আশাপূর্ণা দেবীর কাহিনি অবলম্বনে, ‘অগ্নিপরীক্ষা’র হিন্দি রূপ। বাঙালির জাত্যাভিমান আর সর্বভারতীয় দর্শকের সামনে নিজেকে প্রমাণের তাগিদে ভরপুর উত্তম এই ছবির শেষে কী পেয়েছিলেন জানেন? একরাশ হতাশা, জটিলতা এমনকি বিশ্বাসঘাতকতাও।

শেষ আপডেট: 17 October 2025 21:08
বাংলা ছবির ইতিহাসে তিনি ছিলেন সেই ধ্রুবতারা, যাকে আঁকড়ে বহুদিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল ইন্ডাস্ট্রি, নাবিকের দল দিক ভুল করে হারিয়ে যায়নি মহাসমুদ্রে, তিনি মহানায়ক উত্তম কুমার। পর্দায় নাম থাকলেই হলে ভিড়, শহর থেকে গ্রাম-- দর্শক তাঁর একঝলক দেখার অপেক্ষায়। 'পাশে দাঁড়ান' আকুতি নিয়ে হাত পাততে হয়নি দীর্ঘকায় মানুষটিকে, তবু জীবনের সবটাই কি ছিল বিনা কণ্টকময়? আলো যেমন তাঁর সঙ্গী ছিল, তেমনই ছিল ছায়াও। সেই ছায়ার সবচেয়ে কালো অধ্যায়—১৯৬৭ সালের তাঁর স্বপ্নের ছবি, ‘ছোটি সি মুলাকাত’।
ছবিটি ছিল মহানায়কের স্বপ্ন। বাংলা সিনেমার বাইরে, সর্বভারতীয় পরিসরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার অদম্য ইচ্ছেই ছিল এই ছবির শিকড়। আশাপূর্ণা দেবীর কাহিনি অবলম্বনে, ‘অগ্নিপরীক্ষা’র হিন্দি রূপ। বাঙালির জাত্যাভিমান আর সর্বভারতীয় দর্শকের সামনে নিজেকে প্রমাণের তাগিদে ভরপুর উত্তম এই ছবির শেষে কী পেয়েছিলেন জানেন? একরাশ হতাশা, জটিলতা এমনকি বিশ্বাসঘাতকতাও।
ভাই তরুণ কুমারকে ডেকে একদিন বলেছিলেন, “আমি প্রমাণ করতে চাই, বাঙালিও পারে ভালো, রুচিশীল সিনেমা বানাতে। আমাদের ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই।”এই বিশ্বাস থেকেই শুরু ‘ছোটি সি মুলাকাত’–এর পথচলা। প্রথমে ঠিক হয়, ছবিটি প্রযোজনা করবেন তিনজন—উত্তমকুমার, আলো সরকার (পরিচালক) এবং অভি ভট্টাচার্য। পরিকল্পনা ছিল, যৌথ প্রযোজনায় তৈরি হবে এক শিল্পসমৃদ্ধ, বাণিজ্যিক হিন্দি সিনেমা।

কিন্তু তা আর হল কই? ইতিহাস সাক্ষী, খুব দ্রুত মতানৈক্য দেখা দেয় তিন প্রযোজকের মধ্যে। প্রথমে সরে যান অভি ভট্টাচার্য। পরে আলো সরকারও প্রযোজনা থেকে সরে গিয়ে দাবি করেন মোটা পারিশ্রমিক— পরিচালনার দায়িত্ব নিতে রাজি, কিন্তু লাভ হলে অতিরিক্ত টাকাও চাই। উত্তমকুমার তাতেও রাজি হয়ে যান, চোখে তখন শুধু একটাই লক্ষ্য—একটা সফল সিনেমা, একটা ভাল ছবি, যার নায়ক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা একরাশ স্বপ্ন দেখা এক বাঙালি।
সিনেমার কলাকুশলী নির্বাচনেও কোথাও কার্পণ্য করেননি উত্তমকুমার। সেই সময়ের বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালাকে বেছে নেওয়া হয় নায়িকার চরিত্রে। সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন বিখ্যাত সুরকার জয়কিষাণ। আর প্লে-ব্যাকে ছিলে লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে এবং মহম্মদ রফির মতো শিল্পী। সব খাপে খাপ, তবু কোথাও যেন এক গন্ডগোল, আভাস পেয়েছিলেন উত্তম নিজেই। অভিনয়টাই পারতেন, সেটাই করতে চাইতেন, কিন্তু ব্যবসা? না, গুছিয়ে উঠতে পারছিলেন না কিছুতেই। ঠিক এমনই এক সময় ডাক পাঠালেন ভাই তরুণ কুমারকে, 'বম্বে আয়, প্রোডাকশনের কাজটা সামলা'।

তরুণকুমার তখন নিজেও ব্যস্ত। মঞ্চ অভিনয়ে তখন তিনি কলকাতা কাঁপাচ্ছেন। তবু দাদার ডাক, তিনি গেলেন বম্বে। আর পৌঁছেই টের পেলেন, 'অঙ্ক কী কঠিন'। হিসেব কিছুতেই মিলছে না।
তিদিন সকাল দশটায় নায়িকা বৈজয়ন্তীমালা সেটে এলেও, মেক-আপ শেষ হতে দুই ঘণ্টা চলে যায়। পরিচালক আলো সরকারের আচরণও সুবিধের লাগেনি তাঁর। ভালো শটকেও ‘নট গুড’ বলে বাতিল করা হচ্ছে। ওদিকে জলের মতো অপচয় হচ্ছে দাদার যাবতীয় সঞ্চয়।
তবুও দাদার স্বপ্নে ভরসা রেখে কাজ চালিয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে কিছুটা শৃঙ্খলাও ফিরলেও ততদিনে সময় পার হয়েছে অনেক, টাকাও উড়ে গিয়েছে লক্ষ লক্ষ।
প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে চলল ‘ছোটি সি মুলাকাত’–এর শ্যুটিং। এর মধ্যেই উত্তমকুমার অভিনয় করেছেন ‘থানা থেকে আসছি’, ‘রাজকন্যা’, ‘সূর্যতপা’–র মতো জনপ্রিয় ছবিতে, এমনকি সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’–তেও। কলকাতা থেকে মুম্বই, শ্যুটিং থেকে স্টুডিও, অর্থের হিসাব থেকে স্ক্রিপ্ট— একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে আর যেন পারছিলেন না মহানায়ক। তবু স্বপ্ন বড় দায়!

শেষমেশ যখন ছবির কাজ শেষ, তখন আবার নতুন ধাক্কা। ট্রেলার মুক্তি পেল, কিন্তু সেখানে প্রযোজক হিসেবে উত্তমকুমারের নামই নেই! পরিচালক আলো সরকারের নামটাই শুধু বড় করে লেখা। এই অপমান চাক্ষুষ করেও সেদিন প্রতিবাদ করেননি উত্তম। পাছে ছবি মুক্তি আটকে যায়! কিন্তু দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ল না তাঁর। কলকাতা ফেরার পথে উত্তমকুমারের বিমান দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। সেদিন প্রাণে বেঁচে গেলেও, সেই ধাক্কা তাঁর হৃদয়ে গভীর দাগ ফেলে। হার্ট অ্যাটাকের পর তিনি তখন প্রায় শয্যাশায়ী। সেই সময়েই আসে আরও এক দুঃসংবাদ—‘ছোটি সি মুলাকাত’ বক্স অফিসে চূড়ান্ত ব্যর্থ। সেদিন চুরমার হয় উত্তমের স্বপ্ন। অর্থের ক্ষতি? তা তখন আকাশ ছুঁয়েছে।
শোনা যায়, বাংলার হিরোকে সম্মুখীন হতে হয়েছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের। অনেকেও এও দাবি করেন, রাজ কাপুর নাকি বম্বেতে ছবির প্রচারে কলকাঠি নেড়েছিলেন ভালভাবেই। কেউ বলেছিলেন, ব্যর্থতার কারণ উত্তমকুমারের হিন্দি উচ্চারণ আবার কারও মতে ছবির গতি ছিল দুর্বল। ওদিকে শাম্মি কাপুরের মতো উত্তম-ভক্ত বলেছিলেন, “উত্তমকুমারের মতো অভিনেতাকে বোঝার মতো পরিপক্বতা হিন্দি দর্শকের নেই।”
ওদিকে মহানায়কের মাথায় তখন লক্ষ লক্ষ দেনা। আবার নতুন করে শুরু। হাল ছাড়েননি উত্তম। নতুন উদ্যমে শুরু করলেন অভিনয়। এখন আর কোনো চরিত্রই অপছন্দের বলে ফিরিয়ে দেন না। দেবেনই বা কী করে? টাকার যে দরকার। তরুণ কুমার পরে স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, “দাদা তখনও হাসতেন। বলতেন, ব্যর্থতা তো জীবনেরই অংশ। আমি অভিনয় করে আবার সব ফেরাব।”
ফিরিয়েও ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে শক্তি সামন্তের ‘অমানুষ’ আর ‘আনন্দ আশ্রম’–এ অভিনয় করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন হিন্দি সিনেমাতেও তিনি সমান পারদর্শী। ‘ছোটি সি মুলাকাত’ আজ ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে ছবির স্মৃতিও হয়েছে ধূসর। তবু বলিউডের অন্দরে বা গোল টেবিলের বৈঠকে আজও ঘুরেফিরে আসে সেই সব অজানা গল্প, যার হদিশ পাননি কেউই! বেশিরভাগই থেকে গিয়েছে গভীর কোটরে।
তথ্যসূত্র:
১। আমার দাদা উত্তমকুমার – তরুণ কুমার
২। আমার আমি – উত্তমকুমার