখনও কোনও বিরূপ মন্তব্য করতে শোনেননি। যদিও এই 'ব্যান' হওয়াতে 'আঁধি' সংবাদ শিরোনামে চলে আসে যাতে ছবিটি দেখার আগ্রহ সারা দেশের মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পায় আর ছবির গানের রেকর্ড তো সুপার ডুপার হিট। 'পদ্মশ্রী' খেতাব পাবার পর সুচিত্রা সেন ১৯৭২ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সৌজন্য-সাক্ষাৎও করেন। পরবর্তীকালে বেশ কয়েকবার দুই প্রিয়দর্শিনীর সাক্ষাৎ হয়।
পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার খবরে সুচিত্রা সেন খুব মুষড়ে পরেছিলেন। সারাদিনই রেডিও কানে আর টিভি খুলে বসে ছিলেন। ঐ সময় মুনমুন সেন শ্যুটিং-এ বাইরে ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার খবর মিডিয়ায় চাউর হওয়ার আগেই সুচিত্রা সেনের কাছে সে খবর পৌঁছে যায় এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে কারফিউ জারি হবার আগেই মুনমুনকে কলকাতা ফিরে আসতে ফোন করেন।

কীভাবে এত আগে কোন সোর্সে সুচিত্রা সেন খবর পেয়েছিলেন তাঁর কিনারা মুনমুন সেন আজও করতে পারেননি। সমাজবিচ্ছিন্ন অন্তরাল জীবনে থাকলেও পরিবারের রিমোট কন্ট্রোলটি সুচিত্রা সেনের হাতেই থাকত।

ইন্দিরা গান্ধীর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পেয়ে তার কাছের কয়েকজন মানুষকে দুঃখ করে বলেছিলেন সুচিত্রা সেন, "মিসেস গান্ধীকে আমি বিশ্বের অন্যতম সেরা রাজনীতিবিদ বলে মনে করি। তাঁর মতো 'ক্যারিশমা' কারও দেখিনি। মিসেস গান্ধীর অকালমৃত্যুতে দেশ অনাথ হয়ে গেল।''