শেষ আপডেট: 2 November 2022 05:46
বাংলায় চলচ্চিত্রের মাচো-লুকের হিরোদের মধ্যে আজও তিনি সামনের সারিতে। টু হ্যান্ডসম ম্যান অন স্ক্রিন! চিরঞ্জিত চক্রবর্তী (Chiranjeet Chakraborty)। আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
আটের দশকের পর থেকে আজ অবধি তাঁর মতো বাঙালি সুপারস্টার আর একজনও এল না, যাঁর আর্বিভাব দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করতেই। অনেকেই বলেন, দেব, জিত তো এসেছেন। তবে দেখতে গেলে দেব আজকাল অন্যধারার ছবিতেই মন দিয়েছেন আর জিতের হার্ডকোর ছবিগুলিতে বড্ড বেশী দক্ষিণী হাওয়ার রমরমা।
কিন্তু চিরঞ্জিতের ছবিগুলি যেন ছিল নিখাদ বাঙালি গল্প, সেখানে একান্নবর্তী পরিবারের বড় দাদার দায়িত্ব যেমন ছিল, তেমন ছিল প্রেমিকার জন্য একবুক ভালবাসাও। আবার তিনিই ভিলেনকে জব্দ করে তিনটে শো-তে সিঙ্গেলপ্লেক্সের বাংলা ছবি হাউসফুল করেছেন। মহানায়ক-পরবর্তী মরাগাঙে জোয়ারের জল আনত চিরঞ্জিতের সংলাপ। যেসব সংলাপ আজও মিথ।
সুপারস্টার বা বিজয়ী বিধায়ক হিসেবেই নয়, মানুষ চিরঞ্জিতও অতি আন্তরিক এবং মার্জিত, নম্র, বিনয়ী এক ভদ্রলোক। ওঁর স্টারডমের অভাব নেই, তবু আজও মাটিতে পা দিয়ে চলেন। গুণী বাবার শিক্ষা বলেই একে মনে করেন অনেকে। চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর বাবা শৈল চক্রবর্তী ছিলেন বিখ্যাত কার্টুনিস্ট, ইলাস্ট্রেটর তথা ইন্ডিয়ান পাপেট্রি'র জনক। সত্যজিৎ রায়ের 'সন্দেশ' পত্রিকার বহু ইলাস্ট্রেশন তাঁর করা। এমনকি রবীন্দ্রনাথে'র 'ল্যাবরেটরি'র ইলাস্ট্রেশনও তাঁরই হাতের সৃষ্টি।
চিরঞ্জিত নিজেও 'দেশ' পত্রিকা-সহ কলকাতা দূরদর্শনে কাজ করেছেন সংবাদপাঠক রূপে। তখন তিনি দীপক চক্রবর্তী। প্রথম যৌবনে সত্যজিৎ রায়কেও অ্যাসিস্ট করেছেন চিরঞ্জিত, আবার 'লক্ষণের শক্তিশেলে' অভিনয়ও করেছেন। সত্যজিৎ রায় চিরঞ্জিতকে বলেছিলেন, "তুমি তো এখন অনেক সুপারহিট ছবি-টবি করছ। লক্ষণের চরিত্রে তোমায় ভাবছিলাম। কিন্তু গোঁফ থাকলে তো চলবে না। ছেড়ে দাও তবে ছবিটা। এমনিতেও এটা ছোট চরিত্র।"
সত্যজিৎ যাই বলুন, তাঁর ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি চিরঞ্জিত। তার উপর তাঁর সঙ্গে রামের ভূমিকায় অভিনয় করবেন কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি রাজি হয়ে গোঁফ ছেঁটেও ফেলেন। বাকিটা ইতিহাস। কিন্তু চমকপ্রদ বিষয়, সেসময় তিনি আরও একটা ছবি করছিলেন 'অগ্নিতৃষ্ণা', পরিচালক প্রভাত রায়। সেই ছবিতেও তিনি গোঁফ-ছাড়া অভিনয় করে হিট দেন।
চিরঞ্জিত মানেই 'প্রতীক'-এর বেজন্মা, যাঁর বাঁশির সুরে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাস। 'পাপী'র গরিব বড়দা, 'প্রতিকার'-এর সুদর্শন পুলিশ অফিসার ভাই, 'বেয়াদপ'-এর কালী ডাকাত। মাচো-লুকের হিরো। বার সেই চিরঞ্জিতই 'প্রেম ও পাপ' ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর রোম্যান্টিক হিরো, 'সমর্পিতা'য় আল্পনা গোস্বামী-নন্দিনী মালিয়ার ক্রাশ, কলেজের আধ্যাপক, তিনিই 'ঘরের বৌ' শতাব্দী রায়কে দিচ্ছেন যোগ্য 'মর্যাদা',
'সেদিন চৈত্রমাস'-এ ভীষণ পছন্দের বস, 'ভয়' থেকে দেবশ্রী রায়কে উদ্ধারকারী ভগবান, আবার 'বাড়িওয়ালি'তে বনলতা আর সুদেষ্ণার চিরপ্রেমিক পরিচালক দীপঙ্কর বাবু।
একজন মানুষের এতগুলো চরিত্র কমই দেখা যায়। এবার পুজোতে দীর্ঘ ২০ বছর পর মুক্তি পেল চিরঞ্জিতের ছবি, পরিচালক অয়ন চক্রবর্তীর 'ষড়রিপু'। ছবিটি জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছে দর্শকমহলের।
[caption id="attachment_2387681" align="alignnone" width="720"]
মেয়ে দীপাবলি ও স্ত্রী রত্নাবলি।[/caption]
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী নিজেও একজন সফল পরিচালক। কিন্তু একসময়ের টলিউড ত্রাতা আজ নিভৃতে, নীরবে নিজের মতো করেই থাকতে পছন্দ করেন। জন্মদিন কাটান কাছের মানুষদের সঙ্গে নিজের ফ্ল্যাটেই। তিনি আজকাল বেছে ছবি করেন, বিরাজমান রাজনীতির জগতেও কিন্তু নিজের ঢাক নিজে পেটানোয় তিনি বিশ্বাসী নন। মিডিয়ায় রোজ মুখ দেখানোও তাঁর স্বভাব নয়। এই প্রচারের যুগেও তিনি চুপ করে থাকতেই ভালবাসেন।একান্ত আলাপচারিতায় অনেকদিন পর ইন্ডাস্ট্রি ও বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ নিয়ে মুখ খুললেন চিরঞ্জিত।
অনেক ভাল ভাল থিম আসে মাথায়, ছবি করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ছবি করার বড্ড ঝামেলা। আজকাল আর অত খাটাখাটি পোষায় না। অনেকেই তো বলে ছবি করতে। কিন্তু সিনেমাই তো নেই আর। আমাদের সময় ৭৫০ সিনেমাহল ছিল। তার মধ্যে এখন ৭১০ টা বন্ধ। এখন সেই সংখ্যা শুধুমাত্র ৪০।
হলমালিক থেকে ইন্টেলেকচুয়ালদের কাছে প্রশ্ন করুন বাংলার ৭৫০টা সিঙ্গেলপ্লেক্স এই দশকে ৪০ হয়ে গেল কী করে? মেনস্ট্রিম ছবিকে অপমান করার ফলই কি এটা?
সেই চল্লিশটাও সেরকম চলছে না। আর বাকি ৬০টার মতো মাল্টিপ্লেক্স। সেখানে দিনে ছটা ছবি। তার মধ্যে বাংলা ছবি জায়গা পাচ্ছে মাত্র একটা। মাল্টিপ্লেক্সে বাংলা ছবি চলে না। কারণ ওদের টিকিটের দাম এত বেশী যেটা মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শকের রেঞ্জের বাইরে। আর মাল্টিপ্লেক্সে গিয়ে বাংলা ছবি মানুষ দেখে না, কারণ বাংলা ছবির সেই আকর্ষণটা তৈরি করতে পারেনি। কমার্শিয়াল বাংলা সিনেমা বড় পর্দায় প্রায় শেষ।
ওটিটি-তে বাংলা ছবি দেখতে গেলে অ্যানড্রয়েড ফোন লাগে, যা নিম্ন থেকে মধ্যবিত্ত সমস্ত বাঙালির কাছে সহজলভ্য নয়। তার পর ওই ওটিটি প্ল্যাটফর্মটা কিনতে হবে পয়সা খরচ করে। ক'জন এতগুলো ওটিটি অ্যাপ কিনবে! যদি কেনেও, সে ভাল ভাল ইংরেজি, হিন্দি ছবি দেখবে। বাংলা ওটিটি-তে তো কার্যত পর্নোগ্রাফি চলছে লোক টানতে।
আমাদের সময় একটাই ছবি তিনটে শো-তে চলত একদিনে সাড়ে সাতশোটা হলে। বেশী চাহিদা হলে চারটে শো করে দিত দুপুর এগারোটা থেকে। ভাবতে পারছেন তফাতটা! তাই এখন আর পরিচালনা করার প্রয়োজন বোধ করি না। তবু ইচ্ছে করে কিছু গল্প বলতে। তখন আবার শ্রদ্ধেয় অশোক কুমার (বম্বে)-এর কথা আমার মনে পড়ে। অশোক কুমার আমায় খুব পছন্দ করতেন। ওঁর বাড়িতেও যেতে বলেছিলেন আমাকে।
এখানে একটা সন্ধে কিশোর কুমার নাইটে পুরো আমার সাথে আমার হাত ধরে বসেছিলেন উনি। তখন আমি 'মর্যাদা' ছবি ডিরেকশান দিচ্ছিলাম। সেসময় আমাকে অশোক কুমার একটা কথা বলেছিলেন, "ছবি পরিচালনা করা তো গাধার খাটুনি! এত খাটনির তোমার কি দরকার। তুমি সুপারস্টার সুপারস্টারই থাকো।"
আমি সেটাই ভাবলাম, যে নায়ক একজন সুপারস্টার তার কোনও দরকার নেই রোদে বসে আরেক জন আর্টিস্ট তার ছবি করতে কেন সময়ে এল না সে জন্য মাথা চাপড়ানোর, প্রোডিউসার কী বলল, কেন টাকা কমিয়ে দিল-- অত ঝামেলায় যাওয়ার দরকার কী আর।
চিরঞ্জিত একমাত্র সেই অভিনেতা, যিনি ফিল্ম, যাত্রা, পেশাদার রঙ্গমঞ্চ, টেলিভিশন-- সবকটি মাধ্যমে আইকনিক কাজ করেছেন। যেসব কাজ আজও মানুষের মুখে মুখে ঘোরে।
এখনকার ছেলেগুলোর জন্য আমার খুব কষ্ট হয়। অনির্বাণ, ঋত্বিক, পরমদের জন্য। যখন সিনেমাটা মরে গেছে, পেশাদার মঞ্চ, থিয়েটারও মরে গেছে, তখন ওরা ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছে। সবথেকে ভাল সময়টা আমরা মানে আমি, বুম্বা (প্রসেনজিৎ), রঞ্জিতদা কাজ করে এলাম। তাপস তো চলেই গেল। আমি তো সবচেয়ে বেশি কাজ করেছি। আমি যে পেশাদার মঞ্চে একের পর এক সুপারহিট থিয়েটার করেছি সেই স্টেজটা বুম্বা, রঞ্জিতদা, তাপস কেউ করেনি।
বুম্বা স্টেজ করলেও তখন স্ট্রাগলার, ছোট রোল করত। আর আমি মঞ্চে শুরুই করেছি নায়ক হয়ে, সুপারহিট নাটক 'নাগপাশ' দিয়ে। ৭৫০ রজনী সুপারহিট। আমার খেলাটাই অন্যরকম, ছয় মেরে মেরে খেলা। মঞ্চের পরে সিনেমা। তার পর আমি যাত্রা করেছি চার বছর। যাত্রাতে আমি হায়েস্ট পেইড অভিনেতা ছিলাম এবং সেই ইতিহাস আজও কেউ ভাঙতে পারেনি। পঁচিশ বছর আগে ১ লাখ টাকা পারিশ্রমিক হলে আজকে সেটা কত টাকা হবে! কত ফাংশন করেছি আমরা! এখন সেসব নাইট কোথায়!
https://youtu.be/a5Cf9TnhOS4
এখনকার অভিনেতারা তো কিছুই পাচ্ছে না। লো বাজেট সিনেমা, পাবলিকের সঙ্গে কোনও কমিউনিকেশান নেই, মাস টিকিট কেটে কর্মাশিয়াল ফিল্ম দেখে না, এরা কেউ স্টার নয়। এদের জন্য ভিড় হচ্ছে না হলে। কিন্তু এরা দুর্দান্ত সব অভিনেতা। ঋত্বিক চক্রবর্তী এযুগের সেরা অভিনেতা, কিন্তু তাঁকে রাস্তায় কেউ চেনে না। অদ্ভুত সময়ে চলেছি আমরা। সেই সময়টাই নেই আর।
আমার 'বাড়িওয়ালি' টিভিতে দেখায় না। অথচ ভাল ছবি তো! কিন্তু 'বেয়াদপ', 'জয় বিজয়' দু'সপ্তাহে একবার দেখায়। মানুষ দেখে তাই দেখায়। আমজনতাকে অস্বীকার করার জায়গা নেই। স্টার নিয়ে ফিল্ম নেই, সেইসব পারিবারিক বাংলা ছবি নেই বলেই হল হাউসফুল হয় না। আজকাল কোনও নায়কের সংলাপ কি হিট হয়!
https://youtu.be/xJdGk2-H--E
ইন্টেলেকচুয়ালরা পচা সিনেমা বলতে পারেন কিন্তু সিনেমার গোল্ডেন পিরিয়ডে আমরা কাজ করেছি। উত্তমকুমারের সময় ৪৫০ সিনেমাহল ছিল। সেটা আমরা ৭৫০ করেছিলাম। আসল গল্প এটাই। সেই যুগ, সেই বক্সঅফিসের দাপট আজকাল আর নেই। তাই এরা অনেকেই রাজনৈতিক দলে যাচ্ছে। এখনকার ডিরেক্টররা হিন্দি ছবি করছেন। হিন্দি ছবিতে ছোট অকিঞ্চিৎকর রোল করতে চলে যাচ্ছে। বম্বেতে ছোট ছবি ঢুকতেই পারবে না। যাই হোক, স্ট্রাগল করছে। কিন্তু আমার খুব কষ্ট হয়। টালিগঞ্জ পাড়াটা মরে গেল। সিনেমাহল আর বাংলা ছবি বাঁচাতে সমবেত চেষ্টা দরকার। শুধু ইন্টেলেকচুয়াল ছবি নয়। মেনস্ট্রিম ছবি সিনেমাহল বাঁচাতে পারবে। সেটাই করার নির্মাতা আজকাল নেই। করলেও সব তামিল-তেলেগু রিমেক।
পলিটিক্সে আমি যেতে চাইনি। আমায় বারবার অনুরোধ করে নিয়ে গেছে। যেচে যাইনি। যাই হোক, মানুষ তো আমায় ভালবেসে জিতিয়েছেন তাই মানুষের পাশে আছি।
আমি একটা ছবির কথা ভেবেছি। স্ক্রিপ্ট করার কথা একজনকে বলেছি। সে ইন্টেলেকচুয়াল ফিল্ম লিখে নিয়ে এসেছিল আমার কাছে। আমি না হয় টাকা কম নিয়েও পার্ট করে দেব কিন্তু সে ছবিটা তো হলে চলবে না। লাভ কী? আমি তাঁকে বললাম, চল 'কেঁচো খুঁড়তে কেউটে' বানাই। পার্ট টু। তুই আমার সঙ্গে থাক। তাঁকে চিত্রনাট্য লিখতে বলেছি। আমি ডিরেকশান দেব। দেখা যাক আদৌ তার ভিতর কর্মাশিয়াল ছবির স্ক্রিপ্ট লেখার ক্ষমতা আছে কিনা।
এমন একটা আমার সুপার ডুপার হিট ছবির পার্ট টু আমি করতে চাই। আমার পার্ট টু-র গল্পটা ভাবাই আছে। কেঁচো খুঁড়তে সাপকে আমি কেউটে বানিয়ে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়েছিলাম। সেটার রিপিট যদি করি সেই 'কেঁচো খুড়তে কেউটে' রোলে যদি আবার চিরঞ্জিত ফিরে আসে আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি যে সিনেমাহল আবার হাউসফুল করে দেব। সেইসব দর্শক আবার সেই চিরঞ্জিতকে দেখতে সেসব সংলাপ শুনতে হলে ছুটে আসবেন।
[caption id="attachment_2387682" align="aligncenter" width="585"]
স্ত্রী রত্নাবলির সঙ্গে।[/caption]
রূপে-নাচে-অভিনয়ে অনন্যা, তবু জোটেনি নায়িকার রোল! অভিমানেই বুঝি অকালে চলে গেলেন সোনালী