Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
নববর্ষের শুভেচ্ছাতেও মুখ্যমন্ত্রীর SIR তোপ! গণতান্ত্রিকভাবে জবাব দেওয়ার আহ্বান রাজ্যবাসীকেইরানের সব পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে‌ দেওয়া হয়েছে, দাবি আমেরিকার, চিন্তা ইরানি ল্যান্ডমাইনও Poila Baisakh: দক্ষিণেশ্বর থেকে কালীঘাট, নববর্ষে অগণিত ভক্তের ভিড়, পুজো দিতে লম্বা লাইনপয়লা বৈশাখেই কালবৈশাখীর দুর্যোগ! মাটি হতে পারে বেরনোর প্ল্যান, কোন কোন জেলায় বৃষ্টির পূর্বাভাসমেয়েকে শ্বাসরোধ করে মেরে আত্মঘাতী মহিলা! বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে জোড়া মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত রহস্য UCL: চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ চারে পিএসজি-আতলেতিকো, ছিটকে গেল বার্সা-লিভারপুল‘ইরানকে বিশ্বাস নেই’, যুদ্ধবিরতির মাঝে বিস্ফোরক জেডি ভ্যান্স! তবে কি ভেস্তে যাবে শান্তি আলোচনা?১৮০ নাবালিকাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শোষণ! মোবাইলে মিলল ৩৫০ অশ্লীল ভিডিও, ধৃতের রয়েছে রাজনৈতিক যোগ ৩৩ বছর পর মুখোমুখি ইজরায়েল-লেবানন! ওয়াশিংটনের বৈঠকে কি মিলবে যুদ্ধবিরতির সমাধান?ইউরোপের আদালতে ‘গোপনীয়তা’ কবচ পেলেন নীরব মোদী, জটিল হচ্ছে পলাতক ব্যবসায়ীর প্রত্যর্পণ-লড়াই

দাবার চালে কিস্তিমাত করল 'দাবাড়ু',ছবি শেষে রয়ে যায় আনন্দ-অশ্রু

রমরম করে চলছে 'দাবাড়ু'। কেমন হল ছবিটি? রিভিউ লিখলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

দাবার চালে কিস্তিমাত করল 'দাবাড়ু',ছবি শেষে রয়ে যায় আনন্দ-অশ্রু

রমরম করে চলছে 'দাবাড়ু'। কেমন হল ছবিটি?

শেষ আপডেট: 22 May 2024 19:00

ছবি - দাবাড়ু

চরিত্রচিত্রণে - ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, দীপঙ্কর দে, চিরঞ্জিত, শঙ্কর চক্রবর্তী, সমদর্শী, অর্ঘ্য

পরিচালনা - পথিকৃৎ বসু

প্রযোজনা - উইন্ডোজ প্রোডাকশন 

দ্য ওয়াল রেটিং - ৮.৫ / ১০ 

রমরম করে চলছে 'দাবাড়ু'। কেমন হল ছবিটি? রিভিউ লিখলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় 

''বড় প্লেয়ারের আসল পরীক্ষা জিতে আসায় নয়, ফিরে আসায় হয়!" দীপঙ্কর দে-র এই সংলাপ যেন 'দাবাড়ু' ছবির সারসত্য। খেলা নিয়ে ছবি এবং ছোটদের নিয়ে ছবি, অনেকদিন পর টালিগঞ্জ পাড়ায়। বাঙালির খেলা মানেই তো  ফুটবল ক্রিকেট। কিন্তু এককালে বাঙালি বুদ্ধিতে বাজিমাত করত দাবা খেলায়। ঘরে ঘরে আট থেকে আশির মনের সঙ্গী ছিল দাবা। সে বাঙালি টাকায় রাজা না হলেও রাজার খেলায় খুঁজে পেত প্রাণের আনন্দ। অথচ দাবা আজ অবহেলায় পিছিয়ে পড়েছে অনেকটাই। সেই দাবা খেলাকে নিয়েই সর্বাঙ্গসুন্দর বাংলা ছবি বানিয়েছেন পথিকৃৎ বসু। শিবপ্রসাদ-নন্দিতার প্রযোজনায় উইন্ডোজ প্রোডাকশনের ছবি'দাবাড়ু' মন জয় করেছে সব্বার । নবীন পরিচালক পথিকৃৎ এর মতো হীরে চিনতে শিবপ্রসাদ-নন্দিতার জহুরির চোখ ভুল করেনি। 'দাবাড়ু' শুধু স্পোর্টস মুভি নয়, খেলার পরতে পরতে রয়েছে টানটান পারিবারিক গল্প। অথচ নেই অহেতুক মেলোড্রামা। খেলা কেন্দ্রিক নিখুঁত ছবি বহু যুগ পর দেখে যেন মনের শান্তি, প্রাণের আরাম। 

'দাবাড়ু' দেখতে যাবার সৌভাগ্য হল টলিকুইন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর আমন্ত্রণে। আমি নিশ্চিত  প্রতিটি দর্শক 'দাবাড়ু' দেখে এক বুক প্রশান্তি নিয়ে ছবিঘর থেকে বেরবেন। ছবিটি যেন উইন্ডোজকে নতুন করে প্রথম আসনে বসাল। 'দাবাড়ু' যেমন খেলা নিয়ে ছবি তেমন এ ছবি দাদু-নাতির গল্প,মা-ছেলের গল্প। করুণা চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত আর তাঁর ছেলে সূর্যর অভিনয় মনে করাল শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ২০১১ রিলিজ 'ইচ্ছে' ছবিটিকে। 

মাত্র ১৬ বছর বয়সে গ্র‍্যান্ডমাস্টার হওয়া সূর্যশেখর গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবন কাহিনির নির্যাস নিয়ে পথিকৃৎ বসু তৈরি করেছেন 'দাবাড়ু'। তবে পুরোপুরি লাইফস্টোরি নয়। খেলোয়াড়ের লড়াই শুধু তাঁর একার নয়, তার পরিবারের,তার প্রশিক্ষকের, তার পারিপার্শ্বিক সমাজের। আমরা খেলোয়াড়ের সাফল্যে পাশে থাকি, কিন্তু বার বার খেলাতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যে অনিশ্চয়তা,তার জীবনের অভাব অনটন কষ্ট, তার খবর আমরা রাখি কই? শুধুমাত্র টাকার অভাবে কত প্রতিভা বিদেশে গিয়ে খেলতে পারে না। সেই বাস্তবকে দুর্দান্ত ভাবে ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। 

এই ছবি দেখতে দেখতে যেন ফেলে আসা আশি-নব্বই দশকে চলে গেছিলাম।যখন হাতে হাতে মোবাইল ফোন নেই, হোয়াটস অ্যাপ ফেসবুক নেই, কিন্তু রকের আড্ডা আছে, দেওয়ালে কাস্তে হাতুড়ি তারা আছে, সাদা-কালো টিভিতে বি আর চোপড়ার 'মহাভারত' আছে। সূর্যশেখর ছবিতে বিস্ময় বালক সৌর (যার ছোটবেলা করেছে সমদর্শী আর কিশোর বেলা করেছে অর্ঘ্য)। সৌরর দাবায় হাতেখড়ি দাদুর কাছে। কিন্তু সৌরর মা করুণাও দাবা খেলতে জানে। সংসার আর দারিদ্রের চাপে করুণা নিজের স্বপ্নপূরণ করতে চায় একমাত্র ছেলেকে দিয়ে। করুণার স্বামীর  চরিত্রে শঙ্কর চক্রবর্তী ,এককালে জ্যোতিষচর্চা করলেও তার পসার জমেনি। সে শ্বশুরের ঘরজামাই। একদিন ছোট্ট সৌর দাবা খেলায় পাড়ার ক্লাবের দাবা খেলোয়াড়দের হারিয়ে দেয়। পড়াশোনা বাদ দিয়ে দাবায় মন দেয় সে। আর সৌর চোখে পড়ে যায় পিতৃসম এক প্রশিক্ষকের (চিরঞ্জিত চক্রবর্তী)। চিরঞ্জিত বলেন আসল চ্যাম্পিয়ন সে যে ওলট পালট হয়ে যাওয়া দাবার ঘুটি নতুন করে সাজিয়ে আবার সবটা ঠিক করে দিতে পারে।

এই দীক্ষামন্ত্রে সফল হয় সৌর। আর তাতেই তাঁর উত্তরণ। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তাঁর নাম। সৌরর অর্জিত টাকাতেই চলে তাঁদের ধুকতে থাকা সংসার। আত্মীয় পড়শিরা বলতে থাকে দাবা যেন সোনার খনি। কিন্তু উত্তরণের মাঝেই আসে টাকার অভাব। বিদেশে খেলতে যাবার টাকা কোথা থেকে আসবে দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারে? সরকার কী তাঁদের পাশে দাঁড়াবে? খেলার উন্নতির পাশাপাশি সৌরর কৈশোরে আসে প্রথম প্রেম। কিন্তু সৌর শেষ পর্যন্ত মনোনিবেশ করে  দাবায়। তবে কিশোর প্রেমকে ভিলেন বানানো হয়নি ছবিতে। বরং ধীরেধীরে সৌরর এই প্রেম তার উত্তরণের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে। আর সঙ্গে ছিল দাদুর আশীর্বাদ। দাদু-নাতির গল্প দ্বিতীয়ার্ধে হয়ে ওঠে মা-ছেলের গল্প। টানটান চিত্রনাট্য ও জবরদস্ত সংলাপে এতটুকু ক্লান্তি আসে না। সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে সৌর গ্র‍্যান্ডমাস্টার হবেই যা দেখার অপেক্ষায় মুখিয়ে থাকেন দর্শক। 

অভিনয় প্রসঙ্গে প্রথমেই যার কথা বলতে হয় তিনি দীপঙ্কর দে। কী অভিনয়টাই না করলেন। দাবাড়ু যেন দীপঙ্কর দে'র জন্যই তৈরি। এই ছবির রাশ তিনি টেনে রেখেছেন। এক আটপৌরে শিক্ষিত স্নেহময় দাদুর চরিত্রে তিনি অতুলনীয়। তাঁর অভিনয় দেখতে এ ছবি বারবার দেখা যায়।

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ছবির প্রাণপ্রতিমা। আমাদের নব্বই দশকের আটপৌরে মাকে ফিরে  পাওয়া গেছে তাঁর মধ্যে। মায়ের চরিত্র হলেও ঋতুপর্ণা ছাড়া এ ছবি অসম্ভব। শান্ত গভীর বুক চাপা কষ্টের অভিনয়ে বহুদিন পর এক পরিণত ঋতুপর্ণাকে  ফিরে পাওয়া গেল। ছেলেকে প্রেরণা দেওয়া থেকে ছেলের প্রেমপত্র পড়ে ছেলেকে চড় মারার দৃশ্যে ঋতুপর্ণা দুর্দান্ত। শেষদৃশ্যেও তিনি অপ্রতিরোধ্য। মা-ছেলের বন্ডিং অন্যদিকে বাবা-মেয়ের বন্ডিং। আবার বেকার স্বামীর পাশেও থাকা কী সুন্দর করে সামলেছেন ঋতুপর্ণা। গ্ল্যামারাস ঋতুপর্ণাকে সরিয়ে করুণার চরিত্রে ঋতুপর্ণার উত্তরণ অনবদ্য।

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী এই প্রথম শিবপ্রসাদ-নন্দিতার প্রোডাকশনের ছবিতে কাজ করলেন । ২০ বছর আগে শিবপ্রসাদ-নন্দিতার 'মুসকিল আসান' সিরিয়ালের হিরো হন চিরঞ্জিত। দু দশক পেরিয়ে ঠিক সময়োচিত চরিত্রে চিরঞ্জিত চক্রবর্তীকে যে ভাবে ব্যবহার করলেন পথিকৃৎ তা প্রশংসনীয়। যে প্রশিক্ষককে বাবার আসনেই বসানো যায়। চিরঞ্জিতের একটি সংলাপে রয়েছে 'যেটাকে আপনি কেঁচো ভাবছেন সেটা আসলে কেউটে'। এককালে তো পরিচালক চিরঞ্জিত কেঁচো খুঁড়তে সাপ বাংলা প্রবাদটাকেই পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন কেউটে এনে। সেইটা মনে রেখে সংলাপ বেশ লাগল। শঙ্কর চক্রবর্তী অসহায় বাবার ভূমিকায় বড় বাস্তব। মনেই হয়নি তিনি অভিনয় করছেন। যখন ছেলের সঙ্গে মায়ের দূরত্ব বাড়ছে তখন বাবা শঙ্কর ছেলের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার দৃশ্যে অসাধারণ। বাবাকে নতুন করে চিনতে পারে ছেলে। নতুন কোচ কৌশিক সেন ছবিতে ধূসর চরিত্রে যথাযথ। সুদখোর চরিত্রে খরাজ মুখোপাধ্যায় বেশ । সংঘশ্রী সিংহ মিত্রের উপস্থিতি থেকে অভিনয় পুরনো দিনের অভিনেত্রী রেণুকা রায়ের কথা মনে করায়। সেই দাপট। বিশ্বনাথ বসুর চরিত্রটা স্ত্রী সংঘশ্রীর কপি পেস্ট খুব বেশি কিছু করার নেই। অতনু বর্মণকে ছোট্ট চরিত্রে অনেকদিন পর ভাল লাগল। ক্রীড়ামন্ত্রী রূপে অভিজিৎ গুহর সাদা টুপি সুভাষ চক্রবর্তীর অনুসরণে তৈরি। বেশ নস্ট্যালজিক লাগল।

এবার যে দুজনের অভিনয় প্রসঙ্গে বলব, সৌর চরিত্রের দুই অভিনেতা। ক্ষুদে সমদর্শী সরকার প্রথমেই সবার মন জিতে নেয়। যেমনি মিষ্টি কন্ঠ তেমনই অপাপবিদ্ধ মায়াময় মুখ। কী পাল্লা দিয়ে অভিনয় করল দীপঙ্কর দে,চিরঞ্জিত ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর মতো তিন দাপুটে স্টারের সঙ্গে। কিশোর সৌরর  চরিত্রে অর্ঘ্য বসু রায় ভীষণ স্মার্ট। মায়ের উপর অভিমান, বান্ধবীর সঙ্গে আলাপন বা গুন্ডাদের জব্দ করার দৃশ্য-সব ক্ষেত্রেই অর্ঘ্যর অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করে। সৌরর বান্ধবীর চরিত্রে তীর্থা মিস্ত্রি সাবলীল। 

'দাবাড়ু' ছবির সবচেয়ে মন কাড়ল ছবির সেট থেকে পোশাক পরিকল্পনা। একেবারে আশি-নব্বইয়ের দশকে ফিরে গেলাম। খুব ডিটেইলে চারপাশ ঐ সময়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আটপৌরে ঘরদোর, এস টি ডি ফোন বুথ, রোববার সকাল নটায় টিভিতে চলা মহাভারত সিরিয়ালের উন্মাদনা, সাদা নীল রেনল্ডস পেন, হাতপাখা, সেই সময়কার চশমার ফ্রেম -যেন পুরনো দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

Rituparna and Chiranjit come together again for Dabaru

অসামান্য চিত্রনাট‌্য লিখেছেন অরিত্র বন্দ্যোপাধ‌্যায় আর আবেগপূর্ণ সংলাপে অনন্য  অর্পণ গুপ্ত। বনি চক্রবর্তীর সংগীত পরিচালনায় রূপম ইসলামের গাওয়া শীর্ষসঙ্গীতটি ক্লাইম্যাক্সে দুর্দান্ত। মৈনাক-সুরঙ্গনার 'ঝগড়া করি চল' গানটি প্রথম প্রেমের মতোই শ্রুতিমধুর। তবু ছবির গানগুলো আরো ভাল হওয়ার দাবি রাখে। 

তবে ছবির শেষে চেন্নাইয়ের রাস্তায় ঋতুপর্ণার দৌড় ক্লাইম্যাক্স আনলেও অনেকটাই হিন্দি ছবির অনুকরণ বলে মনে হয়। তেমনই আটপৌরে অভাবী মা বোঝাতে সে ঘরে-বাইরে সর্বক্ষণ সাদাসিধে করে শাড়ি পরে চলাফেরা করছে যা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। নব্বই দশকের মহিলারা বাইরে বেরবার সময় প্রচলিত স্টাইলেই শাড়ি পরতেন। তবু ঋতুপর্ণার অভিনয়ের সততায় একটি শ্রেষ্ঠ চরিত্র হয়ে থাকল 'করুণা'। 


```