
দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে কাজল
শেষ আপডেট: 8 April 2024 14:30
'মা মা মা মাগো
তুই আমায়
দয়া করবি কিনা বল
বল মা মাতঙ্গী !
আমি ভজন সাধন জানিনে মা
জেতেতে ফিরিঙ্গি !
তুই আমায় দয়া করবি কিনা বল !'
অ্যান্টনি কবিয়াল আর নিরুপমার প্রেম যেন বাংলার চিত্রপটে স্মরণীয় হয়ে আছে আজও। মধ্য কলকাতার বৌ বাজার অঞ্চলে রয়েছে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি প্রতিষ্ঠিত 'ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি'। ঐতিহাসিক তথ্য আর লোকমুখে প্রচলিত মিথ রহস্য চিরকাল আছে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিকে ঘিরে। তবে এই অ্যান্টনি সাহেবকে বাঙালির মনে জায়গা করে দিয়েছেন যিনি তিনি উত্তমকুমার। সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ১৯৬৭ সালের ছবি 'অ্যান্টনী ফিরিঙ্গী' ছবিতে উত্তমকুমার কালীভক্ত অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি আর তাঁর বাঙালি স্ত্রী নিরুপমার ভূমিকায় তনুজা। যে নিরুপমা চেয়েছিল বাড়িতে দুর্গাপুজো করতে। অ্যান্টনি সাহেব পুজোর সব ব্যবস্থা করে দিলেও উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণদের রোষানলে পুড়ে যায় অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির ঘর। সঙ্গে আগুনে দগ্ধ হয় সোনার প্রতিমা নিরুপমা। তনুজা এই নিরুপমার চরিত্র করে প্রতিটি বাঙালির মনে জায়গা করে নেন।
অভিনেত্রী শোভনা সমর্থর মেয়ে তনুজা অবাঙালি হয়েও স্পষ্ট উচ্চারণে বাংলা বলেছিলেন দেয়া নেয়া, অ্যান্টনী ফিরিঙ্গী, তিন ভুবনের পারে বা প্রথম কদম ফুল ছবিতে। বলিউডেও তনুজা প্রথম সারির নায়িকা। শুধু তাই নয় বম্বের শশধর মুখার্জির পরিবারের বউ হন তনুজা। খোদ বাঙালি পরিবারে বিয়ে হয় তাঁর। সোমু মুখার্জী ও তনুজা মুখার্জীর দুই মেয়ে কাজল ও তানিশা। কাজল ও তানিশা মায়ের পথেই নায়িকা হন। তানিশা অভিনয় জগতে ছাপ ফেলতে না পারলেও কাজল হয়ে যান নাইন্টিজ কুইন অফ বলিউড।
গত ৩১ মার্চ কলকাতায় এসেছেন কাজল। কাজলের সঙ্গে ছিলেন বলিউডের বাঙালি অভিনেতা রণিত রায়। আগামী সিনেমা ‘মা’-এর শ্যুটিং করতে কলকাতায় আসেন তাঁরা। বর্ধমানের একাধিক জায়গায় 'মা' ছবির শ্যুটিং করেছেন অভিনেত্রী। আউশগ্রামের জঙ্গলেও শ্যুটিংয়ের ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। 'মা' কাজলের ঘরের ছবি। 'মা' ছবিটির পরিচালনা করছেন বিশাল ফুরিয়া। ছবিটির প্রযোজনা করছেন কাজলের স্বামী অভিনেতা অজয় দেবগন। অজয় নিজে এসে এর আগে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় রেইকি করে গিয়েছেন।
তবে মেয়ে কাজল বাংলায় এসেছেন মা আসবেন না তা কি হয়, যে তনুজার জন্য আজও বাঙালিরা পাগল! আশি পার করা তনুজা নাতির হাত ধরে একাই চলে এলেন কলকাতা। ভাবা যায়! শুক্রবার সকালে নাতি যুগকে সঙ্গে করে নিয়ে মুম্বই থেকে কলকাতা উড়ে আসেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। কাজলের ছেলের নাম যুগ দেবগন। দিদি নাইসা যতটা লাইমলাইটে থাকেন, যুগ কিছুটা অন্তরালেই। মা কাজল যখন শান্তিনিকেতনে শ্যুটিংয়ে ব্যস্ত, তখন দিদিমার হাত ধরে যুগ চলে আসেন কলকাতায়। শনিবার বেলা ৩টের দিকে কাজল দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে হাজির হন তাঁর মা তনুজা এবং ছেলে যুগের সঙ্গে। দক্ষিণেশ্বরে মায়ের মন্দিরে পুজো দেন তাঁরা।
তনুজা আর কাজল দুজনেই দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে। দুই নক্ষত্রকে দেখতে ভিড় উপচে পড়ে। এত বছর পর তনুজা মেয়ে নাতিকে সঙ্গে করে গেলেন দক্ষিণেশ্বরে মায়ের মন্দিরে। যেন সেই প্রথম যৌবনের নিরুপমাকে বাংলার মানুষ ফিরে পেল আশি পেরনো তনুজার মধ্যে।
হুইলচেয়ারে করেই মন্দির থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গিয়েছে তনুজাকে। সাদা রঙের স্যুট এবং রঙিন ওড়না পরেছিলেন তিনি। সুতির আনারকলি লাল কুর্তা আর দোপাট্টা পরে দেখা মিলেছে কাজলের। প্রায় কুড়ি মিনিট মন্দিরের ভিতরে ছিলেন তাঁরা। কড়া নিরাপত্তায় পুজো দিয়েছেন। এরপরই কলকাতায় ফিরে আসেন। চৈত্রের প্রখর দাবদাহে একেবারে তেতেপুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয় এ দিন তাঁদের। মা ও দিদাকে আগলে ছবি তুলল যুগ দেবগন।
এর আগে অভিনেতা রণিত রায়কে দেখা গিয়েছিল শান্তিনিকেতনের কঙ্কালীতলায় পুজো দিতে। আবার এখন কাজলকে দেখা গেল দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে। মুম্বই বিমানবন্দরে দিদিমার সঙ্গে যুগকে দেখামাত্রই ক্যামেরাবন্দি করেন ছবি শিকারিরা। যে ভাবে দিদিমার হাত ধরে বিমানবন্দরে ঢুকছিলেন যুগ, তাতে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ নেটপাড়া। এ বার দক্ষিণেশ্বর মন্দিরেও একইভাবে দেখা গেল অভিনেত্রীর ছেলেকে।
কলকাতায় পা রেখেই মেজাজি নায়িকা তনুজা ছুটে গেলেন দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে। আজও তিনি সত্যিকারের বাঙালি বাড়ির বউ, মনেপ্রাণে বাঙালি। আবার প্রমাণ হয়ে গেল। মেয়ে নাতিকেও সেই আদর্শে দীক্ষিত করেছেন আমাদের নিরুপমা তনুজা।